অন্তরালের প্রণয়িনী

পর্ব - ২১

🟢

অরণ্যরা সবাই বাড়িতে পৌঁছেছে অনেক সময়ই হলো। আসতে আসতে রাত হয়ে গেছে প্রায়। আসার আগে আবার অরণ্য সুবহাকে নিয়ে গিয়েছিল সেই চেনা জায়গায়। খোলামেলা আকাশের নিচে মন ভালো করার মতো সুন্দর পরিবেশ বরাবরই পছন্দ সুবহার। আবারও দুজনে একসাথে গিয়েছিল সেই নদীর পাড়ে। অনেকদিন পর মন খুলে কথা বলেছে দুজনে। পুরোটা সময় সুবহা শুধু দেখে গেছে অরণ্যকে। সে কি তাহলে ভুল বুঝেছিল অরণ্যকে? আনহা নিশ্চয়ই তার ভালোবাসাকে পেতে সেদিন মিথ্যে গল্প শুনিয়েছিল তাকে। মিথ্যে হলেও রাগ করবে না সুবহা। নিজের ভালোবাসাকে পেতে এইটুকু তো করেই মানুষ! অরণ্যের প্রতি সুবহার সব রাগ কোথায় যেন উড়ে গেছে। বারবার মন বলছে তাকে ভালোবাসতে। কেন হচ্ছে এমন? এই উত্তর জানা নেই সুবহার।

বরযাত্রী সবাই বাড়িতে এসে খুঁজছিলেন বর-কনেকে। সম্পর্ক তাদের যেমন, একসাথে কোথাও ঘুরতে যাবে—এটা কারো ধারণাতেও আসেনি। অনেক অপেক্ষার পর দেখা মিলেছে তাদের, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে প্রায়। সুবহা আর অরণ্য দরজার সামনে আসতেই অরণ্যের আম্মু জাহানারা সুলতানা ঝামেলা লাগিয়েছিলেন একটা। কোনোভাবেই ছেলের বিয়ে মেনে নিতে পারছেন না তিনি সুবহার সাথে। অরণ্যের পাশে তিনি দেখতে চেয়েছিলেন আনহাকেই—তা আর হলো কোথায়! কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকবেন, এই মেয়েকেও মেনে নেবেন না বলে ঠিক করেছেন।

মায়ের কাজে বিরক্ত অরণ্য মাথার মুকুটটা কিরণের হাতে দিয়ে মায়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল—--

“তোমার কি নাতি-নাতনি চাই না আম্মু?”

ছেলের এহেন কথায় মেজাজ দেখিয়ে উত্তর দিলেন জাহানারা সুলতানা—--

“তা চাইব না কেন?”

“তাহলে বাংলা সিনেমার রিনা খানের মতো দজ্জাল শাশুড়ি টাইপ ব্যবহার কেন করছো?”

“অরণ্য, মুখ সামলে কথা বলো।”

“এতো রাগ করো না তো আম্মু, দোয়া করো বছর না ঘুরতেই তোমাকে একটা নাতি-নাতনি গিফট করব আমরা।”

ছেলের কথায় দাঁত কটমট করে তাকিয়েছেন জাহানারা সুলতানা। অরণ্য তেমন পাত্তা দিলো না মায়ের রাগের—জানে ভালো করেই এই রাগ বেশিদিন থাকবে না ওনার মনে। অরণ্যকে আপাতত নিজের রুমে যেতে হবে, ফ্রেশ না হলে মাথা ঠান্ডা হচ্ছে না কোনোভাবেই।

যাওয়ার আগে অরণ্য পেছন ফিরে তাকালো, কিরণের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সুবহার দিকে। মেজাজ খারাপ তার এমনিতেই—এতো ঝামেলা, এখানে এসে আবার আরেক কাণ্ড। অরণ্যের আম্মু পথ আটকে বসেছিলেন, তখন বলছিলেন বারবার—

“এই মেয়েকে নিজের ছেলের বউ বলে মানি না আমি।”

সুবহারও তখন মুখের উপর বলে দিতে ইচ্ছে করছিল—“আপনার এই গুণধর ছেলেই পাগল হয়ে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে আমাকে।কিন্তু বলল না কিছুই, মনের কথা মনেই রয়ে গেল তার।

বাড়ির মেহমান সবাই মিলেই অরণ্যের আম্মুর কথার ভুল ধরেছেন, অরণ্যের আব্বুও বকাবকি করেছেন, বুঝিয়ে বলেছেন সুবহাকে রাগ না করতে ওনার কথায়। অরণ্য সুবহার কাছে এসেছে, সুবহা চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে আছে অরণ্যের দিকে। আবারও তাকে কোলে তুলবে,অকারণেই—বুঝে গেছে ভালো করেই। সুবহা চোখ দিয়ে ইশারা করে না করলো অরণ্যকে, কিন্তু কে শুনে কার কথা! সুবহার বারণ না শুনে আবারও এক ঘর লোকের সামনে কোলে তুলে নিলো তাকে, হাঁটতে শুরু করল নিজের রুমের দিকে।

ছোট-বড় সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে তাদের যাওয়ার পানে। কেউ কেউ আবার মিটিমিটি হাসছে আর বলছে—“নিজের বউকেই তো কোলে নিয়েছে, অন্য কাউকে নেয়নি তো।” অবাক হওয়ার কিছুই নেই এতে।

অরণ্য রুমে আসার আগেই এসে হাজির হয়েছে মিহি আর তার দলবল। কিরণ আর আদ্রীশ চুপ করেই দাঁড়িয়ে আছে, তবে বুদ্ধি পুরোটাই কিরণের ছিল। অরণ্য বিরক্ত হলো সবাইকে দেখে, এদিকে সুবহা বারবার অরণ্যকে বলছে তাকে নামিয়ে দিতে। অরণ্য তার প্রতিউত্তরে সুবহার কানের কাছে গিয়ে বলেছে—

“এখন যে এত পালাই পালাই করছ, পরে এমনভাবে ধরব—চাইলেও আর পালাতে পারবে না।”

সুবহা রেগে তাকিয়েছে অরণ্যের দিকে। এদিকে অরণ্য সুবহার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। সুবহাকে রাগাতে পেরে ভালোই লাগছে তার।

অরণ্য আর সুবহার চোখে চোখে কথা বলা লক্ষ্য করল মিহি আর কিরণ দুজনেই একসাথে চিল্লিয়ে বলে উঠলো তখন।

“ টাকা কোথায়?”

অরণ্য তাকালো কিরণদের দিকে ভ্রূ কুঁচকে বলল —--

“ কীসের টাকা? তোদেরকে আমি টাকা দিতে যাব কেন?”

“ ওমা, তুমি বিয়ে করলে আর আমরা কষ্ট করে ফুল দিয়ে বাসরঘরের খাট সাজালাম। তার বকশিশ লাগবে না বুঝি?”

“ রুম আমার,খাট আমার, ফুল কিনেছিস আমার টাকায়। তোদের আমার বকশিশ দিতে যাব কেন?”

এতো সময় কথা বলেছে কিরণ, এবার মিহি চুপ থাকতে পারল না আর। মিহি অরণ্যের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল —--

“ শুন অরণ্য এই চোখে চোখে প্রেম পরে করিস আগে আমাদের টাকা দে।”

“ ডিজিটাল স্টাইলে ভিক্ষা চাইছিস? ”

“ ও তুই যা ভাবিস তাই, আমাদের টাকা দে। ”

অরণ্যের বকবকানিতে বিরক্ত সুবহা অরণ্যের গলা জড়িয়ে ধরা হাতটি দিয়ে মাথার চুল টেনে বলছে।

“ কিপটে কোথাকার! টাকা দিয়ে দিলেই তো হয়ে যায়। ”

“ রুমে যাবে?”

“ তো! আর কত সময় ধরে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকব?”

“ বাহ! লাভবার্ড তুমি তো দেখছি আমার থেকে এক ধাপ এগিয়ে বাসর করবে বলে মরিয়া হয়ে উঠেছে।”

সুবহা দাঁত কিড়মিড় করে তাকিয়েছে অরণ্যের দিকে মাথার চুলে আরও জুড়ে টান দিয়ে বলল —--

“ অসভ্য, নির্লজ্জ, বেহায়া লোক। ”

“ জাস্ট ফর ইউ বেবি।”

সুবহা মুখ সরিয়ে নিলো অন্য দিকে। অরণ্য বুঝালো সবাইকে, ভেতরে যেতে দিলেই টাকা দেবে তাদের। কিরণ যদিও চেনে তার ভাইকে, বারবার মিহিকে বলেছে বিশ্বাস না করতে। কিন্তু মিহি গলে গেছে অরণ্যের কথায়। অরণ্য সুবহাকে রেখে আবারও এসেছে দরজার সামনে। সবাই এবার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে—অরণ্য তাদের টাকা দেবে। কিন্তু অরণ্য কী করল! মুখে হাসি টেনে সবার উদ্দেশে বলল—--

“হাতে থালা নিয়ে সব কয়টা গিয়ে গুলিস্তানের মোড়ে ভিক্ষা কর।”

বলেই অরণ্য মুখের উপর ‘টাস’ করে দরজাটা আটকে দিয়েছে। মিহির চরমভাবে রাগ উঠেছে। দরজায় একটা লাথি মেরে মেজাজ দেখিয়ে বলছে অরণ্যকে—--

“শালা কিপটে! তোর বাসর ঘরের খাট ভেঙে পড়বে, বদ দোয়া দিলাম আমি।”

অরণ্যের কানে গেল কথাটা। দাঁড়িয়েছিল সে দরজার সামনেই। দরজাটা আরেকটু ফাঁক করে অরণ্য বলল—--

“খাট তো আমি এমনিতেই ভাঙবো, তুই আবার বদ দোয়া দিবি কিরে?”

ভাইয়ের এমন কথা শুনে কিরণ চলে গেছে সাথে সাথে। আদ্রীশ মিটিমিটি হাসছে অরণ্যের কথা শুনে। মিহি রেগে কিছু বলতে যাবে, আবারও অরণ্য লাগিয়ে দিল দরজাটা।

———

ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে মাথার ওড়নাটা খুলে নিয়েছে সুবহা। এত ভারী সাজগোছ, বিরক্ত লাগছে তার। অনেকক্ষণ তো হলো, এবার এসব খুলে ফেলা দরকার—এই ভেবে আয়নার সামনে বসেছে। গলার জুয়েলারিগুলো খুলতে পারছে না সুবহা, বিরক্ত হচ্ছে সে। আচমকাই কারো হাতের স্পর্শ লাগলো সুবহার পিঠে। কেঁপে উঠল সে, চমকে তাকালো পিছনের দিকে। অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, মুখে হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে সুবহার দিকে। সুবহা কিছু বলতে গেলে অরণ্য তাকে বসতে বলল আগের মতো। সুবহাও শুনলো অরণ্যের কথা। অরণ্য অতি যত্নে এক এক করে খুলে দিল সুবহার সব গহনা। মাথার ফুলগুলো খুলে দিয়ে ছেড়ে দিল চুল। পিঠ পর্যন্ত এসে সুবহার চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিল অরণ্য। পুরোটা সময় ধরে সুবহা তাকিয়েছিল নিচের দিকে। কী যেন হয়েছে তার! কথা আসছে না মুখ দিয়ে।

হঠাৎই উপলব্ধি করল সে, কেউ তার ঠোঁট ছুঁয়েছে সুবহার নগ্ন পিঠে চোখ বন্ধ করে নিল সুববা সাথে সাথে। ঠোঁটের ছোঁয়া গভীর হলো—তার গলায় এসে মুখ ডোবালো অরণ্য। সুবহার কী হয়েছে বুঝতে পারল না—কেন সে আটকাচ্ছে না অরণ্যকে? এত তাড়াতাড়ি নিজেকে অরণ্যের হাতে সঁপে দেবে না সে। কথাটা ভাবনায় আসতেই সুবহা উঠে দাঁড়ালো দ্রুত। অরণ্য বিরক্ত হলো খুব, ভ্রূ কুঁচকে তাকালো তার দিকে। এ দেখে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠেছে সুবহা। —--

“ কি..কি হচ্ছে এসব?”

অরণ্য এক পা দু পা করে এগিয়ে গেলো সুবহার দিকে কোমর চেপে কাছে নিয়ে আসলো তাকে। দুজন এতোটাই কাছাকাছি একজনের মুখের গরম শ্বাস পড়ছে অন্য জনের মুখে। সুবহা অরণ্যকে সরিয়ে দিতে চাইল নিজের থেকে, ব্যর্থ হলো সে।অরণ্য এবার সুবহার নাকে নাক ঘষে ধরা গলায় বলে উঠলো।

“ আজকের দিনটা আমার হয়ে যাও লাভবার্ড। কথা দিচ্ছি আর জ্বালাবোনা তোমাকে। আজকে পুরো তুমিটাকে ছেড়ে দাও আমার হাতে। ”

সুবহার কি যেন হলো অরণ্যের কথাগুলো কানে বাজছে বারবার। এক অদ্ভুত টান অনুভব করছে অরণ্যের প্রতি। কেন শুনতে ইচ্ছে করছে অরণ্যের কথাগুলো? চোখ বন্ধ করে একটা শ্বাস ছাড়লো সুবহা, নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল অরণ্যকে।

“ সরুন আমি ফ্রেশ হব।”

“ উঁহুঁ আজকে আমি শুনছি না আপনার কথা।”

অরণ্য সুবহার কথা না শুনে এগিয়ে আসছে তার দিকে কি হবে আন্দাজ করতে পেরে সুবহা মুখ চেপে ধরল অরণ্যের। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল সে আবারও—--

“ আমি এক্ষুনি প্রস্তুত নই এসবের জন্য। ”

সুবহার অসহায় চোখের চাহনির কারণ বুঝল অরণ্য, ছেড়ে দিলো তাকে। কাবাড থেকে একটা সুন্দর শাড়ি বের করে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসতে বলল সুবহাকে৷

———

সকালের আলো ফুটেছে চারদিকে, ঘুম ভেঙেছে সুবহার। চোখ খুলে তাকাতেই নিজেকে নতুন একটা জায়গায় আবিষ্কার করল সে। ফুল দিয়ে সাজানো রুমটা দেখে মনে পড়ল—কালকেই তার বিয়ে হয়েছে অরণ্যের সাথে। তার হাত ধরে এসেছে এই বাড়িতে। সুবহা উঠতে যাবে, মনে হলো ভারী কিছু পড়ে আছে তার শরীরের উপরে। তাকিয়ে দেখতে পেলো অরণ্য শুয়ে আছে তার বুকের উপর মাথা রেখে। তাকে দু-হাতে জড়িয়ে রেখেছে শক্ত করে। মনে মনে হাসলো সুবহা। এই লোকটাকে আজকাল এতো ভালো লাগছে কেন? সব রাগ, অভিমান, অভিযোগ দূরে সরিয়ে দিয়ে বারবার তার কাছে যেতে চাইছে কেন সুবহার পাগল মন? সুবহা পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিলো অরণ্যের ঘন চুলের ভাঁজে।

কানে আসল মিহির ডাক। দরজা ধাক্কাচ্ছে আর বলছে বারবার।

“আর কত ঘুমাবি তোরা? উঠ এবার।”

সুবহা তখন ডাকলো অরণ্যকে। চলে যাবে বলে ছুটতে চাইলো তার থেকে, কিন্তু পারলো কোথায়! অরণ্য বিরক্ত হলো, মাথা তুলে প্রথমে সুবহার দিকে তাকিয়ে পরে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বললো—--

“তোদের জ্বালায় কি আমি ঘুমাতেও পারব না?”

“আর কত ঘুমাবি? আন্টি ডাকছেন তোদের—খেতে আয়।”

অরণ্য ‘আসছি’ বলে আবার এসে শুয়েছে বিছানায়। সুবহা ছিল না সেখানে, ওয়াশরুমের দিকে তাকালো অরণ্য। পানি পড়ার শব্দ আসছে কানে। বুঝতে পারলো, সুবহা ওয়াশরুমেই আছে।

———

সদ্য গোসল সেরে বেরিয়েছে সুবহা। টাওয়াল দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে দাঁড়িয়েছে এসে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে। বিছানায় শুয়ে থাকা অরণ্য মাথা ঘুরিয়ে সুবহার দিকে তাকিয়েছে তখন। শাড়ি পরেছে সুবহা, এলোমেলো শাড়ি, খোলা চুলে দারুণ লাগছে তাকে। অরণ্যকে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্রুত নিজের শাড়ির আঁচল ঠিক করছে সে। অরণ্য এবার হাসলো, ঠোঁট কামড়ে। সুবহা বিড়বিড় করে “অসভ্য” বলে বকুনি দিলো অরণ্যকে। অরণ্য তা শুনে সুবহাকে আরও রাগানোর জন্য বলল—--

“কিছুই তো করিনি আমি! এত সকালে গোসল করলে যে!”

অরণ্যের কথার মানে বুঝতে পেরে সুবহা রেগে তাকালো তার দিকে। সুবহার এমন রাগান্বিত চেহারা দেখে অরণ্য আবারও হেসে বলল—--

“রাগ করো না সোনা বউ! কাছে আসো, আদর দিয়ে রাগ ভাঙিয়ে দিই।”

সোফার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেখানে রাখা কুশনটা হাতে তুলে নিয়ে অরণ্যের দিকে ছুড়ে মারলো সুবহা কটমট কণ্ঠে বলে উঠলো।

“ সময় থাকতে মুখে লাগাম টানুন অসভ্য লোক।”

“ এসব না বলে কাছে আসো তোমাকে টেস্ট করি।”

বিজ্ঞাপন

অরণ্যের কথাটা শেষ হয়েছে মাত্রই, রুমের দরজায় নক করেছে তখন কিরণ। মিটিমিটি হেসে বলছে সুবহাকে—--

“ভুল সময়ে এসে পড়েছি মনে হয়? আমি গেলাম। তাড়াতাড়ি নিচে এসো তোমরা।”

অরণ্য আর সুবহা দুজনেই উত্তর দিলো, তারা আসছে। এটা শুনে তখনই চলে গিয়েছে কিরণ।

———

সুবহা আর অরণ্যের রিসেপশন আজ। কিয়ানসহ সুবহাদের বাড়ির বাকিরা এসেছেন আজকে অরণ্যের বাসায়। এসেছে আনহাও।

আজকে সুবহা সেজেছে সুন্দর করে—রয়্যাল ব্লু কালারের একটা সুন্দর সিল্ক শাড়ি পরেছে সে, যার ওপর সূক্ষ্ম গোল্ডেন জরির কাজ আছে। তার সাথে স্লিভলেস গোল্ডেন এমব্রয়ডারির কাজ করা ব্লাউজ। মাথায় গোল্ডেন কালারের সুন্দর একটা দোপাট্টা। গলায়-কানে ডায়মন্ডের পাতলা গহনা, হাতে কিছু কাঁচের চুড়ি আর একটা স্টোন সেট করা আংটি। মুখে রয়েছে সুন্দর সাজসজ্জা। বিয়েবাড়ির সবার নজর কনের দিকেই।

অরণ্য আসলো মাত্রই। দাঁড়ালো এসে সুবহার পাশে। সুবহার সাথে ম্যাচিং করে পাঞ্জাবি পড়েছে সে ব্লু কালারের সুন্দর পাঞ্জাবি, যার গলার চারপাশে ছিল সূক্ষ্ম সোনালি জরি আর হ্যান্ড এমব্রয়ডারির নিখুঁত কাজ। সুবহা তখন লক্ষ্য করল অরণ্যকে চোখ জোড়া বার বার অরণ্যের দিকেই আটকে যাচ্ছে তার। পুরো যেন রাজপুত্রের মতো লাগছে অরণ্যকে।

মিহি আর আদ্রীশ চলে গিয়েছিল তখন, ঠিক করেছিল আজকের অনুষ্ঠানে আর থাকবে না তারা। কিন্তু বন্ধুদের ছাড়া কোনো অনুষ্ঠানই জমে না অরণ্যের। আবার গিয়ে গাড়ি করে নিয়ে এসেছে তাদের। এইজন্যই সবার মাঝে আসতে এতো দেরি হয়ে গেলো তার।

আনহাকে অরণ্য ফোন দিয়েছে বেশ কয়েকবার, কবে আসবে জিজ্ঞেসও করেছে। আনহা শান্ত কণ্ঠেই জবাব দিয়েছে প্রতিবার। কিন্তু অরণ্যের এই আনন্দ, সুবহার প্রতি এমন গভীর ভালোবাসা কেন যেন সহ্য হচ্ছে না তার।

কিরণ এসে সুবহা আর অরণ্যকে বসতে বলল। তারা দুজনে গিয়ে বসেছে বর-কনের বসার জায়গাটাতে।

অরণ্য সুবহার লিপস্টিক পড়া ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। কিছুক্ষণ না যেতেই তার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল—--

“ লাভবার্ড, আজকে তোমার ঠোঁটের এই গ্লসি লিপস্টিক আমি টেস্ট করেই ছাড়ব।”

সুবহা সাথে সাথে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো অরণ্যের পানে, ভ্রূ কুঁচকে বলল—--

“খাবার নেই আপনার জন্য? সবসময় আমার লিপস্টিকের দিকেই শকুনের নজর কেন?”

“ তুমিই আমার প্রিয় খাবার।”

সুবহা এবার রেগেছে ভালো করে। উঠে চলে যেতে চাইলে অরণ্য তার হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিলো আবারও। সুবহার হাতটা চেপে ধরে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে অরণ্য। এদিকে সুবহা রেগে আগুন অরণ্যের ব্যবহারে।

———

অনেকক্ষণ হলো এক জায়গায় বসে আছে সুবহা। অরণ্যের কলিগ থেকে শুরু করে তাদের সব আত্মীয়রা এসে কথা বলছে সুবহার সাথে। সেও হেসে হেসে উত্তর দিচ্ছে সবার কথার।

অরণ্য, মিহি আর আদ্রীশদের সাথে নিয়ে অন্যদিকে গিয়েছে। পুরোটা সময় দূরে দাঁড়িয়ে থেকে আনহা দেখছিলো সুবহাকে। সুবহার এই হাসিমুখ, অরণ্যের সাথে তার কথা বলা কিছুই মেনে নিতে পারছে না সে। কষ্ট হচ্ছে খুব। এই সব কিছু তো হওয়ার কথা ছিল আনহার! তার জায়গায় এখন সুবহা! কীভাবে মেনে নেবে সে?

সবার সাথে কথা বলার মাঝখানে সুবহার চোখ গেলো দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আনহার দিকে। হাতের ইশারায় ডাকল বোনকে।

সুবহা স্পষ্ট দেখতে পারছে আনহার চোখ-মুখে ফুটে ওঠা রাগ। বলে দিচ্ছে সে বিরক্ত কোনো কারণে। আনহা কি এখনও রেগে আছে তার উপরে? পরক্ষণেই আবার মনে হলো, ভুল ভাবছে সে।

আনহা এসে পাশে দাঁড়ালো সুবহার। কষ্ট করে মুখে হাসি টেনে বলল তাকে—--

“ কেমন আছিস সুবহা?”

“ ভালো আছি।তুই কেমন আছিস আপু?”

“ ভীষণ ভালো। কালকের রাতটা কেমন গেলো? অরণ্যের সাথে সব ঝামেলা মিটমাট হয়ে গেছে নিশ্চয়ই!”

সুবহা কিছু না বলে মুচকি হাসল শুধু। তার এই হাসি দেখে আনহার মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো সাথে সাথে।

কিরণ এসে সুবহার হাত টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়েছে, তাকে একটা সুন্দর নেকলেস পড়িয়ে দিলো তার গলায়। সুবহাকে সাজানোর সময় নাকি অরণ্য এটা পড়িয়ে দিতে বলছিল। মনভোলা কিরণের মনে ছিল না তখন কথাটা। কাঁধের ওপর থেকে ওড়নাটা সরতেই আনহার চোখে পড়ল সুবহার গলার লালচে দাগটায়। বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল সাথে সাথে।

অরণ্য ছুঁয়েছে সুবহাকে? এই চিহ্ন যে তারই প্রমাণ দিচ্ছে।

অরণ্য আর সুবহা কাছাকাছি এসেছে, এতোটাই কাছাকাছি যে একদিনেই দুজনের সব রাগ-অভিমান শেষ হয়ে গেছে!

আনহার যে ভালো লাগছে না এটা। মনে মনে কিছু একটা ভেবে আনহা তখন চলে গেছে সেখান থেকে।

———

কিরণ চলে যাচ্ছিল, সুবহা ওর হাতটা ধরে বলল—--

“আমাকে একা রেখে কোথায় যাচ্ছিস?”

“তুই কি ইনডায়রেক্টলি ভাইয়াকে ডেকে দিতে বললি?”

“ হুহ, বয়ে গেছে আমার। ওনাকে ডাকতে যাব কেন? ”

“বুঝি বুঝি! ভাইয়ার আদরের ডোজে রাগী সুবহাও লজ্জাবতী হয়ে গেছে। একটা সত্যি কথা বলবি আমাকে?”

“কি কথা?”

কিরণ সুবহার কাছে গিয়ে বলল—--

“কালকের রাতটা কেমন কাটলো?”

“যা ভাবছিস, তার কিছুই হয়নি।”

“জানি জানি।”

সুবহা বিরক্ত হলো। কিরণের হাত ধরে বলল—--

“যাই জানিস, সব ভুল জানিস। চল, এবার এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না আমার।”

“ তোকে হাইজ্যাক করে নিয়ে গেলে ভাইয়া আমাকে কেলাবে।”

“ আরে বাবা, আমি কি ওয়াশরুমেও যেতে পারব না?”

“আগে বলবি তো এটা! চল।”

———

কিরণ চলে গিয়েছে কিয়ানের সাথে। এদিকে সুবহা ঠিক করেছে আর যাবে না অনুষ্ঠানের জায়গাতে। বড্ড ক্লান্ত লাগছে তার, এত হৈ-হুল্লোড়, ঝামেলা নিতে পারছে না আর। সুবহা হেঁটে নিজের রুমের দিকে যাচ্ছিল। তখনই কানে আসে কোনো পরিচিত কণ্ঠস্বর। ঘুরে তাকালো সুবহা। দেখতে পেলো রাইয়ানকে।

রাইয়ান তার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল—--

“মিস মেহরিন, কনে তাহলে আপনি?”

সুবহা হেসে বলল তাকে—--

“মি. চৌধুরী যে! আপনি এখানে?”

“অবাক হলেন?”

“তা তো বটেই।”

“আপনার শাশুড়ি আমার দূরসম্পর্কের ফুফি হন। আমি দেশে আছি জেনে সকাল থেকে উনি ফোন দিয়ে আসতে বলছিলেন আমাকে। উনার কথাতেই এখানে আসা। তবে এত বড় একটা সারপ্রাইজ পাব, জানা ছিল না আমার।”

“কি এমন সারপ্রাইজ পেলেন শুনি?”

“বউ সাজে মিস মেহরিনকে অন্য কারো পাশে দেখলাম।”

বিস্ময় নিয়ে তাকালো সুবহা, কথার মানে বুঝল না রাইয়ানের।

ঠিক তখনই কারোর কণ্ঠস্বর কানে এলো তাদের। অরণ্যকে দেখতে পেলো দুজনেই। সুবহা কথা বলছে রাইয়ানের সাথে—দেখা মাত্রই অরণ্যের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। ধীর পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়ালো অরণ্য, সুবহার পাশে।

হাত ধরে নিজের কাছে টেনে, রাইয়ানকে বলল—--

“উঁহুঁ ভুল বললেন আপনি, শি ইজ নট মিস... মাই মিসেস... দ্য ওয়াইফ অফ ডক্টর শেহরাজ অরণ্য। ”

ভ্রূ কুচঁকলো রাইয়ান কেন যেন রাগ হচ্ছে তার অরণ্যের উপরে। অরণ্য আবারও রাইয়ানের কাঁধে হাত ছাপড়ে বলল —“ কিপ ইন মাইন্ড মি. রাইয়ান। ”

সুবহার হাত ধরে তাকে রুমের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল অরণ্য।

সুবহা বিরক্ত অরণ্যের এমন ব্যবহার দেখে।ওদিকে রাইয়ান চোখ-মুখে রাগ নিয়ে তাকিয়ে আছে সুবহা-অরণ্যের যাওয়ার পানে।

সুবহা অরণ্যের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়েছে দেখে রাগে ফেটে পড়ল অরণ্য। মেজাজ দেখিয়ে বলল সুবহাকে—--

“আমাকে ভালো লাগে না তোমার? ওই ছেলেটার সাথে ডলাডলি করতে খুব ভালো লাগে তাই না?”

“ছি! কথার কি ছিরি আপনার!”

বলেই সুবহা চলে যাচ্ছিল। অরণ্যের কি যেন হলো। ইচ্ছে করছে আশেপাশের সবকিছু ভেঙে-চুরে চুরমার করে দিতে। হুট করে মাথায় রাগ উঠে গেলো কেন নিজেও জানে না অরণ্য। চাইলেও নিজেকে সংযত করতে পারল না সে। আবারও সুবহার হাতে টান পড়ল। এত জোরে হাত চেপে ধরায় ব্যথা পেলো সুবহা। কিছু বলতে নিলে অরণ্য তার চোয়াল চেপে ধরল। রক্তলাল চোখ নিয়ে তাকাল সুবহার দিকে—--

“তুমি কি বাই এনি চান্স ওই রাইয়ানকে পছন্দ করো লাভবার্ড? বলো আমাকে বলো! ওই ছেলেকে পছন্দ করো তুমি?"

এই অরণ্যকে পুরোপুরি অচেনা লাগছে সুবহার।অরণ্য কি মেন্টালি সিক? সন্দেহ হচ্ছে তার। এমন পাগল লোক ডাক্তার হয় কীভাবে? তার নিজেরই তো চিকিৎসার দরকার।

সুবহা প্রচণ্ড বিরক্ত অরণ্যের কাজে। চিৎকার দিয়ে বলে উঠেছে তখনই—--

“হ্যাঁ, পছন্দ করি! কি করবেন আপনি?”

“কি বললে? কি বললে? আবার বলো! বলতে বললাম না, বলো!”

অরণ্যের এমনভাবে চিৎকারে কেঁপে উঠেছে সুবহা। নিচে যারা আছে তাদের কানেও হয়ত গিয়েছে অরণ্যের চিৎকার৷ সুবহার এবার রাগ হচ্ছে খুব। সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এমন করার কি আছে, বুঝতে পারছে না সে।

বিজ্ঞাপন
অন্তরালের প্রণয়িনী গল্পটি আফরোজা আঁখি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক গল্প