রোদ্দুর এগিয়ে এসে ঝিলমিলকে থামাল। হাত ধরে চাপা ধমক দিয়ে বলল, 'কি করছিস এখানে? এইভাবে সিন ক্রিয়েট করার মানে কি?'
তখন ঝিলমিলের পা পুরোপুরি ঠিক হয়ে গেছে। অবশ্য এত গন্ডগোলের কারণে তারা কেনো এখানে এসেছিল সেটাই ভুলে গেছে। ঝিলমিল রোদ্দুরকে সবটা খুলে বলল। বুড়ো ডাক্তার তখন মাথানিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, প্রথম নিজেকে নির্দোষ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল কিন্তু ঝিলমিলের চোখ রাঙানির কাছে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় নাই।
পুরো ঘটনা শুনে রোদ্দুরের মাথা গরম হয়ে গেল। মানুষ বিশ্বাস করে যাদের কাছে নিজের চিকিৎসা নিতে আসে আর তারা যদি ক্ষ্যাপা সিংহের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে তবে প্রতিবাদ করার কেউ থাকবে না। ঝিলমিলের শত খারাপ দিকের মধ্যে এই একটামাত্র দিক রোদ্দুরের ভালো লাগল। সবাই তো আর প্রতিবাদ করতে পারে না, চুপচাপ নিজের ব্যর্থতা ভেবে মেনে নেয়, চুপ করে যায়; কিন্তু ঝিলমিল যেভাবে লোকটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এলো তা ব্যাখা করা অবর্ণনীয়।
তর্কাতর্কির বিষয়টা কখনোই ওর পছন্দ ছিল না। সে সরাসরি পুলিশে ফোন দিল। তারপর যেই না লোকটার সাথে একটু বোঝাপড়া করার উদ্দেশ্যে এলো ওমনি একটা নার্স ছুটে এসে অনুনয় বিনয় করে বলল, 'প্লিজ প্লিজ, এটা আমাদের হাসপাতালের রেপুটেশনের বিষয়। আপনারা একটু ধৈর্য ধরুন, স্যার আসছেন। এই লোক আমাদের এখানকার ডাক্তার না, একজনের অনুপস্থিতিতে ওনাকে রাখা হয়েছে।'
রোদ্দুর বলল, 'যাকে তাকে রেখে দিলেই হয়? আপনারা রক্ষা করার বদলে যদি ভক্ষক হওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে আমরা কোথায় যাব? আমরা এলাম সাধারণ একটা সমস্যা সমাধানে, সেখানে উল্টো আরও সমস্যা সৃষ্টি করলেন। এই আপনারা ডাক্তার? মানুষের সেবা করেন?'
কথাটা বলতে বলতেই রোদ্দুরের মনে পড়ল ঝিলমিলের পায়ের কথা। ওমা! এই মেয়ে তো দিব্যি হাঁটাচলা করছে। কিছুক্ষণ আগে তো ওই বুড়ো ব্যাটার সাথে ভালোই দোড়াদৌড়ি করল। রোদ্দুর এসে ঝিলমিলের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, 'আমরা কেনো যেনো এসেছিলাম এখানে?'
ঝিলমিল তড়িৎ গতিতে বলল, 'কেনো আবার? পায়ের ডাক্তার দেখাতে।' তারপর হঠাৎ নিজের পায়ের দিকে তাকাল। পা নাড়াচাড়া করে অবাক হয়ে রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে ইশারায় হাসল। করিডোরে একটা চক্কর কেটে এসে বলল, 'অ্যাই অ্যাই আমি হাঁটতে পারছি।'
রোদ্দুর প্রথমে মনে করেছিল, ঝিলমিল হয়ত তার সাথে গতকাল থেকে পা ব্যথা নিয়ে মশকরা করছিল তবে ওর চোখেমুখের উচ্ছ্বাস বলে দিল, সে মিথ্যা কথা বলে নাই।
পুলিশ এসে বুড়ো ব্যাটাকে অ্যারেস্ট করল এবং তাদের আশ্বস্ত করল। হাসপাতালের মেইন ডাক্তার এসে অনেকভাবে ক্ষমা চাইলেন, বিষয়টা গোপন রাখার কথাও বললেন। তারপর সবার শেষে নিজের একটা কার্ড দিয়ে বললেন, 'প্লিজ, যেকোনো প্রয়োজনে স্মরণ করবেন। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব আপনাদের সাহায্য করার জন্য। আর হ্যাঁ, আমি আবারও আজকের ঘটনার জন্য বিশেষভাবে দুঃখিত!'
ঝিলমিলের কাছে ডাক্তারটাকে ভালোই লাগল। বেশ ভদ্র, শান্তশিষ্ট স্বভাবের। অন্যের করা মারাত্মক ভুলের জন্য নিজে কতবার ক্ষমা চাচ্ছেন! ঝিলমিল আর রোদ্দুর বাড়ি ফিরে এলো। এতক্ষণ হাসপাতালের ফিনাইল, ওষুধপত্রের গন্ধে মাথা ধরে গিয়েছিল। বারান্দায় এসে মিনিট দুয়েক দাঁড়াতেই শরীর জুড়ে প্রশান্তির ঢেউ খেলে গেল। ঝিলমিল কড়ি করে দু'কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এলো।
রোদ্দুর হেসে বলল, 'আজ থেকে তো তাহলে তোর সাথে আই মিন আপনার সাথে ভালোভাবে কথা বলতে হবে। কোনো প্রকার উল্টাপাল্টা করা যাবে না। এমনিতেই এত বছর যাবত দেখে আসছি পান থেকে চুন খসলেই তোর চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায় আর আজ তো লঙ্কা কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেললি। তুই কি আগে থেকেই এমন?'
'একই সাথে বড় হয়েও আমাকে এই কথা জিজ্ঞেস করিস? জানা উচিত ছিল তোর।'
রোদ্দুর হালকা চালে মাথা নাড়ল। তারপর ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, 'তুই কি সত্যি পায়ে ব্যথা পেয়েছিলি নাকি....'
রোদ্দুরের কথা পুরোটা শেষ করতে দিল না ঝিলমিল। তার আগেই ওর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে নিজে বলল, 'বিশ্বাস কর, এসব মিথ্যা না। সত্যিই আমার পায়ে এমন ব্যথা ছিল যে মরার মত অবস্থা হয়ে গেছিল। কীভাবে যে ভালো হয়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না। আমি নিজেও অবাক!'
রোদ্দুর মুখে কিছু না বলে মাথা নাড়ল। বুঝতে পারল, এটা দৌড়াদৌড়ির ফালাফল।
কিছুক্ষণ বাদে ঝিলমিল রোদ্দুরকে বাড়ি যাওয়ার কথা বলল। রোদ্দুর মনে হয় এখন বাড়ি যেতে রাজি না, তাই খুব একটা গুরুত্ব দিল। 'দেখি', 'আচ্ছা আচ্ছা', 'যাবনি' বলে কাটিয়ে দিল।
ঝিলমিলের মন খারাপ হয়ে গেল। রোদ্দুরকে রাজি করানোর অন্য উপায় তার জানা নেই। ও হ্যাঁ, একবার দাদিকে ফোন করা যায়। উনি বললে তাও যদি রাজি হয়! ঝিলমিল ঘড়িতে সময় দেখে নিল, এখানে রাত না হলেও ওখানে যথেষ্ট রাত হয়েছে। কাল সকালে রোদ্দুর যখন অফিসে যাবে তখন কথা বলতে হবে।
.
সকালে হঠাৎ ছোট চাচ্চুর আগমন ঘটল। কলিংবেলের আওয়াজে ঘুম ছুটে গেল। রোদ্দুরকে দেখতে পেল না, নিশ্চয়ই চলে গেছে। বলেও যায় নাই একবার। ঘড়িতে সময় দেখল, সাড়ে দশটা বাজে। অলসতা ঝাড়ার সময় পেল না, অনবরত কলিংবেল বেজেই চলছে। ঝিলমিল উঠে বিছানার কম্বল, বালিশ সরিয়ে ওড়না খুঁজে বের করে দৌড়াল। এপাশ থেকে জিজ্ঞেস করল, 'কে?'
ওপাশ থেকে ভরাট গলায় কেউ একজন বলল, 'দরজা খোল, আমরা এসেছি।'
ঝিলমিল উঁকি দিয়ে লুকিং গ্লাসে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পেল না, যতটুকু দেখল ততটুকু ঝাপসা। ঝিলমিল দরজা খুলবে কিনা বুঝতে পারছিল না। আরেকটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, 'ঝিলমিল আমরা, তোর চাচা চাচি।'
ঝিলমিল তৎক্ষণাৎ দরজা খুলে সালাম দিল। বড় চাচা, বড় চাচি এবং তাদের সাথে ছোট চাচ্চুও এসেছে। ও কিছুটা অবাক হয়ে বলল, 'হঠাৎ তোমরা সবাই এখানে? আমাকে তো আগে বলো নাই।'
ছোট চাচ্চু বললেন, 'আগে বলি নাই বলে তুই আমাদের এতক্ষণ দরজায় ওয়েট করাবি? সেই কখন থেকে কলিংবেল বাজাচ্ছি, তোকে ফোনও করেছি কয়েকবার। কি করছিলি? ঘুমাচ্ছিলি তাই না। রোদ্দুর চলে গেছে অফিসে?'
ঝিলমিল নার্ভাস ভঙ্গিতে বলল, 'হ্যাঁ চ-চলে গেছে, আসলে আমার ফোন সাইলেন্ট ছিল তাই আমি খেয়াল করিনি।'
ঝিলমিল সবাইকে বসার জায়গা করে দিল। যেটা করছে সেটাতেই অপ্রস্তুত হয়ে যাচ্ছে, আগে কখনো এইরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় নাই! সাবরিনা এগিয়ে এসে বললেন, 'ঢাকায় এসেছি একটা কাজে, আমার বোন আছে না একটা ও একটু অসুস্থ তাই ওকে দেখতে এসেছি। তোর মা বাবাও আসতে চেয়েছে, কিন্তু যেহেতু তানির জন্মদিন আর তোরা ওখানে যাবিই তার আর এলো না। আমি ভাবলাম ঢাকায় যখন এসেছি তখন তোর নতুন সংসারটাও দেখে যাই। কি মন দিয়ে সংসার করছিস তো?' উনি ঝিলমিলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন। ও কোনোমতে মাথা নাড়িয়ে ইতিবাচক জবাব দিল।
ছোট চাচ্চু জানালেন তার এখানে আসার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিনি ঝিলমিলের ট্রান্সফার নিয়ে এখানে এসেছেন। এখানেই যেহেতু ওকে থাকতে হবে, তবে পড়াশোনাটাও এখানেই হোক। ওদের ওখানকার কলেজে সামনের মাসে পরীক্ষা আর এখানে সামনের সপ্তাহেই পরীক্ষা।
ঝিলমিল মুখটা কালো করে ফেলল। এমনিতেই পড়াশোনা থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে চায়, ততটাই সবাই মিলে তার দিকে ঠেলে দেয়। ওরা সকলে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু ঝিলমিল বারণ করল। যত যাইহোক, মেনে নিক অথবা না মেনে নিক— বড় চাচি যখন একটু আগে তার সংসার কথাটা উল্লেখ করেছে তবে তার এই সংসার থেকে সে কি করে মেহমানদের না খাইয়ে বিদায় করে! দাদি বলতেন, খালি মুখে চলে গেলে গৃহস্থের অমঙ্গল হয়। ঝিলমিল যেতে দিল না, কিন্তু তাদের তাড়া ছিল। তাই সে ঝটপট গিয়ে চা বানিয়ে নিয়ে এলো সকলের জন্য। চা খেতে খেতে সাবরিনা বললেন, 'ঝিলমিল তুই'ও আমাদের সাথে চল। তোর ছোট চাচ্চুর সাথে চলে আসিস। তারপর সবাই মিলে একসাথে সন্ধ্যার পর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিস।'
'কিন্তু রোদ্দুর যে বলল, ও যাবে না বাড়িতে।'
'ধুর, ও কথা কে শোনে? ওর কথার দাম আছে? আমাদের বাড়ির বউ যেতে চেয়েছে, আমরা তার কথাই শুনব।'
ঝিলমিল খুশি হয়ে গেল। তারপর রেডি হয়ে তাদের সাথে রওনা দিল। প্রথমেই বড় চাচির বোনের বাসায় যাওয়া হলো। ঝিলমিলের সাথে ওনাদের আগে থেকেই বেশ ভালো পরিচয় আছে, একসময় খুব যাওয়া-আসা হতো। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর হাসপাতালে গেল। ওরা কেবিনে গেলেও ঝিলমিল করিডোরে বসে রইল। হঠাৎ একটা মেয়ে ওর দিকে এগিয়ে এলো এবং পেছন থেকে কোনো সম্বোধন বিহীন ডাক দিল, 'এই মেয়ে শোনো!'
ঝিলমিল ঘুরে তাকিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল। মেয়েটা বলল, 'তুমি রোদ্দুরের কে হও?'
ঝিলমিল পাল্টা প্রশ্ন করল, 'আপনি কে?'
'আমি কে সেটা তো তোমার জানার প্রয়োজন নেই। তুমি বলো, রোদ্দুর তোমার কে হয়? ইদানিং তোমার সাথে ওকে খুব বেশি দেখতে পাচ্ছি। অন্য একটা ছেলে মানুষের সাথে এত রঙ-তামাশা কীসের?'
ঝিলমিল বোঝার চেষ্টা করল, এই মেয়েটা কে? রোদ্দুরের সাথে নিশ্চয়ই কোনো না ভাবে সংযুক্ত, তা না হলে ঝিলমিলকে চেনার কথা নয়। হতে পারে ফ্রেন্ড, নাহ ফ্রেন্ড হলে এত অধিকার কেনো দেখাবে?
সে সুন্দর করে হেসে জবাব দিল, 'আমার রঙ-তামাশা করতে ভালো লাগে। তোমার ভালো লাগে না? তুমিও করবে নাকি রঙ-তামাশা?'
'এত বাজে কথা কীভাবে বলো? বেহায়া কোথাকার! তোমাকে লাস্ট একটা কথা বলি, রোদ্দুর ইজ মাই বয়ফ্রেন্ড। ওর সাথে কাউকে আমি টলারেট করব না। সো, রোদ্দুরের কাছ থেকে অবশ্যই দূরে থাকবে।'
এরপর মেয়েটা ঢ্যাংঢ্যাং করলে চলে গেল। ঝিলমিল সহসা রোদ্দুরের কাছে মেসেজ দিল, 'তোর গার্লফ্রেন্ড কয়টারে?'
সাথে সাথে রোদ্দুরের রিপ্লাই এলো না। ঝিলমিল ফোন ব্যাগে রেখে রোগীকে দেখতে গেল। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর পর হঠাৎ রোদ্দুরের ফোন বেজে উঠল। এই প্রথম... বিয়ের পর.. না প্রথম না, এর আগেও ফোন করেছিল কিন্তু ঝিলমিল কখনো ফোন করতে পারে নাই। বেশিরভাগ কথা তার সাথে মেসেজেই হয়।
ঝিলমিল ফোন রিসিভ করতেই রোদ্দুর বলল, 'কোথায় তুই? আবার কি পাশের বাসার ভাবির সাথে গল্প করতে গেছিস?'
ঝিলমিল দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'না তোর গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে এসেছি। তুই'ও চলে আয়। একসাথে গল্প করি।'
'সত্যি করে বল, কোথায় তুই?'
'তার আগে তুই সত্যি করে বল, তোর গার্লফ্রেন্ড কয়টা? আজ একজনের সাথে দেখা হয়েছিল। তুই কি রানিং প্রেম করিস? আয়হায়, এটাকে কি বলে জানিস? এটাকে বলে পরকীয়া। ছিঃ ছিঃ, বংশের নাক কাটবি নাকি!'
রোদ্দুর বিরক্ত হয়ে বলল, 'যাতা কথা বলিস না ঝিলমিল। তুই কোথায় সেটা বল?'
'হাসাপাতালে এসেছি।'
'মানে কি? কেনো? আমার সাথে হেঁয়ালি করছিস?'
'না। হাসপাতালে মানুষ কেনো আসে বল?'
'চিকিৎসা করাতে।' রোদ্দুর জবাব দিল।
ঝিলমিল পুনরায় প্রশ্ন করল, 'আর কী?'
'কী? তুই বল। ফাজলামি করলে থাপড়ে গাল লাল করে দিব বেয়াদব। বাড়ি ফিরে এসব অশান্তি আমার পছন্দ হচ্ছে না।' রোদ্দুর রেগে গেল।
ঝিলমিল আগুনে ঘি ঢেলে বলল, 'কেনো রে? অশান্তি কেনো? বাড়ি ফিরে এসে আমাকে দেখতে পাচ্ছিস না বলে কি মন খারাপ? মিস করছিস? ওয়াও, ইন্টারেস্টিং!'
রোদ্দুরের তো বিরক্তির মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। শুধুমাত্র ঝিলমিল কোথায় আছে, এটা জানার জন্য এত বকবক করতে হচ্ছে এবং এত কথা শুনতে হচ্ছে। সে মাথা ঠান্ডা রেখে জিজ্ঞেস করল, 'এইবার বল, কোথায় আছিস। মিস যখন করছি বুঝতেই পারছিস তবে দ্রুত বল, গিয়ে দেখে আসি তোকে।' মনে মনে অবশ্য উল্টো কথা বলল, 'তোকে থাপড়িয়ে আসব জাস্ট একবার বল কোথায় আছিস তুই।'
ঝিলমিল এইবার সত্যি কথাই বলল। চাচা-চাচি এবং ছোট চাচ্চুর কথা বলল। রোদ্দুর তৎক্ষণাৎ হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওনা হলো। বাড়ির বড়রা আছে, তাই ঝিলমিলকে কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু ওর উপর রাগ সর্বোচ্চ ছাড়িয়েছে, বিরক্তিকর একটা! হাসপাতালে গিয়ে ঝিলমিলের সাথে চোখাচোখি হতেই সে চোখ রাঙ্গাল। ঝিলমিল দাঁত কেলিয়ে হাসল। সবার সাথে দেখা হওয়ার পর ছোট চাচ্চু বাড়ি যাওয়ার কথা বললেন। রোদ্দুর গাইগুই করে জবাব দিল, 'এইবার আর যেতে যাচ্ছি না। দেখি সামনের সপ্তাহে যাওয়ার চেষ্টা করব।'
বড় চাচা এসে ধমক দিলেন। তখন রোদ্দুর আর নিজের সিদ্ধান্তে অটুট থাকতে পারল না। বাড়ি যেতে রাজি হলো। ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঝিলমিলকে সাথে করে বাড়ি এসে ব্যাগপত্র গোছাল। একটা কথাও বলল নাই, ঝিলমিল যা বলল তাতেই চোখ গরম করে তাকাল। ঝিলমিল ওর সেই রূপ থেকে বলল, 'পুরো গরুর মত দেখাচ্ছে তোকে। এইভাবে তাকাস না প্লিজ, তাহলে নির্ঘাত তোর ব্রেকআপ হয়ে যাবে। এমনিতেই তোর যা গার্লফ্রেন্ড, বাবারে কী ঝগড়ি! কথাবার্তার কী ছিরি। পারলে আমাকে গিলে খেত।'
'ওহ হ্যাঁ জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি, তোর সাথে কি সানিয়ার দেখা হয়েছিল?'
'অত নামধাম আমি জানিনা। এটা কি সেই মেয়েটা যে সেদিন রাতে তোকে ফোন করে আবোলতাবোল কীসব বলছিল।'
'আমাকে কি বলছিল না বলছিল সেটা তুই কীভাবে শুনলি? আর কীভাবে জানলি ওটা একটা মেয়ে?'
ঝিলমিল নির্বিকারভাবে বলল, 'ফাস্টে আমি ফোন রিসিভ করছিলাম।'
রোদ্দুর বিস্ময়ে হা হয়ে বলল, 'মানে কী? আমার ফোন নিয়ে তুই কথা বলেছিস?'
ঝিলমিল কিছু বলল না। নিজের ব্যাগ নিয়ে নিচে নেমে গেল। রোদ্দুর'ও দরজা লক করে নিচে নেমে এলো। সারা রাস্তা আর ঝিলমিলের কাছ থেকে জবাব পাওয়া গেল না। বলল, 'পরে বলব। এখন বলতে ইচ্ছে করছে না।' রোদ্দুর হাল ছেড়ে দিয়ে বসে রইল। ঝিলমিল নড়েচড়ে আশেপাশে তাকিয়ে চারিদিকের দৃশ্য অবলোকন করেছিল।
ওরা যখন সুখানপুর এসে পৌঁছাল তখন প্রায় আটটা বাজে। বাস থেকে নেমেই রোদ্দুরকে ছাড়িয়ে ঝিলমিল সোজা রাস্তা ধরে দৌড় দিল। যেতে যেতে খোলা প্রকৃতিতে হাঁকডাক ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'মা মা, আমাকে বাঁচাও। আমি এক জাঁদরেলের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছি।'
.