অরণ্যের লালচে ঠোঁটে আঙুল ছুঁয়ে মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলছে সুবহা।
“ মাই রেড স্টবেরি। ”
তৎক্ষণাৎ চোখ খুলে তাকালো অরণ্য। অরণ্য সুবহার কথা শুনেছে, বোঝা মাত্রই সে হাতটা সরিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো। ঠোঁট কামড়ে হাসল অরণ্য। সুবহার পিঠের এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে হাত বুলিয়ে দিলো সেখানে। ব্যথা পেলো সুবহা, কান্না করার ভান ধরে বলল অরণ্যকে—--
“লাগছে আমার।”
সুবহার কান্না করার ধরন দেখে হাসলো অরণ্য। অরণ্যের এই হাসি সহ্য হলো না সুবহার, বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠলো অরণ্যকে—--
“আমার কান্না আপনার ভালো লাগে? আমি কান্না করলে আপনি খুশি হন!”
“নট অলওয়েজ।”
“মানে?”
সুবহার কথার উত্তর দিবে তখনই ফোনে কল আসল অরণ্যের। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো মিহি কল দিয়েছে। রিসিভ করল না দিলো সে। ততক্ষণে রাগে সুবহা বিছানা ছেড়ে উঠে চলে যাচ্ছিলো সেখান থেকে। অরণ্য উঠে বসল, ফোনের স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সুবহার দিকে তাকালো। সুবহার ভিতু ভিতু চাহনি দেখে হাসি পেলো তার। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল অরণ্য—--
“ লাভবার্ড, কাছে এসো।”
নাক ফুলিয়ে রেগে উত্তর দিলো সুবহা।
“আসবো না।”
“ফাইন, আমিও তাহলে মানেটা বুঝাবো না।”
সুবহা কথাটা শুনে এগিয়ে আসলো অরণ্যের কাছে। বউকে কাছে পাওয়া মাত্রই তার হাত টেনে নিজের কোলে বসালো তাকে। সুবহার গোলাপি ঠোঁটে টুপ করে একটা চুমু দিলো অরণ্য। সুবহা বিরক্ত হয়ে উঠে যেতে চাইলে অরণ্য তার কানের কাছে গিয়ে হিসহিসিয়ে বলল —--
“আমার দেওয়া ভালোবাসায় যন্ত্রণায় যখন তুমি কাঁদো, তখন আমার ভালো লাগে! গভীর রাতে তোমার অস্পষ্ট কণ্ঠে আমার নামটা শুনতে বেশ লাগে।”
অরণ্যের কথা কানে যেতেই লজ্জায় চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে সুবহার। কী বলবে বুঝতে না পেরে মুখ লুকিয়েছে অরণ্যের বুকে। অরণ্য হাসলো তার লজ্জাবতীকে দেখে। কোলে তুলে নিয়ে গেলো ওয়াশরুমের দিকে।
———
সুবহাকে রুমে বসিয়ে রেখে অরণ্য নিচে গিয়েছে, সার্ভেন্টকে বলেছে সুবহাকে এনে খাবার দিয়ে যেতে। যাওয়ার আগে বারবার বলে দিয়েছে সুবহা যেন নিচে না নামে।
————
ড্রয়িং রুমে পাতানো সোফায় বসে আছে মিহি আর আদ্রীশ। পাশেই মিহির কাজিন রবিন, সে আবার এখানকার থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি। মিহি আর আদ্রীশ পাশাপাশি বসে আছে ঠিকই, তবে কেউই কারো দিকে তাকাচ্ছে না, দুজনেই অপেক্ষা করছে অরণ্যের জন্য। মিহি ল্যাপটপ হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখছে। আদ্রীশ তখন চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে। মিহি বুঝতে পারলেও চুপ করেই আছে, মন দিয়ে নিজের কাজ করছে।মাঝেমধ্যে আবার রবিনের সাথে এটা সেটা নিয়ে কথা বলছে। আদ্রীশের ভালো লাগলো না মিহির এমন আচরণ। চঞ্চল মিহি হুট করেই এতটা গম্ভীর হয়ে যাবে ভাবনাতেও ছিলো না আদ্রীশের। পরক্ষণেই আবার ভাবছে আদ্রীশ—মিহির এই পরিবর্তনের কারণ তো সে-ই। অবাক হচ্ছে কেন? আনহা যেভাবে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছে তাকে, ঠিক তেমন করেই আদ্রীশ ফিরিয়ে দিয়েছে মিহিকে। একবার মিহির জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ভাবল আদ্রীশ। মিহির অভিমান করাটা স্বাভাবিক বুঝতে পারলেও কিছু না বলে চুপ রইলো সে।
অরণ্য এসে বসেছে মিহির মুখোমুখি। মিহি তখন ল্যাপটপটা অরণ্যের দিকে ঘুরিয়েছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রাখতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো সে। বিস্ময় নিয়ে তাকালো মিহির দিকে। চোখের ইশারায় বুঝালো অরণ্য—যা দেখছে, তা সত্যি কিনা। মিহি হয়তো বুঝল অরণ্যের চোখের ভাষা, বলে উঠলো সে—--
“অবাক হলি? আমিও হয়েছিলাম! তুই যা দেখছিস, সেটাই সত্যি।”
অরণ্য আবারও ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলো। স্পষ্ট বোঝা না গেলেও দেখা যাচ্ছে ভালো করেই, আনহার মতো একটা মেয়ে কারোর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে যাচ্ছে তার সাথে। কিরণের মুখেও অরণ্য শুনেছিলো—সুবহার আম্মুর যেদিন এক্সিডেন্ট হলো, সেদিন কিরণও দেখেছিলো আনহাকে। বুঝতে বাকি রইলো না অরণ্যের, তার ভাবনাই সত্যি। হসপিটালে আনহার ওমন ভয়ার্ত মুখশ্রী দেখেই বুঝে নিয়েছিল অরণ্য সবকিছুর পিছনে কিছুটা হলেও আনহা আছে। সুবহার আম্মুকে যে গাড়িটা ধাক্কা মেরেছিলো, ওই গাড়িতে ছিলো আনহাও। রবিন তখনই বলল ওই গাড়িটা ছিলো রাইয়ানের। অবাকের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছালো অরণ্য। আনহা আর রাইয়ান মিলে এসব করেছে? কিন্তু গাড়িটা তো ধাক্কা মারতে এসেছিলো কিরণকে! রাইয়ান কি তবে কিরণের ক্ষতি করে অরণ্যের থেকে প্রতিশোধ নিতে চাইছিল? আনহাও তাকে সাহায্য করেছে এই কাজে। হাত দুটো আপনা আপনি মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো অরণ্যের, তিরতির করে রাগ বেড়ে গেলো তার। মিহি তখন অরণ্যকে ডাকলো—--
“অরণ্য!”
ধ্যান ভাঙলো অরণ্যের। নিজেকে স্বাভাবিক করে তাকাল মিহির দিকে। বিস্মিত হয়ে বলল তখন—--
“আনহা এসব করেছে? আই কান্ট বিলিভ দিস।”
“আনহা একা নয়, আনহা আর রাইয়ান দুজন মিলে এসব করেছে।”
আনহার নামটা শোনা মাত্রই ভ্রু কুঁচকে মিহির দিকে তাকালো আদ্রীশ। সবার কথা বলার মাঝখানেই বলে উঠল—--
“মানে, আনহা এসব করেছে মানে কী? ওই মেয়েটার কি মুখ দেখা যাচ্ছে?”
মিহি রেগে তাকিয়ে বলল আদ্রীশকে—--
“তোর কি মনে হচ্ছে আমি এ.আই দিয়ে এই মিথ্যে ভিডিওটা বানিয়ে এনেছি?”
আদ্রীশ চোখ বন্ধ করে শ্বাস ছাড়ল। মিহিকে কিছু বলতে যাবে, তখনই মিহি উঠে দাঁড়িয়ে অরণ্যকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো।
“দেখ অরণ্য, তুই হেল্প চেয়েছিলি, আমি যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছি। এখন তোরা আমার কথা বিশ্বাস করবি কি না, এটা তোদের ব্যাপার। আমরা যাচ্ছি।”
মিহি চলে যাচ্ছিলো, পিছু পিছু গিয়েছে ওর কাজিনও। এদিকে অকারণেই রাগ হচ্ছে আদ্রীশের, মিহির সাথে ছেলেটাকে দেখে ভেতরটা জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে ওর। না পারছে দেখতে, না পারছে সইতে।
অরণ্য উঠে দাঁড়িয়েছে। আদ্রীশের রাগান্বিত চেহারার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলছে তাকে—--
“বাবাহ! আমার ভোলাবালা চ্যালা কালো মানিক প্রেমে পড়েছে।”
আদ্রীশ কথা বলল না কোনো, চুপচাপ বেরিয়ে গেলো অরণ্যের ফ্ল্যাট থেকে। আদ্রীশের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হাসছে অরণ্য। দেরি করলো না অরণ্য, তাকেও এবার বাসায় ফিরতে হবে। কিরণ সকাল থেকেই ফোন দিয়ে যাচ্ছে একের পর এক এবার না ফিরলে এখানে এসেই ঝামেলা বাধাবে অরণ্যের সাথে।
————
খাটের সাথে মাথা ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে আছে আনহা। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, গায়ের ওড়নাটা পড়ে আছে মেঝেতে। পুরো রুমের জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে এদিক-সেদিকে। যে কেউ দেখলে বলে দিবে বহুদিন হলো নিজের যত্ন নেয় না সে। আনহার আম্মু এসেছেন মেয়ের জন্য খাবার নিয়ে। চোখের সামনে মেয়েটাকে এভাবে শেষ হয়ে যেতে দেখছেন, তাঁর কষ্ট কম হচ্ছে না। কিন্তু আনহার এমন আচরণের কারণ অজানা ওনার কাছে। সেলিনা বেগমের মৃত্যুর পর থেকেই এমন,নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিয়েছে সবকিছু থেকে, রুম থেকে বের হয় না এখন আর। একটা সময় সারাদিন বাইরে সময় কাটানো আনহা এখন নিজেকে বন্দী করে নিয়েছে চার দেয়ালের মধ্যে। আনহার আম্মু ওর কাছে গিয়ে বসলেন, কাঁধে হাত দিয়ে বললেন—--
“কি হয়েছে মা তোর? কী সমস্যা হয়েছে? আমাকে বল, নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছিস কেন?”
“অনুশোচনা হচ্ছে আম্মু। অনুশোচনা বোধ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে আমাকে।”
“কিসের জন্য অনুশোচনা হচ্ছে? কী করেছিস তুই?”
মায়ের কথা কানে আসতেই ভয় পেলো আনহা, ঘামতে শুরু করেছে সে। আমতা আমতা করে উত্তর দিলো—--
“যা..যাও তো আম্মু, আমার কিছুই হয়নি। কিছু করিনি আমি।”
কথা বাড়ালেন না আনহার আম্মু, চলে গেলেন সেখান থেকে। আনহা দ্রুত গিয়ে দরজাটা আটকে দিলো। কান্না পাচ্ছে ওর।আনহা ভুল করেছে,মায়ের মতো বড় আম্মুকে মে/রে ফেলেছে সে। বারবার কানে বাজে ওনার ডাক। বাহিরে গেলেই ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়ে যেদিকে তাকায় ওনাকে দেখতে পায় শুধু।মাঝেমধ্যে নিজেকে প্রশ্ন করে আনহা কী হলো এত কিছু করে? আনহা কি পেয়েছে অরণ্যকে? সেই তো অরণ্য সংসার করছে সুবহার সাথে। তাদের ভালোবাসায় ভরা সুন্দর একটা সংসার হয়েছে। দুইদিন পর হয়তো ঘর আলো করে রাজকন্যা বা রাজপুত্র আসবে। আনহা কি পেলো? কিছুই পায়নি। ও তো অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে সবার জন্য। যখনই নিজের করা ভুলের কথা মনে পড়ে, আনহার ইচ্ছে করে নিজেকে শেষ করে দিতে কিন্তু পারে না। হাসি পায় তখনই নিজের উপরেই, নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ক্ষমতা টুকুও নেই ওর মধ্যে।
————
সময় পেরিয়ে গেছে দুই তিন দিনের মতো,কিরণ আর কিয়ান দুজনের বাড়িতেই বিয়ের আয়োজন চলছে। কিয়ানের রাগীনি রাগ করেছিলো, অনেক চেষ্টা করে তার রাগ ভাঙিয়েছে কিয়ান। নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে সে, কাজ আর অফিস নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে কিরণকে সময়ই দিতে পারেনি। সুবহা সেদিন অরণ্যকে সবটা বুঝিয়ে বলেছিল, অরণ্যেরও মনে হলো এবার কিরণ আর কিয়ানের বিয়ে দেওয়া উচিত। বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে, কিয়ানের পরিবারের সবার সঙ্গেও কথা বলেছিল সে। কেউই আপত্তি করেনি। বিয়েটা তো হওয়ার কথা ছিল অনেক আগেই মাঝখানে এত কিছু হয়ে যাবে, তা কল্পনাতেও ছিল না কারও।
বাড়িতে বিয়ে মেহমানদের আনাগোনা চলছে, সকাল থেকেই শাশুড়ির সাথে হাতে হাতে কাজ করছে সুবহা। অবাক হচ্ছেন জাহানারা সুলতানা, এই মেয়েটাই কিনা একসময় সারাদিন অফিস সামলাতো, বাইরে পড়াশোনা করতো! দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি পড়াশোনা, কাজ—সব কিছুতেই পারফেক্ট। এত ভালো বউমাকে প্রথমে তিনি কত কিছু শুনিয়েছেন, ভাবলেই নিজের ওপর রাগ হয় জাহানারা সুলতানার।
অরণ্য এসে কিচেনের দরজার সামনে উঁকিঝুঁকি মারছে। বিষয়টা চোখে পড়তেই মুচকি হেসে কিচেন থেকে বেরিয়ে গেলেন অরণ্যের আম্মু। অরণ্য তখনই সুযোগ বুঝে রান্নাঘরে ঢুকে পড়লো। কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে গিন্নিদের মতো কাজ করছে সুবহা। মাঝেমধ্যে অরণ্যের এই ভেবে আনন্দ হয়, এই অতি সুন্দরী মেয়েটি গুণবতী মেয়েটি তার বউ। কাছে এসে সুবহাকে হুট করে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো অরণ্য, মুখ ডুবালো সুবহার ঘাড়ে। বিরক্ত হয়ে গভীর শ্বাস ফেলে বলল সুবহা।
“ছাড়বেন আমাকে?”
“ছাড়ব বলে তো ধরিনি।”
“কেন ধরেছেন? মুড এসেছে আবার?”
“অরণ্য অলটাইম মুডে থাকে। দিনের বেলা তাই প্র্যাকটিক্যালি কিছু করছি না।”
সুবহা দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠল অরণ্যকে।
“ছাড়ুন আমাকে, নির্লজ্জ লোক!”
“একটা কিউট গুলুমুলু মেয়েবাবু দাও, ছেড়ে দিব।”
অরণ্যের কথা শুনে হেসে ফেললো সুবহা। এই কথা তার মুখে নতুন নয়, এই কয়েকদিনে অরণ্য এই আবদার কতবার করেছে, তার হিসেব নেই। অরণ্যের এমন কথার উত্তরে কি বলবে বুঝে পায় না সুবহা, চুপ করেই থাকে তখন।
কিছু একটা নিতে কিচেনে এসেছে কিরণ। অরণ্য আর সুবহাকে এভাবে দেখে গলা খাকাড়ি দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল—--
“আমি কিছুই দেখিনি, তোমরা চালিয়ে যাও।”
সুবহার কানে কথাটা যেতেই সে অরণ্যকে ঠেলে দূরে সরাতে চাইল, কিন্তু অরণ্য এক চুলও নড়লো না। ভ্রু কুঁচকে কিরণের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—--
“যা গিয়ে বরের মাথা খা, আমাদের বিরক্ত করিস না।”
কিরণ হাঁ করে অরণ্য আর সুবহার দিকে তাকিয়ে রইলো। অরণ্য তখন সুবহাকে ছেড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে ঝুড়ি থেকে একটা আপেল তুলে তাতে কামড় বসালো। কিরণের দিকে চোখ গরম করে তাকাতেই মুখ ভেংচি দেখিয়ে চলে গেলো কিরণ।সুবহাও একই ভাবে অরণ্যের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলে উঠল।
“চলে যান এখান থেকে।”
অরণ্য হেসে বলল সুবহা—--
“লাভবার্ড, কাছে আসো। তুমি দূরে দূরে থাকো বলেই বাবু আসতে এত সময় লাগছে।”
“তাই বলে রান্নাঘরে এমন করবেন! আপনার কি কখনোই কাণ্ডজ্ঞান হবে না?”
“মুড আসলে আমি যেখানে-সেখানে যা-তা করে দিতে পারি, রান্নাঘর আর কি! তুমি, আমি একসাথে একা রুমে আছি মানেই...”
পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই সুবহা ওর মুখ চেপে ধরলো। তখনই অরণ্যের আম্মু এসে পড়লেন কিচেনে। বুঝা মাত্রই সুবহা আর অরণ্য দুজনেই সরে গেলো একে অপরের থেকে। মাকে দেখে অরণ্য বেরিয়ে গেছে সেখান থেকে,কি যেন ভেবে হাসলেন জাহানারা সুলতানা, বউমাকেও চলে যেতে বললেন, বাকিটুকু কাজ তিনিই করে নিবেন।
————
কিরণকে সাজানো হয়েছে বিয়ের সাজে। লাল বেনারসি শাড়ি, গলায়-হাতে সোনার গহনা। এমনিতেই কিরণ সুন্দর,আজ বিয়ের সাজে ওর সৌন্দর্য যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। আয়নার সামনে বসে থাকা কিরণের মাথায় ওড়না টেনে দিলো সুবহা। কিছুটা ঝুঁকে ওর দিকে তাকিয়ে বলল—--
“ননদিনীর রূপের আগুনে আজ আমার ভাইয়া পাগল হবেই!”
কিরণ হাসলো শুধু। কথা না বলে চুপ করে বসে রইলো। জাহানারা সুলতানা রুমে এসেছেন মেয়েকে দেখতে। সুবহা এখনো রেডি হয়নি দেখে তাকে বারবার বলছেন, সে যেন গিয়ে রেডি হয়। সুবহাও শুনল শাশুড়ীর কথা চলে গেলো কিরণের রুম থেকে।
রুমে এসে সুবহার চোখ আটকে গেলো বিছানার উপর রাখা নীল শাড়িতে। পাশে গহনা রাখা আছে, খুব যত্ন করে সবকিছু সাজিয়ে রেখেছে কেউ একজন। সুবহার বুঝতে বাকি নেই, এটা অরণ্যেরই কাজ। ঠিক তখনই পিছন থেকে এসে অরণ্য জড়িয়ে ধরলো সুবহাকে। বিরক্ত হয়ে সে বললো—--
“ছাড়ুন আমাকে।”
অরণ্য সুবহার পিঠের চুল সরিয়ে চুমু দিয়ে বলল—--
“দুষ্টু ইশারায় তুমিই তো আমাকে কাছে ডাকলে,এখন পালাই পালাই করছ কেন?”
সুবহা ঘুরে তাকিয়ে বলল অরণ্যকে—--
“আপনি কি কখনোই ভালো হবেন না?”
“আমি খারাপ ছিলাম কবে?”
“চেঞ্জ করব, বের হোন রুম থেকে।”
“ আমি করিয়ে দিই? বিলিভ মি অন্য কিছু করব না।”
“ দরকার নেই। ”
“ তোমারও তাহলে শাড়ি পড়ে বাইরে যাওয়ারও দরকার নেই, থাকো তুমি এখানে।”
“মানে?”
অরণ্য উত্তর না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সুবহা বাধ্য হয়ে তার কথা শুনলো। নিজের পরিকল্পনায় সফল হয়েছে বুঝতে পেরে রাজ্য জয় করা হাসি দিলো অরণ্য। এগিয়ে এসে বিছানায় রাখা শাড়িটা হাতে তুলে নিলো।
————
ফুলসজ্জিত স্টেজে বরের সাজে বসে আছে কিয়ান। আশেপাশে কিরণের বন্ধুবান্ধব আর পুচকে কাজিনরা সবাই ঘিরে রেখেছে তাকে। বিরক্ত হলেও কিছু বলছে না কিয়ান। ঠিক তখনই সুবহা এলো, কিয়ান চোখের ইশারায় কাছে আসতে বলল বোনকে। সুবহাও শুনল ভাইয়ের কথা, কিয়ানের কাছে এসে বসতেই ফিসফিস সুবহাকে বলল কিয়ান—--
“এই বানরের দলের হাত থেকে আমাকে বাঁচা। এরা এত প্যাঁচাল পারছে, আমার মাথা ধরে গেছে।”
“আজকের দিনটা সহ্য করে নাও ভাইয়া। এমন করলে হবে? মানুষ বলবে বরের ধৈর্যশক্তি কম।
“আর কতো? তাড়াতাড়ি তোর ননদকে নিয়ে আয়, আমি বাড়ি যাবো।”
সুবহা হাঁ করে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কিয়ানের কথা শুনে হাসি পাচ্ছে, ওর হাসি সামলাতে পারলো না সুবহা, কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফিক করে হেসে দিলো সে। দূর থেকে দাঁড়িয়ে সুবহার এই সুন্দর হাসি কেউ একজন মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
————
কিরণকে নিয়ে আসা হয়েছে স্টেজে, পাশাপাশি বসেছে দুইজন। মাঝখানে পাতলা কাপড় টানা হয়েছে। কিয়ান বারবার তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করছে কিরণকে। মনে মনে অনেক খুশি সে এতোদিন পর সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি এসেছে। আজকে কিয়ান তার ভালোবাসাকে নিজের করে পেতে চলেছে । কিরণ মাথা তুলে তাকালো তখন, দেখতে পেলো কিয়ানকে। গোল্ডেন রঙের শেরওয়ানি পড়েছে কিয়ান, মাথায় মুকুট দেওয়াতে একেবারে রাজপুত্রের মতো লাগছে কিয়ানকে। আনমনেই হেসে উঠলো কিরণ।
কাজী সাহেব এসে বিয়ে পড়ালেন। তিন কবুল বলে বিয়ের পবিত্র সম্পর্কে বাঁধা পড়ল কিরণ আর কিয়ান দুজনে। কিরণ একটু সময় নিলেও শেষ পর্যন্ত কবুল বললো। অরণ্য তার বোনকে বুঝিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত্বনা দিলো, বুঝিয়ে বলল কান্নাকাটি না করতে প্রতিদিন গিয়ে অরণ্য দেখা করে আসবে তার সাথে। ভাইয়ের কথা শুনে কিরণও শান্ত হলো।
কিরণের সময় হয়েছে চলে যাওয়ার কান্নাকাটির রোল পড়েছে বাড়িতে। সুবহারও কেমন কষ্ট হচ্ছে, এসেছে পর থেকে বোনের মতো যত্ন করেছে কিরণ তাকে। বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে ভেবে খারাপ লাগছে অনেক। কিন্তু নিজের ভাইয়ের উপরে বিশ্বাস আছে সুবহার যাই হয়ে যাক ভালো রাখবে সে কিরণকে।
অরণ্য কিরণকে হাত ধরে গাড়িতে তুললো। পাশে বসলো কিয়ান। গাড়ির গেটটা শব্দ করে বন্ধ করল অরণ্য, কিয়ানের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো, কিয়ানও চোখ পাকিয়ে তাকালো তার দিকে। কান্নার মাঝেও হাসি পেলো কিরণ আর সুবহার।
গাড়ি ছাড়তেই কিরণ কিয়ানের মাথার চুল টেনে বললো—--
“মেয়েদের মতো তোমাদের এই চুলোচুলি করা কি বন্ধ হবে না?”
“তোমার ভাইকে কিছু বললে না কেন? হুহ, যত দোষ সব কিয়ান ঘোষ!”
কিরণ চুপ করে গেছে কথা বলেনি আর,তবে কিয়ান আর অরণ্যের এই চোখে চোখে ঝগড়া দেখে মনে মনে হাসছে সে।