অন্তরালের প্রণয়িনী

পর্ব - ৮

🟢

বিষণ্ন মন নিয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে সুবহা, তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। সকাল পেরিয়ে বিকেল হতে চললো, কালকের ঘটনাটা বারবার মনে পড়ছে তার। ওভাবে সবার সামনে বিয়ে ভেঙে দিয়ে কি অপমান করলো অরণ্যের আম্মুকে! কিন্তু তার যে আর কিছুই করার ছিল না—যেভাবেই হোক, বিয়েটা ভাঙতেই হতো। কারও বিরক্তির বা সম্পর্ক ভাঙার কারণ সে হতে চায় না।

মনের ভেতর এমন খারাপ লাগা কাজ করছে কেন? কেন বিষণ্নতা ঘিরে ধরেছে তাকে?

কাঁধে কারও হাতের স্পর্শ অনুভব করে সুবহা মাথা ঘুরিয়ে তাকালে কিয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সকাল থেকে সুবহার আম্মু, আব্বুসহ বাড়ির বাকিরা তার রুমে এসেছে বহুবার, জিজ্ঞেস করেছেন সুবহার বিয়ে ভাঙার কারণ। প্রতিউত্তর করেনি সুবহা। উত্তর না পেয়ে বিরক্ত হয়ে সবাই একে একে চলে গিয়েছিলো তখন। সুবহার আব্বু, জাহিদ হোসেন, ঠিক করে নিয়েছিলেন—নিজে থেকে কারণটা না বললে মেয়েকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না তিনি।কিন্তু এতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে যে বড়সড় কোনো কারণ আছে এটাও কারোর বুঝতে বাকি নেই।

কারও সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে না সুবহার। তবে কিয়ান যে সুবহাকে কোনো প্রশ্ন করবে না, এটা সে জানে। নিজেকে স্বাভাবিক করে মুখে হাসি টেনে কথা সুবহা কিয়ানের সাথে।

— ‘ কিছু বলবে ভাইয়া?’

কিয়ান কোনো কথা না বলে সুবহার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় তাকে ছাদ থেকে। কিয়ান কি করতে চাইছে বুঝলোনা সুবহা আবারো প্রশ্ন করেছে কিয়ানকে। —--

—‘ কোথায় নিয়ে যাচ্ছো ভাইয়া?

—‘ আমরা ঘুরতে যাবো। ’

— ‘কি! ঘুরতে যাবো আজকে? কালকেই এত কিছু হলো, বাড়ি থেকে বেরুলেই তো পাশের বাড়ির চাচির মতো লোকজন এটা-সেটা বলবে।’

— ‘যে বলবে, তার মুখ ভেঙে গুড়িয়ে দেব আমি। এত কথা না বলে আয় তো, আজকে বাইরে লাঞ্চ করে আসবো দুজনে।’

কিয়ানকে কিছু বললেও সে শুনার পাত্র নয়, তাই সুবহাও আর কথা বাড়ায়নি। তবে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় আপত্তি করেছে সবাই। একেকজনের একেক কথায় বিরক্ত লাগছিল সুবহার। তার মধ্যে আবার আনহা সবাইকে সব কথায় সাপোর্ট করে যাচ্ছিল।

কিয়ান একপ্রকার রাগ দেখিয়েই সুবহাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। ভাইকে বাধা দিতে পারবেনা তাই সুবহাও আর কিছু বলেনি চুপচাপ কথা শুনে গেছে কিয়ানের।

একটা বড় রেস্টুরেন্টের সামনে এসে গাড়ি থামিয়েছে কিয়ান,সুবহা নেমে দাঁড়িয়েছে একপাশে। কিয়ান সুবহাকে অপেক্ষা করতে বলে কোথাও একটা গেলো। সুবহা জানে এরকম কিছু কিয়ান করবে,এই এক সমস্যা তার ভাইয়ের কোথাও গেলে কিয়ান কয়েক মিনিট অপেক্ষা করিয়ে কোথাও একটা যাবে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল সুবহা জায়গাটা সুন্দর অনেকটা পার্কের মতো। সারিবদ্ধ গাছ সুন্দর পাকা রাস্তা তার মধ্যে আবার রাস্তার দুই পাশে ফুলের চারা লাগানো। একটা বাচ্চা মেয়ে কোথা থেকে দৌড়ে এসেছে সুবহার কাছে হাতে থাকা ঝুড়িতে তার কাঁচা লাল গোলাপ আর বেলিফুলের মালা। মেয়েটা সুবহার দিকে ফুল বাড়িয়ে দিয়েছে ইচ্ছে না থাকলে ফুলগুলো হাতে নিয়েছে সুবহা মেয়েটা মিষ্টি হাসির অধিকারী এমন মায়া ভরা চাহনির নিস্পাপ বাচ্চা মেয়েটাকে কিভাবে ফিরিয়ে দিবে সুবহা?ফুলগুলো হাতে নিয়ে মেয়েটার সাথে কথা বলেছে অনেকক্ষণ। এই অল্প সময়ে মেয়েটার সুন্দর কথায় কেমন মায়া জন্মে গেছে তার প্রতি বন্ধুত্ব করে নিয়েছে দুজনে। সুবহা মেয়েটাকে একটা ১০০০ হাজার টাকার নোট ধরিয়ে দিয়েছে যদিও মেয়েটা নিতে চায়নি কিন্তু সুবহা তাকে এটা সেটা বলে বুঝিয়েছে।

—‘ এই না তুমি বললে আমরা আজকে থেকে বন্ধু তাহলে বন্ধুর দেওয়া গিফট নিচ্ছোনা যে?’

—‘ কিন্তু ফুলগুলোর দাম যে অল্প এতো টাকা নিই কিভাবে?’

সুবহা হাসলো মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো।

—‘ তুমি নিজেইতো একটা ফুল বাচ্চা।এই যে আমার নতুন বন্ধু হলে আজকে সেজন্য ডাবল গিফট। ’

মেয়েটা হাসলো সুবহার কথা শুনে বিদায় জানিয়ে চলে গেলো সে। সুবহা তাকিয়ে আছে মেয়েটির যাওয়ার দিকে কেমন মায়া হচ্ছে তার। পড়াশোনা করার বয়সে রাস্তায় রাস্তায় হেটে ফুল বিক্রি করছে বাচ্চা মেয়েটা। মেয়েটার থেকে চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকালো সুবহা দেখতে পেলো পরিচিত কাউকে। সুবহা ঠিক কতোদিন পর অরণ্যকে সামনে থেকে দেখেছে জানা নেই তার।অরণ্যকে খুব এলোমেলো লাগছে সুবহার কাছে উষ্কখুষ্ক চুল বুকের দিকে শার্টের বোতামগুলো খুলে রাখা মুখে চিন্তার ভাজ। ফোনে কথা বলছে কারোর সাথে চেহারা দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে রেগে আছে খুব। এমন লাগছে কেন অরণ্যকে?তারতো ভালো থাকার কথা।অরণ্যের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে সুবহার বুকের ভিতরটাই বা এমন কেঁপে উঠলো কেন?কেমন অদ্ভুত টান অনুভব করছে সুবহা পা বাড়িয়েছিলো সেদিকে যাবে বলে কোথা থেকে তখনই দৌড়ে এসে একটা মেয়ে জড়িয়ে ধরেছে অরণ্যেকে। সুবহা যেভাবে এগিয়েছিলো সেভাবেই আবারো কয়েকপা পিছিয়ে গিয়েছে। মেয়েটির মুখ না দেখলেও বুঝতে বাকি নেই সুবহার এটা তার বোন আনহা। অরণ্যের সাথে আনহাকে এভাবে দেখে দম বন্ধ লাগছে সুবহার কিন্তু তারতো এমন হবার কথা নয়! পিছুতে পিছুটে পা টা কিছুর সাথে লেগে পড়ে যেতে নিচ্ছিলো সুবহা কিয়ান এসে ধরে নিয়েছে তাকে।

—‘ কি রে দেখে হাটবিতো।’

—‘ এখান থেকে চলো ভাইয়া ভালো লাগছেনা আমার।’

সুবহার ঘর্মাক্ত মুখ দেখে কেমন সন্দেহ হলো কিয়ানের কিন্তু পাত্তা দিলোনা হয়তো কালকের ঘটনাটা নিয়েই ভাবছে তার বোন।

—‘ এখানে কি আমরা থাকতে এসেছি চলেইতো যাবো তার আগে খেয়ে দেয়ে পেটটা মোটা করে নেই চল।’

কিয়ান সুবহার হাত ধরে সামনের বড় রেস্টুরেন্টটাতে নিয়ে যাচ্ছিলো চোখ যায় তখনই অরণ্য আর আনহার দিকে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দুজনকে। মুহুর্তেই রাগে ফর্সা চেহারায় অন্ধকার নেমে এসেছে কিয়ানের সুবহার বিয়ে ভাঙার কারণটা তাহলে এই! সুবহা বুঝতে পেরেছে কিয়ান রেগে গেছে কথা ঘুরাতে বলে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

—‘ ভাইয়া চলো খিদে পেয়েছে আমার খাওয়াবে বলেইতো নিয়ে আসলে দাঁড়িয়ে আছো যে। ’

—‘ আগে বলিসনি কেন সুবহা?’

—‘ কি..কি বলবো। ’

—‘ হাত ছাড় আমার।আমি আগেই ভেবেছিলাম আনহা তোকে কালকে ভুলবাল বুঝিয়েছে, কাহিনী তাহলে এটা?অরণ্য ভুল করেছে সুবহা আমি ওকে ছেড়ে দিবোনা এমনি এমনি।’

—‘ ঝামেলা করার দরকার নেই ভাইয়া এটা পাবলিক প্লেস চলো এখান থেকে।’

—‘ ওই দুই মীরজাফর কালনাগিনীকে দেখে নেই ভালো করে তারপর যাবো। হাত ছাড় আমার।’

কিয়ান এক ঝটকায় সুবহার থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়েছে সেদিকেই যাচ্ছিলো সুবহা বলে উঠেছে তখন।

—‘ যা ইচ্ছে করো আমি গেলাম আমাকে আর বোন বলে ডাকবেনা তুমি।’

সুবহা একা একা হেটেই চলে যাচ্ছিলো কিয়ানের মনে হলো বেশি ত্যাড়ামি করে ফেলেছে পরে দেখে নিবে অরণ্যকে এবার নিজের বোনকে বুঝাতে হবে।

——

বাড়িতেই এসেই জানিয়েছে সুবহা সে তার খালামনির কাছে যেতে চায়। সুবহার এমন সিদ্ধান্তে সবাই অবাক হয়েচহিলো। জাহিদ হোসেন হ্যাঁ বা না কিছুই বলেননি। বেশকিছুদিন চলেও গেছে এই কয়দিনে সুবহা বহুবার জানিয়েছে তার ইচ্ছে প্রথমে কেউ রাজি না হলেও সুবহার জেদের কাছে হার মেনেছেন সবাই। ইদানীং মেয়ের কাজগুলো ভালো লাগছেনা জাহিদ হোসেনের। অরণ্যের বাড়িতে গিয়েছিলেন তার আব্বু আম্মুর কাছে ক্ষমা চাইতে মেয়ের এমন ব্যাবহারের জন্য। তখনই কথা দিয়ে এসেছেন সুবহার বদলে আনহার সাথে বিয়ে হবে অরণ্যের এটা প্রথমে বলেছেন অরণ্যের আম্মুই এই কয়দিনের আনহা ভালো ভাবেই ওনার মনে জায়গা করে নিয়েছে। তাই নিজেই সুযোগ বুঝে প্রস্তাব দিয়ে বসেছেন আনহাকেই নিজের ছেলের বউ বানাতে চান তিনি।এই খবরটা শুনার আসার আগেই সে পাড়ি জমিয়েছিলো আমেরিকায়। তবে পরে কিয়ানের থেকে শুনেছে কথা। বাহির থেকে নিজেকে ভালো দেখালেও ভিতরটা জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিলো সুবহার বহুদিন সময় লেগেছে নিজেকে ঠিক করতে।সেইযে সুবহা নিজের আপন মানুষদের ছেড়ে দূরে চলে গিয়েছিলো এসেছে দুই বছর পরে। পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছুই সুবহার সাথে তার আব্বুর বন্ডিংটাও এখন আর আগের মতো নেই আফসোস করেনা সে এসব হওয়ারই ছিলো।

——

বর্তমান —

ভোরের আলো ফুটতেই ঘুম ভেঙে গেছে সুবহার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো এখন সকাল ৬:০০ টা বাজে এতো তাড়াতাড়ি অন্যদিন ঘুম ভাঙেনা তার। তবে আজকে ভেঙে গেছে পেটের খিদেই সেই যে কালকে থেকে রাগ করে দরজা লাগালো বাড়ির সবাই এক এক করে ডেকে গেছে জেদ করে বসে ছিলো দরজা আটকে।

সুবহা নিচে এসেছে টেবিলের উপরে কাঁচা ফলমুল রাখা আছে কিন্তু এগুলো খেলে পেট ভড়বেনা তার। কিচেনের দিকেই যাচ্ছিলো মনে হলো আগে থেকেই কেউ আছে সেখানে। ঠিক ভেবেছিলো সুবহা; তার আম্মু সকালে উঠেই রান্নাবান্না শুরু করে দিয়েছেন ঠিক আগের মতো। আজকে খুব করে মায়ের আদর পেতে ইচ্ছে করছে সুবহার ছোট বেলার মতো মাকে জড়িয়ে ধরে বায়না করতে ইচ্ছে করছে। কোনো কিছু না ভেবেই পিছন থেকে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে সুবহা তার আম্মুকে। মেয়েকে দেখেই মুখে হাসি ফুটে উঠেছে সেলিনা বেগমের। হাতের খুন্তিটা রেখে ঘুরে তাকিয়েছেন সুবহার দিকে। মেয়েকে কাছে টেনে কপালে চুমু দিয়ছেন সেলিনা বেগম।

—‘ কি হয়েছে আম্মু এতো তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেলো?’

সুবহা নিজের পেটে হাত দিয়ে বলছে।

— ‘ পেটের মধ্যে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে আম্মু।ঘুমিয়ে থাকি কি ভাবে?’

—‘ তোমার জন্যই আমি সকাল সকাল উঠেছি।কালকে থেকে কয়বার দরজার সামনে গিয়ে ফিরে এসেছি ঠিক আছে! টেবিলে গিয়ে বসো খাবার নিয়ে আসছি।’

—‘ ঠিক আছে।’

মনে মনে লজ্জা পেয়েছে সুবহা কালকে যে রাগ করে দরজা আটকে সারাদিন পার করে দিয়েছে মনেই নেই তার অতীতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সব গুলিয়ে খেয়ে ফেলেছে এখনতো মনে মনে নিজেকেই বকাঝকা দিচ্ছে। — ‘ কি করলি এটা তুই সুবহা?তুই না রাগ করেছিলি খিদেই রাগ চলে গেলো!’ নিজের কাজে নিজেই বিরক্ত সুবহা এরমধ্যেই কলিং বেলের শব্দ আসলো কানে। সুবহার আম্মু ডেকে বললেন তাকে।

—‘ কে এসেছে দেখতো সুবহা।’

—‘ দেখছি আম্মু।’

এতো সকালে বাড়িতে কে আসবে? মনে মনে ভাবছে সুবহা।পরক্ষণেই আবার মনে হলো খবরের কাগজ নিয়ে কেউ এসেছে হয়তো।আস্তে আস্তে হেটে গিয়ে দরজাটা খুলেছে সুবহা। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই। তাহলে কে কলিং বেল বাজালো তখন? বাহিরে গিয়ে দেখতে চাইছিলো সুবহা তখন কিছু একটা পায়ে লাগে তার। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় একটা ফুলের বুকে রাখা তাও আবার কালো গোলাপের। পাশেই রক্তে মাখা একটা সাদা পুতুল। ভয়ে আঁতকে উঠেছে সুবহা কয়েক পা পিছিয়ে গিয়েছে সাথে সাথে। এতো সকালে বাড়ি বয়ে এসে কে এসব রেখে গেলো? কার জন্যেই বা রেখে গিয়েছে এসব? শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা হাতে ফুলের বুকেতে থাকা হলুদ চিরকুটটা তুলে নিয়েছে সুবহা। হলুদ চিরকুটটায় কালো কালি দিয়ে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা। —--

—‘ গেট রেডি টু বি দ্যা কুইন অফ মাই ডার্ক লাইফ ‘ জাহারা মেহরিন সুবহা।’

পুরো হলুদ কাগজটা রক্তের ছিটে ছিটে দাঁগ।

এইটুকু দেখেই কপালে বাজ পড়লো সুবহার এতো আয়োজন— কালো গোলাপ,রক্তে মাখানো পুতুল এসব তাহলে তার জন্য!কেউ দেখার আগে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে জিনিসগুলো। কিন্তু মনেতো একটা প্রশ্ন থেকেই যায় এসব কে পাঠিয়েছে সুবহাকে?কেনই বা পঠিয়েছে!

বিজ্ঞাপন
অন্তরালের প্রণয়িনী গল্পটি আফরোজা আঁখি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক গল্প