ঝিলমিল রোদ্দুরে

পর্ব - ২৫

🟢

শনিবারে তো ঝিলমিল আর রোদ্দুরের যাওয়া হলো না। রোদ্দুর তাই বলল, রবিবার সকাল সকাল রওনা দিলে সে অফিসটা ধরতে পারত। কিন্তু রোদশী এবং ফারহান দু'জনেই বাঁধা দিল। বলল, দুয়েকটা দিনের ছুটি নিতে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রোদ্দুর ছুটি নিতে বাধ্য হলো। এখন বড় বোন, তার হাজব্যান্ড বারবার করে বলছে, তাদেরও তো একটা সম্মান আছে! মুখের উপর আর কতই বা না বলা যায়।

সময় মাত্র তিন দিন। ওরা পরিকল্পনা করল, ছোটো পরিসরে একটি পিকনিকের আয়োজন করবে। ঝিলমিল তো এতদিন ঝিমিয়ে ছিল, রোদশী আসা উপলক্ষ্যে এইবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ওরা এক পা আগালে সে পুরো কদম এগিয়ে যায়। রোদ্দুরের আসল অর্থে মনে হচ্ছে, সে শশুর বাড়িতে আছে। দু'দিন আগেও নিজেকে এই বাড়ির ছেলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ফারহান আসার পর এক তুড়িতে রোদ্দুরকে বলেছে, 'ভাই! তুমি আর আমি কিন্তু একই পথের পথিক। দেখো, সবকিছুতেই একলা থাকা আনকমফোর্টেবল। তুমি আমি দুই জামাই যদি এইবার একসাথে মাঠে নামি, তবে মনে হবে এটা আমাদের শ্বশুর বাড়ি।'

ফারহান ভাইকে রোদ্দুরের ব্যক্তিগতভাবে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। দারুন একজন মানুষ, অমায়িক এবং আন্তরিক।

.

পিকনিকের পরিকল্পনা থেকে প্রথমেই বাড়ির বড়দের বাদ দেওয়া হলো। তারা থাকলে সবকিছুতে বাঁধা দিবে। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না— নানান কাহিনী। সুখানপুরের শেষ মাথায় ছোটোখাটো একটা জঙ্গলের মত জায়গা আছে, ঝিলমিল সেখানে বনভোজনের আয়োজন করার প্রস্তাব রাখল। জঙ্গলের মধ্যে বিষয়টা কতটুকু নিরাপদ হবে, সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ল বাকিরা। অবশেষে সবাই মিলে চলল, জায়গাটা দেখতে।

নাহ, সবকিছু ঠিকঠাক। জঙ্গলটা অনেক বেশি গভীর না, শুধুমাত্র হালকা লতাপাতায় ভরপুর। সিদ্ধান্ত নিল, ওগুলো ওরা নিজেরাই ঠিকঠাক করে নিবে। কাজ ভাগাভাগি করার সময় ঝিলমিল দেখল, রোদ্দুরের ভাগে অনেক কম আর সহজ কাজ পড়েছে। সে সেটা নিয়েই ঝগড়া শুরু করে দিল। রোদ্দুর বিদ্রুপের স্বরে বলল, 'তোর জীবনে গ্যাঞ্জাম পাকানো ছাড়া আর কোনো কাজ নেই? আপাতত যেটা করছিস সেটাই কর।'

'না, আমি বনজঙ্গল ঘুরে শুকনো পাতা যোগাড় করতে পারব না।'

'তবে কি গাছ কাটতে পারবি?'

ঝিলমিল ইশারায় সামনে থাকা বনজঙ্গল দেখিয়ে বলল, 'এগুলো গাছ না, লতাপাতা। হাত দিয়ে টান দিলেই উঠে যাবে। তুই এখান থেকে উঠে পড়, এসব আমি করব।'

কোনো বাক্যব্যয় ছাড়া রোদ্দুর উঠে দাঁড়াল। ঠিক আছে, যা ইচ্ছে হয় করুক। এখানে একটু আগেও জোঁক দেখেছিল সে, এইবার ঝিলমিল জোঁকের পাল্লায় পড়লে মজা টের পাবে। রোদ্দুর হাসতে হাসতে চলে গেল।

বাহ্যিক দৃষ্টিতে এই কাজটাকে পানির মত সহজ মনে হলেও এটা সহজ নয় একেবারেই। গায়ের সব শক্তি দিয়ে ঘাসগুলো টেনে তুলতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ বিশ্রামের উদ্দেশ্য গাছতলায় এসে বসল। কেউ এখানে উপস্থিত নেই অর্থাৎ সবাই নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। সে একাই ফাঁকিবাজি করছে।

রোদ্দুরের খারাপ লাগছে না। সে শহুরে জীবনেই অভ্যস্ত। তবে এই দিকটা দেখলে মনে হয় সাজানো গ্রাম অঞ্চল। প্রতিদিনের একঘেয়েমি রুটিন, ব্যস্ত নগর, বিরক্তিকর যানজট, অফিসে সারাক্ষণ একই নিয়ম— সবকিছু থেকে বেরিয়ে বেশ শান্তি শান্তি লাগছিল। রোদ্দুর এইদিকে এসে দেখল, ঝিলমিল গালে হাত দিয়ে বসে আছে। সে জিজ্ঞেস করল, 'কিরে শেষ?'

ঝিলমিল জবাব দিল, 'শেষ না করতে পারলেও তোর জন্য রেখে দিই নাই।'

আচ্ছা? উনি ভাঙ্গবে তবুও মচকাবে না। রোদ্দুর যা ভেবেছিল, ঠিক তাই হলো। একটা জোঁক ঝিলমিলের গলায় আটকে রয়েছে। নিশ্চয়ই ও টের পায় নাই, টের পেলে এতক্ষণে কুরুক্ষেত্র ঘটিয়ে ফেলত। রোদ্দুর ঝিলমিলকে কিছু বলল না। ওর কাছাকাছি এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে দাঁড় করাল। তারপর বলল, 'চোখ বন্ধ কর‌।'

ঝিলমিল হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকাল। এই ছেলে এমন করছে কেন? সে জিগাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই রোদ্দুর বলল, 'ওয়েট..... একদম কথা বলবি না।'

তারপর নিজেই একহাত ঝিলমিলের দু'চোখে রেখে আরেক হাত গলায় স্পর্শ করল। ঠান্ডা হাতের স্পর্শ কিংবা যাইহোক ঝিলমিল মৃদু কেঁপে উঠল। বহুকষ্টে কিছু একটা বলতে নিলেই রোদ্দুর ঠোঁটে আঙুল চেপে বলল, 'চুউউপ, জাস্ট ওয়ান মিনিট।'

তারপর সে ঝিলমিলের গলায় সামান্য চিমটি দিয়ে জোঁকটা তুলে এনে অনেক দূরে ছুঁড়ে মারল। এরপর চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। ঝিলমিল জিজ্ঞেস করল, 'কি হলো বুঝলাম না?'

রোদ্দুর সরে গিয়ে বলল, 'চেক করলাম তোর গলার ভলিউম ঠিক আছে কিনা।'

'মানে?' ঝিলমিল বিস্মিত।

'সারাক্ষণ যে ধেড়ে গলায় চেঁচামেচি করিস তাতে কোনো সমস্যা হয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে হতে পারে কিনা, চেক করলাম। পাশাপাশি এটাও দেখলাম যে, গলার আওয়াজ কমানো বা বাড়ানোর কোনো অপশন রয়েছে কিনা!' রোদ্দুর দায়সারা ভাবে বলল।

ঝিলমিল কোমড়ে দু'হাত গুঁজে কটমট দৃষ্টিতে তাকাল। ওরা আসছে দেখে চুপ করে গেল। ওরা বাড়ি ফেরার পর খাওয়া শেষে কেউ কেউ বাহিরে বেরিয়ে গেল, কেউ কেউ ছাদে গেল। রিমঝিম, ঝিলমিল, রোদশী, তানিশা ওরা ছাদে ছিল। একটু আগে পর্যন্ত বড় চাচিও ছিল, ঠান্ডা লাগছে বলে সে চলে গেছে। তানিশা বলছিল, 'তোমাদের সাথে আমাদের মানাচ্ছে না।'

রোদশী হেসে কিছু একটা বলতে নিলেই হঠাৎ ঝিলমিলের গলার দিকে নজর গেল। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ভালো করে খেয়াল করল। একটা দাগ, লাল হয়ে গেছে। এতক্ষণ হাসি চেপে রাখলেও এইবার খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, 'বাহ ঝিলমিল!'

'কী?'

'তেমন কিছুনা। গলায় লাল দাগটা দেখে বললাম।'

ঝিলমিল গলায় হাত দিয়ে বলল, 'কই? কীসের দাগ? আর দাগ দেখে হাসার কি হলো?'

'ওটা লাভবাইট!' রোদশী মুখে হাত দিয়ে হাসল।

ঝিলমিল আকাশ থেকে পড়ল। রিমঝিম আর তানিশাও এগিয়ে এলো। ঝিলমিল ফোনের স্ক্রিনে দেখল আসলেই লাল টুকটুকে একটা দাগ হয়ে রয়েছে। ও চেঁচিয়ে উঠল, 'এটা কীসের দাগ?'

বিজ্ঞাপন

রিমঝিম বলল, 'তোমরা ঠিকই তো চুপি চুপি প্রেম করো কিন্তু কাউকে বলো না। সেদিন আমি ভুলবশত দেখে ফেলেছি, ভাইয়া তোমাকে কোলে নিয়েছে। ইশশশ, কী লজ্জা!'

'আরে সেটা তো আমি পড়ে যাচ্ছিলাম তাই ও আমাকে ধরেছে। কিন্তু এই দাগটা...? ও হ্যাঁ মনে পড়ছে, কিছুক্ষণ আগে রোদ্দুর আমাকে চিমটি কেটেছে। তারপর কি বলেছ জানো? বলেছে, ও নাকি আমার গলার আওয়াজ চেক করছে যে বাড়ানো অথবা কমানোর অপশন আছে কিনা! আমি নাকি সবসময় অনেক বেশি চেঁচামেচি করি। তোমরা যেটা ভাবছ সেটা তো একদম'ই না। ছিঃ ছিঃ, আজ ওর একদিন কি তো আমার একদিন!' ঝিলমিল কাঁদো কাঁদো গলায় বলল।

'আহারে, শেষমেষ এই অবস্থা!' ওরা নিজেদের মত হিহি/হাহা করে হাসতে লাগল। ঝিলমিল বুঝল, ওরা মোটেও তার কথা বিশ্বাস করে নাই। সে হনহন করে নিচে নেমে এলো। রোদ্দুরকে এখুনি খুঁজে বের করতে হবে।

.

রোদ্দুর এখানে থাকে না অনেকদিন হচ্ছে, তবুও পরিচিতি রয়েছে। যাইহোক, ছোটোবেলা পুরোটাই এখানে কেটেছে। আজ ফারহানের সাথে মন্টু মামার চায়ের দোকানে আসতেই ওসমান খন্দকারের বড় ছেলের সাথে দেখা হলো। ওরা দোকানে দোকানে ঝামেলা করে বেড়ায়, চাঁদা তোলে। রোদ্দুরকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এসে কথাবার্তা বলল। ফারহানের সাথে আলাপ হলো। ওরা উঠে চলে আসার সময় হঠাৎ মনোয়ার সরকারের খোঁজ পড়ল চায়ের দোকানে। মন্টু মামা রোদ্দুরকে ডেকে বললেন, 'ও মামা দ্যাখেন তো, এই লোকটা প্রায় সময় আপনার ছোটো চাচার খোঁজ করে। আপনি দ্যাখেন তো ওদের।'

রোদ্দুর এগিয়ে এলো। লোকটাকে সে চেনে না। তাই সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'হ্যাঁ বলুন। যার খোঁজ করছেন উনি আমার ছোটো চাচ্চু।'

আগুন্তক বললেন, 'আমার তো উনার সাথেই কথা ছিল।'

'আচ্ছা তবে বাড়িতে চলুন আমার সাথে, চাচ্চু এই সময় বাড়িতেই থাকে।'

'না না, আমি যাব না। আসলে আমি উনার খোঁজ করছিলাম না, অন্য একজন করছিল। আমার মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছে।'

মন্টু মামা রোদ্দুরকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে বলল, 'এই লোক প্রায় আপনার চাচার খোঁজ করে কিন্তু বাড়িতে যাইতে বললে যায় না। নিশ্চয়ই কোন ঘাপলা আছে। আমার কেমন সন্দেহ সন্দেহ মনে হয় তারে।'

রোদ্দুর প্রথমেই উনার ফোন নাম্বারটা নিয়ে রাখল। তারপর খতিয়ে জিজ্ঞেস করল, কাহিনী কি? অন্যকেউ কেন ছোট চাচ্চুর খোঁজ করছে?

উনি যা বললেন রোদ্দুর তাতে বেশ অবাক হলো। তারপর বলল, 'আচ্ছা ঠিক আছে। আমি ব্যাপারটা দেখব, আপনি এত ঘনঘন এইভাবে খোঁজ করলে আপনাকে সন্দেহভাজন মনে করে গণপিটুনি দিবে মানুষ।'

ওই লোক রোদ্দুরের কথায় সায় জানাল এবং ঠিকানা দিয়ে গেল, বলে গেল মনোয়ার সরকার যেনো খুব দ্রুত এখানে যোগাযোগ করে।

রোদ্দুর বাড়ি আসার পর ঝিলমিলের সাথে একচোট ঝগড়া হয়ে গেল। বাড়ির মানুষ দেখে আর হাসে। বলে, 'এরা এতই পারে রে?'

অবশেষে রোদ্দুর বলেই দিল, 'তোর গলায় ইয়া বড়, পেট মোটকু একটা কালো কুচকুচে জোঁক জেঁকে বসেছিল। আমি সেটাই সরিয়ে দিয়েছিলাম। তার বদলে কপালে যে এত এত মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা হবে, তা জানতাম না।'

জোঁকের কথা আর বর্ণনা শুনে ঝিলমিল ওয়াক ওয়াক করল, ঘেন্নায় গা গুলিয়ে উঠল। ছিঃ, শেষ পর্যন্ত জোঁক লাভবাইট দিল! এর থেকে তো রোদ্দুর'ই ভালো ছিল।

রোদ্দুরের কথা ওইভাবে চিন্তা করতেই মাথা ঘুরে উঠল। নিজের কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বলল, 'আল্লাহ! এসব কি হচ্ছে আমার সাথে? আমি সত্যিই পাগল হয়ে যাব। আমার এসব উল্টাপাল্টা ভাবনার মূলে আছে রোদ্দুর। উফফফ, ওরে যে কী করব!'

মা'কে বলে ঝিলমিল শিউলিদের বাড়ির দিকে রওনা হলো। এখানে অশান্তি লাগছে। যেদিকে তাকাচ্ছে সেদিকেই জোঁক দেখতে পাচ্ছে আর নয়তো রোদ্দুরকে।

শিউলির বাড়িতে একলাই রওনা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু রোদ্দুর পিছে পিছে চলে এলো। ঝিলমিল শর্টকাট ধরার জন্য ধানি জমির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। রোদ্দুর বলল, 'এই ঠান্ডা, এই কুয়াশার মধ্যে এইখান দিয়ে আসার কোনো মানে হয়?'

'আমি এসেছি তাতে তোর কি? তুই কেনো এসেছিস? আমি বলেছিলাম তোকে আসতে? মে'রে একদম মাথা ফা'টি'য়ে দিব।'

'বাবারে কী ঝগড়ুটে। মানুষের কথায় এত তেজ থাকে?'

'মানুষের না থাকুক আমার থাকে।' ঝিলমিল হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে বলল।

'হ্যাঁ থাকবেই তো, তুই কি মানুষ? তুই আস্ত একটা গাধা।'

'আর তুই বাঁদর।'

ঝিলমিল মুখ ভেংচাল। রোদ্দুরের একটু ফাজলামি করার সাধ জাগল মনে। ওইতো সামনেই শিউলিদের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। ঝিলমিল রোদ্দুরকে চলে যেতে বলল। কিন্তু রোদ্দুর গেল না উল্টো চেঁচিয়ে উঠল, 'অ্যাই অ্যাই জোঁক জোঁক!'

ঝিলমিল থমকে গেল। রোদ্দুরের কথা শোনা মাত্র ঝিলমিল লাফিয়ে উঠে বলল, 'কই কই?'

রোদ্দুর হাতের ইশারায় সামনের দিকে দেখাল। ঝিলমিল এক দৌড়ে পিছু হটে রোদ্দুরকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'ওইটাকে আমার সামনে থেকে সরিয়ে ফেল।'

.

বিজ্ঞাপন
ঝিলমিল রোদ্দুরে গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও রহস্যময় গল্প