ঝিলমিল রোদ্দুরে

পর্ব - ১৬

🟢

রোদ্দুরের সারারাত কাটল ওইভাবেই ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে। ঝিলমিলের উপর এত রাগ লাগল, যা বলার মত নয়। সিদ্ধান্ত নিল, কাল কাল সকাল সকাল'ই কেই জেলখানা থেকে নিজেকে মুক্ত করবে।

সারারাত একদমই ঘুম হলো না। হেলায় দিয়ে দাঁড়িয়ে এবং বসে রাত কেটে গেল। সকালের দিকে চোখটা একটু লেগে গেল। ঠিক ওই সময় ঝিলমিল এসে দরজা খুলে দিয়ে দেখল, রোদ্দুর এক কোণে ঘাপটি মেরে বসে আছে, মনে হয় ঘুমাচ্ছে। ঝিলমিলের এই বিষয়টা একদম খেয়াল ছিল না। তখন খেয়ালে থাকলে, ঠিকই একটা কম্বল দিয়ে দিত। একটু খারাপ লাগল নিজের কাছে। তার উপর আবার কপালের ক্ষতটা। বেশ গাঢ় হয়য়ে উঠেছে। ওই জায়গাটা লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। যত যাইহোক, একটা মানুষ তো! এভাবে সারারাত কষ্ট দেওয়া একদম ঠিক হয় নাই। ঝিলমিল একটা কম্বল নিয়ে এসে আলতো ভাবে রোদ্দুরের গায়ে দিয়ে দিল। ঘরের দরজার লক'টা এইবার খোলাই পেল। দ্রুত বের হলো। এক দৌড়ে তানিশার ঘরে এলো, কিন্তু তাকে ঘরে পাওয়া গেল না। রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। দরজায় উঁকি দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল, 'তানিশা কি এখানে আছে?'

সাবরিনা হেসে বললেন, 'আরে আরে, আমাদের বাড়ির নতুন বউ যে! এসো এসো, সুস্বাগতম। রাতে ঘুম ভালো হয়েছে আম্মাজান! এই নীলিমা, তোমার ছেলের বউ এসেছে খোঁজখবর নাও, ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করো।'

নীলিমা জিজ্ঞেস করলেন, 'রোদ্দুর কোথায় রে? উঠেছে ঘুম থেকে?'

'আমি জানিনা।' ঝিলমিল এইবার রিমঝিমকে খোঁজার উদ্দেশ্য সব ঘর উঁকি দিল। দু'জন ষড়যন্ত্রকারী একসাথে পালিয়েছে। দাদির ঘরের সামনে আসতেই তিনি ঝিলমিলকে ডাক দিলেন, 'কী রে নাতবউ! রাতে ঘুম হয়েছে ঠিকঠাক মত? আমার দাদুভাই কোথায়?'

'ঘুমাচ্ছে।'

'আচ্ছা, তুই এদিকে আয়। আমার পাশে বস দেখি। রাগ করে আছিস আমার উপর? দেখিস, একদিন ঠিকই বলবি দাদি তুমি ভাগ্যিস আমাদের বিয়েটা দিয়েছিলে। সেদিন আর সেই কথাটা শোনার জন্য আমি বেঁচে থাকলেই হয়!'

ঝিলমিল বিরক্ত হয়ে বলল, 'ধুর, এসব ইমোশনাল ডায়লগ দিও না তো। তোমার এই ডায়লগের চক্করে আমার জীবনের সাড়ে সর্বনাশ হয়ে গেছে।'

'ওই তো বললাম, একদিন ঠিক বুঝবি। বাদ দিই এসব কথা। একটা কথা সবসময় মনে রাখবি, মেয়ে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে তার স্বামী। চেষ্টা করবি স্বামীর মন যুগিয়ে চলতে, মেনে নিতে। এইটুকু করতে পারলেই তুই সংসার জীবনে সুখী। আর হ্যাঁ, পুরুষ মানুষ কিন্তু উড়তে পছন্দ করে। ঘরে অর্থাৎ খাঁচায় বন্দী পাখি থাকা সত্ত্বেও আকাশে চলতি পথে উড়ে যাওয়া অনেক পাখি কিন্তু মনে ধরে যায়। তুই কি করবি জানিস? মায়ায় বেঁধে রাখবি। মানুষ অনেক ক্ষেত্রে ভালোবাসা ছাড়তে পারে কিন্তু মায়া কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারে না। আর হ্যাঁ স্বামী মানে হচ্ছে.......'

ঝিলমিল চিবিয়ে চিবিয়ে নিজের মনেই বলল, 'স্বামী না তো আসামি।' দাদির করা পুরোপুরি শোনার প্রয়োজনবোধ করল না, উঠে চলে গেল।

.

রোদ্দুর ঘুম থেকে উঠে আসার পর বাড়ির সবাই ওর কপালের ক্ষতটা দেখে নিশ্চিত মনে মনে ভেবে নিয়েছেন, কাল রাতে নিশ্চয়ই দু'জন মারামারি করতে গিয়ে এই অবস্থা করেছে। শিমু ঝিলমিলকে একগাদা কথা শোনালেন। সম্ভব হলে, দু'টো থাপ্পড়'ও মারতেন। আফসোস করে কপাল চাপড়ালেন, এটা তিনি কেমন মেয়ে পেটে ধরেছেন! রাগে গজগজ করতে করতেই রোদ্দুরের কপলে খুব যত্ন করে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'বাবা, আর ব্যথা আছে?'

রোদ্দুর হেসে জবাব দিল, 'না কাকি।'

এতক্ষণ সে একটাও কথা বলে নাই। বাড়ির সবাই যা বলেছে, তা চুপচাপ কানে নিয়েছে। ওরা ভেবেছে, কপাল কেটে যাওয়ার জন্য ঝিলমিল দায়ী, রোদ্দুর সেটাতেই চুপচাপ সায় দিয়েছে। কাল ও যা করেছে, সেই তুলনায় এটা তেমন কিছুই নয়। শুধুমাত্র প্রতিশোধ নেওয়ার প্রথম ধাপ আর কী! ঝিলমিল অনেকবার নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইলেও কেউ তাকে বিশেষ পাত্তা দেয় নাই, সবাই রোদ্দুরকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল। ঝিলমিলের অসহায় চাহনি দেখে অনেকক্ষণ বাদে রোদ্দুরের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসির রেখা ফুটে উঠল।

.

দুপুরের আগে আগেই রোদশী এসে হাজির। গতকাল রাতে বিয়ের সময় সশরীরে উপস্থিত না থাকতে পারলেও ওরা ভিডিও কলে ঠিকই উপস্থিত ছিল। এই বাড়িতে সবাই তো ঝিলমিলের বিপক্ষে একমাত্র রোদশী'ই সবকিছুতে ওর পক্ষে ছিল। বড় বোনকে দেখেই ঝিলমিল কান্নায় ভেঙে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'দেখেছ ওরা কি করল আমার সাথে? আমি তো এই বিয়েটা করতে চাই নাই, জোর করে ইমোশনাল ব্ল্যাক'মেইল করে আমাকে বিয়ে করাইছে। তুমি এদের কিছু বলো আপু।'

সবসময় রোদশী ওর পক্ষে থাকলেও এইবার থাকতে পারল না। বলল, 'রোদ্দুর আমাদের হিরের টুকরো ছেলে। আমি তো তোদের সম্পর্কের কথা কোনদিন ভুলেও ভাবি নাই, ভাগ্যিস দাদি ভেবেছিল।'

বিজ্ঞাপন

'অ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা.... আমার হিরের টুকরো চাই না তো। কোনোমতে ভাঙ্গা চোরা একটুখানি কয়লার টুকরো আমার কপালে জুটলেও আমি খুশি হতাম।'

ঝিলমিলের হা'হুতাশ গেল না। কার কাছে একটু শান্তনা পাবে, তাই ভেবে ভেবে শিউলির কাছে ছূটল। আর শিউলি করল কি? ক্রিকেট খেলায় খেলোয়াড় ছক্কা মারলে যেমনে লাফায় ও ঠিক সেভাবেই লাফিয়ে উঠল। ঝিলমিলকে কংগ্রাচুলেশন জানিয়ে বলল, 'আরে বাহ দোস্ত! জীবনে একটা কাজের কাজ তুই'ই করলি। দেখ, আমার চাচাতো ভাই'ও নেই আর বিয়ের কোনো খবর'ও নেই। সবার মত তুই'ও প্রমাণ করে দিলি আজকের ভাইয়া, কালকের ছাইয়া!'

ঝিলমিল শুধু পারছে না দুনিয়াদারি উল্টে দিতে। ওর এই সাপের মত হিসহিস করা দেখে সকলেই মজা পাচ্ছে।

.

তানিশা আর রিমঝিম সকালেই বের হয়ে গিয়েছিল। তারা জানে, সকাল সকাল অবশ্যই ওদের খোঁজ পরবে। নতুন দুলাভাই এবং নতুন ভাবীর কাছে উত্তম মাধ্যম'ও খেতে পারে। তাই দুপুরের পর ওরা বাড়িতে ঢুকল। প্রথমেই ঝিলমিলের সাথে হয়ে গেল, কিন্তু ও কিছুই বলল না। তানিশা হেসে সুর টেনে জিজ্ঞেস করল, 'বাসর রাত কেমন কাটল ভাবিইইইইইই? কী কী করলে একটু শুনি। ননদ হিসেবে শোনার অধিকার তো আছেই।'

ঝিলমিল দাঁত কেলিয়ে হেসে জবাব দিল, 'খুউউউউব ভালো কেটেছে। এত ভালো কাটবে কল্পনাও করি নাই। আগে যদি জানতাম জীবনে এত আনন্দে কাটবে, তাহলে আগেই বিয়ে করে ফেলতাম তাও তোর ভাইকে।'

তানিশা খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, 'ওয়াও! আই এমন রিয়েলি হ্যাপি। ভেবেছিলাম গতকালের জন্য তুমি অনেক বেশি রেগে থাকবে প্লাস আমাদের বকাবকি করবে। কিন্তু তুমি যে নিজেই এতটা হ্যাপি হবে, ভাবতেই পারি নাই। কংগ্রাচুলেশন ফর ইওর ম্যারিড লাইফ।'

ঝিলমিল আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল। ওকে দেখে মনে হচ্ছে, ও দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষের মধ্যে একজন। কিন্তু সর্বক্ষণ ওর মাথার ভেতর যে বুদ্ধি এবং মানুষকে ফাঁসানোর ধান্দা ঘোরে, এটা আপাতত সবার জানা থাকলেও কেউ গুরুত্ব দিল না। মেয়েকে তো সবাই জানে, বোঝে। সবাই বলাবলি করছিল, 'এখন যেহেতু বিয়েশাদী হয়েছে, দেখে নিও ঝিলমিলের মাথার বুদ্ধি খুলবে। মেয়ে এইবার একটু মানুষের মত মানুষ হবে। এতদিন তো গায়য়ে গতরে যা বড় হয়েছে, মাথায় বুদ্ধিসুদ্ধি ছিল কিছু?'

ঝিলমিল আড়াল থেকে সেসব শুনে ঠোঁট বাঁকা করে, ত্যাড়া করে যেভাবে পারল; হাসল। আনন্দে তার নাচতে ইচ্ছে করছে। সবাই কত ইতিবাচক ভাবনা ভাবছে, ঝিলমিল সবার ভাবনা এক চুটকিতে হাওয়া করে দেওয়ার যোগ্যতা রাখে। গতরাতে রোদ্দুরকে বারান্দায় বন্দি করেছিল, আজ রাতের জন্য আরেকটা পরিকল্পনা সাজিয়ে রাখল।

.

রোদ্দুর বাড়ির সবার কাছে এক কাপ চা চাইল। কারো সময় হচ্ছে না, বাড়ি ভর্তি মেহমান। শিমু এসে ঝিলমিলকে ধমক দিয়ে বললেন, 'তোর কি কোনো কান্ড জ্ঞান নাই? অকর্মা মেয়ে কোথাকার! রোদ্দুর কখন থেকে এক কাপ চা চাইছে, একটু বানিয়ে দে যা। এইরকম করলে তুই সারাজীবন সংসার করবি কি করে? আশ্চর্য। এইরকম বেয়াদবি যেনো আমার সামনে করিস না ঝিলমিল। বড় হয়েছিস বলে কিন্তু ছাড় দিব না, থাপড়ে গাল লাল করে দিব।'

ঝিলমিল মুখ কালো করে ফেলল। রোদ্দুর যে সত্যিকার অর্থে তার চরম শত্রু, এটা বুঝতে পারল। আর তা না হলে, ওর জন্য তাকে কথায় কথায় বকা খেতে হয়!

ঝিলমিল চা বানাতে গেল। চা সে বেশ ভালোই বানাতে পারে। কিন্তু ঘরের শত্রু বিভীষণকে যত্ন করে চা বানিয়ে দিবে, তা হতে পারে না। ঝিলমিল চায়ে চিনির বদলে তিন চামচ লবণ দিয়ে দিল। তারপর সুন্দর করে ট্রে'তে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে গেল। রোদ্দুরকে বলল, 'নে খা। চায়ের জন্য নাকি সারা বাড়ি শুদ্ধ মানুষকে পাগল করে দিয়েছিস।'

রোদ্দুর চায়ের কাপ হাতে নিল, কিন্তু ঝিলমিলের কথার জবাব দিল না এবং ওর সাথে উচ্চবাচ্য'ও করল। মনে মনে বলল, 'মূর্খের সাথে তর্ক করা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোকামি।'

ঝিলমিল চা দিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেল। রোদ্দুরের হঠাৎ করে মনে পড়ল, আগামীকাল রবিবার। তার অফিস আছে, সে ঝট করে উঠে দাঁড়াল। সবকিছুর চিন্তায় মাথা থেকে আসল জিনিস'ই বেড়িয়ে গেছে। রোদ্দুর মনে মনে খুশি হলো। এই জেলখানা থেকে পালানোর একটা যুক্তিসঙ্গত উপায় সে পেয়ে গেল। উঠে ফটাফট নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিল। একটু বাদেই ঢাকার উদ্দেশ্য বেরিয়ে যাবে, কিন্তু কাউকে বলবে না। পৌছে গিয়ে তারপর বাড়িতে একটা ফোন করে দিবে।

রোদ্দুর চায়ের কাপ হাতে নিল। এক চুমুক খেয়েই চোখমুখ বিষিয়ে গেল। থু থু করে ফেলে দিল। প্রথম অবস্থায় টেস্ট বুঝল না, আরেকবার চুমুক দিল। ইয়াক থুহহহ! বেয়াদব মেয়েটা চিনির বদলে একগাদা লবণ ঢেলে দিয়েছে। উফফফ, আল্লাহ! এই মেয়েটা এমন কেনো? ওর মাথায় কি সামান্যও বুদ্ধি নেই! নাকি এসব ইচ্ছে করেই করে। কীসের যে এত শত্রুতামি? আজকালের নয়, একদম জন্মের পর থেকে। তখন খামচা খামচি করত। একবার তো খা'ম'চি দিয়ে রোদ্দুরের হাতের চা'ম'ড়া তুলে ফেলেছিল। কোলের সেই ছোটো বাচ্চা তখনই চুল টেনে ছিঁ'ড়ে ফেলত। আর এখন? সেই মেয়ে তো খ্যাপা ষাঁড় হবেই, স্বাভাবিক!

রোদ্দুর আর অপেক্ষা করল না। এখানে থাকলে সে পাগল হয়ে যাবে। আর এক মুহূর্তও নয়.... এক মিনিটও নয়। প্রথমে আশেপাশে দেখে নিল কেউ আছে কিনা। কাউকে দেখতে পেল না, তবুও রিস্ক নিতে চাইল না। নিজের ঘরের জানলা দিয়ে ব্যাগটা ফেলে দিল, আগে যেভাবে স্কুল পালানোর সময় বন্ধুদের সাথে করত; তাই ভালো অভিজ্ঞতা আছে। ব্যাগ নিচে ফেলে দিয়ে সকলের সামনে দিয়েই নেমে এলো। তারপর সোজা চলে এলো বাড়ির পেছনে। ব্যাগটা তুলল এবং ঝড়ের গতিতে দৌড় দিল। কিছুটা দূরে এসে হাঁটার গতি স্লথ হয়ে এলো। হেলতে দুলতে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকেই বলল, 'সাব্বাস রোদ্দুর। অবশেষে জেলখানা থেকে নিজেকে মুক্ত করে এনেছিস। ক্যারি অন, কোনো স্বৈরাচারীর ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না... কিছুতেই না। তোর এই সহজ-সরল, সুন্দর, ভদ্র জীবনে স্বৈরাচারীর স্থান হবে না।'

.

বিজ্ঞাপন
ঝিলমিল রোদ্দুরে গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও রহস্যময় গল্প