দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা অতিথিদের দেখে ঝিলমিল একদম থ বনে গেল। কিছুক্ষণ বাদেই ওর ঠোঁটে কোণে লেগে থাকা সামান্য হাসি বিস্তৃত হয়ে এলো। হাসান হাস্যোজ্জ্বল স্বরে বলল, 'আমাকে তো চিনতে পেরেছেন ভাবি? বাকিদের সাথেও আলাপ করিয়ে দিচ্ছি। আমরা সবাই রোদ্দুরের বন্ধু। বন্ধু তো বিয়ের কথা আমাদের এতদিনেও নিজের মুখে জানাল না। তাই জেনে নিজেরাই চলে এলাম। আমরা কি ভেতরে আসতে পারি?'
ঝিলমিল তৎক্ষণাৎ দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। ওরা এসে একে ঘরে প্রবেশ করল। রোদ্দুর'ও এমন অসময়ে বন্ধুদের দেখে অবাক! ওদের একেকজনের হাতে চকোলেট, ফুলের তোড়া, কেক আরও বিভিন্ন জিনিসপত্র। ওরা ভীষণ ইনোসেন্ট মুখ করে রোদ্দুরকে কংগ্রাচুলেট করল। রোদ্দুর এখনও বিস্ময়ের ভাবটা কাটাতে পারে নাই, এরইমধ্যে ওরা কেক'সহ যাবতীয় অনেককিছু বের করে সাজিয়ে ফেলেছে। আদিয়াত বলছিল, ওর নাকি সময় হবে না বেশিক্ষণ। তাই রায়হান'ও তাড়া দিল। বলল, 'তুই আর ভাবি মিলে কেক কাট দোস্ত। আমরা তো বিয়েতে ছিলাম, বিয়েও খেলাম না, আপাতত কেক খাই।'
ঝিলমিল তো এক পায়ে খাড়া। রোদ্দুর কী ভাবছে জানা নেই, তবে তার কাছে পুরো বিষয়টা দারুণ লেগেছে। তার উপর আবার ছেলেগুলো কী কিউট করে 'ভাবি' সম্মোধন করছে, এটা আরও বেশি জোস!
অবশেষে রোদ্দুর কেক কাটল, ঝিলমিলের হাত ধরে। ওইদিকে হাসান আর সৌভিক হাততালি দিতে দিতে সমস্বরে গাইতে লাগল, 'রোদ বন্ধুর বিয়ে, টোপড় মাথায় দিয়ে। হৈ হৈ হৈ হৈ, আমাদের বন্ধু গেল কই? আসো সবাই নাচি, প্রাণ খুলে বাঁচি। তাক ধুমা ধুম তা, বিয়ে করে স্বর্গে যা।'
ঝিলমিলের সাথে একমাত্র হাসানের'ই ভালোভাবে পরিচয় ছিল। হাসান যে হাস্যরসিক টাইপের মানুষ এটা জানাই ছিল। কিন্তু ওই ছড়াটা শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল। রোদ্দুর অনেক অনুনয় বিনয় করল, ওদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তার সম্ভব হলো না। বিদায়কালে রোদ্দুর রাস্তার মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেল। ঝিলমিল ওদেরকে বারবার বলে দিয়েছে, 'ভাইয়া আপনারা কিন্তু অবশ্যই আবার আসবেন।' ওরা তাতে সায় জানাল।
সবাইকে বিদায় দিয়ে রোদ্দুর বাড়ি ফিরতেই ঝিলমিল বলল, 'দেখ দেখ, তোর বন্ধুরা কত ভালো! ওদের দেখে জীবনে ভালো কিছু শিখতে পারলি না। তুই তো শুধু জানিস, কথার দাড়ি কমায় ধমকাতে।'
'হ্যাঁ। আমি এমন'ই।'
'তাহলে তোকে আমায় সারাজীবন এইভাবেই সহ্য করতে হবে? এমন কাঠখোট্টা, মাথামোটা, বদমেজাজি, নাক উঁচু, অহংকারী, দাম্ভিক, উদ্ভট একটা ছেলের সাথে সারাজীবন ভাবাই যায় না।'
'সহ্য করতে পারলে কর, আর না করতে পারলে....' রোদ্দুর থেমে গেল। ঝিলমিল কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, 'কী? পুরো কথা শেষ কর।'
'কিছু না, এতকিছু ভেবে বলি নাই। এমনি কথার কথা। তুই যে একলা আমার কথা বলছিস, তুই নিজে কি? ঝগড়ি কোথাকার! পান থেকে চুন খসলেই তো আসিস কোমড় বেঁধে ঝগড়া করতে।'
ঝিলমিল দু'পা এগিয়ে এসে বলল, 'আমি ঝগড়া করি?'
রোদ্দুর সেইভাবেই দু'পা পিছে সরে গেল। হেসে বোঝানোর চেষ্টা করল, হ্যাঁ ঠিক এইভাবেই তুই পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে আসিস। ঝিলমিল সেটা বুঝতে পেরে ফুঁসে উঠল বঙ্গোপসাগরে উতলে ওঠা ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের মত। পাশ ফিরতে নিলেই আচমকা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল পেছন দিকে অর্থাৎ রোদ্দুরের উপর। হঠাৎ ওকে নিয়ে তাল সামলাতে না পেরে রোদ্দুর নিজেও পড়ে গেল। বিষয়টা এমন হলো যে, দু'জন নিজেদের গোপনে চুপিচুপি প্রেমালাপ চালিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ কেউ চলে আসায় দু'জন দু'দিকে পালাতে গিয়ে ফের নিজেদের কাছে চলে এসেছে অজান্তেই।
রোদ্দুর থ! ঝিলমিল কী হলো এখনও বুঝতেই পারল না। যখন'ই বোধগম্য হয়েছে যে সে একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে তখন দ্রুত উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ওড়নার সাথে পা পেঁচিয়ে আবারও ধপাস! আগেরবার রোদ্দুরের উপর পড়ার কারণে ব্যথা পায় নাই, কিন্তু এইবার রোদ্দুর উঠে গিয়ে বিপত্তি বাঁধিয়ে দিল।
এমন একটা পরিস্থিতিতে হাসা উচিত নয় তবুও রোদ্দুর হো হো করে হেসে উঠল। সে নিজেও পড়ে গিয়ে পিঠে, কোমড়ে ব্যথা পেয়েছে। কিন্তু হাসির ছলকে নিজের ব্যথার কথা ভুলে গেল।
ঝিলমিল কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল, 'একজন অসহায় মানুষকে এভাবে হাসাহাসি করা কোন মানবিকতার পরিচয় বলতে পারিস?'
'ওহো সরি সরি। মুখ ফসকে হাসি বেরিয়ে গেছে বিশ্বাস কর। নে উঠ এখন। এভাবে শুকনো মাটিতে মানুষ যে পরপর দু'বার আছাড় খায় তা তোকে না দেখলে জানতাম না।'
রোদ্দুর হাত বাড়িয়ে দিল ঝিলমিলের উঠার জন্য। ঝিলমিল হাত না ধরেই উল্টো বলল, 'তুই একটা স্বার্থপর।'
'আচ্ছা ঠিক আছে, এখন উঠে আয়।'
ঝিলমিল উঠতে গিয়ে বুঝতে পারল ব্যথাটা সে বেশ ভালোভাবেই পেয়েছে। রোদ্দুরের সাহায্যে উঠে বসে ফোন করল বাড়িতে। সবার কাছে কান্নাকাটি করে নালিশ করল, 'তোমাদের ছেলে আমাকে ফেলে দিয়েছে। মনে হয় কোমড়টা এইবার ভেঙ্গেই গেল।'
রোদ্দুর নির্বিকার ভঙ্গিতে সব শুনছিল। ঝিলমিলের কথা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ও বলল, 'আমি তোকে ফেলে দিয়েছি? আমার জন্য এখনও আস্ত আসিস। যদি সরাসরি আগেই মেঝেতে পড়তি তবে হাড় হাড্ডি একটাও খুঁজে পাওয়া যেত না।'
'তোর জন্য'ই তো। তুই কথা বলতে আসিস কেন? আমাকে কেনো বলিস, আমি ঝগড়া করতে আসি!'
রোদ্দুর হেসে বলল, 'তখন তো জাস্ট মুখে বলেছি এইবার তো প্রমাণ আমি পেয়েই গেলাম সাথে তুই নিজেও দেখলি। প্লিজ এখন কিছু বলিস না। নিজের দোষটা স্বীকার করে নে।'
ঝিলমিল কিছু বলল না, একবার ফুঁসে উঠে পড়ে গিয়ে আর উঠে দাঁড়াতে পারছে না এইবার আবার ফুঁসে উঠলে কী থেকে কী যে হয়ে যায়!
.
সুখানপুর ছোটোখাটো একটা মফস্বল শহর হলেও বেশ উন্নত, সবদিক থেকেই। মনোয়ার সরকার কিছুদিন আগে ঝিলমিলের ঘরের জানালায় ঠকঠক করার বিষয়টা পুলিশে জানিয়েছিলেন। আজ হাতে কাজ না থাকায় খোঁজ নিতে এলেন। অফিসার কামরুল হাসান জানালেন, 'খোঁজখবর করলাম, কিছু পাই নাই তো। সম্ভবত এলাকার কিছু ছ্যাঁচড়া চোর-বাটপারের কাজ। তবুও আমরা বিষয়টা নজরে রেখেছি। কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ'ও করা হয়েছে, দেখা যাক কী হয়।'
ইদানিং ওসমান খন্দকার চুপ করে গেছেন, অথচ তিনি চুপ থাকার মানুষ নয়। মনে মনে কোনো ছক কষছেন কিনা কে জানে? মনোয়ার সরকার চায়ের দোকানে এসে তার খোঁজ করা অজ্ঞাত মানুষের খোঁজ নিল। আশ্চর্য, তিনি এসেছিলেন আরও বেশ কয়েকবার। তাকে বাড়ি দেখিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি বাড়িতে যাবেন না। তার একটাই কথা, মনোয়ার সরকারের সাথে তিনি এখানেই দেখা করবেন অথবা পথেঘাটে কখনো যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায়! তবে বাড়িতে কিছুতেই যেতে পারবেন না। উনি সেই আগুন্তকের খোঁজ করে বেরাচ্ছেন। যখন তিনি উপস্থিত থাকেন না, তখন তার উপস্থিতি ঘটে!
ফজলুল সরকার'ও এলাকার বিভিন্ন কাজেকর্মে, বিভিন্ন মিটিং নিয়ে ইদানিং ব্যস্ত সময় পার করছেন। বাড়ির ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন বাকি ভাইয়েরা। সবাই একসাথে থাকার ফলে কখনো কিছু নিয়ে অশান্তি সৃষ্টি হয় নাই। তাদের অন্দরের অবস্থাও একই রকম। সবাই মিলেমিশে, নির্ঝঞ্ঝাট ভাবেই এতকাল সংসার করে আসছে। আজ হঠাৎ মাহফুজ সরকার কিছু বিষয় নিয়ে মন খারাপ করলেন। তাদের পারিবারিক ব্যবসার এইদিক পছন্দ হচ্ছে না, এটা অন্যকারো কাছে বিক্রি করে দেওয়া উচিত, এটা ঠিক হচ্ছে না, ওটা ঠিক হচ্ছে না; নানান মনোমালিন্যের সৃষ্টি হলো। বড়ভাই যেহেতু বাড়িতে নেই তাই সকলেই তার কথা চুপচাপ শুনে গেলেন। প্রত্যুত্তর করলেন না, ফজলুল সরকার এসে সামলাবে সব।
ছেলেরা ব্যবসা-বাণিজ্য ভাগাভাগি চায়, নিজেদের অংশ বিক্রি করে অন্যকিছু করতে চায়— রেহানা খাতুনের কানে এখনও এই সংবাদ পৌঁছায় নাই। শুনলে তিনি নির্ঘাত তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়ে ছাড়বেন। আজ ব্যবসায় ভাগ চাচ্ছে, দু'দিন পর বাড়ি ভাগের জন্য উঠে পড়ে লাগবে। তখন বলবে, 'আমরা নিজেদের আলাদা আলাদা অ্যাপার্টম্যান্ট চাই। বউ বাচ্চা নিয়ে নিজেদের মতো করে থাকব।'
কখনোই সম্ভব নয়। এটা অনেক আগের বাড়ি, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি বহন করে। পুরাতন হয়ে গেছে, তবে বছর বছর বাড়ি রং করা হয়; এছাড়াও বিভিন্ন জিনিসপত্রের পরিবর্তন ঘটে যার ফলে কখনো পুরাতন বলে মনে হয় নাই। বাড়ির মেয়ে-বউয়েদের আবার এত অভিযোগ নেই, বরং তাদের একসাথে থেকে থেকে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে এখন আর একলা একলা কিছুতেই সময় কাটতে চায় না। শনিবার আবার তানিশার জম্মদিন, সে বায়না ধরেছে বাড়ির সবাইকে নিয়ে এইবার জমজমাট করে বার্থডে সেলিব্রেট করবে। সেক্ষেত্রে রোদ্দুর আর ঝিলমিলকেও দরকার, ওরা ছাড়া অনুষ্ঠান অসম্পূর্ণ। তানিশা সরাসরি ঝিলমিলকে ফোন করল। বলল, 'আপু কবে আসবা?'
ঝিলমিল ওপাশ থেকে উত্তর দিল, 'আর আসব না রেএএ।'
'ওমা কেনো কি হয়েছে?'
'পা ভাঙ্গছে আমার। সব দোষ ওই ব্যাটার। তুই জানিস ও কি করছে.......' ঝিলমিল ননস্টপ রোদ্দুরের দোষ বলতে লাগল। ওর কথা শেষ হলো না, মুখ'ও ব্যথা হলো না। অথচ তানিশার মাথা ঘুরতে লাগল ভনভন করে। রোদ্দুরের শুধু আজকের দোষ না, ও জন্মের পর থেকে কি কি খারাপ করে এসেছে সব খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করেছে। তানিশা পেট ব্যথার দোহাই দিয়ে কোনোরকম ওর বার্থডের খবর দিয়ে ফোন রেখে দিল।
.
রোদ্দুর সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে এসে দেখল, আজ ঝিলমিল ঘরেই আছে। সে গলার টাই খুলতে খুলতে বলল, 'কিরে আজ তোর পাশের বাসার ভাবি কই?'
ঝিলমিল থমথমে মুখে জবাব দিল, 'ভাবি আছে ঠিকই কিন্তু আমি নাই।'
'তুই'ও তো আছিস। এইতো আমি দেখতে পাচ্ছি।'
'আমার পায়ে ব্যথা। আমি বিছানা থেকে উঠতে পারছি না।'
রোদ্দুর কিছুটা অবাক হওয়ার ভান করে বলল, 'ওমা! পায়ে ব্যথা? আমি তো ভাবছি এসব ছোটোখাটো ব্যথা তোকে কাবু করতে পারে না।'
ঝিলমিলের কণ্ঠশূণ্য। সারাদিন যে কীভাবে কেটেছে, এটা রোদ্দুর না দেখলেও আন্দাজ করে নিল। রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, যেটা যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেভাবেই আছে। অর্থাৎ ঝিলমিল সকালের পর থেকে কিছুই মুখে তোলে নাই। রোদ্দুর একমুহূর্ত কিছু ভেবে ওর জন্য খাবার রেডি করল। তারপর ঘরে গিয়ে বলল, 'খাওয়া-দাওয়া করিস নাই যে? একদম'ই উঠতে পারিস নাই?'
'উঠেছি তো। কিন্তু বেশি হাঁটাহাঁটি করলে পায়ে টান লাগে। খাই নাই, কারণ ইচ্ছে করে নাই।'
রোদ্দুর আর কথা প্যাঁচাল না। ঝিলমিলকে একটুখানি খাইয়ে দিয়ে রেডি হতে বলল, ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। ঝিলমিলের কাছে ডাক্তার বড় কথা নয়, সে বাহিরে ঘুরতে পারবে এটাই বড় কথা। তৎক্ষণাৎ সবকিছু চনমনে হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাড়া দিয়ে বলল, 'আমার পাঁচ মিনিটে হয়ে যাবে, তুই দ্রুত রেডি হ।'
রোদ্দুর স্বভাবসুলভ তার শাসনের কণ্ঠে বলল, 'তুই'ও একটা মানুষ, কীভাবে পারিস গিরগিটির মত বদলে যেতে! এইতো খেতে গিয়েও ক্যা কু করলি, আর এখন?'
'তুই প্লিজ সবকিছু বোঝার চেষ্টা করিস না। সবকিছু বোঝার যোগ্যতা তোর নাই।'
রোদ্দুর চুপ করে বাইরে এসে দাঁড়াল। মিনিট দশেক যেতেই ঝিলমিলের মেসেজ এলো। 'আমাকে এসে নিয়ে যা। আমি কীভাবে যাব?'
রোদ্দুর মেসেজ পেয়ে মনে মনে বলল, 'হুমমম, তোর বাপ তো আমারে মাসে মাসে বেতন দিয়ে রাখছে।'
রোদ্দুর উঠে গেল। দরজায় ঝিলমিল ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। রোদ্দুর ঝিলমিলের হাত ধরে বলল, 'আয়।'
ঝিলমিল খোঁড়াচ্ছিল। ওখান থেকে লিফট পর্যন্ত যেতেই আর আগাতে পারল না। রোদ্দুর বলল, 'নে আমার কাঁধে ভর দে। আর কি করবি? আমার জীবন জ্বালিয়ে খাওয়া ছাড়া তোর কাজ আছে তাই।'
ঝিলমিল সটান দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, 'যা যাবই না। এভাবে বললি কেনো?'
'ঘাট হয়েছে আমার। ভুল হয়েছে তোকে কিছু বলা। মাফ কর, বাপ। সরি সরি, হাজারবার সরি। এইবার আয়, তোকে আর কিছু বলব না প্রমিজ। আমি কিন্তু কথা দিলে কথা ভঙ্গ করি না।'
ঝিলমিল চুলগুলো পেছন দিকে ঝাড়া দিয়ে একহাতে গায়ের চাদরটা টেনে নিয়ে বলল, 'ঠিক আছে।'
ওরা দু'জন সন্ধ্যা সাতটায় এসে পৌঁছাল। সেখানেও রোদ্দুর ঝিলমিলের হাত ধরে ধরে নিয়ে গেল। রোদ্দুর ঝিলমিলকে ভেতরে পৌঁছে দিয়ে নিজে ওয়েটিং রুমে এসে বসল।
ওইদিকে একটা বুড়ো ডাক্তার ঝিলমিলের পা চেক করছিল। প্রথমেই বুড়োটার হাবভাব ভালো ঠেকছিল না। কিন্তু, নিজের ধারণা ভুল হবে ভেবে চুপ করে গেল। কিন্তু সেই ডাক্তার যখন পা থেকে হাত স্পর্শ করছিল বাজেভাবে তখন ঝিলমিল আর চুপ করে থাকতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে ভদ্রভাবে বলল, 'আপনার হয়েছে আংকেল?'
'না আরেকটু বসুন, আপনার পায়ের আঘাত খুব গুরুতর। আরেকটু দেখতে হবে। বসুন দেখি।'
ঝিলমিল ফেল বসে পড়ল। চোয়াল শক্ত করে তক্কে তক্কে রইল কখন এই বুড়ো ভামটাকে একটু টাইট দেবে। উনি ফের পায়ের অযুহাতে হাতে হাত দিলেন। বললেন, 'দেখি এখানে সমস্যা আছে কিনা? এসব ব্যথা খুব গুরুতর, সারা শরীর ছড়িয়ে পড়ে।'
ঝিলমিল চুপচাপ শুনে সাপের মত ফুঁসে উঠল। বা পায়ে ব্যথা, ডান পা এগিয়ে বুড়ো ব্যাটাকে একটা ফুটবলের মত কিক মারল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'শালা বুইড়া ব্যাটা এই বয়সে লুচ্চামি? বয়স কত হে? এক পা কবরে চলে গেছে, তারপর'ও ভন্ডামি যায় না। দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।'
ঝিলমিল দু'কদম এগিয়ে গিয়ে বুড়ো ব্যাটার চুল টানতে টানতে বলল, 'আমার কি চিকিৎসা করবি, আমি করব তোর চিকিৎসা। আয় আয়।'
ওইদিকে চেঁচামেচি বাহির পর্যন্ত পৌঁছে গেল। ঝিলমিল'ও সে সময় বুড়োটাকে টানতে টানতে রিসেপশনে নিয়ে এলো। রোদ্দুর এমন বিরল দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কী হচ্ছে? এই বয়স্ক লোকটাকে কেনো এই পাগল টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসছে?
.