অরণ্যের সাথে কথা বলা শেষে মিহি চলে যাচ্ছিল। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই টান পড়ে ওর হাতে, তাকিয়ে দেখল আদ্রীশ দাঁড়িয়ে আছে মিহির চোখের সামনে। কেমন করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে, আদ্রীশের এই চাহনিতে নিজের প্রতি ভালোলাগা খুঁজে পাচ্ছে মিহি? আদ্রীশ কি তাহলে ভালোবাসতে শুরু করেছে মিহিকে? হবে হয়তো! কিন্তু মিহিও মনে মনে ভেবে নিয়েছে, আদ্রীশকে পাত্তা দেবে না। আদ্রীশ যেভাবে ওকে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছে, একইভাবে মিহিও এবার ফিরিয়ে দেবে আদ্রীশকে।
আদ্রীশের থেকে এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে বলে উঠেছে মিহি —--
' সমস্যা কি? যখন-তখন গায়ে হাত দিস কেন?'
' গায়ে হাত দিলে ফোসকা পড়ে তোর? আমি হাত দেব না তো কে দেবে?'
' এ্যাহ! ক্যাবলার কথা শোনো, আমি কি তোর বিয়ে করা বউ? গায়ে হাত দিবি কেন?'
আদ্রীশ অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলছে মিহিকে —--
' বউ নয় হতে কতক্ষণ!'
আদ্রীশের কথা স্পষ্টই কানে এসেছে মিহির, মুখ ভেংচি দেখিয়ে বলে উঠেছে তাকে।
' তোর মতো ক্যাবলার বউ হওয়ার জন্য বসে নেই মিহি।'
রাগ হলো আদ্রীশের, ভ্রু কুঁচকে তাকালো মিহির দিকে, শক্ত করে ওর হাত চেপে নিয়ে নিজের কাছে এনে বলল,
' এতো জেদ কিসের তোর?'
কথা বলল না মিহি, চুপটি করেই দাঁড়িয়ে রইল সে। অরণ্য ওদিকে গাড়িতে বসে বিরক্ত হচ্ছে, গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে আদ্রীশকে বলে উঠেছে,
' তোরা কি আজকে বিয়ে করে বাসর সেরে এখানে ছানাপোনা ফুটিয়ে ফেলার চিন্তা করেছিস?'
অরণ্যের কথা কানে আসতেই মিহিকে ছেড়ে দিয়েছে আদ্রীশ। গাড়িতে উঠতে উঠতে বিড়বিড় করে বলছে অরণ্যকে,
' তোর মতো নির্লজ্জ হলে এটাই করতাম। '
' কি বললি? '
আদ্রীশ অরণ্যের দিকে তাকিয়ে একটা ক্যাবলা মার্কা হাসি দিয়ে বলে উঠেছে,
'তোকে নিজের বন্ধু হিসেবে পেয়ে ধন্য আমি।'
অরণ্য মনে খুশি হলো কথাটা শুনে, ভাব নিয়ে বলল আদ্রীশকে,
' ঠিক আছে ঠিক আছে, এতো প্রশংসা করতে হবে না। আমি ভালো, এটা জানি। আমার সাথে থেকে থেকে তোর অনেক উন্নতি হয়েছে দেখা যাচ্ছে।'
আদ্রীশ মাথা উপর-নিচ নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিল অরণ্যকে। সুবহা চুপচাপ বসে আছে আর শুনছে দুজনের কথা। ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়িটা স্টার্ট দিয়েছে আদ্রীশ। সুবহা বাইরের দিকে তাকিয়ে মিহিকে হাতের ইশারায় বিদায় জানিয়েছে। মিহিও একইভাবে বিদায় জানিয়েছে সুবহাকে, হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে ওখানেই। যতদূর অরণ্যদের গাড়িটা দেখা যায়, তাকিয়ে ছিল সে চলন্ত গাড়িটার দিকে।
————
লম্বা একটা জার্নির পর নিজেদের চেনা পরিচিত জায়গাতে ফিরেছে অরণ্য-সুবহা। অরণ্য সুবহাকে নিয়ে ওর ফ্ল্যাটে এসেছে। আদ্রীশ অরণ্যদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে সেখান থেকে। সুবহা ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই অরণ্য আর জাগায়নি তাকে, কোলে তুলেই নিয়ে গেছে রুমে। সুবহাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে অরণ্য চলে গেছে ওয়াশরুমে মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে ওর। আয়নার সামনে যেতেই দেখতে পেলো অরণ্য, ব্যান্ডেজের উপর দিয়েই রক্ত বের হচ্ছে ওর মাথা থেকে। এতোটা রাস্তা জার্নি করে এসেছে, গাড়ির ঝাকুনিতেই এমনটা হয়েছে মনে হলো। রুমে এসে ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে নিজেই কাটা স্থানটা পরিষদ করে নতুন করে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে নিয়েছে।
অরণ্য এসে শুয়েছে সুবহার পাশে। তাকিয়ে আছে ওর মায়াবী মুখপানে। হঠাৎ কী যেন মনে হলো অরণ্যের উঠে বসে নিজের ঠান্ডা হাত দিয়ে স্পর্শ করল সুবহার উদর। কিছুক্ষণ পর এগিয়ে গিয়ে চুমু একেঁ দিলো সেখানে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল—--
' দেখলি তো সন্টু-মন্টু! প্রতিশোধ নেওয়ার নাম করে এই নাক-উঁচু মেয়েটাকে তোদের আম্মু বানিয়ে দিচ্ছি! হুঁহ, এমনি এমনি কি বলি অরণ্য দ্য গ্রেট বয় সব পারে। '
সুবহা তখনই নড়েচড়ে উঠেছে। অরণ্য ভাবল, ওর ঘুম ভেঙে যাবে, তাই কথা না বলে চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়েছে সুবহার পাশে।
————
ভোরের আলো ফুটতেই ঘুম ভেঙে গেছে সুবহার। পিটপিট নয়নজোড়া মেলে তাকাতেই অরণ্যের ঘুমন্ত মুখশ্রী নজরে আসল তার। পরম যত্নে নিজের বাহুডোরে সুবহাকে আগলে রেখেছে সে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল সুবহার। টুপ করে একটা চুমু দিল অরণ্যের ঠোঁটে। সুবহার চুমু দিতে দেরি হয়েছে, অরণ্যের চোখ খুলে তাকাতে দেরি হয়নি। অরণ্য জেগে উঠেছে বুঝতেই চোখ বন্ধ করে নিয়েছে সুবহা। অরণ্য হাসল, সুবহার মুখের দিকে তাকিয়ে ওর বন্ধ করা দুই চোখের পাতায় চুমু দিয়ে বলল,
' কি করলে এটা?'
ধরা পড়ে গেছে বুঝতে পেরে সুবহা চোখ খুলে তাকিয়েছে, অরণ্যের গলা জড়িয়ে ধরে ঠোঁট কামড়ে হেসে বলছে —--
'খেলাম।'
'কি খেলে?'
' স্ট্রবেরি।'
অরণ্য ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কন্ঠে বলছে সুবহাকে।
' লুচ্চামি হচ্ছে আমার সাথে?'
' আপনার থেকেই তো শিখেছি।'
' আর কি কি শিখলে প্র্যাকটিস করে দেখাও তো দেখি।'
সুবহা লজ্জা পেল এবার। অরণ্যের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে করে বলল —--
' ছাড়ুন তো!'
অরণ্য আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলছে সুবহাকে।
' উঁহু, আমিও খাবো।'
সুবহার রাগ হলো এবার, অরণ্যের বুকে ঘুষি মেরে বলল ওকে,
' কি খাবেন?'
' তোমাকে।'
সুবহা রেগে তাকিয়েছে অরণ্যের দিকে, নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে বারবার। অরণ্য ওর মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরেছে নিজের বুকে, মাথায় বিলি কেটে আদুরে কন্ঠে বলছে সুবহাকে।
' আরেকটু ঘুমাও না লাভবার্ড, আমার উঠতে ইচ্ছে করছে না।'
সুবহারও একই অবস্থা, ঘুম এখনো কাটেনি ওর। অরণ্যের বুকে মাথা রেখে চুপটি করে শুয়ে পড়েছে আবারও। সুবহা ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝে, ওর মাথাটা আস্তে করে বালিশে রেখে বিছানা থেকে উঠে চলে গেছে অরণ্য।
————
আনহা আজকে ছাদে এসেছে কতদিন পর নিজের রুম থেকে বেরিয়েছে জানা নেই ওর। কিরণ তখন ছাদেই ছিলো, গাড়ি নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে কিয়ান ছাদে দাঁড়িয়ে ওর চলে যাওয়া গাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে কিরণ। হঠাৎই চোখ পড়ল আনহার দিকে। ভালো করে দেখল ওকে, আনহা অনেকটা পরিবর্তন হয়ে গেছে আগের থেকে। সব সময় পরিপাটি হয়ে থাকা আনহা এখন কেমন অগুছালো হয়ে গেছে। নিজের যত্ন নিতে ভুলে গেছে সে। সুবহার আম্মুর মৃত্যুর কারণ যে আনহাই এটা কিরণের বুঝতে খুব একটা সময় লাগেনি। অরণ্য সেদিন কল দিয়ে এটা সেটা জানতে চাইছিল কিরণের থেকে। ওর মাথায় এসেছিল তখন সবটার পিছনে একটু হলেও আনহা আছে। কিন্তু আজকে কেমন মায়া হচ্ছে ওর জন্য এতো কিছু তো করলো অরণ্যের জন্যই তাকে কি পেয়েছে? ভালোবাসার জন্য মানুষ কি না কি করতে পারে এটা আনহাকে দেখলেই বুঝা যায়। আনহা এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে কিরণের মুখোমুখি। কিরণ বড় একটা শ্বাস ফেলে বলল আনহাকে।
' নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ কেন আনহা আপু? '
আনহা কষ্ট করে মুখে এক হাসি টানলো মুখে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ছাদের রেলিঙে হাত রেখে, কিরণের দিকে না তাকিয়েই বলল —--
' আমি কষ্ট পাওয়ারই যোগ্য। আমার কথা তোকে ভাবতে হবে না কিরণ। তোদের ম্যারিড লাইফ কেমন যাচ্ছে সেটা বল।'
' কথা কাটালে বুঝি?'
' না তো।'
কিরণ নিজেও গিয়ে আনহার পাশে দাঁড়িয়েছে, ওর দিকে তাকিয়ে বলছে —--
' সবকিছু সবার ভাগ্যে থাকে না আনহা আপু। অতীত ভুলে নতুন করে নিজের জীবন সাজাতে তো ক্ষতি নেই।'
' অতীতের কিছুই আমি মনে রাখিনি কিরণ। নতুন করে জীবন সাজানোর কথাও ভাবতে পারি না। '
কিরণ বুঝল, আনহাকে বুঝিয়ে লাভ নেই ওর। আনহা মনে মনে ঠিক করেই নিয়েছে, সে নিজেকে কষ্ট দেবে। কিরণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, আনহার দিকে তাকিয়ে। চলে যাবে বলে পা বাড়িয়ে, আবার কী যেন মনে করে তাকালো আনহার দিকে বলল ওকে।
' তুমি কী জানো আনহা আপু, ভাইয়া আর সুবহার বেবি আসতে চলেছে?'
' জানি।'
' তুমি যার জন্য এতো কিছু করছ, নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ সে তো ভালো আছে, তার বউ-সংসার নিয়ে। তাহলে তুমি কেন নিজের জীবন গুছিয়ে নিচ্ছ না? '
আনহা নিশ্চুপ রইল। কিরণের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল ওকে —--
' তুই এতো বুঝদার হলি কবে কিরণ?'
আনহার কথা শুনে হেসে বলছে কিরণ —--
' বিয়ে হয়েছে, দুই দিন পর তোমার ভাইপো-ভাইজির আম্মু হব এইটুকু বুঝ না থাকলে হয়?'
আনহা হেসে উঠল কিরণের কথা শুনে। এই মেয়েটাকে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে আনহা, অরণ্যের বোন বলে ওকে একটু বেশিই কেয়ার করত। এদিকে সুবহাকে সারাজীবন হিংসা করে এসেছে ওর ভালো দেখলে অকারণেই রাগ হতো আনহার। এখন এসব ভাবলেও খারাপ লাগে, নিজের ওপর নিজেরই রাগ হয় ওর। কিরণ চলে গেছে, আনহার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে। আনহা এখনও দাঁড়িয়ে আছে ছাদে, খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভেবে চলেছে সে।
————
চোখ খুলে আশেপাশে তাকিয়ে অরণ্যকে খুঁজলো সুবহা। রাগ হলো এবার, ওকে ঘুমোতে বলে অরণ্য কোথায় চলে গেলো? সুবহা উঠে বসেছে, মেঝেতে পা রাখতেই কিছু একটা পায়ে ঠেকলো ওর। মাথাটা নিচু করে মেঝের দিকে তাকাতেই নিচে পড়ে থাকা রঙ বেরঙের শখানেক বেলুন চোখে পড়ল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে চোখ যেতেই আয়নায় লাগানো লাভ আকৃতির কাটা রঙিন কাগজগুলো দেখতে পেলো। সুবহা উঠে গিয়ে একটা কাগজ হাতে তুলে নিলো। সুন্দর করে লেখা সেখানে।
‘ গুড মর্নিং লাভবার্ড। '
অন্য কাগজ গুলোতেও চোখ বুলালো একেকটাতে একেক রকম কথা লিখে রেখেছে কেউ। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো সুবহার। বুঝতে বাকি নেই, এসব অরণ্যের কাজ।
ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকবে, তখনই বিছানায় রাখা শপিং ব্যাগটার দিকে চোখ গেলো ওর।কাছে গিয়ে ব্যাগের ভিতরে কি রাখা আছে দেখতে চাইলো। সুন্দর একটা পার্পেল কালারের শাড়িতে চোখ আটকে গেলো। আবারও আনমনে হাসল সুবহা। অরণ্যের কাজগুলো ভালোই লাগছে ওর।এই যে, সুবহা প্রেগন্যান্ট শুনার পর থেকেই ওর প্রতি অরণ্যের কেয়ার বেড়ে গেছে আগের থেকে অনেকটা।
অরণ্যের আনা সেই শাড়িটা পড়েছে সুবহা। আজকে অকারণেই ওর সাজতে ইচ্ছে করছে। সুন্দর করে রেডি হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে সে। ড্রয়িংরুমটা কেমন অন্ধকার হয়ে আছে। অরণ্যই বা গেলো কোথায়? অরণ্যকে পরে খুঁজবে আগে ভাবলো রুমের লাইট জ্বালানো দরকার। সুইচবোর্ডটা খুঁজে লাইট অন করা মাত্রই কারো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো সুবহার কানে। পটাপট মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়েছে সেদিকে। অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে সুবহার সামনে, হাঁটু গেড়ে ওর সামনে বসে হাতে থাকা বড় একটা গোলাপ ফুলের তোড়া এগিয়ে দিয়ে বলছে সুবহাকে—--
' হ্যাপি বার্থডে আমার ডাউনলোড না হওয়া সন্টু মন্টুদের আম্মু।'
অরণ্য সুবহাকে উইশ করতেই একে একে কিয়ান, কিরণ, আদ্রীশ সবাই এসে দাঁড়িয়েছে অরণ্যের পিছনে। একসাথে সবাই মিলে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে সুবহাকে। খুশিতে সুবহার কান্না চলে আসবে এবার। ওর তো মনেই ছিল না নিজের জন্মদিনের কথা। সকাল থেকে তাহলে এত আয়োজন ওর জন্যই করেছে অরণ্য! বেশি কিছু ভাবলো না সুবহা, এগিয়ে গিয়ে অরণ্যের হাতে থাকা ফুলের তোড়াটা হাতে তুলে নিলো সে। অরণ্য উঠে দাঁড়িয়ে বুকে টেনে নিলো সুবহাকে, সুবহাও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অরণ্যকে। মুখ তুলে তাকাতেই ওর কপালে চুমু দিলো অরণ্য। কিয়ান এসব দেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে, অরণ্যকে বকুনি দিয়ে বলছে বিড়বিড় করে—--
'এই ছাগলের বুদ্ধি হবে না কোনোদিন, বউয়ের বড় ভাই সামনে দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পাচ্ছে না?'
কিরণের কানে কথাটা যেতেই দ্রুত কিয়ানের থেকে সরে গেলো ও। হাতটা ছাড়িয়ে নিয়েছে তখনই, মুখ ভেংচি দেখিয়ে বলছে কিয়ানকে—--
'আপনি তাহলে ভাইয়ার সামনে আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরেছেন কেন?'
কিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছে কিরণের দিকে। মাঝেমধ্যে কিরণের বাচ্চামিতে বিরক্ত হয় কিয়ান, এখনও মুখের উপর কথা বলাটা ভালো লাগল না ওর। তবুও কথা না বাড়িয়ে চুপ করেই রইল। কিরণের হাত ধরে টেনে নিয়ে আসল নিজের কাছে।
————
সুবহার জন্মদিন, তাই দুই বাড়ির বাকিরাও এসেছেন এখানে। সুবহার আব্বুও এসেছেন। সোফায় বসে থাকা সুবহার ঠিক পাশটায় বসে আছেন তিনি। কপালে চুমু দিয়ে বলছেন মেয়েকে।
'শুভ জন্মদিন প্রিন্সেস।'
সুবহা হেসে ধন্যবাদ জানিয়েছে বাবাকে। সবাই মিলে হৈ-হুল্লোড় করে পালন করেছে সুবহার জন্মদিন। অরণ্য আর বাকিরা সবাই দামী দামী গিফট নিয়ে এসেছেন সুবহার জন্য। সবাই থাকলেও আনহা আর মিহি নেই দেখে মন খারাপ হয়ে গেলো সুবহার। কোনো কারণে সুবহার মন খারাপ হয়েছে বুঝতে পেরে অরণ্য ওর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে এটা সেটা বলে হাসিয়ে দিয়েছে সুবহাকে।সুবহা এক ধ্যায়ে অরণ্যের দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে মনে মনে —' এই মানুষটার প্রতিই কিনা ওর এত রাগ ছিলো একসময়?' সময় সবকিছুই পালটে দিয়েছে কীভাবে। রাগ সরে গিয়ে অরণ্যের প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টি হয়েছে ওর। এবারের জন্মদিনটাও সুবহার মনে থাকবে সবসময়।
————
সময় কেটে গেছে অনেকটা। সুবহার প্রেগনেন্সির এখন ছয় মাস চলছে। মিহি আবারও এসেছে এখানে, কোনো সমস্যা হলেই এসে দেখে যায় সুবহাকে। অরণ্য আর বাকিরা খুব খেয়াল রাখে ওর। সবার মধ্যে থেকেও নিজের আম্মুকে খুব মিস করে সুবহা। এই সময়টাতে ওর আম্মুকে খুব করে পাশে চাইছিল সে। তবে অরণ্যের আম্মু আর সুবহার চাচি ওর আম্মুর অভাবটা বুঝতে দেন না। যখনই মায়ের কথা ভেবে মন খারাপ করে, ওনারা এসে সামলে নেন। বেবি আসবে বলে অরণ্য আর সুবহা যতটা এক্সসাইটেড, তার থেকেও বেশি এক্সসাইটেড অরণ্যের আম্মু আর বাড়ির বাকিরা। সুবহার ভালোই লাগে ওদের এমন কেয়ার। সুবহার আব্বু জাহিদ হোসেনের শরীরটা খুব খারাপ, মেয়েকে বারবার দেখতে ইচ্ছে করছিলো। বাবার অসুস্থতার জন্যই বাড়িতে এসেছিল সুবহা। এখানে আসার পর আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না ওর। সাপ্তাহখানেক হলো সুবহা এখানেই আছে।
অরণ্য প্রতিদিনই এসে নিয়ে যেতে চায় সুবহাকে। যেতে চায় না বলে রাগ দেখিয়ে নিজেই ফিরে যায়। অরণ্যের এমন আচরণে মাঝেমধ্যে কান্না পায় সুবহার। কিন্তু মন খারাপ করেও বেশিক্ষণ থাকতে পারে না, অরণ্য ঠিক কিছু না কিছু বলে সুবহার মন খারাপ তাড়িয়ে দেয়, ভালোবেসে বুকে টেনে নেয় নিজের।
অরণ্য মাত্রই গেলো, এসেছিল সুবহার আব্বুকে দেখতে। আগের থেকে এখন অনেকটা সুস্থ তিনি। তাই নিয়ে যেতে চেয়েছিল সুবহাকে। বউ তার বায়না ধরেছে, আজকের দিনটাও এখানে থাকতে চায় সে। বাড়িতে একা একা বসে থাকতে নাকি বিরক্ত লাগে তার। কিরণও চাইছিল সুবহা থাকুক, ভাইকে বুঝিয়ে বলেছে সে। খেয়াল রাখবে সুবহার। অরণ্য আর মানা করেনি, চলে গেছে নিজের কাজে। যাওয়ার আগে বারবার বলে গেছে কিরণকে, সুবহার খেয়াল রাখতে। কিরণও প্রতিবারই মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়েছে ভাইয়ের কথায়।
————
সকাল পেরিয়ে বিকেল হয়েছে, ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে বারবার মেয়ে বউমাকে ডেকে চলেছেন কিয়ানের আম্মু। আনহা আজকে রুম থেকে বেরিয়েছে, সুবহার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো ওকে—--‘কেমন আছিস সুবহা?’
বোনের হাসির উত্তরে হাসল সুবহাও, উত্তর দিলো আনহার কথার।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আনহার আম্মু তাকিয়ে আছেন মেয়েদের দিকে। দুই বোনের সম্পর্কটা ভালো হয়েছে দেখে মনে মনে খুশি হলেন তিনি। আনহা খাবেনা বলে চলে যাচ্ছিলো নিজের রুমে। সুবহারও খেতে ইচ্ছে করছে না আপাতত। কিরণকে বলে সেও নিজের রুমে চলে যাচ্ছিলো। আনহা আর সুবহা পাশাপাশিই ছিল। কয়েকটা সিঁড়ি উঠতেই টের পেলো সুবহা মাথাটা প্রচন্ড ঘুরছে ওর। ব্যালেন্স হারিয়ে সুবহা পড়ে যেতে নিচ্ছিলো, চাইলেও তাকে আটকাতে পারেনি আনহা। চিৎকার দিয়ে উঠেছে সে। সুবহাও চিৎকার দিয়ে পেটে হাত চেপে ধরেছে। তীব্র ব্যথায় চোখ বন্ধ করে কান্না করে দিয়েছে। কিয়ানরা সবাই ছুটে এসেছেন সুবহার কাছে। আনহা নেমে এসে ধরতে যাচ্ছিলো ওকে, তখনই কিরণ এসে আনহার হাতটা ধরে নিয়েছে। মেজাজ দেখিয়ে বলে উঠেছে ওকে।
‘কেন করলে তুমি এটা?’
‘কি...কি করেছি আমি?’
‘কি করেছি মানে? এত হিংসা তোমার আনহা আপু? সুবহা প্রেগন্যান্ট, তুমি জানো না? ফেলে দিলে কেন ওকে? আন্টির মতো কি সুবহাকে মেরে ফেলতে চাইছো তুমি?’
কিরণের কথাটা শুনেই কয়েক পা পিছিয়ে গেছে আনহা। মেঝেতে বসে থাকা ওর আম্মু চোখ মুখ শক্ত করে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে। মাত্রই কি শুনলেন তিনি? কী বলল কিরণ? এগুলো কি সত্যি? মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে ওনার, কান্না পাচ্ছে কেন যেন। মাথায় হাত দিয়ে দপ করে বসে পড়েছেন মেঝেতে। কিয়ানের কানে যায়নি কিছুই, সে চিন্তিত সুবহাকে নিয়ে।
আনহা কথা না বলে, হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে কিরণের দিকে। ওকে অবিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে, জানে। তাই বলে এভাবে বলবে? আজকে তো আনহা কিছুই করেনি। সুবহার পড়ে যাওয়ার জন্য তো ও দায়ী নয়।
কিয়ান চিন্তিত হয়ে বারবার ডাকছিলো বোনকে। পেটে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে সুবহা, কথা বলার বদলে কাঁদছিল মেয়েটা। কিয়ানের মনে হলো, সুবহাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া দরকার। দেরি না করে কোলে তুলে নিয়েছে বোনকে, বেরিয়ে গেছে হসপিটালের উদ্দেশ্যে। কিরণও আনহাকে রেখে চলে গেছে কিয়ানের পিছু পিছু। অরণ্য এগুলো জানলে কি হবে, ভেবেই গলা শুকিয়ে আসছে কিরণের।
আনহার আম্মু উঠে দাঁড়িয়েছেন। ধীর পায়ে হেঁটে এসে সামনে দাঁড়িয়েছেন মেয়ের। আনহার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। মাকে কিছু বলতে যাবে, তখনই গালে মায়ের শক্তপোক্ত হাতের চড় পড়ল ওর।