পরিত্যক্ত বাড়ি

পর্ব - ৪

🟢

ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ এলো।

খুব নিচু গলায় “রাফি…!”

রাফি ঠান্ডায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা ভয়ে। কণ্ঠটা তার নিজের। তখন টেলিফোনে যে ছিলো। আবার কন্ঠটা আসল, “দরজা খোলো।”

রাফি এবার দৃঢ়ভাবে বলল, “না।”

কিছুক্ষণ আর কোনো শব্দ এলো না।

তারপর বাইরে থেকে উত্তর এলো—“ঠিক আছে।”

পায়ের শব্দটা আস্তে আস্তে দূরে সরে গেলো ।

এক পা।

দুই পা।

তিন পা। তারপর নিস্তব্ধতা। তানভীর ধীরে বলল,

“ও চলে গেছে।”

রাফি দরজার দিকে এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে হাতলটা টান দিয়ে দরজা খুলল। দরজা খুলতেই করিডোর দিক তাকাল ফাঁকা, কেউ নেই। শুধু মেঝেতে একটা জিনিস পড়ে আছে।

একটা পুরোনো ক্যাসেট। তার ওপর হাতে লেখা—“এটা শুধু রাফির জন্য।” রাত তখন ১২টা ৪১ বাজে। বাড়ির নিচতলায় একটা পুরোনো টেপ রেকর্ডার ছিলো। ক্যাসেটটা রাফি ঢোকালো, কিছুক্ষণ শুধু শোঁ শোঁ শব্দ হলো। তারপর একজন পুরুষের কণ্ঠ, “যদি কেউ এই রেকর্ডিং শুনে থাকে, তাহলে ধরে নেবেন আমি ব্যর্থ হয়েছি।”

রাফি, মেহরিন আর তানভীর একে অপরের দিকে তাকাল।

কণ্ঠটা সালেহার স্বামীর ছিলো।

তিনি বললেন—“এই বাড়িতে কোনো ভূত বা কোনো আত্না নেই।”

“কিন্তু এমন একটা কিছু আছে, যেটাকে বাইরে থেকে ভূত বলে মনে হবে।”

তানভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।

রেকর্ডিংয়ে আরও বলল—

- উত্তরের দেয়ালের ভেতর একটা সরু সার্ভিস টানেল আছে। বাড়ির নির্মাণের সময় এটা করা হয়েছিল। পুরোনো বায়ু চলাচলের পথ। আমি সেই পথ ব্যবহার করে কয়েকবার বাড়ির ভেতরে যাতায়াত করেছি।”

মেহরিন বলল, “তাহলে পায়ের ছাপের কারণ জানতে পারা গেল।”

রাফি মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।”

কিন্তু রেকর্ডিং তখনও চলছে,,

- সমস্যা শুরু হয় যখন আমি টানেলের ভেতরে একটা ক্যামেরা বসাই।”

রাফি চুপ করে গেল।

“ক্যামেরাটা এমন এক জায়গায় ছিল, যেখান থেকে বাড়ির কয়েকটা ঘর দেখা যেত। কিন্তু কিছুদিন পর ক্যামেরার ছবিতে এমন মানুষ দেখা যেতে লাগল যারা ওই সময় ঘরে ছিল না।”

রেকর্ডিং থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর আবার রেকর্ডিং বেজে উঠলো “প্রথমে আমি ভেবেছিলাম ছবি এডিট করা হয়েছে, তারপর বুঝলাম…!”

রেকর্ডিংটা থেকে একটা দীর্ঘ বিরতি। আবার বেজে উঠলো

“কেউ আমার ক্যামেরাটা ব্যবহার করছে।” টেপে হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো। তারপর রেকর্ডিং শেষ।

তানভীর বলল, “এটা কি পুরোনো বাড়ির নজরদারি করার জন্য নাকি?”

রাফি বলল, “হতে পারে।”

তানভীর বলল “তাহলে আজকের ছবির ঘটনাটা?”

রাফি বলে উঠল “তাহলে কেউ হয়তো এখনো এই বাড়ির ভেতরে আছে।”

তিনজনেরই ভয় একটু কমে গেলো। রাত বাজে ১টা ২৬। তারা টানেলের প্রবেশপথ খুঁজতে শুরু করল। নকশা অনুযায়ী গোপন ঘরের পেছনের দেয়ালের ভেতর একটা সরু পথ থাকার কথা। রাফি দেয়াল মেপে জায়গাটা চিহ্নিত করল। একটা কাঠের প্যানেল সরাতেই অন্ধকার সরু পথ দেখা গেল। টানেলের ভেতর বাতাস চলাচল করছে।

মাটিতে ধুলো জমে আছে। কিন্তু সেই ধুলোর ওপর—পায়ের ছাপ দেখে মনে হচ্ছে এখন কেউ এখান দিয়ে গেছে।

এইবার তিনজনই নিশ্চিত হলো। এখানে তো কেউ সত্যিই যাতায়াত করছে। রাফি ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে সামনের দিক এগোলো। দশ মিটার পার হয়ে গেলো বিশ মিটার পার হয়ে গেলো, তারপর টানেলটা নিচের দিকে নামতে শুরু করল।

শেষে একটা ছোট রুম। সেখানে একটা পুরোনো ক্যামেরা।

তার পাশে আধুনিক ডিজিটাল ব্যাটারি। ক্যামেরাটা পুরোনো হলেও কেউ সেটাকে নতুন ব্যাটারি দিয়ে চালু করে রেখেছে।

বিজ্ঞাপন

তানভীর ব্যাটারিটা হাতে তুলে দেখে বলল “এটা সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ পুরোনো হবে।”

মেহরিন ক্যামেরার মেমোরি কার্ড বের করে তারপর নিজের ক্যামেরায় লাগালো। শেষ কয়েকটা ছবি খুলতেই তিনজন স্তব্ধ হয়ে গেল। ছবিগুলো গত সাত দিনের তোলা। বাড়ির প্রতিটি ঘর। দিনের বেলায় তোলা । রাতের বেলায় তোলা। আর তাদের আজকের এখানে আসার ছবিও আছে।

তিনজন গাড়ি থেকে নামছে, তারপর বাড়িতে ঢুকছে, তারপর গোপন ঘরে যাচ্ছে এরকম সব ছবি তোলা আছে এখানে। কেউ তাদের শুরু থেকেই নজরদারি করছে।

মেহরিন শেষ ছবিটা খুজে বের করলো। ছবিটা মাত্র পাঁচ মিনিট আগের তোলা।

তাতে দেখা যাচ্ছে—তিনজন টানেলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু ছবিটা তোলা হয়েছে তাদের ঠিক পেছন থেকে। রাফি ধীরে ধীরে পিছনের দিক তাকালো। সেখানো অন্ধকার, কেউ নেই।

হঠাৎ, টানেলের শেষ মাথা থেকে একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। ধাম…! তিনজন দৌড়ে সেখানে গেল।

দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। রাফি ধাক্কা দিল।

কিন্তু খুললো না। তানভীর বলল,

“দরজাটা খোলো আমরা এখানে আটকে আছি।” কিন্তু কোনো পাত্তা দিলোনা কেউ।

মেহরিন ক্যামেরার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললো,

“দরজার ওপাশে একটা ঘর আছে।”

তানভীর বললো “কীভাবে জানলি?”

মেহরিন ছবিটা তানভীর আর রাফিকে দেখাল।

শেষ ছবির একদম কোণের দরজার নিচে আলো দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ—ওপাশে কেউ আলো জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাফি দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করল।

“কে আছেন দরজাটা খোলেন?”

কোনো উত্তর নেই।

আবার ধাক্কা দিতে থাকলো।

“দরজাটা খুলুন!”

এইবার ভেতর থেকে শব্দ এল। একটা চেয়ার টানার শব্দ।

তারপর পায়ের হাঁটার শব্দ। কেউ দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। রাফি থেমে গেল কিছু বললো না আর।

ভেতর থেকে খুব শান্ত একটা কণ্ঠ শোনা গেল—“রাফি?”

রাফি কোনো উত্তর দিল না। কণ্ঠটা আবার বলল—

“তুমি অবশেষে ফিরে এসেছ।”

রাফির মুখ ফ্যকাসে হয়ে গেল, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না। মেহরিন জিজ্ঞেস করল,

“রাফি… লোকটা তোকে চেনে?”

রাফি কোনো উত্তর দিল না।

কারণ সে বুঝতে পারছে—এই লোকটা তাকে চিনবে কীভাবে? সে তো জীবনে কখনো এই বাড়িতে আসেনি। র

তার যেটুকু মনে পড়ে সে এবারই প্রথম এই বাড়িতে এসেছে।

দরজার ওপাশ থেকে আবার বলে উঠল—

“তোমার বাবা বলেছিল, তুমি আর কখনো এখানে আসবে না।”

রাফি এবার এক পা পিছিয়ে গেল। তার বাবা মারা গেছেন এগারো বছর আগে। আর, রাফির বাবা কখনো তাকে এই বাড়ির কথা বলেনিও, কখনো না। তবু দরজার ওপাশের মানুষটা এ কথা কীভাবে বলে। হঠাৎ মেহরিনের ফোনে একটা ছবি এলো অচেনা নম্বর থেকে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে—রাফি ছোটবেলায় বয়স যখন হয়তো আট। তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ, হয়তো রাফির বাবা। পেছনে সেই একই কালো রঙের দরজা।

ছবির নিচে লেখা - “তোমার বাবা তোমাকে সত্যিটা বলেনি।” আর ঠিক তার নিচে আরেকটা লাইন - “কারণ সেদিন দরজার ওপাশে যে ছিল… সে রাফি ছিল না।” এই লাইনটার মানে কেউ বুঝতে পারলো না।

হঠাৎ টানেলের দরজার খোলার শব্দ শুরু হলো, ওপাশ থেকে কেউ দরজার তালা খুলে, ক্লিক একবার ক্লিক দুইবার। রাফি পিছিয়ে গেল দরজাটা এক ইঞ্চি খুলল।

ভেতর থেকে অন্ধকার দেখা গেল। তারপর—

একটা হাত দরজার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এলো। হাতটা ছবিতে থাকা রাফির বাবার হাতের মতো দেখতে।

আর হাতে ধরা ছিললো রাফির ছোট বেলার সেই পুরোনো লাল খেলনা গাড়ি। যেটা রাফি ২০ বছর আগে ছোট থাকতে হারিয়েছিল। দরজার ওপাশ থেকে কণ্ঠটা আবার শোনা গেল—“এবার বলো, রাফি… তুমি আসলেই কোনটা মনে

বিজ্ঞাপন
পরিত্যক্ত বাড়ি গল্পটি নিলয় মাহমুদ রাকিব-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভয়ানক রহস্যময় গল্প