এই কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না। তবে চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় চারিপাশ অভিভূত। সবাই বলাবলি করছিল, আজ মনে হয় জোৎস্না রাত। রাতের আকাশে মেঘেরা দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মনে হয় আকাশ রাজ্য পাহাড়া দিচ্ছে। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে মাঝেমধ্যে দুয়েকটা তারা খুব নজরে পড়ছে। এমনই একটা মুহূর্তে ঘটনাচক্রে এমন দু'জন মানুষের জীবন একই সূত্রে গাঁথা পড়ল, যাদের এই সূত্র সম্পর্কে কোনো ধারনাই ছিল না। কী আশ্চর্য নিয়তির লিখন! আজকের এই ঘটনাটা ঘটবে বলেই হয়ত সেদিন সানিয়ার কাছে থেকে নির্মম প্রত্যাখ্যান পেতে হয়েছিল।
ঝিলমিল অনেকবার মানা করেছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয় নাই। মা-বাবা, চাচা-চাচিসহ সবাই উঠে পড়ে লেগেছে, এমনকি হবু শাশুড়িও। ঝিলমিলের মত জেদি মেয়েকে কব্জা করা সোজা ছিল না, শুধুমাত্র দাদি ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলেন বলে মানবিকতার খাতিরে এই বিয়ের আসনে বসতে হলো। ঠিক ৮ টা ১৮ মিনিটে তাদের বিয়েটা সম্পন্ন হয়েছে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ঝিলমিল মুখ কালো করে বসে আছে। একই অবস্থা রোদ্দুরের'ও।
ছোট চাচ্চু একটা রুমাল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'নতুন জামাই, এই রুমালটা দিয়ে মুখখানা ডেকে রাখো তো।' রোদ্দুর রুমালটা হাতে নিয়ে সেটাকে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে ধলাই মোচরাই করে রাগ মেটানোর ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
রোদ্দুরকে বিয়ে করতে হয়েছে বলে ঝিলমিলের যতটা না দুঃখ হচ্ছে, তারচেয়েও বেশি দুঃখ হচ্ছে এই ভেবে যে সে সারাজীবন এই বাড়ি থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছে অথচ এই বাড়িতেই আজ তার পারমানেন্ট জায়গা হয়ে গেছে।
রিমঝিম ফিসফিস করে ঝিলমিলের কানে কানে বলল, 'ভাবি ওমন মুখ ভার কেনো গো? একটু হাসো। আমরাও দেখি হাসলে তোমাকে কেমন দেখায়!'
একটু দূর থেকে দাদি বললেন, 'ওরে মিষ্টি খাওয়া। ওই চোখমুখ এরকম শক্ত করে রেখেছে কেনো? আজ একটা আনন্দের দিন, কোথায় এসে মুরুব্বিদের থেকে দোয়া নিবে তা না করে ঠাঁই ওখানেই বসে আছে। ও সেজো বউ, তোমার মাইয়ার কি হইছে জিগাও না কেন?'
দাদি এতক্ষণ অসুস্থ ছিলেন, এমন নাজেহাল অবস্থা যা মুখে প্রকাশ করার মত নয়। অথচ এখন তিনি সুস্থ, শুধু তাই নয় আগের মত সবাইকে ধমকাধমকিও করছেন, সবার সাথে হাসাহাসি করছেন। অন্যসময় হলে ঝিলমিল খুশি হতো, কিন্তু এখন ওর রাগ লাগছে।
সবার মাঝখান থেকে সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'আমি ঘরে যাব।'
বড় চাচি বললেন, 'যাবিই তো মা, তার আগে আরেকটু বস। শুভ কাজে একটু মিষ্টিমুখ করতে হয়। এই তানিশা তুই বসে বসে কি করছিস? উঠ যা। তোর নতুন ভাবিকে মিষ্টিমুখ করা।' বলেই তিনি চাপা হাসলেন।
রোদ্দুর এইদিকে তাকাল। কী থেকে কী করবে বুঝতে পারছে না। ইচ্ছামতো কাউকে রামধোলাই দিতে পারলে মনের রাগ মিটত। এই অসহ্যকর, ঝগড়াটে মেয়ের সাথে সারাজীবন সংসার করার কথা চিন্তা করলেই তো হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। নাহ, সম্ভব নয়। এখন'ই ভনভন করে মাথা ঘুরছে, ভবিষ্যতে তাহলে কী হবে!
ঝিলমিল আর কথা বাড়াতে চায় না বলেই চুপচাপ মিষ্টি খেয়ে নিল। তারপর নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই শুনতে পেল, সবাই বলাবলি করছে— বহু কষ্টে বাগান থেকে অল্পকিছু ফুল ছিঁড়ে রোদ্দুরের ঘরটা সাজিয়েছি। বিয়ে যেভাবেই হোক, বাসরটা অন্তত ঠিকঠাক হোক। আমাদের তো আবার.......
ওদের বাকি কথা ঝিলমিল শুনল না। বাসর? হাহ, সে এখন নিজের ঘরে গিয়ে দরজা যে বন্ধ করবে দু'দিনের মধ্যে ঘরের দরজা খুলবে না সিদ্ধান্ত নিল।
এইদিকে রিমঝিম আর তানিশা রোদ্দুরকে 'দুলাভাই, দুলাভাই' বলে সম্বোধন করা শুরু করে দিয়েছে।
বিয়ে যেহেতু কোনোরূপ অনুষ্ঠান ছাড়াই হঠাৎ করে হয়ে গেছে, তাই সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা থেকে তারা পরিপূর্ণ ভাবে বঞ্চিত হয়েছে.... হচ্ছে। এখন সবাই বায়না ধরল, শালী হিসেবে নতুন দুলাভাইয়ের কাছ থেকে তারা বখসিস আদায় করেই ছাড়বে। কিন্তু রোদ্দুরকে কিছুতেই টলানো গেল না।
রিমঝিম অনুনয়ের সুরে বলল, 'দুলাভাই প্লিজ! আজ টাকা না দিলে আপনাকে কিছুতেই ঘরে যেতে দিব না। সারারাত কিন্তু এখানে বসিয়ে রেখে আমরা পাহারা দিব।'
রোদ্দুর নির্বিকার কণ্ঠে বলল, 'ঠিক আছে।'
ওরা তবুও অনুনয় বিনয় করতেই লাগল। রোদ্দুর কোনো কথা শুনল না। ও ওখানেই বসে রইল। কিছুক্ষণ বাদে মেজো কাকি এসে ধমক দিয়ে বললেন, 'এই আমার ছেলেটাকে তোরা এইভাবে ধরে বেঁধে রেখেছিস কেনো? ছাড় ওকে। রোদ্দুর তুই উঠ বাবা, উঠে ঘরে যা।'
রোদ্দুর তাই করল। রোবটের মত নিষ্প্রাণ হেঁটে ঘরে চলে গেল।
নীলিমা তানিশাকে বললেন, 'ঝিলমিল তো ওর ঘরে তাইনা? শোন, নতুন বর বউ বিয়ের দিন এভাবে আলাদা থাকবে এটা তো ঠিক না। তোরা তো এখন দু'পক্ষের আত্নীয়। এক পক্ষের ননদ আরেক পক্ষের শালী। তোদের একটা কর্তব্য আছে না? আর নিশ্চয়ই কিছু বলে দিতে হবে না। যা এইবার।'
তানিশা আর রিমঝিম দু'জনেই ছুটল। পরিকল্পনা করল কীভাবে দু'জনকে আজ রাতে একসাথে করা যায়! দু'জনই ঘরে গিয়ে ভেতর থেকে লক করে রেখেছে। রাত বাজে সাড়ে দশটা! যা করার এক্ষুনি করতে হবে!
তানিশা অনেক ভেবেচিন্তে একটা বুদ্ধি বের করল, যদিও সেটা কতটা যৌক্তিক হবে তার জানা নেই। রিমঝিমকে বলতেই, সেও সায় জানাল। আপাতত মাথায় যেহেতু কিছুই আসছে না, তাই এই উপায়'ই অবলম্বন করতে হবে। প্রথমে তানিশা গেল ঝিলমিলের কাছে। গিয়ে দরজা ঠকঠক করে বলল, 'আপু আছো? একটু দরজা খোলো। কথা আছে।'
ঝিলমিল তৎক্ষণাৎ ওপাশ থেকে জবাব দিল, 'যা বলবি বাইরে থেকেই বল। আমি দরজা খুলব না।'
'আপুউউ.... আপু! একটা সারপ্রাইজ আছে। প্লিজ একটু বাইরে আসো।'
ঝিলমিল দরজা খুলে বের হলো। উঁকি দিয়ে তানিশার আশপাশ'টা দেখে নিল। কাউকে দেখতে পেল না বলে মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
তানিশাকে জিজ্ঞেস করল, 'কি হয়েছে? অসময়ে আমাকে বিরক্ত করছিস কেনো?'
'ছোট চাচ্চু দারুন একটা সারপ্রাইজের ব্যবস্থা করেছে তোমার জন্য। চলো প্লিজ। আমরা তো দেখে থ! ভাবছি, তুমি দেখলে কিনা করবে। তোমার কতদিনের স্বপ্ন ফাইনালি পূরণ হতে যাচ্ছে।'
ঝিলমিল তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল, 'কী সারপ্রাইজ?'
'সেটা আমি বলে দিলে মজা থাকবে? সবাই ওখানেই আছে, চলো প্লিজ।'
'আচ্ছা চল।'
ঝিলমিল দু'পা এগিয়ে গেলেই তানিশা বাঁধা দিয়ে বেশ সাবধানী কন্ঠে বলল, 'আপু দাঁড়াও। এভাবে যেও না।'
ঝিলমিল নিজের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কেনো? খারাপ দেখাচ্ছে বা কি সমস্যা?'
'না না, তুমি ঠিক আছো। সারপ্রাইজ অবশ্যই সারপ্রাইজের মত হতে হবে তাইনা! আসো, তোমার চোখ বেঁধে নিয়ে যাই।' বলেই তানিশা হাতের মুঠোয় লুকিয়ে রাখা রুমালটা বের করল।
ঝিলমিল ইতস্তত করে বলল, 'আশ্চর্য! এসবের কি দরকার? এমনিতেই তো....'
'উহুঁ, সবসময় শাসন চলবে না। দেখি ঘোরো ওইদিকে, তারপর চলো আমার সাথে।' তানিশা ঝটপট ঝিলমিলের চোখ বেঁধে দিল। তারপর ঝিলমিলকে নিয়ে একবার ড্রয়িংরুম রুমে গেল, একবার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আবার উপরে উঠে কয়েকটা ঘর ঘুরে রোদ্দুরের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। উঁকি দিয়ে দেখল, রোদ্দুর'ও ঘরে নেই। তারমানে রিমঝিম'ও তার কাজ ঠিকঠাক মত করেছে। তানিশা ঝিলমিলকে নিয়ে বসিয়ে দিল। ঝিলমিল বুঝল না কোথায় এসেছে! জিজ্ঞেস করল, 'সারা দুনিয়া ঘুরে কোথায় এসে বসলাম? এইবার কি চোখের বাঁধন খুলতে পারব?'
'এক মিনিট....'
ততক্ষণে রিমঝিম'ও রোদ্দুরকে নিয়ে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। ওর'ও চোখ বাঁধা। তানিশা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো দ্রুত। দুজন'ই রোদ্দুরকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে তৎক্ষণাৎ দরজা বাহির থেকে লক করে দিল। ওইদিকে রোদ্দুর কিছু বুঝে উঠতে পারল না, হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়ে টেবিলের কোণার সাথে হাতে কপালে বেশ ব্যথা পেল। শব্দ শুনে ঝিলমিল উঠে দাঁড়াল এবং চোখের বাঁধন একটানে খুলে ফেলল। রোদ্দুর এবং ঝিলমিল দু'জনই দু'জনকে এইভাবে দেখে হতবাক হয়ে গেল। রোদ্দুর কোনোমতে কপাল ডলতে ডলতে উঠে দাঁড়াল। দু'জনেই একসাথে বলে উঠল, 'তুই? তুই এখানে?'
কথাটা বলেই রোদ্দুর চারিদিকে চোখ বুলাল। এগিয়ে এসে পুনরায় বলল, 'আমার ঘরে তুই কি করছিস? এসবের মানে কি?'
ঝিলমিল তাকিয়ে দেখল, সে সত্যিই রোদ্দুরের ঘরে। তারমানে ওরা তাকে ধোঁকা দিয়েছে, এত্ত বড় ধোঁকা! এতক্ষণ ঝিলমিলের কান্না পায় নাই, চাপা রাগ ছিল। কিন্তু এইবার সত্যি সত্যি কান্না পেল। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, 'আমি কীভাবে আসলাম এখানে? চলে যাব। আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।'
রোদ্দুর দরজায় হাত দিয়ে দেখল বাহির থেকে দরজা লক। বুঝতে পারল, এতক্ষণ তার আদরের ছোটো বোনের বলা প্রতিটা কথাই ছিল ওদের পরিকল্পনার একটা অংশ মাত্র।
রোদ্দুর ঝিলমিলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, তুই এখানে কেনো এসেছিস? ওরা তোকে বলল আর তুই ঢ্যাংঢ্যাং করে নাচতে নাচতে চলে এলি?'
'ওরা তো আমাকে সারপ্রাইজের কথা বলে নিয়ে এসেছে।' ঝিলমিল এইবার কেঁদেই বলল।
রোদ্দুর বুঝল, ওকে কিছু বলে লাভ নেই। ওই নিজেই ষড়যন্ত্রের শিকার। এমনিতেই কপালের অংশটুকু কেটে যাওয়াতে ওই জায়গাটা চিনচিন করছে, তারমধ্যে এই মেয়ের ফ্যাসফ্যাস করে কান্নাকাটির শব্দ একেবারেই মাথা ধরিয়ে দিল। সারাদিন আজ বহুত ধকল গেল, আর সন্ধ্যার পর তো জীবনের উপর দিয়ে ঝড় উঠে গেছে। ভেবেছিল, এখন একটু শান্তিমত বসে বিশ্রাম করতে পারবে। কিন্তু তা আর হলো কোথায়? একটু আগে ঘরে ঢুকেই সর্বপ্রথম ফুল লতাপাতা গুলো সরিয়ে এই সাইডে রেখে দিয়েছিল।
ঝিলমিল এক কোণায় ওই ফুলগুলো দেখে বলল, 'আমার কষ্ট করে লাগানো ফুলগুলো তুই তুলে কেনো এনেছিস? আবার নষ্ট করে ফেলে দিয়েছিস।'
এখন তার কথায় ঝগড়ার আভাষ টের পাওয়া যাচ্ছে না। কান্নাকাটির কারণে কথা বলছে মৃদুস্বরে।
রোদ্দুর ধমক দিয়ে বলল, 'চুপ থাক।'
'আমি এখানে থাকব না।'
'আমার'ও তোকে এখানে থাকতে দেওয়ার ইচ্ছে নেই। ওই যে বারান্দা, গ্রিল বেয়ে নেমে চলে যা। আমি আটকে রাখি নাই।'
রোদ্দুর ওর সামনে থেকে চলে গেল। ঝিলমিল ভাবতে লাগল, কী করে ওকে এই ঘর থেকে বের করা যায়। এই বাঁদরের সাথে সে কিছুতেই এক ঘরে এক বিছানায় থাকতে পারবে না, অসম্ভব। রোদ্দুর ফ্রেশ হয়ে এলো, হাতের তোয়ালেটা বারান্দায় নিয়ে যেতেই ঝিলমিল সেই সুযোগটাকে কাজে লাগাল। রকেটের গতিতে দৌড়ে গিয়ে বারান্দায় দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। রোদ্দুরের উদ্দেশ্য বলল, 'চেঁচামেচি করবি না। আমি কিন্তু একদম দরজা খুলব না। সকাল হবে, তখন নিজে গিয়েই দরজা খুলে দিব।'
রোদ্দুর জীবনে প্রথম এতটাই হতভম্ব হয়ে গেল। একটু আগে যখন ওরা দরজা বন্ধ করেছিল, তখন অযথা সিনক্রিয়েট হবে ভেবে সে চেঁচামেচি থেকে বিরত দিয়েছে। এইবার'ও তাই করল.... করতে বাধ্য হলো। উফফফ আল্লাহ, ভালো মানুষীর ফল বারবার এইরকম নিষ্ঠুর হচ্ছে কেনো?
.