দরজার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা হাতটা এখনও স্থির। হাতে ধরে থাকা ছোট্ট লাল খেলনা গাড়ির দিকে রাফি তাকিয়ে আছে। তার মনে পড়ছে—এই গাড়িটা সে আট বছর বয়সে হারিয়েছিল। বাবা বলেছিলেন, গাড়িটা হয়তো বাড়ির পেছনের পুকুরে পড়ে গেছে। কিন্তু খেলনাটা এখানে কীভাবে?
তানভীর রাফির কাঁধে হাত রেখে বলল “পিছিয়ে আয়।”
কিন্তু রাফি নড়ল না। দরজার ওপাশ থেকে আবার সেই কণ্ঠ এলো—
“তুই কি সত্যিই কিছুই মনে করতে পারিস না?”
রাফি এবার বলল, “আপনি কে?”
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসলোনা। হাতটা ধীরে ধীরে দরজার ওপাশে চলে গেলো। তারপর দরজাটা পুরোপুরি খুলে গেল। ঘরটা ছোট, একটা কাঠের চেয়ার, একটা টেবিল, দেয়ালে পুরোনো কাগজ লাগানো। আর টেবিলের ওপর একটা টেপ রেকর্ডার। কিন্তু সেখানে কোনে মানুষ নেই। তানভীর চারপাশ দেখে বলল,
“এখানে কেউ ছিল দেখে মনে হচ্ছে।”
মেঝেতে জুতোর ছাপ এখন কেউ এখান দিয়ে হেঁটে গেছে।
কিন্তু দরজা দিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার কোনো ছাপ নেই।
রাফি টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। টেপ রেকর্ডারের পাশে একটা খাম রাখা আছে। খামটির ওপরে লেখা—
“রাফির জন্য রাখা চিঠি।”
রাফির বুক ধক করে উঠল। রাফি বলল, “এটা তো আমার বাবার হাতের লেখা।”
মেহরিন খামটা খুলতে বলল। ভেতরে একটা চিঠি, সেখানে লেখা -
- রাফি,
“তুই যদি এই চিঠিটা পড়িস, তার মানে তুই আবার এই বাড়িতে এসেছিস। আমি জানি তোর ছোট বেলার কিছুই মনে নেই। আমি ইচ্ছে করেই তোকে ভুলিয়ে দিয়েছিলাম সবকিছু। কারণ সেদিন যা ঘটেছিল, সেটা যদি তোর এখনো মনে থাকত তাহলে তুই স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারতিস না। আর, কালো দরজার ওপাশে কোনো অদৃশ্য আত্মা বা ভূত নেই। আছে একটা মানুষ আর তুই সে মানুষটাকে চিনিস। আর সেও তোকে অনেক আগে থেকেই চেনে।”
চিঠি সেখানেই শেষ। রাফি চিঠিটা হাত থেকে নামিয়ে রাখল।
“আমার বাবা আমাকে কী ভুলিয়ে রাখতে পারে?”
তানভীর বলল, “হয়তো তোর ছোটবেলায় কোনো দুর্ঘটনা হয়েছিল।”
মেহরিন ঘরের ভিতরে ঘুরে ঘুরে দিখছিল, একপাশে দেওয়ালের দিক তাকিয়ে হঠাৎ সে বলল,
“এখানে কারও একটা ছবি আছে।”
দেয়ালে একটা পুরোনো ছবিসহ ফ্রেম। ধুলো সরাতেই ছবিটা পরিষ্কার দেখা গেলো। ছবিতে আট বয়সে তোলা রাফির ছবি, তার পাশে দাড়িয়ে তার বাবা, আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আরেকজন রাফির মতো দেখতে হুবুহু। একই মুখ, একই বয়স, একই পোশাক। রাফি ছবিটা দেখে পিছিয়ে গেল।
“এটা…..”
তার মাথার ভেতর হঠাৎ একটা দৃশ্য ঝলকে উঠল।
বৃষ্টি, কালো দরজা, বাবার হাত, আর একটা শিশুর কান্নার আওয়াজ। তারপর একটা বাক্য—
“ওকে বাইরে বের হতে দিও না।”
রাফি মাথা চেপে ধরল। মেহরিন তাকে ধরে চেয়ারে বসালো।
তানভীর বলল “কিছু কি মনে পড়ছে?”
রাফি চোখ বন্ধ করে বলল,
“একটা ছেলে ছিল।”
“কী ছেলে, কে সে?”
“আমার মতো দেখতে হুবুহু।”
“তুই কি তাকে চিনতিস?”
রাফি উত্তর দিতে পারল না। কারণ এবার আরেকটা স্মৃতি ফিরে এসেছে তার মাথায়। ছেলেটা তার সঙ্গে খেলছিল।
একই লাল গাড়ি নিয়ে। তারপর বাবা এসে দুজনকে আলাদা করে দিয়ে বলছিলো
রাফিকে বলেছিলো—“তুই বাইরে থাকবি। ও ভেতরে যাবে।”
এরপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম আমি।
তারপর রাফি চিৎকার করে উঠলো রাফি চোখ খুলে বললো
“আমি ওকে ভেতরে রেখে এসেছিলাম।” রাত তখন ২টা ০৮।
তারা তিনজন আবার সেই গোপন ঘরে গেলো।
রাফি এবার বুঝলো এই বাড়িতে কোনো ভূত বা আত্মা নেই।
কেউ বহু বছর ধরে এই বাড়ির গোপন পথ ব্যবহার করে আসছে।
কেউ তাদেরকে গত কয়েকদিন ধরে নজরদারি করেছে।
কিন্তু একটা প্রশ্ন সবারই এখনও রয়ে গেছে—রাফির মতো দেখতে ওটা কে?
তানভীর টেবিলের পুরোনো নথিগুলো দেখতে লাগলো।
একটা ফাইল পাওয়া গেল। হাসপাতালের কাগজ।
তারিখ—১৮ আগস্ট ২০০৯।
রোগীর নাম: রাফি রহমান, বয়স: ৮ বছর।
রাফি কাগজটা দেখে তো স্তব্ধ। “আমি তো হাসপাতালে ছিলাম না।”
তানভীর কাগজের নিচের অংশ দেখাল। রোগীকে রাত ৩টা ১৭ মিনিটে মৃত ঘোষণা করা হয়।
মেহরিন ধীরে বলল, “কিন্তু তুই তো বেঁচে আছিস।”
রাফি কিছুই বলল না। ফাইলের সঙ্গে আরেকটা কাগজ ছিল।
ডাক্তারের নোট: “রোগীর মুখমণ্ডল ও পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আগুনে শরীরের অধিকাংশ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত।”
রাফি এবার বুঝতে পারলো “আমার বাবা…” বলেই সে থেমে গেল। আবার বলতে শুরু করলো,
“আমার বাবা হয়তো কাউকে আমার নামে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন।”
তানভীর মাথা নাড়িয়ে বললো “হ্যা, এটাও হতে পারে।”
রাফি বললো “কিন্তু কেন সে এই কাজ করবে?”
মেহরিন নথির পরের পাতাটা বের করল।
সেখানে লেখা—“পরিবার দাবি করেছে মৃত শিশু তাদের সন্তান রাফি রহমান।” আর নিচে বাবার স্বাক্ষর দেওয়া।
রাফির বাবার সাক্ষর।
—---
রাত ২টা ২৬ বাজে। তারা বাড়ির পুরোনো স্টোররুমে গেলো একটা ধাতব বাক্স পেল। বাক্সের ভেতর পুরোনো খবরের কাগজ। একটা খবরের শিরোনাম—
“পরিত্যক্ত বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড, আট বছরের শিশুর মৃত্যু।”
তারিখ—১৮ আগস্ট ২০০৯।
-খবরে লেখা ছিল, আগুনে বাড়ির উত্তর পাশের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন শিশুকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এবং পরিবারের তথ্য অনুযায়ী শিশুটি তাদের ছেলে রাফি রহমান।
রাফি খবরের নিচের ছবিটা দেখল। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তার বাবা। তার পাশে একজন নারী-সালেহা রহমান।
কিন্তু সালেহা তো ২০০৯ সালের আগেই মারা গিয়েছিলেন।
রাফি কাগজটা উল্টে দেখল। পেছনে হাতে লেখা—
“সালেহা মারা যাননি। তাকে মৃত হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল।”
তানভীর বলল, “এখন ব্যাপারটা পরিষ্কার হচ্ছে।”
রাফি তার দিকে তাকাল। “কী?”
“এই বাড়িতে অন্তত দুইটা পরিচয় লুকানো হয়েছে।”
-কার কার?
“সালেহার।”
“আর?”
তানভীর রাফির দিকে তাকিয়ে বললো
“তোর।”
রাত তখন ২টা ৪১। হঠাৎ পুরো বাড়িতে বিদ্যুৎ চলে গেল।
তানভীর সঙ্গে সঙ্গে টর্চ জ্বালাল।
টর্চের আলো দেয়ালে পড়তেই মেহরিন দেখতে পেল দেয়ালে নতুন করে একটা লেখা। আগে সেখানে কিছু ছিল না। কালো কালি দিয়ে লেখা—“৩টা ১৭ বাজার আগে উত্তর ঘরে এসো।”
রাফি ঘড়ির দিকে তাকাল আর ৩৬ মিনিট বাকি। তারা উত্তর ঘরের দিকে এগোলো। কালো দরজার সামনে এসে রাফি খেয়াল করলো দরজার নিচে এবার কোনো পায়ের ছাপ নেই বরং ধুলোর উপরে একটা শব্দ লেখা—“শুধু একজনই ঢুকবে।”
তানভীর বলল, “কেউ আমাদের ভয় দেখাচ্ছে।”
রাফি বলল, “হ্যাঁ, সেটাই মনে হচ্ছে।”
তানভীর বলল “তাহলে তিনজনই একসঙ্গে ঢুকব।”
রাফি মাথা নাড়িয়ে “না।”
মেহরিন বলল “কেন?”
রাফি বলল “কারণ যে মানুষটা এটা লেখেছে, সে চায় আমরা তিনজন একসঙ্গে ঢুকি।”
রাফি দরজার দিকে তাকিয়ে বলল “এতদিন ধরে যেহেতু সে আমাদের নজর রেখেছে কাছ থেকে তাহলে সে আমাদের সিদ্ধান্তও বুঝতে পারবে, এখানে সে বুদ্ধি খাটিয়েছে।”
মেহরিন বলল “তাহলে এখন কী করবো?”
রাফি বলল “আমরা ওর অনুমান অনুযায়ী ঢুকবো না।”
রাফির হাতে ক্যামেরা ছিলো ক্যামেরাটা মেহরিনের হাতে দিল। তারপর দরজা খুলে সে একাই ভেতরে ঢুকল।
কালো দরজার ওপাশে ছোট একটা ঘর, ঘরের ঠিক মাঝখানে চেয়ার। চেয়ারের ওপর একটা পুরোনো আয়না রাখা। আর আয়নার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে— একজন মানুষ বয়স প্রায় চল্লিশ। চেহারায় ক্লান্ত ভাব। দাড়ি আছে। চোখের নিচে কালো দাগ। লোকটা ঘুরে দাঁড়াল।
“অবশেষে।”