তারা ওখান থেকে নিচতলায় ফিরে এলো বাড়ির পুরোনো বিদ্যুৎ সংযোগ পরীক্ষা করার জন্য, বিদ্যুৎ লাইন ঠিক করতে গিয়ে তানভীর একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করল।
মেইন সুইচ বন্ধ। পুরো বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু রান্নাঘরের পাশে একটা পুরোনো বৈদ্যুতিক মিটারে লাল আলো জ্বলছে। তানভীর মিটারটা খুলে দেখল।
মিটার চলছে এবং লেখাও উঠছে ঠিকঠাক ভাবে।
কিন্তু বিদুৎতের লাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন। সে মিটার নম্বরটা লিখে রাখল। তারপর নিজের মোবাইলে বিদ্যুৎ অফিসের পুরোনো ডাটাবেস থেকে নম্বর মিলিয়ে দেখল।
কয়েক মিনিট পর তার মুখের মানচিত্র বদলে গেল।
তানভীর বলল “এই মিটারটা এখনো কারও নামে আছে।”
রাফি জিজ্ঞেস করল “কার নামে?”
তানভীর নামটা বললো “সালেহা রহমান।”
মেহরিন বলল “এই বাড়ির মালিক হয়তো?”
তানভীর বললো “না।”
তানভীর মোবাইলের স্ক্রিন দেখাল।
“সালেহা রহমান এই বাড়ির মালিকের স্ত্রী ছিলেন।”
রাফি থেমে গিয়ে বলল “ছিলেন মানে এখন আর নেই?”
তানভীর বলল “হ্যাঁ। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী তিনি মারা গেছেন।”
রাফি বলল “তিনি কবে মারা গেছেন, এটা কি লেখা আছে?”
তানভীর তারিখটা দেখে বলল “১৭ বছর আগে।”
তাহলে এত বছর পরও তার নামে মিটার সচল থাকে কীভাবে?
আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার—মিটারের সর্বশেষ রিডিং আপডেট হয়েছে মাত্র তিন দিন আগে।
রাফি বলল,”চলো ওইদিক আগে যাওয়া যাক”
তারা ওখানে থেকে বাড়ির উত্তর পাশের করিডোরে পৌঁছাল
ঘড়িতে তখন রাত ১১টা ৩২।
সেখানেই ছিল সেই কালো দরজা। দরজাটা অন্য সব দরজার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। লোহার তৈরি। কোনো হাতল নেই টানার জন্য। শুধু মাঝখানে একটা ছোট গোল ছিদ্র। রাফি দরজার কাছে গিয়ে নিচের অংশ দেখতে লাগলো। ধুলোর ওপর কোনো পায়ের ছাপ নেই। কিন্তু দরজার নিচ দিয়ে খুব সামান্য বাতাস বের হচ্ছে।
তানভীর হাত রেখে বলল “ভেতরে বাতাস চলাচল করছে।”
রাফি বলল, “মানে ভেতরে ফাঁকা জায়গা আছে।”
মেহরিন দরজার ছবি তুলে নিলো। ক্যামেরার স্ক্রিনে ছবি দেখে সে হঠাৎ থেমে গেল। ছবিটা বড় করে দেখল।
দরজার ওপরের অংশে একটা ক্ষীণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
দেখে মনে হচ্ছে যেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের পেছনে—আরেকজনও দাঁড়িয়ে আছে।
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। করিডোর ফাঁকা কেউ নেই ওখানে।
রাফি ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে বলল, “আলোর প্রতিফলন হতে পারে।”
সে দরজার সামনে টর্চ ধরল। আবার ছবি তুলল।
এইবার কিছু নেই। তিনজনই বিষয়টা নিয়ে আর ভাবলোনা এড়িয়ে গেলো। সেখান থেকে তারা একটা ফাকা জায়গাই এসে বসলো। রাত তখন ১১টা ৪৯ বাজে।
তানভীর বাড়ির পুরোনো নকশা নিয়ে বসেছিল। হঠাৎ সে একটা বিষয় খেয়াল করল।
কালো রঙেরযে দরজারটা ছিলো তার অবস্থান যে দেয়ালে, সেই দেয়ালের দৈর্ঘ্য বাইরে থেকে মাপলে ৩২ ফুট। কিন্তু, এই বাড়ির নকশায় এই দেয়ালের দৈর্ঘ্য ৪১ ফুট। মানে নয় ফুটের পার্থক্য।
অর্থাৎ— দেয়ালের ভেতরে প্রায় নয় ফুট চওড়া একটা ফাঁকা জায়গা আছে। রাফি উঠে গিয়ে দেয়ালটা পরীক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর একটা সরু ফাটলের ভেতর ধাতব কিছু দেখতে পেল। সে টর্চ লাইট দিয়ে ভালোভাবে দেখলো। একটা পুরোনো লোহার রড। রডটা টেনে বের করতেই দেয়ালের একটা অংশ সামান্য নড়ে উঠলো।
পেছনে পুরো অন্ধকার। একটা সরু পথ দেখতে পেলো তারা ঢুকে পড়লো, একটা গোপন ঘর। তিনজন কেউ কিছু বলল না। তারা শুধু একে অপরের দিকে তাকাল।
রাফি প্রথমে ঘরটার ভিতরে ঢুকল। ঘরটা খুব ছোট ভেতরে একটা কাঠের টেবিল। একটা চেয়ার। আর দেয়ালে সারি সারি পুরোনো ছবি। সব ছবি একই ব্যক্তির, সালেহা রহমান।
কিন্তু ছবিগুলো দেখে একটা বিষয় পরিষ্কার হলো—সালেহা একা থাকতেন না।
প্রতিটি ছবির পেছনে, প্রতিটি আয়নার প্রতিফলনে, প্রতিটি জানালার কাঁচে—একজন পুরুষের অস্পষ্ট অবয়ব দেখা যাচ্ছে। মেহরিন ছবিগুলোর একে একে ফটো তুলতে লাগল। তারপর টেবিলের ওপর একটা ডায়েরি পেল।
ডায়েরির শেষ পাতাটা খোলা ছিলো। সেখানে মাত্র তিনটি লাইন লেখা
—সে কোনো অদৃশ্য আত্মা নয়।
সে এই বাড়ির ভেতরেই আছে।
আর সবচেয় আশ্চর্য ব্যাপার হলো—আমি তাকে দেখতে পাই না, কিন্তু সে আমাকে দেখতে পায়।
ডায়েরির নিচে একটা তারিখ লেখা ১৮ আগস্ট ২০০৯।
আজকের তারিখও ছিলো—১৮ আগস্ট। মেহরিনের হাত থেমে গেল।
রাফি ডায়েরিটা টান দিয়ে তুলে নিল। ঠিক তখনই ঘরের বাইরে থেকে একটা শব্দ এলো।
ঠক-একবার।
তারপর—ঠক। আরেকবার।
তানভীর ফিসফিস করে বলল,“আমরা তো দরজাটা খোলা রেখেছিলাম, তাই না?”
রাফি পেছনে তাকাল। গোপন ঘরের দরজা খোলা এখান থেকে সোজা করিডোর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু, কালো দরজাটা—যেটা আমরা কিছুক্ষণ আগে খুলেছিলাম—এখন বন্ধ হলো কীভাবে।
রাফি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। দরজার সামনে গিয়ে থামল। বাইরের দিক থেকে কেউ দরজাটা বন্ধ করেছে।
কারণ, দরজার গায়ে দেখা যাচ্ছে নতুন করে হাতের ছাপ।
ভেজা হাতের ছাপ। একটা নয়। চারটা।
তিনজনের হাতের ছাপ আলাদা আলাদা করে চেনা যায়।
চতুর্থটা কার—
সেটা বোঝার আগেই মেহরিনের ক্যামেরা নিজে থেকেই ছবি তুলল, ক্লিক।
তিনজন ঘুরে তাকাল। ক্যামেরার স্ক্রিনে নতুন ছবিটা দেখা গেল। ছবিতে তারা তিনজন গোপন ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের পেছনে—সালেহা রহমানের পুরোনো ছবিগুলোর মাঝখানে—একটা নতুন ছবি ঝুলছে।
ছবিটা আজকেরই। তিনজনের। ছবির নিচে লেখা—১৮ আগস্ট ২০২৬।
আর ছবির একদম ডানদিকে দাঁড়িয়ে আছে একজন চতুর্থ মানুষ।
এবার মুখটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। মেহরিন কাপতে কাপতে ক্যামেরাটা হাত থেকে ফেলে দিল।
কারণ লোকটাকে তারা তিনজনই চেনে । লোকটা রাফি।
কিন্তু ছবিটা তোলা হয়েছে এমন একটি মুহূর্তের—যখন রাফি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল না। সে তখন গোপন ঘরের দরজার বাইরে ছিল। রাফি ধীরে ধীরে নিজের দিকে তাকাল। তারপর ছবির দিকে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে গোপন ঘরের ভেতরের পুরোনো টেলিফোনটা বেজে উঠল। ট্রিং……
তিনজন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে টেলিফোনের কাছে গেল। ফোনটা গত সতেরো বছর ধরে তো লাইন বিচ্ছিন্ন থাকার কথা।
রাফি কয়েক সেকেন্ড টেলিফোনের দিক তাকিয়ে থেকে রিসিভ করে হাতে তুলল। ওপাশে কোনো কথা নেই।
কিছুক্ষণ পর খুব ধীরে শোনা গেল—“রাফি… দরজাটা খুলে দাও।”
রাফির মুখ সাদা হয়ে গেল। কারণ কণ্ঠটা তার নিজেরই ছিলো।
আর ফোনের ওপাশ থেকে তার নিজের কণ্ঠে আবার বলল—“আমি এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।”