অন্তরালের প্রণয়িনী

পর্ব - ৫

🟢

গাড়ি থেকে নামবে তখনই শপিং ব্যাগটা চোখে পড়ে সুবহার।ভাবছিলো আরেকটা বাড়তি শপিং ব্যাগ আসলো কোথা থেকে!পরে মনে হলো এটা নিজেদেরই এতো কিছু নিয়ে এসেছে তাই গুলিয়ে ফেলেছে হয়তো। কিয়ান একের পর এক কথা বলেই যাচ্ছে সুবহার কানের অবস্থা খারাপ কিয়ানকে পাবনা থেকে পালিয়ে আসা রোগী ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছেনা তার।

—“এতো দামী পেনডেন্ট না দিয়ে আমাকেই গিফট দিয়ে দিতে পারতি আমারও একটু সুবিধা হতো।”

—“ হ্যাঁ তারপর ঝগড়া করে মরতে দুইজন। ”

—“ সুবহা তোর ভাই ভালো হয়ে গেছে ওই বোকাটাই বুঝেনা। ছ্যাচড়া ছেলেদের মতো মেয়েদের পিছে ঘুরঘুর করতে পারবোনা আমি তোর টিউবলাইট ফ্রেন্ড না বুঝলে তুলে নিয়ে এসে বিয়ে করবো।”

—“ সময় আসলে দেখা যাবে কি করতে পারো।”

—“ সময় চলে এসেছে বেশি দেরি নেই। ”

সুবহা হাসলো ভাইয়ের কথা শুনে কথা বলতে বলতে বাড়ির সদর দরজার কাছে এসে পৌঁছালো দুজনেই। বাড়িতে লোকজন প্রচুর মেহমান এসেছে হয়তো সবাই হৈ-হুল্লোড় করছে। সুবহা আর কিয়ান ভিতরে আসতেই দেখতে পেলো সবাইকে।

চা হাতে বাড়ির সবাই ড্রয়িং রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে। এই সময়টাতে আগেও এরকম হতো সুবহা মিস করেছে এতোদিন এগুলো। তবে আজকে নতুন কারোর উপস্থিতি বাড়িতে। সুবহার একমাত্র ফুফু আর ওনার একমাত্র ছেলে রিফাত এসেছে আজকে তাদের বাড়িতে। কিয়ান গিয়ে সবার সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছে সুবহা মুখে হাসি টেনে সিড়ি বেয়ে নিজের রুমে যেতে চাইছিলো তখনই কানে আসে ফুফির ডাক না পেরে দাঁড়িয়েছে তখন। কথা না বললে কেমন দেখায় তাই গিয়ে কথাও বলেছে।যতোসময় সুবহা কথা বলেছে রিফাতের নজর ছিলো তার দিকে। আড়চোখে বার বার দেখছিলো তাকে।

রিফাত সুবহাকে সেই ছোট বেলা থেকেই পছন্দ করে জানে এটা সুবহা কিন্তু রিফাতকে সবসময় কিয়ানের মতো নিজের ভাইয়ের চোখেই দেখে এসেছে সে।সবার কথাবার্তায় বুঝতে বাকি নেই আজকে এখানে তাদের আসার কারণটা।ফুফি যে আজকে আবার ওনার ছেলের সাথে সুবহার বিয়ের কথা তুলবেন জানে সুবহা।তবে এসব তেমন পাত্তা দিলোনা সবার সাথে কথা শেষ করে নিজের রুমে চলে গেছে।

___

এই মাত্র শাওয়ার নিলো সুবহা ড্রেসিং টেবিলের উপরেই হেয়ার ড্রায়ার রাখা কিন্তু আলসেমি লাগছে ভেজা চুল গুলো শুকিয়ে নিতে। বিছানার উপরে রাখা ফোনটায় সমানে রিং হচ্ছে সাব্বির হয়তো কোনো কাজে ফোন দিচ্ছে সুবহাকে এই ভেবে ফোনটা হাতে নিয়েছিলো কিন্তু সাব্বিরের বদলে অরন্যের নাম্বার দেখতে পেলো তখন। এই কয়দিনে এতো বার ফোন দিয়েছে নাম্বারটা প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে তার। অরন্যের এতো পরিবর্তন ভাবাচ্ছে সুবহাকে রাগী বদমেজাজী ছেলেটা দুই বছরে এতো পরিবর্তন হলো কিভাবে?তার উপর নিজের প্রাণপ্রিয় বেস্ট ফ্রেন্ড যার সাথে কিনা কয়দিন পরেই বিয়ে হওয়ার কথা তাকে রেখে সুবহাকেবা ইমপ্রেস করতে চাইছে কেন?অরন্যকে নিয়ে সুবহার মনে হাজারো প্রশ্ন।বার বার অরন্যের এমন পরিবর্তন দেখে গিরগিটির থেকে কম লাগছেনা তাকে। নাম্বারটা সেভ করা নেই সেভ করতে চাইছে সুবহা কিন্তু কি নাম দিবে!অরন্যের জন্য এই গিরগিটি নামটাই বেস্ট হবে সুবহার মনে হলো এটা দিয়েই সেভ করবে দেরি কিসের!ফোনতো ধরবেনা কিন্তু এই নাম দিয়ে লোকটার নাম্বার সেভ করে রাখলে ক্ষতি হবেনা।মেসেজ এসেছে অরন্যের নাম্বার থেকে সুবহা ভালো করে দেখলো মেসেজটা।

—“ ভেজা চুলে বেশি সময় থাকতে নেই লাভবার্ড চুল শুকিয়ে নাও।আমি কাছে এসে গভীর স্পর্শ এঁকে দিলে ভেজা চুল শুকানোর সময় পাবেনা।”

অরন্যের কথার মানে বুঝা মাত্রই ফোনটা হাত থেকে চট করে বিছানায় রেখে দিয়েছে সুবহা।বুকের ভিতরে কেমিন দ্রিম দ্রিম আওয়াজ হচ্ছে কেন হচ্ছে এমন!এই অরন্য যে এতোটা হাড়ে বজ্জাত জানা ছিলোনা সুবহার। বেশি কিছু না ভেবে আয়নার সামনে গিয়ে চেয়ার টেনে বসেছে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে ভেজা চুল গুলো শুকিয়ে নিয়েছে।আয়নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রিফাতকে সুবহা সেদিকে তাকাল।

—“ দাঁড়িয়ে আছেন কেন রিফাত ভাই ভিতরে আসুন।”

সুবহার কথায় ভিতরে আসার সাহস পেলো রিফাত। এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে সুবহার সামনে।

—“ তুমি পুরোপুরি চেঞ্জ হয়ে গেছো সুবহা। ”

—“ চেহারায় না স্বভাবে।”

—“ দুটোতেই।”

হাসলো সুবহা এই কথাটা নতুন শুনছেনা সে এসেছে পর থেকে আনহার মুখ থেকেই শুনেছে বহুবার কিন্তু পরিবর্তন হওয়ার পিছনে যে কারণ আছে এটাওতো অজানা নেই কারোর।কথা কাটানোর জন্য সুবহা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় রিফাতের দিকে।

—“ আর কিছু বলবেন ভাইয়া?”

—“ আমাকে তুমি করে বলতে অসুবিধে কোথায় তোমার জানতে পারি এটা?”

—“ আমাদের ভাই বোনদের মধ্যে আপনিই সবার বড়। আপনাকে আপনি করে বলেই অভ্যস্ত আমি। ”

—“ তোমাকে কোনো কালেই আমি নিজের বোন ভাবিনি সুবহা।জানো নিশ্চয়ই এটা।”

—“ আমিও কোনো কালে ভাই ব্যাতীত অন্য কোনো নজরে আপনাকে দেখিনি রিফাত ভাই।”

রিফাতের হাসি মুখটা চুপসে গেলো মুহুর্তেই। এই কথাটা বহুবার শুনেছে সে তবু্ও নিজেকে আটকাতে পারেনা বার বার ছুটে আসে এই মেয়েটার কাছে ভালোবাসা চাওয়ার বাহানায়।

খাবার খাওয়ার জন্য সুবহা আর রিফাতকে ডাকতে এসেছেন তার চাচি। আসছি বলে ওনাকে যেতে বললো সুবহা তিনিও আর দাঁড়াননি চলে গিয়েছেন তখনই। সুবহা চলে যাচ্ছিলো রিফাতকেও আসতে বলেছে মেঝেতে কিছু একটা পড়ে আছে খেয়াল করেনি অসাবধানতায় পা পিছলে পড়ে যেতে নিচ্ছিলো দ্রুত এসে পড়ে যাওয়া থেকে সুবহাকে আটকায় রিফাত। সুবহা রিফাতের দিকে তাকিয়ে ভাবছে কতো বড় আহাম্মকের মতো কাজটাই না করলো দেখে শুনে চলাফেরা করলে এমন অঘটন ঘটতোনা।

ঠিক সেই সময়টাতেই সুবহার রুমের পাশ দিয়ে নিচে যাচ্ছিলো আনহা চোখ যায় সুবহা আর রিফাতের দিকে দরজার আড়ালে লুকিয়ে দেখেছে সবটায় মুখে তার সয়তানি হাসি হাতে থাকা ফোনটা দিয়ে পটাপট কয়টা ছবি তুলে নিয়েছে। সুবহা দেখে ফেলবে বুঝতে পেরে সরে গিয়েছে সেখান থেকে যেতে যেতে ফোনটা চোখের সামনে নিয়ে এসে বলছে।

—“ কখন কি কাজে লাগে বলা যায়না এটাও লেগে যেতে পারে।”

—“ নতুন করে আবার কার ক্ষতি করার চিন্তা করছিস তুই?”

কিয়ানের কথা কানে আসতেই হাটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে আনহা। কিয়ান নিজেও নিচে যাচ্ছিলো আনহার পিছনেই আসছিলো তখনই কানে এসেছে আনহার কথাটা।দাঁত কটমট করে কিয়ানের দিকে তাকিয়েছে আনহা।

—“ কার কি ক্ষতি করেছি আমি?”

—“ জেনেও না জানার বান করিসনা।”

বিজ্ঞাপন

—“ কিয়ান তোর বড় বোন হই আমি তুই এভাবে কথা বলতে পারিসনা আমার সাথে।”

কিয়ান হাসতে হাসতে আনহাকে বলছে।

—“ স্বার্থপরদের আবার ভাই,বোন?ফ্যামিলির কথা মাথায় থাকে তাদের তারাতো থাকে নিজের উদ্দেশ্য পুরনের চিন্তায়।যেমন তুই নিজে!অন্যদের কি হলো না হলো ভাবিসনা নিজে ভালো থাকলেই হলো তাইনা। ”

—“ কি বলতে চাইছিস তুই?”

—“ আমি কি বলতে চাইছি ভালো করেই জানিস তুই।”

—“ তুই কি সুবহার বিয়ের বিষয়টা নিয়ে বলছিস?তুই আর বাড়ির বাকিরা ভালো করেই জানিস অরন্যের সাথে বিয়েটা সুবহা নিজেই ভেঙেছিলো।”

—“ হ্যাঁ আর তুই ভালো করেই সবার কানে বিষ ডেলেছিলে।বাড়ির সবাইকে হাত করতে পারলেও আমাকে পারিসনি কিন্তু।”

—“ সুবহার প্রতি এতো ভালোবাসা কেন তোর?আমি কি তোর কেউ নই সবসময় সুবহার হয়ে কথা বলাটা বন্ধ কর তুই।”

—“ তোর মতো স্বার্থপরকে নিজের বড় বোন ভাবতেও লজ্জা লাগে আমার আম্মু আব্বু আর বাকিরা না জানলেও তুই কেমন আমি সুবহা ভালো করেই জানি এটা।”

—“ তোদের ভাবনাতে আমার যায় আসেনা বুঝলি।তোর বোনকে সাবধান করবি আমার হবু বরের থেকে দূরে তাকে যেন।”

—“ তুই এতো নির্লজ্জ কেন রে?”

এইটুকু বলেই চলে গেছে কিয়ান আনহা পরে কি বলেছে না বলেছে কানে নেয়নি। আনহার সাথে আজকাল কথা বলতেও বিরক্ত লাগে কিয়ানের। বাহির থেকে বুঝা না গেলেও মনে মনে সুবহার প্রতি কি পরিমাণ হিংসে আনহার জানে ভালো করেই কিয়ান।

___

খাবার টেবিলে বসে আছে সবাই রিফাত সুবহার ঠিক মুখোমুখি বসেছে।সুবহার মনটা আজকে ভালো কতোদিন পর পরিবারের সবার সাথে একই টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে। রিফাত ছেলেটা বার বার আড়চোখে তাকাচ্ছে সুবহার দিকে বুঝতে পারলেও এতো মানুষের মাঝখানে কিছুই বলতে পারছেনা সুবহা চুপচাপ বসে আছে।

খাবার প্রায় শেষের দিকে সুবহার আব্বু উঠে যাচ্ছিলেন তখনই বোনের কথায় থেমে যান।

—“ মেয়ের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাওয়ার আগে বিয়ে দেও ভাইজান।মেয়েদের ওতো দেরি করে বিয়ে দিলে ভালো দেখায়না।”

ননদের কথা শুনে বাড়ির দুই বউ একজন অন্যজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন বোনের প্রশ্নের উত্তরে জাহিদ হোসেনও বলেছেন।

—“ মেয়ে আমার বড় হয়েছে বাবার পছন্দের সাথে তার পছন্দ মিলবেনা পছন্দের ব্যাপারটা তার উপরেই ছেড়ে দিয়েছি। আর বাড়ির বড় মেয়ে আনহা আগে আমাদের পছন্দে তার বিয়ে দিবো পরে বাকিদের যা ইচ্ছে করবে।

কিয়ান আর সুবহা একজন অন্যজনের দিকে তাকালো বাবার খোঁচা মারা কথাটার কারণ বুঝতে বাকি নেই তার কিয়ান কিছু বলতে যাবে সুবহা ইশারা দিয়ে থামিয়ে দেয় তাকে।

—“ আনহার বিয়ে আজ নাহয় কাল হবে সবতো ঠিকঠাকই আছে।তোমাদের করোর আপত্তি না থাকলে সুবহাকে আমার কাছে নিয়ে যেতাম সবসময়ের মতো।”

ভাতের লোকমা মুখে তুলেছিলো সুবহা ফুফির কথাটা কানে আসতেই কাশতে শুরু করেছে। কিয়ান টেবিলে থাকা গ্লাসটাতে পানি নিয়ে বোনের দিকে এগিয়ে দিয়েছে সাথে সাথে।

—“ এতো তাড়াহুড়ো করে খাচ্ছিস কেন আস্তে খা।”

সুবহা কথা বললোনা আবারো মনোযোগ দিয়েছে খাবারের প্লেটে।

সুবহার আব্বু আর চাচ্চু দুজনেই গিয়ে সোফায় বসেছেন। গিয়েছেন সেখানে সুবহার ফুফিও কথাবার্তা কি হচ্ছে সবটাই কানে আসছে সুবহাদের।

সেলিনা বেগম আর ওনার জায়ের প্রস্তাবটা খারাপ লাগেনি রিফাতকে ছোট বেলা থেকেই দেখছেন তারা ছেলেটা ভদ্র স্বভাবের ভালো চাকরি করে বাবার সম্পত্তিরও কমতি নেই।বহুদিন আগে এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন জাহিদ হোসেনের বোন তখন পাত্তা দেননি তিনি বন্ধুর ছেলেকেই মেয়ের জন্য ঠিক করে রেখেছিলেন কেন জানতো ওনার পছন্দ আর মেয়ের পছন্দ এক হবেনা শেষ মুহুর্তে এসে বিয়ে ভেঙে দিলো সুবহা।মেয়ের কাজে বন্ধুর কাছে লজ্জিত হয়েছে জাহিদ হোসেন আজও মনে আছে সেদিনের কথা।

সুবহার ফুফির প্রস্তাবে সায় জানাতে সময় নিচ্ছিলেন জাহিদ হোসেন ভাইয়ের অবস্থা দেখে বাধ্য হয়ে জাবেদ হোসেন নিজেই বলেছেন।

—“ ঘরের মেয়ে ঘরেই থাকলো এখানে আপত্তি থাকতে যাবে কেন।”

ভাইয়ের কথা শুনে খুশি হয়েছেন রিফাতের আম্মু রিফাত নিজেও খুশি হয়েছে খুব মুখে তার রাজ্য জয় করা হাসি।ভাবতে পারছেনা এতো সহজেই সবাই সবটা মেনে নিয়েছে।

সুবহার গলায় খাবার আটকে এসেছে গিলতে কষ্ট হচ্ছে যেন।সবার কথা শুনে নিজেকে স্থির রাখতে পারছেনা কোনোভাবেই কেন হচ্ছে এমন?নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করছে সে।এখান থেকে না গেলে রাগে কিছু একটা করে ফেলবে সেইজন্য উঠে দাঁড়িয়েছিলো যাবে বলে কিয়ান বড়বড় চোখ করে তাকিয়েছে সুবহার দিকে। ভাইয়ের তাকানোর মানে বুঝতে পেরে বলেছে সুবহা।

—“ আর খাবোনা ভাইয়া আমার খাওয়া শেষ আমার।”

—“ প্লেটের খাবার শেষ করে যা অন্যদের কথায় কান দেওয়ার দরকার নেই।”

সুবহার ভালো লাগছেনা কিয়ানকে কোনো রকমে বুঝিয়ে উঠে চলে গেছে নিজের রুমে।সুবহার যাওয়ার দিকে তাকিয়েছে কোনো কারণে হাসছে আনহা।

বিজ্ঞাপন
অন্তরালের প্রণয়িনী গল্পটি আফরোজা আঁখি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক গল্প