পরিত্যক্ত বাড়ি

পর্ব - ৬

🟢

রাফি বলল, “আপনি কে?”

লোকটা কিছুক্ষণ রাফির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

“তুই আমাকে চিনবি না।”

-কিন্তু আপনি কি আমাকে চেনেন।”

- হুম চিনি।”

- আমার বাবাকে চিনতেন?”

লোকটা মাথা নাড়ল।

-হ্যাঁ।”

-সালেহাকে?”

-হ্যাঁ।”

-তাহলে এখন সব বলুন।”

লোকটা চুপ করে রইল। তারপর আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল “তোর বাবা একটা ভুল করেছিল।”

-কী ভুল?”

-সে ভেবেছিল, একটা শিশুকে মেরে ফেলে আরেকটা শিশুকে বাঁচানো যায়।”

রাফি স্থির হয়ে গেল। লোকটা বলল,

-২০০৯ সালে আগুন লাগার রাতে এখানে দুইজন শিশু ছিল।”

রাফির শ্বাস আটকে গেল।

-তার ভিতর একজন তুই।”

-আর অন্যজন কে?”

লোকটা তার দিকে তাকিয়ে বলল

-তোর যমজ ভাই।”

রাফি যেন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল। তার কোনো যমজ ভাই ছিল যে তার এটা জানা ছিল না।

লোকটা বলল,

-তোদের জন্মের পর তোর বাবা-মা তোদের আলাদা করে রেখেছিল। কারণ তোর ভাইয়ের একটা বিরল রোগ ছিল। যেটার চিকিৎসা ব্যর্থ হচ্ছিল।”

-তারপর?”

-তোর বাবা একজন গবেষকের সাহায্য নেয়।”

-কে সেই গবেষক?”

লোকটা নিজের বুকের দিকে আঙুল দেখাল। “আমি।”

রাফি ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।

“আমি সেই গবেষক, যে তোর ভাইকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম।”

-তাহলে আমার ভাই কোথায়?”

লোকটা উত্তর দেওয়ার আগে—ঘরের বাইরে থেকে মেহরিনের চিৎকার এলো।

“রাফি, রাফি!”

রাফি দরজার দিকে ঘুরল। কিন্তু লোকটা তার হাত ধরে ফেলল।

“এখন বের হবি না।”

“কেন?”

“কারণ তুই এখনও জানিস না, কে তোকে এখানে নিয়ে আসছে।” রাফি তার হাত সরিয়ে দিল।

“কে আর আপনি?”

বিজ্ঞাপন

লোকটা মাথা নাড়ল। “না।”

তারপর সে আয়নাটা ঘুরিয়ে দিল।

আয়নায় দেখা গেল—মেহরিন ও তানভীর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তাদের মাঝখানে আরেকজন।

একজন বৃদ্ধ। রাফির বাবার মতো দেখতে। রাফি দরজা খুলে বেরিয়ে এলো, করিডোর ফাঁকা। মেহরিন আর তানভীর সেখানে নেই। শুধু মেঝেতে পড়ে আছে মেহরিনের ক্যামেরা।

রাফি ক্যামেরাটা তুলে নিল। স্ক্রিনে শেষের ছবিটা খোলা।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে—মেহরিন ও তানভীর কালো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। তাদের পেছনে একজন বৃদ্ধ। ছবির নিচে সময়—২:৫৮। রাফি ঘড়ির দিকে তাকাল ২:৫৯ বাজে। তারপর ফোন বেজে উঠল। মেহরিনের কল। রাফি ফোন ধরল, ওপাশে মেহরিনের কণ্ঠ—“রাফি, আমরা নিচতলায় আছি।”

রাফি চারপাশে তাকিয়ে বলল “তুই মাত্রই চিৎকার করলি এত তাড়াতাড়ি নিচ তলায় কীভাবে?”

মেহরিন বলক “তুই কোথায়?”

রাফি বলল “উত্তরের ঘরটায় যে ঢুকলাম এখানেই আছি।”

তারপর মেহরিন বলল,

-রাফি…!

-হ্যাঁ বল?

-তোর পাশে কে দাঁড়িয়ে আছে?

- রাফি ধীরে ঘুরে তাকাল সেই গবেষক লোকটা নেই।

তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে—রাফির বাবা। কিন্তু তার বাবা তো মারা গেছে এগারো বছর আগে। বৃদ্ধ লোকটা রাফির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই এবার সত্যিটা জানলি।”

রাফি পিছিয়ে গেল। বলল,

“আপনি কে?”

বৃদ্ধ হেসে বলল, “তুই যাকে এতদিন বাবা বলে চিনেছিস…!”

তারপর সে নিজের মুখের মুখোশের চামড়া টেনে খুলে ফেলল। ভেতরে অন্য একজনের মুখ। “আমি তোর আসল বাবা নই।”

রাফির বুক কেঁপে উঠল। লোকটা বলল—

“তোর বাবা ২০০৯ সালেই মারা গেছে, আর যে মানুষটা তোকে এত বছর বড় করেছে…”

লোকটা ধীরে ধীরে রাফির কাছে এসে বলল, “সে ছিল সেই মানুষ, যে তোর আসল পরিচয় লুকিয়েছিল।”

ঘড়িতে তখন—৩টা ১৬ বাজে। দূরে কোথাও একটা পুরোনো ঘড়ি একবার বেজে উঠলো। রাফি হঠাৎ বুঝতে পারল—

সালেহার ডায়েরি, হাসপাতালের কাগজ, পুরোনো ছবি, ক্যামেরা। সবকিছু একই সময়ের দিকে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর ঠিক তখনই কালো দরজার ভেতর থেকে একটা শিশুর কণ্ঠ শোনা গেল—“ভাইয়া…!”

তখনই রাফি পিছন দিক ঘুরে দেখে লোকটি নেই। রাফি হতভম্ব হয়ে গেল। কণ্ঠটা পরিচিত ছিলো, খুব পরিচিত। শৈশবের কোনো গভীর জায়গা থেকে উঠে আসা একটা স্মৃতি। তারপর শিশুটি বলল—“তুই সেদিন আমাকে রেখে পালিয়ে গিয়েছিলি।”

ঘড়ির কাঁটা বদলে গেল ৩টা ১৮। কালো দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। আর বাইরে থেকে মেহরিনের কণ্ঠ শোনা গেল—“রাফি, দরজা খুলিস না।”

এক সেকেন্ড পর—আরেকটা মেহরিনের কণ্ঠ শোনা গেল দরজার ওপাশ থেকেই।

“রাফি, দরজা খোল।” দুটো কণ্ঠ একসঙ্গে।

একটা সত্যি ছিলো একটা মিথ্যা ছিলো। আর রাফির হাতে তখন একটাই জিনিস—তার বাবার পুরোনো চাবি।

চাবির গায়ে খোদাই করা মাত্র তিনটি সংখ্যা—০৩৭। রাফি চাবিটার দিকে তাকাল। তারপর কালো দরজার তালার দিকে। তালায় তিনটি ঘর।

প্রথম ঘরে—০

দ্বিতীয় ঘরে—৩

তৃতীয় ঘরে—৭

রাফি ধীরে ধীরে বুঝতে পারল—এই চাবিটা দরজা খোলার জন্য নয়। কাউকে বাইরে আটকে রাখার জন্য।

আর দরজার ওপাশ থেকে শিশুটার কণ্ঠ আবার শোনা গেল—“ভাইয়া… এবার অন্তত আমাকে বের হতে দে।”

বিজ্ঞাপন
পরিত্যক্ত বাড়ি গল্পটি নিলয় মাহমুদ রাকিব-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভয়ানক রহস্যময় গল্প