রোদ্দুরের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। যেহেতু ওখান থেকে খাওয়া করেই ফিরেছে, তাই এসে ফ্রেস হয়ে সোজা শুয়ে পড়ল। এক ঘুমে রাত কাবার!
সকালে কোন প্রয়োজনে নয়, এমনিতেই বেরিয়েছে ওমনি সানিয়ার সাথে দেখা। একই শহরে থাকে তাই হুটহাট দেখা হওয়াটা মোটেও অবাক করার মত ব্যাপার নয়। রোদ্দুর চেষ্টা করল এড়িয়ে যেতে। কিন্তু সানিয়া ঠিকই পথরোধ করে দাঁড়াল।
রোদ্দুর একরোখা জেদি কণ্ঠে বলল, 'পথ ছাড়ো।'
'তুমি বললেই আমাকে শুনতে হবে? আমি যদি এখন তোমাকে বলি, তোমাকে আমি ভালোবাসি; তবে তুমি সে কথা শুনবে?'
রোদ্দুর বিদ্রুপ করল, 'হাস্যকর!'
'তুমি একসময় বলেছিলে, যেকোনো পরিস্থিতিতে কখনো আমার হাত ছাড়বে না। তোমার সেই কথার কি কোনো দাম নেই? এতটা ভিত্তিহীন ছিল.....'
'নিজেকে দয়া করে আর হাসির পাত্রী বানিয়ো না প্লিজ। তুমি আমার ভালোবাসা নিয়ে দিনের পর দিন খেলা করে যাবে, আমার যত্ন করা, পাশে থাকাকে ভেজাল মনে করবে, আমি ভালোবাসি বললে তুমি সেটাকে হেসে উড়িয়ে দিব— তোমার কি মনে হয় আমাকে? এরপরও আমি নির্লজ্জের মত তোমার পিছু পড়ে থাকব? হোয়াই? পৃথিবীতে মানুষের আকাল পড়েছে? তুমি ছাড়া আর কেউ নাই আমার জন্য?' রোদ্দুর রেগে গেল।
রাগের চোটে পুনরায় একনাগাড়েই বলতে লাগল, 'কোথায় তোমার তানভীর এখন? ওকে পাচ্ছো না এখন? নাকি ওর জীবনে তোমার দরকার ফুরিয়েছে? যাও, যাও ওখানেই যাও। আমার কপালে ভাই মানুষ থাকে না।'
রোদ্দুর সানিয়াকে আর কিছুই বলার সুযোগ দিল না। গটগট করে সামনের দিকে হেঁটে যেদিকে দুচোখ গেল, সে পথ দেখল।
.
শিমুর মেজাজ আজ বড্ড খারাপ হয়ে আছে। রাগে গজগজ করতে করতে উনি রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন কাজের মেয়েটা কাজ বাদ দিয়ে জানালায় উঁকি দিয়ে একজনের সাথে হাসাহাসি করছে। অন্যসময় হলে শিমু কিছু বলতেন না কিন্তু এখন কড়া একটা ধমক দিলেন। মেয়েটা আচমকা ভয় পেয়ে সরে দাঁড়াল। শিমু বলল, 'এদের কাজ নাই কর্ম নাই, সারাদিন খালি আড্ডা। আড্ডা দেওয়ার হলে কাজ করতে আসিস কেন বাপু? যা না, ওদিকেই চলে যা। এই বাড়িতে কি? সব যন্ত্রণা কেনো যে আমাকেই পোহাতে হয় কে জানে?'
তৎক্ষণাৎ সাবরিনা এসে তার রেগে যাওয়ার কারণটা জিজ্ঞেস করলেন। শিমু তার'ও জবাব দিল না। একমনে চুপ হয়ে চুলায় রান্না বসিয়ে দিল। তার রাগের কারণ কিছু না.... কেউ না; একমাত্র ঝিলমিল ছাড়া। মেয়ের কর্মকাণ্ডে মাঝে মাঝে তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন। ভাবতে থাকেন, এই মেয়েটাকে আসলেই পেটে ধরেছেন তো!
আজ সকালে ঘরে গিয়ে দেখলেন, সেজেগুজে মহারানী ভিক্টোরিয়া হয়ে বসে রয়েছে। কারণ জিজ্ঞেস করতেই ঝিলমিল উত্তর দিল, 'ঘুরতে যাব মা।'
'কোথায় ঘুরতে যাবি? আগে তো আমাকে বলিস নাই। তোর বাবাকে বলেছিস?'
'না কাউকে কিছু বলি নাই।'
'তবে কোন সাহসে তুই সেজেগুজে বসে আছিস?'
ঝিলমিল কথার জবাব দিল না। আয়নার সামনে বসে আঁচড়ানো চুলগুলো ফেল ঠিকঠাক করতে লাগল। মা যে বারবার জিজ্ঞেস করছে একটা কথা, সেটা কানেই নিচ্ছে না। মা শেষবারের মত বললেন, 'কথার উত্তর দিবি নাকি থাপ্পড় খাবি?'
ঝিলমিল মায়ের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, 'কোথাও যাচ্ছি না। তোমার শশুর বাড়িতেই আছি। এমনিই, মনে রং লেগেছে তাই সাজগোজ করে বসে আছি। সুন্দর লাগছে না আমাকে? জানি জানি, সুন্দর লাগছে। আচ্ছা মা তুমি কী ভেবেছ বলো তো? আমি বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘুরতে যাচ্ছি? সো স্যাড! আমার তো বয়ফ্রেন্ড'ই নাই।'
মেয়ের এসব উল্টাপাল্টা কথা শোনার পর থেকেই তার মেজাজ তুঙ্গে। ওর বাবা তো ভুলেও মেয়েকে কিছু বলে না, বাড়ির কেউ বলে না; সবার লাই পেতে পেতে ও এখন তার মাথার উপর চড়ে নাচছে।
বড়টা যথেষ্ট ম্যাচিউর ছিল, বুঝবুদ্ধি জ্ঞান সর্বদা ভালো ছিল। আর ছোটো টা? কীভাবে যে এটার একটা গতি করবেন তাই ভাবছেন। পুরাই বেয়াক্কেল।
রেহানা খাতুন রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। সারাদিন ঘরে শুয়ে বসে থাকতে আর ভালো লাগে না। ঘরের কাজকর্ম করার মত শক্তিও এখন নেই। বউদের বারণ সত্ত্বেও মাঝেসাঝে উঠে এসে রান্নাঘরে উঁকি দেন। বহু বছরের অভ্যাস, কী করে ছাড়বেন!
ওনাকে দেখে নীলিমা এগিয়ে এসে বলল, 'আম্মা আপনি? কিছু লাগবে?'
'না কিছু লাগবে না। ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না তাই এলাম। তোমাদের রান্নাবান্না শেষ নাকি? রোদ্দুরের সাথে তোমার কথা হয়েছে?'
'হয় তো। সকালেই কথা বললাম।'
'তো সাহেব বিয়ের কথা কি বলল? আর জানিয়েছে কিছু? তোমরা বলেছ কিছু নাকি তোমাদের'ই আপত্তি? কোনটা?'
'আমাদের দিক থেকে তো কোনো আপত্তি নেই। রোদ্দুরকে অনেকবার বলেছি, ঘুরেফিরে ওর সেই একই কথা; ও নাকি বিয়েই করবে না।'
রেহানা রেগে বললেন, 'ও বিয়ে করবে না ওর বাপ বিয়ে করবে। যত্তসব কাহিনী করে পোলাপান।'
শাশুড়ির কথা শুনে শিমু আর সাবরিনা দু'জনেই মুখ টিপে হাসলেন। নাতির বদলে ছেলের বিয়ে করাবেন, বাহ বেশ হবে। ওমন সময় ঝিলমিল রান্নাঘরে এসে এককাপ চা চাইল।
দাদি ওকে পাকড়াও করলেন। বললেন, 'তুই সারাদিন এইরকম টইটই করে ঘুরে বেড়াস কেন?'
ঝিলমিল চুল নাড়াতে নাড়াতে বলল, 'ভালো লাগে!'
'ন্যাকা! পড়াশোনার তো বালাই নাই। অযথা টাকা পয়সা নষ্ট। সবগুলো একই পদের।'
ঝিলমিল চোখ উল্টে বলল, 'হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলেছ।' এরপর ঝিলমিল নাচতে নাচতে, চুল উড়াতে উড়াতে, গান গাইতে গাইতে চলে গেল। তিনি শুধু পড়া চোখে তাকিয়ে নাতনির কর্মকাণ্ড দেখলেন। মেয়েটা দিনকে দিন অসভ্য হয়ে যাচ্ছে। এইজন্য চেয়েছিলেন, রোদ্দুরের সাথে ওর বিয়েটা দায়ে একটা গতি করতে। কিন্তু পাত্র-পাত্রী কেউ রাজি হচ্ছে না, কেউ কাউকে সহ্য'ই করতে পারে না, সম্পর্কটাও সাপে নেউলে!
রোদ্দুর এই বংশের একমাত্র ছেলে। ওনার একটাও মেয়ে নেই আর ওনার ছেলেদের মেয়ের অভাব নেই! একমাত্র নাতিকে তাই নিজেদের মধ্যেই রাখতে চান। কিন্তু এরা যা ত্যাড়া স্বভাবের, ভবিষ্যৎ কী হয় কে জানে?
শিমু বললেন, 'আম্মা ওর সাথে কথা বলে কাজ নেই। ওই কথায় কথায় ঝংকার মারে। মেয়ে মানুষ এমন হলে হয়? আপনি ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করুন।'
'মেয়েকে সামলাও। কথাবার্তার সাইজ এমন কেন? এখনই এমন শুরু করছে বাকি জীবন তো পড়েই আছে। মেয়ে মানুষকে হতে হয় সহজ, নম্র, ভদ্র। তোমার এই মেয়ে এইরকম ধানি লঙ্কা হলো কথা থেকে? আশ্চর্য!'
শিমু জবাব দিলেন না। এই মুহূর্তে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মেয়ের সাথে তিনি আর কথাই বলবেন না।
.
রোদ্দুর বোঝে না, একটা মানুষ কী করে এতটা লাইফলেস এতটা ফালতু কী করে হতে পারবে? সে একসময় সানিয়াকে ভালোবেসেছিল ঠিকই, সেটাও মন থেকে। করো সাথে বাজি রেখে সে কিন্তু সানিয়াকে ভালোবাসে নাই। তবে হ্যাঁ এটা সত্যি যে, নিজের জেদের কারণেই এবং তানভীরের কাছ থেকে সানিয়াকে নিজের কাছে নিয়ে আসার জন্য'ই সে দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করেছিল। তবে সেটাতে তো প্রথমে ভালোবাসাটাই মুখ্য ছিল, বাদবাকি সব অনেক পরে। তানভীর যে এখন আগে পরে পিঞ্চ মেরে কথা বলছে, সেটা রোদ্দুরের হজম হচ্ছে না। এই মূর্খ ছেলের সাথে বাজে তর্ক করার'ও কোনো ইচ্ছে নেই। এমনিতে যাইহোক না কেন, রোদ্দুর শান্তশিষ্ট স্বভাবের; ছোটো বেলা থেকেই। কেউ তাকে না খোঁচালে সহজে সে কারো ধারে কাছে যায় না।
আজকে রোদ্দুরের সাথে দেখা হতেই প্রথম যে কথাটা বলল তা হলো, 'ফাইনালি চ্যালেঞ্জ'এ হেরেই গেলে। যেখানে হেরে যাবে সেখানে পাঙ্গা নেওয়া কি ঠিক মশাই? তোমার জন্য আমার সত্যি খুব খারাপ লাগছে।'
রোদ্দুর হেসে বলল, 'আশ্চর্য! এত সিমপ্যাথি দেখাচ্ছ যে? কে চেয়েছে?'
'আমার মন অনেক বড়। চাইতে হয় না এমনি সবাইকে সবকিছু দিয়ে দিই।'
'ওহ আচ্ছা.... সবকিছু? আই মিন সবকিছু? ঠিক আছে।' রোদ্দুর হো হো করে হেসে উঠল।
তানভীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 'হোয়াট ডু ইয়ু মিন?'
'নাথিং। একটা কথা বলে রাখি.... সানিয়া ইজ ইউর'স নাও। বি ইউর'স, কিপ ইট। বাট বাই নো মিনস কাম টু আরগ্যু উইথ মি অন দিজ ম্যাটার। অ্যানিওয়ে, গুড লাক ফর ফিউচার লাইফ।'
রোদ্দুর তানভীরকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না। বাইক স্টার্ট দিল এবং সেখান থেকে চলে গেল। মানুষকে সুযোগ দিলেই মাথায় চড়ে নাচে। আর সুযোগ না দিলে, কথা বলতে আসার সাহসটুকুও পায় না।
.
গতকাল মাঝরাতে হঠাৎ ঝিলমিলের ঘুমের ঘোরে মনে হলো, কেউ তার ঘরের জানালায় ঠকঠক করতেছে। কিন্তু ঘুমের ঘোরে থাকায় তখন খেয়াল করে নাই। সকালে উঠে ঝাপসা মনে পড়তেই, মনের ভুল ভেবে ঝেড়ে ফেলল। কিন্তু সন্ধ্যার পর আবার সেই আওয়াজ... কেউ ঠকঠক করছে। ঝিলমিল জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ যাবত 'কে কে' করল। কিন্তু কারো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। জানালা খুলে উঁকিঝুঁকি দিয়েও কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। ঝিলমিল চিন্তিত হয়ে ছোট চাচ্চুকে বিষয়টা জানাল। পাড়ার ছেলেপেলেরা অনেকসময় এইরকম ফাজলামি করে থাকে।
তিনি ঝিলমিলকে বললেন, 'আচ্ছা তুই আজকে রাতে মায়ের সাথে ওই ঘরে থাক। আমি এই দিকটা দেখতেছি।'
ঝিলমিল তাই করল। নাচতে নাচতে দাদির কাছে চলে এলো। পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'হেই ডার্লিং, আজ রাতে তোমার কাছে থাকতে এসেছি।'
রেহানা ঝিলমিলকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, 'সর তো হতচ্ছাড়ি, এই বয়সে তোর ভার নিতে পারি আমি? এইভাবে বাদড়ের মত ঝুলছিস কেনো?'
'কারণ তুমি মুক্তো।' ঝিলমিল বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হাসল।
অন্য ঘরে ঝিলমিলের মোটেও ঘুম আসে না। মাঝেমধ্যে চিন্তা করে শ্বশুর বাড়ি গেলে সে রাতে ঘুমাবে কি করে? এই চিন্তার সমাধান অবশ্য শিউলি করে দেয়। বলে, 'তোর স্বামী তোকে রাতে ঘুমাতে দিলে তো তারপর ঘুমাবি।'
ঝিলমিল'ও বলে, 'হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক ঠিক.....' তারপর'ই বোধগম্য হয় শিউলির অসভ্য কথাখানা। তৎক্ষণাৎ পিঠের উপর ধুমধাম কিল বসিয়ে দেয়।
আজ এই ঘরে এসে রাতে ঘুমানোর সময় কেমন সব অচেনা অচেনা লাগছিল। তার উপর কোলবালিশ'ও নেই। ঝিলমিল কিছুক্ষণ এ'পাশ ও'পাশ করে দাদিকে বলল, 'কোলবালিশ কই? আমার কোলবালিশ!'
'কোলবালিশ ছাড়া থাকার অভ্যাস কর।'
'কেনো?'
'জামাইয়ের বাড়ি গেলে তখন কোলবালিশ কোথায় পাবি?'
'যেই বাড়িতে আমার পছন্দের জিনিস নাই, সেখানে আমি বিয়েই করব না।' ঝিলমিল সাফ জানিয়ে দিল।
দাদি হেসে বললেন, 'ওরে গাঁধী মেয়ে! জামাই কি আর তোকে কোলবা নিতে দিবে? তখন বলবে, আমি থাকতে আবার তোমার কোলবালিশ লাগে? তাই বলছি এখন থেকেই অভ্যাস করে ফেল। হাহাহা!'
.