জনমানবহীন নিস্তব্ধ রাস্তাটা দিয়ে একা হেঁটে যাচ্ছে আনহা। পুরোনো সবকিছু ভুলে নতুন করে নিজেকে গুছিয়ে নিতে চেয়েও বারবার ফিরে আসে সে। এখনও মনের কোথাও না কোথাও রয়ে গেছে অরণ্য। মুখে সব ভুলে গেছি বললেও, যে মনে মনে এখনও অরণ্যকে ভালোবাসে আনহা। পরক্ষণেই মনে হয়, সে ভুল করছে এসব ভাবাও যে পাপ। সুবহাকে আর কষ্ট দিতে চায় না আনহা। ওরা ভালো থাকুক ওদের জীবনে। কিন্তু আনহার মস্তিষ্ক যে বিগড়ে গেছে পুরোপুরি, ওর পুরো মন-মস্তিষ্ক জুড়ে অরণ্য ব্যতীত আর কেউই নেই। কখনো আর কাউকে ভালোবাসতে পারবে কিনা এও জানা নেই। আনহার তো উচিত, ওদের থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়া যেখানে গেলে দ্বিতীয়বার সুবহা-অরণ্যকে বিরক্ত করতে আসতে পারবে না সে।
আজকে পুরোনো অতীত মনে পড়ছে আনহার। মনে পড়ছে নিজের করা সবগুলো ভুলের কথা। হাঁটতে হাঁটতে রেলস্টেশনের কাছে চলে এসেছে আনহা। আশেপাশে এখন দু-একজন মানুষ দেখা যাচ্ছে।ওর খেয়াল নেই ওদিকে,মনোযোগ দিয়ে কি যেন ভাবছে আর হাঁটছে। ওদিক থেকে ট্রেন আসছে, ট্রেনের ঝনঝন শব্দ কানে আসতেই আনহা ঘুরে তাকিয়েছে। ট্রেন আর আনহার দূরত্ব খুব একটা বেশি না। আনহার মনে হলো, মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সে। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা যে হারিয়ে গেছে তার। ওভাবেই দাঁড়িয়ে আছে রেললাইনে, চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করছে মৃত্যুর। কেউ একজন দূর থেকে ডেকে যাচ্ছে আনহাকে, শুনছে না দেখে দৌড়ে এসেছে ওর কাছে, হাতে টান দিয়ে নিয়ে গেছে সেখান থেকে। হাপাতে হাপাতে রাগমিশ্রিত কণ্ঠে আনহাকে বলছে যুবকটি—--
" পাগল হয়েছেন? এক্ষুনি তো ট্রেনটা পিষে ফেলতো আপনাকে!"
ধ্যান ভাঙলো আনহার। তাকালো চলন্ত সেই ট্রেনের দিকে। কিছু দূরেই ট্রেনের লাইনে কাটা পড়েছে কেউ, লোকজন জড়ো হয়েছে সেখানে। বিষয়টা নজরে আসল আনহার, বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল ওর। কিছু সময়ের ব্যবধানে ওই ভদ্রলোকের জায়গায় আনহাই থাকত। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখতে পেলো চেনা পরিচিত কাউকে, সাব্বির দাঁড়িয়ে আছে আনহার সামনে। এই ছেলেটাকে ভালো করেই চেনে ও। ওদেরই কোম্পানিতে কাজ করত এই সাব্বির। দেখতে শুনতে ছেলেটা মাশাল্লাহ, কিয়ানের থেকে খানিকটা বড়ই হবে। তবে আনহার থেকে কিছুটা ছোট বা ওর সমবয়সীই হবে। সাব্বিরকে কিছু বলতে যাচ্ছিল আনহা সুযোগ দিল না সাব্বির, কথা না বলে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো লোকজন যেখানে জড়ো হয়েছে সেখানে।
ট্রেন চলে গেছে ততক্ষণে, ভদ্রলোকের পুরো শরীরটা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে সেখানে। পাশেই দাঁড়িয়ে ওনার স্ত্রী-মেয়ে আহাজারি করছে। আনহা দেখল সবটা, ওরও কেমন কান্না পাচ্ছে। আসার আগেই তো মাকে বলে এসেছিল সময়মতো বাড়ি ফিরে যাবে। এত ভুল করার পরেও নিজের মায়ের কাছে আগের মতোই ভালোবাসা আর যত্ন পায় আনহা। কিয়ান, কিরণসহ বাড়ির বাকিরাও সমান গুরুত্ব দেয় ওকে। আনহা যদি মা/রা যেত আজকে, তাহলে তারাও নিশ্চয়ই এভাবে কষ্ট পেত। সাব্বির ওর হাতটা ধরে নিয়ে গেছে সেখান থেকে, বলে উঠেছে ওকে।
"ওই লোকটার জায়গায় নিজেকে আর ওনার স্ত্রী মেয়ের জায়গায় আপনার ফ্যামিলির সবাইকে বসিয়ে ভাবুন তো, কেমন লাগে!"
"আমি আসলে..."
সাব্বির মুচকি হেসে বলল আনহাকে।
"নিজেকে ভালোবাসতে শিখুন, ম্যাডাম। যে নিজেকে ভালোবাসতে পারে না, সে অন্যকে ভালোবাসবে কীভাবে? পুরোনো সবকিছু ভুলে নতুন করে নিজের জীবন সাজান। জীবন একটাই। অন্য কারো নিজেকে শেষ করে দিবেন কেন?"
আনহা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল সাব্বিরকে।
"নিজেকে ভালোবাসতে না পারলেও অন্যকে ভালোবাসতে পারি আমি। কিন্তু আমাকেই কেউ চায় না, বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাও হারিয়ে গেছে সেখান থেকে।"
"এই গোলাকার পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও এমন কেউ থাকে, যে অগোছাড়েই ভালোবেসে যায় আমাদের। সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।"
সাব্বিরের কথার মানে বুঝতে পারছে না আনহা। প্রশ্নও করেনি আর। আনহা চলে যাচ্ছিল ওখান থেকে। হাঁটতে হাঁটতে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান চোখে পড়ল ওর। চারদিকে সুন্দর আবহাওয়া, বাতাস বইছে আজকে। তেমন গরম নেই, আবার ঠান্ডাও নেই। এই সময়টাতে ওই সাদামাটা দোকানটাতে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিলে মন্দ হয় না। আনহা তাকিয়ে আছে দোকানটার দিকে, কানে এসেছে কারো কথা—--
"চা খাবেন?"
সাব্বিরের প্রশ্নের উত্তরে কিছু না বলে উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলো আনহা। দুজনেই গেল দোকানটার কাছে।
সাব্বিরের সাথে অনেকক্ষণ কথা হলো আনহার। ছেলেটা আর ওদের কোম্পানিতে চাকরি করে না এটা শুনেছে কিয়ানের মুখে। কারণ জানতে চাইলে বলল সাব্বির—-- 'ওর আব্বুর সাথে ঝামেলা হওয়ায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ওদেরও আনহাদের মতো বড় বিজনেস আছে, এমনকি আনহার আব্বুর সাথে ওর আব্বুর পরিচয়ও আছে। বেশ কিছুদিন আগে, যখন বিজনেস ডিল কনফার্ম করতে আসলেন, তখন দেখেছিলেন সাব্বিরকে। নিজেদের এত বড় বিজনেস রেখে ছেলে অন্য জায়গায় কেটে মরছে দেখে নিজেই ক্ষমা চাইলেন ওর কাছে। বুঝতে পারলেন নিজের ভুল। সাব্বিরও বুঝল ওর এত ইগো দেখানো ঠিক হয়নি। মা অসুস্থ জেনে আরও খারাপ লাগল ওর। তখন চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছিল বাবার সাথে নিজের চেনা পরিচিত জায়গায়। আজকে আবার কোনো একটা কাজে এসেছে এখানে। হাঁটতে বের হয়েছিল, তখনই দেখল আনহাকে। '
সবটা বলে বড় করে শ্বাস টানলো সাব্বির। আনহাও এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সাব্বির কি যেন বলেছে, আনহার চাহনি দেখে এ শুনে হাসছে আনহা। সাব্বির মুগ্ধ হয়ে দেখছে ওর হাসিমাখা সুন্দর মুখটি। সাব্বিরের এমন চাহনি দেখে কেমন অস্বস্তি হলো আনহার। হাসি থামিয়ে উঠে দাঁড়াল, চলে যাবে বলে। দু এক পা বাড়াতেই বলে উঠেছে সাব্বির—--
"হাসলে আপনাকে সুন্দর দেখায় ম্যাডাম।"
আনহা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছে সাব্বিরের দিকে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠেছে ওকে —--
"আপনি কি বাই এনি চান্স আমাকে পটানোর চেষ্টা করছেন?"
মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে ঠেলে পিছনে সরিয়ে দিলো সাব্বির। হেসে বলল আনহাকে—--
"ক্ষতি আছে কি?"
"তা তো আছেই।"
"যেমন?"
"আমাকে ভালোবাসতে আসবেন না জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবেন।"
সাব্বির কথা না বলে কাছে গেল আনহার। বাতাসে ওর চোখেমুখে এসে পড়া চুলগুলো ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিলো, ওর দিকে কিছুটা ঝুঁকে শান্ত কণ্ঠে বলল—--
"আপনাকে ভালোবাসা যদি অপরাধ হয়, এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে আমি শতবার পুড়ে ছাই হতে রাজি।"
আনহা বুঝল, সাব্বির ফ্লাটিং করছে ওর সাথে। কথা না বাড়িয়ে চোখ গরম করে ওর দিকে একবার তাকিয়ে চলে গেল সেখান থেকে।
————
১২টা বাজতে আর কিছু সময় বাকি, বিছানায় পড়ে আছে সুবহা ঘুম নেই ওর দু’চোখের পাতায়। ঘুমিয়েছিল মাত্রই, আনহাকে নিয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখেছে ও। আনহার তখনকার কথাগুলো ভাবছে সুবহা। ওর কথা শুনে মতিগতি বোঝা দায় না জানি কী করে বসে, ঠিক নেই তার। চিন্তিত হয়ে ফোন দিয়েছে বাড়িতে। চাচির মুখে শুনেছে, সবই ঠিকঠাক আছে। না ঘুমিয়ে এমন সময় ফোন দেওয়ায় তিনি আরও কয়েকটা কথা শুনিয়ে শাসন করে দিয়েছেন ওকে। এই হয়েছে এক সমস্যা প্রেগন্যান্সির পর থেকে চাচি আর শাশুড়ির বলা সব কথা ফলো করতে হয় তাকে। প্রতিদিন না হোক, একদিন পরপর হলেও দেখে যান এসে সুবহাকে। সবার এত আদর-যত্ন পেয়ে ভালোই লাগে সুবহার। চাচির মুখে সব ঠিক আছে শুনে নিশ্চিত হয়েছে।
অরণ্যের জন্য অপেক্ষা করছিল এতক্ষণ ধরে। আসছে না দেখে চিন্তা হচ্ছে এখন। কোনো রকমে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল বাইরে যাবে বলে, হুট করেই রুমের আলো নিভে গেছে। পুরো বাড়িতে সুবহা ছাড়া কেউই নেই, সার্ভেন্টকেও বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে,ওনার সমস্যার কথা শুনে। অরণ্য এটা জানলে আবার কাজ ছাড়া করবে ভদ্রমহিলাকে। কিন্তু এখন ভয় লাগছে সুবহার কি হলো হঠাৎ করে? ঘামছে ও, চোখ বন্ধ করে বসে পড়েছে বিছানায়। কেউ একজন এসে পাশে দাঁড়িয়েছে সুবহার কোলে তুলে নিয়েছে ওকে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে লোকটার গলা আঁকড়ে ধরেছে সে। পরিচিত পারফিউমের গন্ধ আর হাতের স্পর্শ পেয়ে বুঝতে বাকি নেই এটা অরণ্য। সুবহার ভয় কমল এবার। কোনো কিছু না ভেবেই ওর মাথাটা রেখেছে অরণ্যের ঘাড়ে।
অরণ্য সুবহাকে নিয়ে এসেছে ড্রয়িংরুমে, সোফায় বসিয়ে হাঁটু গেড়ে বসেছে ওর সামনে। নিজের মুখ উঁচিয়ে চুমু দিতে বলেছে, সুবহাও শুনল অরণ্যের কথা। আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো অরণ্যের কপালে। অরণ্য উঠে বসল ওর পাশে, সুবহার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে পরপর কয়েকটা চুমু দিলো ওর ঠোঁটে,গালে,পুরো মুখজুড়ে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, সুবহা পুরো রুমটা সুন্দর করে সাজানো। পাশের ট্রি টেবিলটাতে কয়েকটা গিফট আর সুবহার পছন্দের চকোলেট কেক রাখা। এত আয়োজনের কারণ অজানা সুবহার জানার বড়ই আগ্রহ হচ্ছে ওর। অরণ্যকে বলতে যাবে কিছু, তার আগেই অরণ্য নিজের আঙুল দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরেছে ওর, শান্ত কণ্ঠে বলছে সুবহাকে—--
"হ্যাপি অ্যানিভার্সারি, লাভবার্ড।"
সুবহার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল মুহূর্তেই। কিন্তু নিজের উপরেই রাগ লাগছে ওর আজকের দিনটার কথা কীভাবে মাথা থেকে বেরিয়ে গেল? সুবহা তো কখনোই এমন মনভোলা ছিল না। অরণ্য হয়তো বুঝেছে এটা হেসে আবারও নিজের কাছে টেনে নিয়েছে সুবহাকে। একটা একটা করে সবগুলো গিফট দিয়েছে ওর হাতে। এত গিফট দেখে মাথায় হাত সুবহার, মনে হচ্ছে, অরণ্য পুরো দোকানটাই তুলে নিয়ে এসেছে ওর জন্য।
অরণ্য সুবহা তাকিয়ে আছে একে অপরের দিকে। পুরোনো স্মৃতিগুলো খুব করে মনে পড়ছে আজ। রাগী, বদমেজাজি অরণ্য পুরোপুরি পালটে গেছে এখন। কঠোর সুবহাও কেমন পরিবর্তন হয়ে গেছে অরণ্যের ভালোবাসায়। প্রথম প্রথম ওর অতিরিক্ত শাসন ভালো না লাগলেও এখন লাগে। বুঝে গেছে, সবটাই অরণ্য ওকে কাছে রাখার জন্য করে। অরণ্য সুবহার কপালে চুমু দিয়ে বলছে ওকে—--
"আমার জীবন রংহীন জীবন রাঙিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ তোমাকে, লাভবার্ড।"
সুবহা হাসল অরণ্যের কথায়। শক্ত করে অরণ্যকে জড়িয়ে ধরে বলল সে—--
"ধন্যবাদ আপনাকেও আমাকে ভালোবেসে আগলে রাখার জন্য, আমার খারাপ সময়ে সঙ্গ দেওয়ার জন্য।"
অরণ্য চোখ বন্ধ করে শান্তির প্রশ্বাস ছাড়ল। আজ নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে ওর। প্রিয় নারী, তার ভালোবাসা আর মায়ায় ভরা সুন্দর একটা ফ্যামিলি পেয়েছে সে খুশি তো হওয়ারই কথা!
————
কেটে গেছে আরও দুই তিনটা দিন। কিছুক্ষণ আগেই সুবহাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। কিরণ আর ওর আম্মু অরণ্যের ফ্ল্যাটেই ছিলেন। সুবহার পেইন উঠলো পরে, নিজেরাই নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে। প্রচণ্ড ব্যথায় কান্না করছে সুবহা, অরণ্যকে এসেছে সেখানে সুবহার কান্নার আওয়াজে বুকের ভেতরটায় কষ্ট হচ্ছে অরণ্যের। কিন্তু ওকে যেতে হবে এক্ষুনি ওটি আছে ওর। সুবহাকে ফেলে যায়ই বা কী করে! মিহি বারবার বলছে, ও দেখে নেবে তবুও মনটাকে শান্ত করতে পারছে না অরণ্য। ওদিকে আইসিইউতে রোগীর মরণ বাঁচন অবস্থা অপারেশন না করলে হবে না কিছুতেই। মিহি আর বাকিদের আশ্বাস পেয়ে অবশেষে গেল অরণ্য।
————
অপারেশনের সরঞ্জাম হাতে নিয়েছে অরণ্য। হাতটা কাঁপছে অকারণেই। চোখ বন্ধ করে একটা শ্বাস ফেলে নিজেকে স্থির করল। আদ্রীশও চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলল ওকে। অরণ্য ভেবে নিয়েছে, এই অপারেশনে সে থাকবে না। সুবহার মুখটা বারবার ভেসে উঠছে চোখের সামনে। নিজের মনকে বোঝাতে পারছে না কোনোভাবেই ভুলভাল কিছু হয়ে গেলে বদনাম হবে হাসপাতালের আর আর ওর নিজের। বাকিরাও শুনেছে অরণ্যের কথা, যেতে বলেছে ওকে।
————
হাসপাতালের করিডরে পায়চারি করছে অরণ্য। দুই বাড়ির সবাই দাঁড়িয়ে আছেন ওখানে। টেনশন হচ্ছে সবারই। অরণ্যের মন মানছে না আর। সুবহা ঠিক আছে তো? এত সময় ধরে মিহি এসে বলছে না কেন কিছু? অরণ্য হেঁটে যাচ্ছিল কেবিনের দিকে, তখনই বেরিয়ে এসেছে মিহি। কোলে একটা ছোট্ট বাচ্চাকে সাদা তোয়ালেতে জড়িয়ে রেখেছে। থেমে গেল অরণ্যের পা জোড়া। বাকিরা সবাই গিয়ে ঘিরে ধরেছে মিহিকে। পেছনে নার্স এসেছে, আরেকটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল অরণ্যের, দুই বাচ্চার বাবা হয়ে গেছে সে। যেমনটা অরণ্য চাইত সবসময়। মিহি ওর কোলে থাকা বাচ্চাটাকে নিয়ে এসেছে অরণ্যের সামনে কোলে নিতে বলছে ওকে। অরণ্যের অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। আনন্দে হচ্ছে খুব, বাবা হলে বোধহয় সবারই এরকম হয়! নিজের কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে অরণ্য স্পর্শ করেছে মেয়ের গাল। ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটা কী যেন বুঝেছে নিভু নিভু চোখে তাকিয়েছে অরণ্যের দিকে। অরণ্য কোলে নিয়েছে মেয়েকে। ভাবনায় আসল সুবহার কথা, মেয়ের থেকে চোখ সরিয়ে মিহির দিকে তাকাতেই বলল মিহি —--
" বাচ্চার মা ঠিকঠাক আছে, টেনশনের কিছুই নেই।"
নিশ্চিন্ত হলো অরণ্য। ধন্যবাদ জানাল মিহিকে, মিহিও অভিনন্দন জানিয়েছে অরণ্যকে। অন্য বাচ্চাটাকে কোলে নিয়েছে কিরণ। মুখে কয়েকটা চুমু দিয়েছে ওর। কিয়ান এদিকে বসে আছে ভাগ্নেকে কোলে নেবে বলে, কিন্তু কিরণ ওকে দেবে না কারোর কাছেই। কিরণের এমন বাচ্চামি দেখে হাসছে সবাই।
————
পিটপিট করে চোখ খুলে তাকিয়েছে সুবহা। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল অরণ্যকে। দোলনায় শুয়ে থাকা বাচ্চা দুটোর সাথে হেসে হেসে কথা বলছে ও। বাচ্চাদের দিকে একবার তাকিয়ে, তাদের বাবার দিকে তাকাল সুবহা। অরণ্যের চোখ মুখে খুশি উপচে পড়ছে যেন। ওরও ভালো লাগছে এ দেখে। অরণ্যের চোখ গেল বেডে শুয়ে থাকা সুবহার দিকে। কাছে গেল ওর। আলতো করে চুমু দিল কপালে। বলল সুবহাকে—--
" থ্যাংকিউ আমার সন্টু মন্টুর আম্মু। "
সুবহা ভ্রু কুঁচকাল। অরণ্য ভাবল রাগ করেছে কোনো কারণে। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলে বলল সুবহা —--
" আপনি কি বাচ্চাদের এইসব উদ্ভট নামেই ডাকবেন? "
অরণ্যও একইভাবে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে উত্তর দিল সুবহাকে—--
" উদ্ভট নাম মানে? আমার বাচ্চাদের আমি এই সুন্দর নামেই ডাকব।"
" বললেই হলো? বাচ্চাদের নাম আমি রাখব। "
" ওরা তোমার পেটে আসার আগেই আমি এই নামগুলো ঠিক করে রেখেছি। আমি ওদের বাবা নামটাও আমিই রাখব। "
" আমিও ওদের মা। "
" তুমি খালি ডিম থেকে ছানা ফুটিয়েছ, বাকি সব কাজ তো করেছি আমি। "
অরণ্যের কথায় লজ্জা পেল সুবহা। ওর বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল তখন।
" নির্লজ্জ লোক। "
অরণ্য কিছুটা ঝুকে সুবহার কানের কাছে গিয়ে বলছে ওকে।
" আমি নির্লজ্জ না হলে এই ছানাপোনার আম্মু হতে না তুমি।"
অরণ্যের এত কথা ভালো লাগছে না সুবহার। এদিকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সবাই অরণ্য বেরোলেই তারা এসে দেখবে বাচ্চাদের। সুবহা বিরক্ত হয়েই বলল অরণ্যকে—--
" যাবেন আপনি? "
দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে না সূচক উত্তর দিল অরণ্য। দরজার দিকে চোখ গরম করে তাকাতেই চলে গেছেন সবাই। সুবহা মাথায় হাত ঠেকিয়ে অরণ্যের দিকে তাকিয়ে আছে ভাবছে মনে মনে —' দুই বাচ্চার বাবা হয়ে গেলো এই লোকের বাঁদড়ামো গেলোনা। '
————
সময় আর স্রোত অপেক্ষা করে না কারোর জন্য। দেখতে দেখতে অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। আনহার জীবনে নতুন করে ভালোবাসা এসেছে, কিছুদিন আগেই বিয়ে করেছে সাব্বিরের সাথে। সাব্বিরকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি এইজন্য। পিছু পিছু কয়েক মাস হেঁটে, দুই তিন বার আনহার হাতের থাপ্পড় খেয়ে তারপর বিয়ে করার মিশনে সফল হয়েছে সে। বাড়ির বাকিদেরও পছন্দ ছিল সাব্বিরকে ছেলেটা দেখতে শুনতে ভালো, বাড়ি গাড়ি কিছুরই কমতি নেই। কেউই আপত্তি করেননি এই বিয়েতে। আনহা একটা সুন্দর সংসার পেয়েছে, বিশ্বাসের হাত পেয়েছে অবশেষে।
কিরণ আর কিয়ানের একটা ছোট্ট মেয়ে বাবু হয়েছে। নামটাও দুজনের নামের সাথে মিলিয়ে রেখেছে " কৃত্তিকা নূর।" কৃত্তিকা বছরে পা দিয়েছে মাত্রই। ওকে নিয়ে খেলা করে সুবহার আব্বু আর চাচ্চুর দিন কেটে যায়। দুই দাদাই নাতনিকে নিয়ে পাগলপ্রায়। এদিকে অরণ্যদের বাড়িতে সারাদিন হৈ-হুল্লোড় লেগেই আছে। বাচ্চারা হয়েছে তাদের বাবার মতো সারাদিন এটা ওটা ভেঙে ফেলছে, কখনো রুমের জিনিসপত্র সব এলোমেলো করে দিচ্ছে। অরণ্যের আম্মু-আব্বু সারাদিন নাতি নাতনির পিছনেই দৌড়াদৌড়ি করেন। বাচ্চাগুলো এতোটাই বিচ্ছু হয়েছে গার্ডেনে বা সোফার নিচে লুকিয়ে থাকে মাঝেমধ্যে। অরণ্যের আব্বু তখন খুঁজে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে বকুনি দিয়ে বলেন—--
" অরণ্য কিরণের ছোটবেলার স্বভাব পেয়েছে দুজনে। "
জাহানারা সুলতানা কথাটা শুনলেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। উনার নাতি নাতনিকে কেউই কিছু বলতে পারবে না! সুবহা অতিষ্ঠ হয়ে মাঝেমধ্যে বকাবকি করলে, ওকে বাবার বাড়িতে চলে যেতে বলেন তিনি। বাড়ির দুই নতুন সদস্য আরভীন আর অদ্রিজার বয়স এখন ৩ বছর।