দরজা খুলতেই দেখা মিললো কিয়ান আর আনহার।আহনা রেগেমেগে তাকিয়ে আছে সুবহার দিকে চোখে মুখে সুবহার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ পাচ্ছে যেন।সুবহা বুঝে পায়না আনহা সবসময় এমন ব্যাবহার কেন করে সুবহার সাথে আগেতো ছিলোনা এমন।এই দুই বছরে হাতে গুনে ৪-৫ বার ফোন দিয়েছে তাও নিজের সাথে অরন্যের ভালোবাসার কথা বলতে। অরন্য তাকে এটা সেটা গিফট দিয়েছে সামনে তাদের বিয়ে এগুলো বলা ছাড়া ভালো খারাপ কেমন আছে সুবহা এসব কিছুই জিজ্ঞেস করেনি আনহা। কিয়ান এসে সুবহার পাশে দাঁড়ায় বিছানায় থাকা সুবহার ব্যাগটা হাতে নিয়ে বোনের হাত ধরে নিয়ে যেতে চায় রুম থেকে।
_“ মাথা গেছে তোর কার না কার রুমে ঢুকে পড়েছিস খেয়াল আছে সেদিকে!”
_“ এতোদূর জার্নি তার উপর এমন গরম আমার মাথা ঠিক ছিলোনা ভাইয়া।”
রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলো কিয়ান আর সুবহা আনহার কথা কানে আসে তখন।
_“ তোর বোন ভুল করে আসেনি এখানে কিয়ান। ইচ্ছে করেই করলো এটা।নিজে থেকে একটা ছেলের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে এতো সময় ছিলো লজ্জা নেই তোর সুবহা?”
সুবহার মুখে কথা নেই রাগ হলেও চুপ করে আছে সে এই মুহুর্তে কথা বলে মুখ খারাপ করতে চাইছেনা।সুবহা কিছু না বললেও কিয়ানের ভালো লাগলোনা আনহার কথা। কিয়ান কিছু বলতে যাবে তার আগে অরন্যই বলে উঠে।
_“ লজ্জা করবে কেন আমার রুমেইতো এসেছে। আমার সবকিছুই তোর বোনের এরপর থেকে বুঝেশুনে কথা বলবি তেতুল গাছের পেত্নী।”
আনহার মুখটা দেখার মতো ছিলো রেগে গেছে অরন্যের কথা শুনে,রাগের থেকেও বেশি খারাপ লাগছে তার।এতোগুলো দিন ধরে পড়ে আছে অরন্যের পিছে অরন্য কি বুঝেনা আনহা তাকে ভালোবাসে!আহনার মুখের রিয়েকশন দেখে খুব হাসি পেলো সুবহার।
_“ তোর হবু বরকে বাক্সের ভিতরে বন্ধ করে রাখ আপু বলা যায়না কখন কে চুরি নিয়ে যায় আবার।”
_“ মজা করছিস তুই আমার সাথে!”
যেতে যেতে বলছে সুবহা।
_“ আমার এতো ফালতু সময় নেই।”
সুবহার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছে অরন্য।
_“এই ধানী লঙ্কাকেই আমার চাই।“
_“ কি বললি? ”
_“ তোকে আমার ছেলের শাশুড়ী বানাবো এটা বলেছি আয় আদ্রীশের সাথে দেখা করতে যাবো।”
আদ্রীশ অরন্য আর আনহার বন্ধু এই তিনজনের বন্ধুত্ব কলেজ লাইফ থেকেই। নিজের কাজে এখানে এসেছে অরন্য জানা মাত্রই আনহা আর আদ্রীশও চলে এসেছে।হেটে চলে যাচ্ছিলো অরন্য আনহাও তার পিছু পিছু গিয়েছে।
___
সুবহা শান্তি পাচ্ছেনা মনে মনে ভাবছে কেন এসেছিলো এখানে। কিয়ান চলে যাচ্ছিলো সুবহাকে রেখে বোন বাড়ি যেতে চাইছেনা তাই জোর করবেনা নিজেও।পা বাড়াতেই কানে আসে সুবহার কথা কিয়ানকে ডেকে বলছে সুবহা।
_“আমি এখানে থাকবোনা ভাইয়া বাড়ি যাবো চলো।এখানে ভালো লাগছেনা আমার।”
_“ আমার চোখের পলক পড়ার আগেই তোর মুখের কথার পরিবর্তন হয়ে যায়। একটু আগেই না রাগ দেখালি বাড়ি যাবিনা বলে।”
_“ এতো কথা বলতে পারবোনা গাড়িতো সাথেই আছে নিয়ে চলো আমাকে এখান থেকে।”
_“ যথা আজ্ঞা রানী সাহেবা আসুন। ”
সুবহা হাসে কিয়ানের কথা শুনে। কিয়ান আর সুবহার বড় আনহা কিয়ান হলো সুবহার চাচাতো ভাই তবে ছোট বেলা থেকে আনহার থেকেও বেশি ভালোবাসা দিয়েছে কিয়ান সুবহাকে।এই যে এখনো বলার সাথে সাথেই মেনে নিলো সুবহার কথা ওর যায়গায় আনহা থাকলে দুই তিনটা কথা শুনিয়ে দিতো এতোসময়ে।
রাত হতে চলেছে প্রায়,বড়ো আলিশান বাড়িটার গেইটের সামনে থেমেছে এসে একটা কালো রঙের কার। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো সুবহা রাত হয়ে গেছে ছাদে তাদের কি সুন্দর লাইটিং করা দেখতে ভালোই লাগছে।এই বাড়িটাকে বাড়ির প্রতিটি মানুষকে মিস করেছে সে এতোদিন।
গেইট পেরিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করেছে গাড়িটা। হর্ণ শুনে বাড়ির ভিতর থেকে ছুটে এসেছেন দুই চল্লিশার্ধো বয়সী মহিলা। একজন সুবহার আম্মু আরেকজন কিয়ান আর আনহার আম্মু অর্থাৎ সুবহার চাচি তাদের পাশে বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ডরা দাঁড়িয়ে আছেন। সুবহাকে দেখার বড়ো ইচ্ছে তাদের এসেছে পর থেকে শুনে যাচ্ছে এ বাড়ির মেয়ের কথা কিন্তু দেখা হয়নি তাকে। সুবহা গাড়ি থেকে নেমেছে কিনা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরেছেন তার আম্মু আর চাচি দুজনে।কথাবার্তা বলে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলেন সুবহাকে।
নিজের রুমে এসে দপ করে বিছানায় পড়েছে সুবহা। চোখ বন্ধ করে ভাবছে কিছু সময় আগে অরন্যের সাথে তার দেখা হওয়ার কথা।কিছু একটা ভেবে উঠে বসে সুবহা। ফোনটা হাতে নিয়ে তখনকার মেসেজটা চেক করে বুঝতে বাকি নেই এখন মেসেজটা তাহলে অরন্যই দিয়েছিলো তাকে।ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে সুবহার। অরন্যের দেওয়া লাভবার্ড নামটা খুব পছন্দ তার।কিন্তু মনে ছিলোনা তখন; মনে ছিলোনা বললে ভুল হবে ইচ্ছে করেই মনে রাখতে চায়নি এই নামটি।পুরনো অতীত মনে পড়ে সুবহার মুখের হাসি মুহুর্তেই চলে যায়।অরন্যকে নিয়ে সে ভাবছে কেন!হবু বউয়ের বোনের প্রতি এমন আচরণ কি মানায় অরন্যকে।সুবহা আর ভাববেনা এসব একটা লম্বা শাওয়ার নিয়ে ঘুমোতে হবে তাকে নাহলে ফ্রেশ হবেনা মাথাটা।
___
ড্রয়িং রুমে পাতানো লম্বা সোফাটায় আধশুয়া অবস্থায় পড়ে আছে অরন্য পাশে থাকা ট্রি টেবিলের উপরে পা দুটো তুলে রেখেছে।কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অরন্যের আম্মু জাহানারা সুলতানা এটা সেটা জিজ্ঞেস করে যাচ্ছেন সেই তখন থেকে উত্তর দেওয়ার নাম নেই অরন্যের ফোনের দিকে মনোযোগ তার।এবার রেগে গেছেন তিনি ছেলের কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন বলছেন তাকে।
_“ তুমি যখন আমাদের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করবেনা তাহলে প্রথমে না করলে না কেন?”
_“ আমি কোনো কালেই সম্মতি দেইনি আম্মু।”
_“ তুমি কি আবারো আনহার যায়গায় ওই মেয়েটাকে বসানোর চিন্তা করছ? ”
ঘাড় কাত করে মায়ের দিকে তাকায় অরন্য উঠে দাঁড়িয়ে বলে মাকে।
_“ ওই মেয়ে না বলে বউমা বলো আম্মু।আজকে থেকে এক/দুই বছর পরে তার কোলে আমার ছেলে মেয়ে আর তোমার নাতি নাতনি থাকবে।”
_“ অরন্য মাথা ঠিক আছে তোমার?মনে নেই মেয়েটা কিভাবে অপমান করেছিলো সবাইকে!”
অরন্য কথা বললোনা আর সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে চলে যাচ্ছে নিজের রুমে।অরন্যের ঠিক পাশ দিয়েই নিচে নামছিলো #কিরণ ভাইয়ের সামনে এসে পথ আটকায়। ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করছে অরন্যকে কি হয়েছে বলতে।
_“ যা তোর আম্মুকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর।”
_“ হ্যাঁ হ্যাঁ আম্মুর কথা তোমার পছন্দ না হলেই আমার আম্মু নইলে দেখা যায় আম্মু আম্মু বলে বাচ্চাদের মতো পুরো বাড়ি ঘুরো।”
_“ সামনে থেকে সর কার্টুন কোথাকার।”
কিরণের রাগ হলো একমাত্র মেয়ে বাড়ির অথচ ভাই থাকে দুই পয়সার দাম দেয় না। কিরণ মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে।
_“ দেখেছো আম্মু ভাইয়া সুবহাকেই বিয়ে করবে যে তোমাকে অপমান করেছিলো।বেচারা,বিয়ে না করে অপেক্ষা করতে করতে মাথার অর্ধেক চুল পাকিয়ে ফেলেছে।”
অরন্য পায়ের দিকে তাকিয়ে জুতোর ফিতেটা ঠিক করছে এমন বান করলো কিরণ এক দৌড়ে অরন্যের থেকে ১০ হাত দূরে চলে গেছে।অরন্য হাসছে কিরণের কাজে রুমে যেতে যেতে বলছে।
_“ ইঁদুরের জান নিয়ে অরন্যের সাথে লাগতে এসেছে।”
জাহানারা সুলতানা ক্ষেপে আছেন। তিনি কোনোভাবেই আনহার যায়গায় সুবহাকে বাড়ির বউ বানিয়ে নিয়ে আসবেন না। কিছুক্ষণ আগেও আনহা মেয়েটা ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করেছে ওনার কাছে। অরন্যের বাবা বাড়ি ফিরলে এই বিষয়ে কথা বলবেন ওনার সাথে ভেবে রেখেছেন এটা।
___
রাত চলে গিয়ে সকাল হয়েছে ভোরের আলো ফুটেছে চারিদিকে ঘুম থেকে উঠেছে মাত্র সুবহা।সেই যে খেয়ে দেয়ে রাতে ঘুম দিয়েছিলো ঘুম ভেঙেছে এখন তবে পড়ে আছে বিছানাতেই আলসেমি লাগছে উঠতে।পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে দেখলো সুবহা ঠিক যেমন রেখে গিয়েছিলো তেমনই আছে সবটা। এসব নিশ্চয়ই সুবহার আম্মু করেছেন!যত্ম করে গুছিয়ে রেখেছেন মেয়ের সবকিছু। পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিয়েছে সে সুবহার দুই বন্ধু আছে তারা বলে দিয়েছিলো পৌছেই যেন ফোন দিয়ে জানায় তাদের। এতো ঝামেলার মধ্যে সুবহার আর মনে ছিলোনা এসব।
মেসেজ অপশনে ঢুকা মাত্রই চোখে পড়লো সেই আননোন নাম্বার থেকে আসা আরেকটা মেসেজের দিকে। কেউ সুন্দর ভাবে লিখে পাঠিয়েছে।
_“ গুড মর্নিং লাভবার্ড,আমার ভবিষ্যৎ সন্টু মন্টু সোনাদের সুন্দরী আম্মু। মেসেজটা দেখে নিশ্চয়ই রাগ হচ্ছে তোমার!আমি আদর করে একটা চুমু দিলেই তোমার সব রাগ অভিমান চলে যাবে। ”
এইটুকু দেখেই ফোনটা রেখে দিয়েছে সুবহা পরে আরো লেখা ছিলো তবে দেখার ইচ্ছে নেই তার।সুবহা বুঝতে পারছেনা অরন্য চাইছেটা কি! মনে হলো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেউ চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেলো আনহাকে ডাকতে যাবে তখনই গটমট করে হেটে চলে গেছে সেখান থেকে।
__
হাতে ধোয়া উঠা গরম চায়ের কাপ আর একটা খবরের কাগজ নিয়ে বসে আছেন সুবহার আব্বু জাহিদ হোসেন। এতো সময় বাকিরাও ছিলো সবাই চলে গেছে যে যার কাজে। সুবহাদের অফিসের সব দায়িত্ব তার চাচ্চু আর আনহাই সামলায় কিয়ান মাঝেমধ্যে গিয়ে অফিসে ঘুরে আসে বলা চলে এসব কাজকর্মের ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন সে। সুবহার আব্বুর শরীর খারাপ হার্টের সমস্যা আগে থেকেই ছিলো এখন অনেকটা বেড়েছে তাইতো তড়িঘড়ি করে ছুটে এসেছে সুবহা।উপরে তাকিয়ে বার বার দেখছেন মেয়ে ওনার নিচে আসছেনা কেন।নিজে গিয়ে দেখা করবেন না বলেই ঠিক করেছেন মেয়ের প্রতি অভিমান জমেছে জাহিদ হোসেনের।
সুবহা সিড়ি দিয়ে নিচে নামছিলো বসে থাকতে দেখে বাবাকে। বড় হওয়ার সাথে সাথে আগের চঞ্চল হাসিখুশি সুবহা কেমন রাগী গম্ভীর সুবহাতে পরিনত হয়েছে।কারোর সাথে নিজে থেকে কথা বলতেও যেন ইগোতে বাধে তার।কিন্তু বাবার প্রতি এতো অভিমান কি মানায় তাকে!কিছু না ভেবেই হুট করে এসে পাশে বসেছে জাহিদ হোসেনের বাবার গলার জড়িয়ে ধরেছে সুবহা। বাবা মেয়ে দুজনেই নিশ্চুপ কথা নেই কারোর মুখে নিরবতা ভেঙে কথা বলে সুবহা নিজেই।
_“ কেমন আছো আব্বু?এখনো রাগ করে আছো তোমার প্রিন্সেসের উপরে?”
জাহিদ হোসেন হাসেন ভারী কন্ঠে জবাব দেন মেয়ের কথার।
_“ রাগের কারণটা কি অযৌক্তিক?আমার ছোট্ট প্রিন্সেস বড়ো হয়ে গেছে বাবাকে এখন মনে আছে তার?”
বাবার কথায় সুবহার প্রতি অভিমান প্রকাশ পাচ্ছে বুঝতে পারছে এটা ভালো করেই।
_“ তোমার হাত ধরে আমি হাটতে শিখেছি আব্বু আমার পৃথিবী তুমি তোমাকে আমি ভুলে যাই কি করে বলো?”
_“ কেন চলে গিয়েছিলে সেদিন বাবার পছন্দের উপর ভরসা ছিলোনা তোমার?”
_“ তোমার পছন্দ ঠিকই ছিলো আব্বু তবে আমার জন্য নয় এ বাড়ির আরেক মেয়ের জন্য। ”
_“ আনহার কথা বলছো তুমি?সে অরন্যের ছোট বেলার বন্ধু কার না অজানা এটা তাদেরকে এক করছো কেন? “
সুবহা কথা বাড়াতে চাইলোনা চলে যাবে বলে উঠেছে সোফা থেকে যাওয়ার আগে বাবার মুখের সেই অতি পরিচিত ডাকনাম টা শুনতে ইচ্ছে করছে তার।আবারো আসে জাহিদ হোসেনের কাছে।
_“ আমাকে প্রিন্সেস বলে ডাকবেনা আব্বু!”
জাহিদ হোসেন কথা বললেন না মুখ ঘুরিয়ে নিলেন অন্য দিকে।সুবহাও বুঝলো দুই বছরের জমানো রাগ অভিমান শেষ হওয়ার নয় একদিনে কষ্ট নিয়ে চলে যাচ্ছিলে সেখান থেকে কানে আসে আবারো বাবার কথা। জাহিদ হোসেন গম্ভীর কন্ঠে বলছেন মেয়েকে।
_“ কালকে থেকে তুমি অফিস জয়েন করবে।তোমার ভাইকে পারলে সাথে নিবে ঘুরাঘুরি ছাড়া তারতো আর কোনো কাজ নেই। ”
_“ চাচ্চু আর আপুতো আছেই আব্বু অফিসে কি স্টাফ কম! ”
_“ ওতো কথা শুনতে চাইনা আমি সুবহা তুমি কালকে অফিস জয়েন করবে আমরা সবাই থাকবো অফিসিয়ালি CEO পদটা তোমাকেই দেওয়া হবে।পড়াশোনা করে এসেছো বাহির থেকে এইটুকু দায়িত্ব নিতে তোমার এতো আপত্তি কেন?”
_“ ঠিক আছে যাবো আমি।”
সুবহা চলে যাবে তখনই হাতে টান পড়ে তার তাকিয়ে দেখলো মা চাচি দুজনেই দাঁড়িয়ে আছেন।সেলিনা বেগম ভ্রু কুচখে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে মায়ের রাগের কারণ বুঝলোনা সুবহা।
_“ আমাকে নিয়ে সবার এতো সমস্যা হলে চলে যাচ্ছি আমি।”
_“ বাবার মতো এতো রগচটা কেন তুই? সমস্যা থাকবে কেন না খেয়ে উপরে চলে যাচ্ছিস তাই আটকালাম।”
_“ খিদে নেই আম্মু খাবোনা আমি।”
সুবহার কথা পছন্দ হলোনা তার চাচির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেছেন ড্রাইনিং টেবিলের কাছে।সুবহাকে বসতে বলে প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বলছেন।
_“ না খেয়ে খেয়ে শুটকির মতো চেহারা বানিয়েছিস খেয়াল আছে সেদিকে।”
কিয়ান চেয়ার টেনে সুবহার পাশে বসতে বসতে বলছে।
_“ বিয়ে করবেনা বলেইতো লুকিয়ে ছিলো এতোদিন খাচ্ছেনা কেন জানোনা পাত্র যেন শুকটির মতো চেহারা দেখে পালিয়ে যায় সেইজন্য। ”
_“ হয়েছে তোমাকে আর কথা বলতে হবেনা বাঁদরমুখো ছেলে সারাদিন ঘুরে বেড়ানো আর বিছানায় বসে বসে খাট ভাঙা ছাড়া আর কোনো কাজ আছে তোমার।”
_“ সবাই মিলে আমাকে কাজের কোটা দিওনাতো আম্মু।একদিন আমিও নিজের বিজনেস সামলাবো বস্তা বস্তা টাকা হবে রাখার যায়গা খুঁজে পাবেনা তখন।”
সুবহা আড়চোখে কিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলছে।
_“ কনফিডেন্স ভালো ভাইয়া তবে ওভার কনফিডেন্স ভালোনা।”
_“ ভয় দেখাবি না পারলে তোর বান্ধবীকে গিফট করে দে। ”
_“ জেনেশুনে তার জীবন নষ্ট করতে ইচ্ছুক নই আমি। ”
কিয়ান সুবহাকে মুখ ভেংচি দেখিয়ে নিজের খাবারে মনোযোগ দিয়েছে।সুবহাও কথা বলেনি আর,তবে কিয়ানের সাথে কথা বললেই মনটা ভালো হয়ে যায় তার এই বাড়িতে কিয়ান ছাড়া আর কেউ সুবহাকে এতো ভালোবাসে বলে মনে হয়না।
___
ভার্সিটি থেকে বাড়িতে ফিরছে কিরণ প্রতিদিন বাড়ির গাড়িতেই আসে তবে আজকে ইচ্ছা হলো নিজে হেটে বাসা পর্যন্ত যাবে।ড্রাইভারকে বলেছে আরো পরে আসতে এদিকে ক্লাস সবগুলো না করে একা একা বেরিয়ে পড়েছে।সামনেই পার্ক কিরণের ইচ্ছে হলো সেখানে যাবে। যদিও শিশু পার্ক তবে একদিন শিং ভেঙে বাছুরের দলে নাম লেখালে খারাপ কিছু হবেনা। কিরণ পার্কের ভিতরে এসেছে একদল বাচ্চারা মনের আনন্দে খেলা করছে সেখানে। এই বাচ্চাগুলোর প্রাণোজ্জ্বল হাসি আর আনন্দ দেখে নিজের ছোট বেলায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে কিরণের। পাশ ফিরে তাকাতেই নজরে আসে একটা কাঠগোলাপের গাছ। সাদা সাদা ফুল ফুটে আছে পুরো গাছে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করলো কিরণের। দেরি কেন?চলে গেছে গাছটির কাছে একটা ফুল ছিড়ে গুজে নিয়েছে কানের পাশে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজোড়া চোখ পর্যবেক্ষন করছে কিরণকে। বিড়বিড় করে বলছে সে।
_“ কাঠগোলাপের মতোই সুন্দর তুমি।”
ভাইয়ের কথা কানে এসেছে সুবহার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে হেটে যাচ্ছিলো কিরণের কাছে। তখনই কোথা থেকে দুই তিনটা ছেলে আসে কিরণ ঘুরে তাকাতেই ছেলেটির বলা কুরুচিপূর্ণ কথা কানে আসে তার।
_“ কিগো মামুনি একা কেন কেউ নেই বুঝি,তিনজন আছি চলবে!নাকি আরো কাউকে ডেকে আনবো।”
ভয়ে কয়েকপা পিছিয়ে যায় কিরণ ছেলেগুলো সাহস পেলো তাকে ভয় পেতে দেখে হাত ধরতে যাবে তখনই শক্তপোক্ত কিছু উড়ে এসে হাতে পড়ে ছেলেটির ব্যাথায় অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরেছে সাথে সাথে।রেগেমেগে তাকালো ছেলেটি তার তাকানো অনুসরণ করে বাকিরাও তাকিয়েছে। সুবহা দাঁড়িয়ে আছে একটা হাটু পর্যন্ত সাদা টপস আর কালো রঙের জিন্স প্যান্ট পড়ে।চোখের সানগ্লাসটা তুলে মাথায় নিয়েছে। সুবহা এগিয়ে আসে মুখোমুখি দাঁড়ায় ছেলেগুলোর পিছে পিছে আসে কিয়ানও রাগ তার সীমা ছাড়িয়েছে ছেলেগুলোকে মেরেই ফেলবে এখন।সুবহা আটকালো ভাইকে হাতে থাকা ইটের আধভাঙা টুকরোটা এক হাত থেকে অন্য হাতে নিতে নিতে ছেলে তিনটাকে বললো।
_“ কি বললি শুনতে পায়নি তখন আবার বল।”
ছেলেটা রেগে গালি ছাড়তে যাবে মুখ থেকে থামিয়ে দেয় পাশের দুইটা ছেলে মুখ চেপে ধরে সুবহার দিকে তাকিয়ে বলে।
_“ না না কিছুই বলেনি। ”
এইটুকু বলেই দৌড় লাগিয়েছে উল্টো পথে ছেলে দুটো পালালেও হাতে ব্যাথা পাওয়া ছেলেটা পড়ে গেছে হোছট খেয়ে।কিয়ান গিয়ে ছেলেটার আঘাত পাওয়া হাতটা শক্ত করে ধরে টেনে তুলে তাকে। ইচ্ছামতো মারতে থাকে ছেলেটিকে বেচারা এতো কিল ঘুষি আর নিতে পারছেনা কিরণের পায়ে পড়ে গেছে।
_“ আপনি আমার বোন লাগেন আর জীবনে এমন করবোনা মাফ করে দেন আফা।”
কিরণ হা করে তাকিয়ে আছে কি বলবে বুঝতে পারছেনা না পেরেই বলেছে যা মনে এসেছে।
_“ আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে যান আপনি।”
নিজের জান বাঁচিয়ে পালিয়েছে ছেলেটি দৌড়ানোর স্টাইল দেখে হাসি পেলো কিরণের।এই মুহুর্তে কিরণের হাসি দেখে রাগ হলো কিয়ানের।
_“ তোমার ভাইয়ের না এতো টাকা এতো অহংকার তার, বোনকে একা ছেড়ে দিয়েছে! কোনো অঘটন ঘটে গেলে কি করতে তুমি?”
কিয়ানের কথা ভালো লাগলোনা কিরণের এই কিয়ান সবসময়ই অরন্যকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলে যেটা একেবারেই অপছন্দ কিরণের।
_“ আমার ভাইয়াকে নিয়ে কিছু বলবেন না।আমাকে বাঁচিয়েছে সুবহা আমার ভাইয়ার সম্পর্কে আপনার মুখ থেকে কোনো কথা শুনতে রাজি নই আমি।”
_“ যেমন ভাই তেমন তার বোন অহংকারে মাটিতে পা পড়েনা দুটোর।”
ঝগড়া বাড়ছে দেখে সুবহা ভাইকে বলে।
_“ আহ ভাইয়া থামোতো।”
_“ থামবে কেন তোর ভাইতো ভাঙা রেডিও যেখানে পারে আমার ভাইয়াকে নিয়ে যাতা বলা শুরু করে।আরেকবার কিছু বলে দেখুক ভাঙা রেডিও পুরোপুরি ভেঙে গুড়িয়ে দিবো আমি।”