—“আমার সন্টু মন্টু সোনা বাচ্চাদের মা বানানোর জন্যে হলেও তোমাকে কাছে চাই। তাড়াতাড়ি চলে আসো লাভবার্ড আর কতোদিন এভাবে পালিয়ে বেড়াবে আমার থেকে!”
ফোনের স্ক্রিনে আননোন নাম্বার থেকে আসা মেসেজটার দিকে তাকিয়ে আছে সুবহা। বুঝতে পারছেনা মেসেজটা দিলো কে!তবে আপাতত এসব নিয়ে মাথা ঘামাবেনা। অনেক্ষন হলো এয়ারপোর্টে কারোর জন্য অপেক্ষা করছে সুবহা বার বার হাতে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখছে।চোখে রোদ চশমা, পরনে কালো রঙের টপস তার উপরে ডেনিম জ্যাকেট গলায় ঝুলানো কালো রঙের একটা সুন্দর স্কার্প তার এই সাদামাটা সাজে অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে। সুবহা সবসময় এভাবেই থাকে যদিও তার বাড়িতে কারোরই এসব পছন্দ নয়। নিজের চলাফেরার জন্য সবসময় কথা শুনতে হয়েছে বাবার কাছ থেকে।এই দুই বছর থেকেছে নিজের মতো। যখন যা ইচ্ছে হয়েছে তাই করেছে। আশেপাশের লোকজন তাকিয়ে আছে তার দিকে সুবহা বুঝলোনা সবার এমন তাকানোর মানে। সবার দিকে একবার তাকিয়ে মুখে হাসি টেনে চলে গেছে অন্যদিকে এতো মানুষজনের মধ্যে থাকতে বরাবরই অস্বস্থি হয় তার।
এতো সময় ধরে ব্যাগপত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বিরক্ত লাগছে খুব। মনে মনে বকাবকি করছে ভাইকে।#কিয়ানের আজকে নিতে আসার কথা ছিলো সুবহাকে। সুবহার পুরো নাম হচ্ছে #জাহারা_মেহরিন_সুবহা। আজকে থেকে দুই বছর আগে নিজের বিয়ে আটকাতে পরিবারের সবার সাথে একপ্রকার ঝামেলা করেই চলে গিয়েছিলো আমেরিকাতে। যাওয়ার কথা ছিলো আগে থেকেই মাঝখান থেকে এসে বিয়ে নামক সমস্যা আটকে দিলো তার বাহিরে যাওয়া। এই সমস্যা থেকে বাঁচার জন্যই একমাত্র ক্রাইম পার্টনার অর্থাৎ চাচাতো ভাই কিয়ানের সাহায্যে মা চাচা সবাইকে বুঝিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলো আমেরিকায়। বাবার সাথে সুবহার সম্পর্কটা ভালো হয়নি এখনো মেয়েকে ভালোবাসলেও এই আবদারে সায় দেননি সুবহার বাবা সেইজন্যই মেয়ের সাথে এখন তেমন কথা বলেননা প্রতি মাসে টাকা পাঠিয়ে দিতেন নিয়ম করে। আজকে ঠিক দুই বছর পরে সুবহা পা রেখেছে তার পরিচিত দেশের মাটিতে।ফোন থেকে নজর সরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখছিলো সুবহা। ভাবলো আর অপেক্ষা করবেনা নিজেই চলে যাবে এবার। হাটতে শুরু করবে তখনই কেউ তার দু'হাতে সুবহার চোখ ধরে নিয়েছে।বুঝতে বাকি নেই এটা তার ভাই কিয়ান।কিয়ানের হাত ধরে বলছে সুবহা।
_“ ছাড়োতো ভাইয়া ঢং করতে হবেনা এখন আর।”
কিয়ান সুবহার চোখ ছেড়ে তাড়াতাড়ি করে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
_“ বলতে পারলি এভাবে! ভুলে যাসনা সুবহা আমি তোর ছয় মাসের বড়ো।বড় ভাইকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয়। ”
_“ হ্যাঁ হ্যাঁ অনেক বড় তুমি আমার, মনে থাকবে এখন থেকে।এবার যাই চলো গরমে আমার অবস্থা খারাপ।”
কিয়ান তাড়াতাড়ি করে গাড়ির কাছে গিয়েছে সুবহার হাতে থাকা ট্রলি ব্যাগটি নিয়ে তুলেছে গাড়িতে।হাত দিয়ে দেখিয়ে বলছে সুবহাকে।
_“ আমার গাড়িতে উঠে গাড়িটাকে ধন্য করুন রানী ভিক্টোরিয়া।”
ভাইয়ের কথা শুনে হাসে সুবহা এটা নতুন নয় কিয়ান যে তাকে কতো নামে ডাকে হিসেব নেই।
সুবহাকে নিয়ে কিয়ান একটা দামী হোটেলে এসে উঠেছে আজকে সুবহা থাকবে এখানেই কালকে আবার কিয়ান এসে নিয়ে যাবে তাকে।সুবহারও বাড়ি ফিরতে ভালো লাগছেনা বাড়িতে গেলেই বিয়ের জন্য চাপ দিবে বাবা মা সবাই মিলে তাকে।সুবহা বুঝে পায়না বাড়িতে তার বড় ভাই বড় বোন রেখে সবাই মিলে তাকেই বিয়ে দিতে চায় কেন। কিয়ান সুবহাকে দাঁড় করিয়ে রেখে অন্য দিকে গিয়েছে ফোনে কথা বলতে।হোটেলের কর্মচারী ছেলেটা ব্যাগপত্র সব নিয়ে রুমে রেখে এসেছে। ফোনের দিকেই নজর ছিলো সুবহার তাই খেয়াল না করে নিজের রুমের পাশের রুমটাতে গিয়ে ঢুকেছে সে। হাতে থাকা ব্যাগটা বিছানায় রেখেছে। গরমে নাজেহাল অবস্থা ভাবলো চেঞ্জ করবে। আশেপাশে তাকিয়ে কাপড় ছোপড়ের ব্যাগ খুঁজলো না পেয়ে বিছানায় রাখা ব্যাগটা থেকেই একটা টি-শার্ট বের করে নিয়েছে আপাতত এটাই পড়বে। রুমে সুবহা ছাড়া আর কেউ নেই দরজা আটকে চেঞ্জ করে নিয়েছে। হাত মুখে পানি দেওয়ার জন্য ভাবলো ওয়াশরুমে যাবে সেদিকে তাকাতেই চোখ দুটো গোল গোল হয়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম সুবহার। উদোম শরীরে দেয়ালের সাথে পিঠ টেকিয়ে দুই হাত বুকে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে এক সুদর্শন যুবক।বয়স তার উনত্রিশ বা ত্রিশের কাছাকাছি হবে। সুবহা চিনে তাকে ভালো করেই এই মানুষটার জন্যই দেশ ছেড়েছিলো সে ফিরেই আবার এই মানুষটার সাথে দেখা হতে হলো তার। কিন্তু এটা বিষয়টা ভাবাচ্ছেনা তাকে,ভাবছে এটাই সুবহা যে চেঞ্জ করলো সেটা কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে এই অসভ্য লোক।ঠোঁট কামড়ে হাসছে কিভাবে দেখেতো সুবহার এটাই মনে হচ্ছে।তার রুমে এই মানুষটা আসলো কিভাবে? ইচ্ছে করেই কি করেছে এসব! রাগ হচ্ছে খুব ভ্রু জোড়া কুচখে রেগেমেগে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা #শেহরাজ_অরন্য নামক লোকটির দিকে। অরন্য এগিয়ে আসে সুবহার কাছে সুবহা কিছু বলতে যাবে তখনই বলে উঠে অরন্য।
_“ অপুর্ব লেগেছে। ”
সুবহা ঘাবড়ে গেছে যা ভেবেছিলো তাই কি সত্যি হলো।থমথম খেয়ে জিজ্ঞেস করে অরন্যকে।
_“ কি..কি অপুর্ব লেগেছে!”
_“ আরে আরে ভয় পাচ্ছো কেন আমার জিনিস আমিইতো দেখেছি অন্য কেউ দেখেনি।”
_“ মানে! কি দেখেছেন?”
অরন্য ঠোঁট কামড়ে হাসে সুবহার হাত ধরে একটানে নিজের কাছে নিয়ে আসে।সুবহার হাত আপনা-আপনি চলে যায় অরন্যের উন্মুক্ত বুকে। এক হাত দিয়ে সুবহার কোমর চেপে ধরে কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলে অরন্য।
_“ লাভবার্ড এতো বড়ো হয়ে গেলে কবে?”
সুবহার ভালো লাগলোনা অরন্যের আচরণ ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিতে চায় অরন্যকে কিন্তু শক্তপোক্ত শরীরের অরন্যের শক্তির সাথে পেরে উঠেনা সুবহা।
_“ কি ধরনের অসভ্যতামো এগুলো?”
অরন্য বাঁকা হাসে ফু দিয়ে সুবহার মুখের চুলগুলো সরিয়ে দেয়।
_“ আমিইতো যেতাম তোমার কাছে নিজেই চলে আসলে যে।খুব বেশি মনে পড়ছিলো আমাকে? এসেছো যখন আর যেতে দিচ্ছিনা ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিবো তোমাকে লাভবার্ড।”
ঠাট্টার স্বরে বলে সুবহা।
_“ তারপর? ”
_“ প্রেম,বিয়ে,বাসর,বাচ্চাকাচ্চা তারপর ২য় বাচ্চার প্ল্যানিং।”
অরন্যের উপরে জমিয়ে রাগ আছে সুবহার এই কথাগুলো কেন যেন নিতে পারছেনা সে।অরন্য কি যেন ভেবে এগিয়ে আসছিলো সুবহার দিকে ঠিক তখনই নিজের পায়ের হিলটা দিয়ে জুড়ে আঘাত করে অরন্যের পায়ে। প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব হওয়ার সুবহাকে ছেড়ে দিয়েছে অরন্য।এবার আর ভালো ভাবে কথা বলেনি সুবহা রাগে পাশে থাকা কাচের গ্লাসটা ছুড়ে ফেলেছে অরন্যের দিকে অরন্য সেটা লুফে নিয়েছে।
_“ বিয়ের আগেই আমাকে মেরে বিধবা হওয়ার শখ জেগেছে তোমার?”
_“ ডক্টর শেহরাজ অরন্য অসভ্য সাথে চরিত্রহীনও জানা ছিলোনাতো আমার এটা।”
অরন্য চোখ তুলে তাকায় সুবহার দিকে এই মেয়ের মুখ থেকে এই কথা নতুন শুনছেনা সে। আবারো সুবহাকে ধরতে গেলে সে চলে যেতে নেয় অরন্য দ্রুত গিয়ে সামনে দাঁড়ায়।এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছে সুবহার দিকে অরন্য যতো এগুচ্ছে সুবহা ততোই পিছিয়ে যাচ্ছে পিছুতে পিছুতে দেয়ালের সাথে টেস লেগে গেছে সুবহার পিঠ।চলে যেতে চাইলে অরন্য দু'হাতে আটকে নেয় সুবহাকে ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিতে ভরা হাসি নিয়ে বলে সুবহাকে।
_“ এই চরিত্রহীন লোকটার সাথেই থাকতে হবে তোমাকে। এই চরিত্রহীন লোকটাই তোমার ছেলের বাপ হবে। তোমাকে ছোঁবে আদর করবে ত্যাড়ামি করলে চড় থাপ্পড়ও দিবে।আরো গভীরে যাবো!”
_“ হবু বউ রেখে তার বোনের সাথে ফ্লার্টিং করছেন লজ্জা লাগেনা আপনার?”
_“ নিজের বরকে বোনের বর বানিয়ে দিতে লজ্জা লাগছেনা তোমার?”
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেউ দরজা ধাক্কানোর শব্দ কানে আসছে সুবহার। অরন্যের রাগ হলো এই অসময়ে কে ডাকতে এলো তাকে।চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে বলছে।
_“ কোন শালারে?”
_“ দরজা খুল অরন্য। ”
মেয়েলী কন্ঠস্বর ভেসে আসলো দরজার ওপাশ থেকে এই মেয়ে আর কেউ নয় সুবহার বোন আর অরন্যের বেস্টফ্রেন্ড আনহা।অরন্য গিয়ে একটা শার্ট হাতে তুলে নেয় পড়তে পড়তে সুবহার দিকে একটা ফ্লাই কিস ছুড়ে দিয়ে বলছে।
_“ ভয় নেই লাভবার্ড আমার এই দেহ, এই মন সবকিছুই তোমার আর কাউকে দেখাবোনা।”
সুবহা মুখটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলছে।
_“ দেখার জন্য বসে আছি আমি।”
বিড়বিড় করে বললেও সুবহার কথা শুনে নিয়েছে অরন্য।
অরন্য ঠোঁট কামড়ে হাসে সুবহার কাছে গিয়ে তার দিকে কিছুটা ঝুকে বলে।
_“ বসেইতো আছো নাহলে দেশে ফিরে সোজা আমার বেডরুম পর্যন্ত চলে আসতে!তোমার বোন ডিস্টার্ব করলো তাই নইলে হাজারটা চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিতাম এতোসময়ে।তাড়াতাড়ি কাজ সারলেই না তাড়াতাড়ি আমার সন্টু মন্টু সোনারা ডাউনলোড হবে।”
অরন্যের কথা সহ্য হচ্ছেনা সুবহার ইচ্ছে করছে কষে একটা থাপ্পড় মারতে গালে।দাঁত কটমট করে দাঁড়িয়ে আছে কোনো কথা না বলে ভিতরে ভিতরে রাগে শেষ হয়ে যাচ্ছে সে।যার জন্য দেশ ছাড়লো একসময় দেশে ফিরে সবার আগে তার সাথেই দেখা হলো সুবহার।