খাটের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে আছে আনহা। চোখ দিয়ে আপনা-আপনিই পানি গড়িয়ে পড়ছে তার। বাড়িতে ফিরেছে অনেকক্ষণ আগেই আদ্রীশ আর মিহি পৌঁছে দিয়ে গেছে তাকে। রুমে এসে সেই যে বসেছিল মেঝেতে, এখনো ঠিক আগের মতোই বসে আছে। বারবার রেস্টুরেন্টের ঘটনাটা ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়। অরণ্য কীভাবে পারল সবার সামনে ওভাবে তাকে রিজেক্ট করে দিতে? কার জন্য এতদিন এত কিছু করল আনহা? আজকের দিনটা দেখার জন্যই কি মনে-প্রাণে সেই কবে থেকে ভালোবেসে এসেছে অরণ্যকে?
আনহার মনে হলো, কেউ তার রুমে এসেছে। চোখের পানি মুছে নিয়ে তাকাল দরজার দিকে কিয়ান দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। আনহা ভালো-মন্দ কিছুই বলল না, চুপচাপ আগের মতোই বসে রইল। কিছুক্ষণ না যেতেই আচমকা হাতের কবজিতে টান পড়ল তার।বুঝতে বাকি নেই এই কাজটা করেছে কিয়ান। কিয়ানের এমন ব্যবহারে বিরক্ত হলো সে। উঠে দাঁড়িয়ে মেজাজ দেখিয়ে বলল কিয়ানকে।
—'হচ্ছেটা কি কিয়ান? আমি বয়সে তোদের বড়, মনে থাকেনা এটা? নাকি আমাকে বাড়ির সদস্য বলেই মনে হয় না তোদের?'
—'সুবহা কোথায়?'
—'আমি কীভাবে জানব তোর বোন কোথায়?'
—'নাটক করছিস?'
কিয়ানের কথায় রাগ হলো আনহার। এক ঝটকায় নিজের হাতটা কিয়ানের থেকে ছাড়িয়ে নিলো, রেগে তাকিয়ে বলল তাকে।
—'নাটক তো তোরা করছিস!'
—'এইমাত্র আমি নিচ থেকে আসলাম, দারোয়ান আমাকে বলেছে তুই আর সুবহা একসাথে কোথাও গিয়েছিস।'
—'তো কি হয়েছে?'
—'তুই বাড়ি ফিরেছিস অনেক সময় হলো, সুবহা এখনো আসলো না কেন? ফোন দিচ্ছি, তুলছে না পর্যন্ত। আমার তো মনে হচ্ছে তুই ওর ক্ষতি করেছিস।'
—'কিয়ান, আমাকে বিরক্ত না করে যা এখান থেকে।'
—'ভালোয় ভালোয় বলে দে, সুবহা কোথায়? আমি চলে যাব।'
—'কিয়ান, রাগাস না আমাকে। যা এখান থেকে। কতবার বলব, সুবহা কোথায় আমি জানি না।'
আনহার এভাবের কথাটা জুড়ে চিৎকার দিয়ে বলেছে। কিয়ান এখনো ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চলে যাবে বলে পা বাড়িয়ে আবারও ফিরে তাকিয়ে বলল —--
—'সুবহার যদি কোনো ক্ষতি হয়, আমি কিন্তু সব বলে দেবো আম্মু-আব্বুকে।'
—'কি বলবি?'
—'এটাই যে, ওই কাপুরুষ অরণ্যের সাথে কোনো কালেই তোর কোনো সম্পর্ক ছিল না। সুবহাকে ভুল বুঝিয়ে বিয়ে ভেঙেছিস। ওদের বাড়ির সবার কাছে এ বাড়ির সবাইকে ছোট করেছিস তুই।'
ভয়ে শুকনো ঢোক গিললো আনহা। কয়েক পা পিছিয়ে গেল সে। কিয়ান এসব কথা জানলো কিভাবে? আনহার ভয়ার্ত মুখশ্রী দেখে কিয়ানের ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেল। সেভাবেই বলল সে।
—‘ কি ভাবছিস,আমি এগুলো জানলাম কিভাবে?’
—‘ এ..এগুলো সব মিথ্যা, অরণ্য আমাকে ভালোবাসে।’
—'অরণ্য তোকে ভালোবাসে না আপু, নিজের ভালো বুঝতে শিখ। অরণ্য এখনো আগের মতো সুবহাকেই ভালোবাসে, কেউ না বুঝলেও আমি বুঝেছি এটা।'
কিয়ানের কথা শুনে রাগ হলো আনহার। কিছু দূরে চোখ গেল তার, দেখতে পেল একটা কাচের ফুলদানি। এগিয়ে গিয়ে ওটা হাতে তুলে ছুড়ে ফেলল মেঝেতে, সাথে সাথে ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গেল ফুলদানিটা। চিৎকার দিয়ে নিজের মাথার চুল খামছে ধরে বলছে আনহা —
—'না, অরণ্য সুবহাকে ভালোবাসে না। অরণ্য আমার, আগেও ছিল, এখনও আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে।'
কিয়ান চলে যাচ্ছে, যেতে যেতে বলছে —
—'জোর করে কিছুই পাওয়া যায় না আপু। যার জিনিস, তার থেকে কৌশলে কেড়ে নিলে সেটা নিজের হয়ে যায় না।'
আনহা রেগে তাকালো কিয়ানের দিকে, চোখ মুখ শক্ত করে বলল —
—'কিয়ান, তুই এখান থেকে যাবি না আমি আম্মু-আব্বুকে ডেকে আনব?'
কিয়ান কথা না বলে বেরিয়ে গেল আনহার রুম থেকে। সে যেতেই আনহা এসে বিছানায় বসেছে, মাথা চেপে ধরেছে দুই হাত দিয়ে। হঠাৎই একটা চিন্তা মাথায় এসে বারি খেল তার সুবহাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আর অরণ্যকেও এতবার কল দেওয়ার পরেও পাওয়া গেল না। এসবের মানে কি? এটাই? অরণ্য আর সুবহা একসাথে আছে?
আনহা আর ভাবতে পারছে না কিছু, মাথাটা পুরোপুরি বিগড়ে গেছে তার। অরণ্যকে না পেয়ে আদ্রীশকে ফোন দিয়েছে। প্রথমবার রিংটোন বাজতেই ধরে নিয়েছে আদ্রীশ। অনেকক্ষণ হলো বুঝিয়েছে আনহাকে, মাথা ঠান্ডা করে ঘুমিয়ে পড়তে বলেছে তাকে। আনহার মন চটপট করছে অরণ্যের জন্য এটা ভালো করেই জানে আদ্রীশ। আনহা কি জানে, তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে কত কষ্ট লুকিয়ে রাখে সে?
———
সকাল হয়েছে, ভোরের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে চোখ-মুখে এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেছে সুবহার। চোখ খুলতেই নিজেকে কোনো এক অচেনা জায়গায় আবিষ্কার করল সে। কারোর প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল এতক্ষণ। কেউ তার দুই হাতের বাঁধনে শক্ত করে ধরে রেখেছে তাকে, যেন পড়ে না যায়! টের পেতেই মাথা তুলে তাকিয়েছে সুবহা, দেখতে পেল ঘুমন্ত অরণ্যকে চোখ বন্ধ করে রেখেছে সে। ফর্সা মুখে কোঁচা কোঁচা দাড়িতে কি সুন্দর লাগছে অরণ্যকে। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল সুবহার, ইচ্ছে করল হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেবে অরণ্যের মুখ।
হাতটা বাড়াতেই মাথায় এলো তার এই বাড়িটা কার? সে এখানে আসলই বা কীভাবে? উঠে দাঁড়াতে চাইলো সুবহা, উঠতে গেলেই অরণ্য তাকে এক টানে মিশিয়ে নিল নিজের বুকের সাথে, আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুম-জড়ানো কণ্ঠে বলল —
—'ঘুমোতে দাও লাভবার্ড।'
বিরক্ত হলো সুবহা, চোখ মুখ কুঁচকে তাকালো অরণ্যের মুখপানে। কিছু না ভেবেই খামছি দিয়েছে অরণ্যের বুকে। আচমকা এমন হওয়াতে সে দ্রুত সুবহাকে ছেড়ে দিয়ে চোখ খুলে তাকিয়েছে। চমকে উঠল সুবহার রাগান্বিত চেহারা দেখে। মনে মনে হাসলো অরণ্য, আবারও জাপ্টে ধরে বলল সুবহাকে —--
—‘ তাই তো বলি আমার বাড়িতে বিড়াল আসলো কোথা থেকে। আস্ত একটা মানুষ রূপি বিড়াল আমার উপরে গুয়ে আছে মনেই ছিলোনা এটা। ’
সুবহা অরণ্যের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করছে। বিরক্ত হয়ে রেগে তাকিয়ে বলল অরণ্যকে —--
—‘ ছাড়ুন আমাকে অসভ্য লোক। ’
—‘ উহু।’
—‘ ছাড়বেন না? আরেকটা খামছি খাবেন?’
অরণ্য নিজের ঠোঁট দেখিয়ে বলছে।
—‘ চুমু খাবো, চুমু দাও। ’
—‘নির্লজ্জ কোথাকার, ছাড়ুন বলছি।’
অরণ্য আর রাগালো না, সুবহাকে ছেড়ে দিয়েছে সাথে সাথে। সুবহা দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে সোফায় বসে থাকা অরণ্যের দিকে। মাথায় চাপ প্রয়োগ করেও কোনোভাবেই কিছু মনে করতে পারছে না—কিভাবে আসলো এখানে? আশেপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারলো সে আর অরণ্য ব্যতীত রুমে আর কেউ নেই। একা একটা বাড়িতে সুবহা আর অরণ্য একসাথে—এগুলোর মানে কী? কিছুতেই সুবহার মাথায় ঢুকছে না, সে এসেছে কিভাবে এখানে।
অরণ্য ঠোঁট কামড়ে হাসল, বুকে হাত ভাঁজ করে বলল —--
—‘তোমার শরীরে আমার শার্টটা খুব মানিয়েছে লাভবার্ড, কাছে এসো, বোতামগুলো ঠিক করে দিই।’
অরণ্যের কথা কানে যেতেই সুবহা নিজের দিকে তাকালো। পরনে টপসের বদলে শার্ট দেখে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে খুলে আসার উপক্রম তার। যতদূর মনে পড়ছে, রাতে রাইহানের সাথে রেস্টুরেন্টে ডিনার করেছিল সে। তারপর কী হলো? অরণ্য কোথা থেকে এলো? নিজের অজান্তেই কি ভুল করে বসেছে সে?অরণ্যের দিকে তাকাল সুবহা, শুকনো ঢোক গিলে মিনমিন কণ্ঠে বলল তাকে —--
—‘এসব কী? আমার ড্রেস কে চেঞ্জ করেছে?’
অরণ্য আগের মতোই বসে আছে, ঠোঁটের হাসি চওড়া হলো তার। উঠে দাঁড়িয়ে সুবহার কাছে কিছুটা এগিয়ে এসে বলল —--
—‘তোমার ছেলের বাপ করেছে।’
—‘কিহহ!’
—‘জ্বী ম্যাডাম, সব কাজ হয়ে গেছে, এবার শুধু শুখবরটা পাওয়ার অপেক্ষা।’
—‘পাগল হয়েছেন আপনি?’
—‘বহু আগেই।’
অরণ্যের এমন হেয়ালিপনা মোটেও ভালো লাগছে না সুবহার। তীব্র রাগে চোখের সামনে টেবিলে রাখা ফুলদানিটা মাটিতে ছুড়ে ফেলেছে, চিৎকার দিয়ে বলে উঠেছে —--
—‘কি করেছেন আপনি আমার সাথে? আমি এখানে আসলাম কিভাবে? আপনি আমাকে কিডন্যাপ করে এখানে নিয়ে এসেছেন, তাই না?’
অরণ্য কিছু না বলে সুবহার কোমর চেপে নিজের কাছে টেনে আনে। ধাক্কা লাগে তার অরণ্যের বুকের সাথে, রেগে কিছু বলতে যাবে তখনই অরণ্য নিজের আঙুল দিয়ে চেপে ধরে সুবহার ঠোঁট। ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বলে উঠে —--
—‘কুল বেবি, এতো প্রশ্ন একসাথে করলে উত্তর দেব কিভাবে?’
সুবহা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে অরণ্যের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল—--
—‘এতো কাছে আসছেন কেন বারবার, সরুন।’
অরণ্য শুনলোনা সুবহার বলা কথা, সুবহার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল —--
—‘কারণ তুমি সব দূরত্ব গুছিয়ে দিয়েছো কাল রাতে।’
অরণ্যের এমন কথায় ভয় হলো সুবহার কি ভুল করেছে সে? বয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল অরণ্যকে।
—‘মা...মানে আমি কি করেছি কাল রাতে?’
—‘মনে করো।’
সুবহা ভাবলো কিছুক্ষণ, কিন্তু তার কিছুই মনে পড়ছে না। মনের মধ্যে কেমন অশান্তি হচ্ছে, কান্না পাচ্ছে তার। অসহায় দৃষ্টিতে অরণ্যের পানে তাকিয়ে সে বলল —--
—‘ আমার কিছুই মনে পড়ছে না কেন?কিভাবে আসলাম এখানে? কে নিয়ে এসেছে আমাকে?’
—‘ বলব, একটা শর্তে।’
—‘ কি শর্ত?’
ফ্যানের বাতাসে সুবহার খোলা চুল এলোমেলো হয়ে এসে মুখে পড়েছে। পরম যত্নে অরণ্য তা গুজে দিলো সুবহার কানের পাশে, মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে সুবহার সুন্দর মুখের দিকে। শান্ত কণ্ঠে বলে উঠেছে সুবহাকে —--
—‘ লাভবার্ড, চলো বিয়ে করি।’
অরণ্যের কথা শেষ হয়েছে কি না বলে উঠেছে সুবহা।
—‘ কখনোই না।’
মুখের উপর সুবহা এভাবে না বলে দিলো দেখে রাগ হলো অরণ্যের। মুহূর্তেই রাগে চোখ দুটো লাল হয়ে গেলো তার। সুবহার কোমরে এমনভাবে শক্ত করে চেপে ধরেছে, মনে হলো অরণ্যের আঙুলের নখ ঢুকে গেছে নরম মাংসের ভিতরে। ব্যথায় অরণ্যের বুকে ধাক্কা দিয়ে মৃদু আর্তনাদ করে উঠেছে সুবহা। তবুও অরণ্য ছাড়লো না তাকে, ক্রোধ মিশ্রিত চাহনিতে তাকিয়ে আছে সুবহার পানে। কিছুক্ষণ যেতেই কি যেন ভেবে ছেড়ে দিলো সুবহাকে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলল —--
—‘ তুমি মানো আর নাই মানো, আমিই তোমার শেষ ঠিকানা। আমার কাছেই তোমাকে আসতে হবে লাভবার্ড।’
রাগে সুবহা বড় বড় শ্বাস ফেলছে, সোফায় বসে কিছুক্ষণ ভাবলো সে। সারা রাত সুবহা অরণ্যের বাড়িতে ছিলো, কী হয়েছে না হয়েছে কিছুই মনে নেই তার। বাড়িতে এসব জানলে সবাই কি রিয়েক্ট করবে? আনহা নিশ্চয়ই ছেড়ে দিবে না তাকে। এবার তো নিজের করা ভুলের জন্য নিজেকেই কষ্ট দিতে ইচ্ছে করছে সুবহার। সোফার দিকে তাকাতেই হাতের কাছে একটা ফোন পেলো। নিজের নাম্বার ডায়াল করে কল দিলো সে। ফোনটা অরণ্যের, সুবহার নাম্বারটা আগে থেকেই সেভ করা ছিলো। "লাভবার্ড" নামটা শুনলেই শত রাগের মধ্যেও মনে কেমন ভালো লাগা কাজ করে তার। কেন হয় এমন? বুঝে পায় না সুবহা। সে তো ভালোবাসে না অরণ্যকে, তাহলে এতো কিসের টান?
নিজের ফোনটা খুঁজতে খুঁজতে অরণ্যের রুম পর্যন্ত চলে এসেছে সুবহা। পুরো রুমটা এলোমেলো হয়ে আছে, সুবহার শরীর থেকে খুলে রাখা টপসটাও মেঝেতে পড়ে আছে। কী হয়েছে তার সাথে, এটা ভাবতে ভাবতেই যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে সে। কেন মনে পড়ছে না কিছু? বেশি কিছু ভাবলো না সুবহা, তাকে যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে যেতে হবে। বিছানায় ফেলে রাখা নিজের ফোনটা হাতে তুলে সাব্বিরকে কল দিতে নিচ্ছিলো, অরণ্য কোথা থেকে এসে ফোনটা কেড়ে নিয়েছে। সুবহা রেগে তাকিয়েছে তার দিকে, কথা বলার সুযোগ দেয়নি অরণ্য। সুবহার হাতে একটা শপিং ব্যাগ দিয়ে বলেছে, চেঞ্জ করে আসতে, অরণ্য নিজেই পৌঁছে দিবে তাকে। কথা বাড়ায়নি সুবহা, চুপচাপ ওয়াশরুমে গিয়ে শাড়িটা পড়ে এসেছে। আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে দেখে নিলো একবার। নীল রঙের পাতলা জর্জেট একটা শাড়ি পড়েছে সে। মনে প্রশ্ন জাগলো সুবহার, অরণ্য এই শাড়িটা কার জন্য এনেছিল? সুবহা এখানে আসবে কোনোভাবে, এটা কি অরণ্য জানতো? নাকি শাড়িটা এনেছিলো আনহার জন্য! হঠাৎই মনে পড়ে রেস্টুরেন্টের ঘটনা। সেখানে তো রাইয়ান, সুবহা ছাড়াও আরও অনেকেই ছিলো, যার মধ্যে ছিলো অরণ্যও। সেখান থেকেই কি অরণ্য কোনো কিছু করে তাকে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে এসেছে? এসব ভাবতেই মাথায় দপাদপ আগুন জ্বলে উঠলো সুবহার। ঠিক তখনই কানে আসলো অরণ্যের কণ্ঠ, দরজা ধাক্কাচ্ছে আর বলছে —--
—‘ তুমি কি ড্রেস চেঞ্জ করার নাম করে গোসল শুরু করে দিলে? আমাকে বলতে পারতে, আমি সাহায্য করতাম।’
সুবহা কথা না বলে দরজা খুলে দিলো, গটগট করে হেঁটে চলে গেলো অরণ্যের সামনে দিয়ে। অরণ্য সেদিক পানে তাকিয়ে মুখে মুচকি হাসি নিয়ে বলছে — ‘ তুমি আমার মানে, শুধুই আমার।’
———
অরণ্য ড্রাইভ করছে, মাঝেমধ্যে আবার পাশে বসে থাকা সুবহার দিকে তাকাচ্ছে। চোখ-মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে রেগে আগুন হয়ে আছেন মহারানী। তাকে আরো রাগাতে বলল অরণ্য —--
—‘ সারা রাত আদর দিলাম, তবুও রাগ করে আছো যে? আজকের দিনটাও আমার কাছে থেকে যেতে পারতে। মন্দ হত না কিন্তু!’
সুবহা অরণ্যের দিকে রেগে তাকিয়ে দাঁত কটমট করে বলছে—--
—‘ আপনাকে আমি দেখে নিবো।’
—‘ তুমি লজ্জা পাচ্ছিলে বলেই না, আমি রুমের লাইট অফ করে দিলাম। ঠিক আছে, নেক্সট বাসরে ভালো করে দেখে নিও।’
—‘ নির্লজ্জ লোক। ’
—‘ তুমি বার বার আমার নাম ভুলে যাও কেন বলো তো? বাচ্চার বাবার নাম ভুললে আল্লাহ পাপ দিবেন কিন্তু। কথায় কথায় নির্লজ্জ না ডেকে ‘ ওগো শুনছো ’ বলে ডাকবে তাহলে হাসবেন্ড ওয়াইফ, হাজবেন্ড ওয়াইফ ফিল পাবো। ’
সুবহা বুঝলো, অরণ্যের সাথে কথা বলে সে পারবে না। বরং এই কথাগুলো শুনে আরো চিন্তা বাড়বে, কাল কি থেকে কি হয়েছে এটা ভেবে। সুবহা কথা বলল না আর, চুপচাপ বসে রইল সে। ততোসময়ে বাড়ির গেইটের কাছে এসে থেমেছে তার গাড়িটা। নেমে গেছে সুবহা, শব্দ করে গাড়ির গেটটা লাগিয়ে চলে যাচ্ছিলো সে। পিছু পিছু গিয়েছে অরণ্যও, সুবহা এটা খেয়াল করেনি তেমন। বাড়ির সদর দরজার কাছে আসতেই চিন্তিত চেহারায় সবাইকে বসে থাকতে দেখলো সে। বাড়ির সবাই তো আছেই, সাথে আবার যোগ হয়েছে রিফাত আর তার আম্মু। সুবহা দাঁড়িয়ে ছিলো দরজার সামনেই। এই মুহূর্তে সবার সামনে দিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে তার? বাবা তাকে দেখলেই হাজারটা প্রশ্ন ছুড়ে দিবেন সুবহার দিকে, এটা তো তার জানা। সুবহা ভয়ে ভয়ে ভিতরে আসলো, এক পা, দুই পা করে এগিয়ে যাচ্ছিলো, লক্ষ্য করছিলো কেউ যেন তাকে না দেখে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো কোথায়? সুবহার ফুফি দেখে নিয়েছেন তাকে, কাছে এসে হাত ধরে নিজের দিকে চাওয়ালেন সুবহাকে। চিন্তিত চেহারা নিয়ে প্রশ্ন করলেন —--
—‘ কালকে থেকে তুই কোথায় ছিলিস মা? আমরা সবাই পাগলের মতো খুঁজে যাচ্ছি তোকে।’
—‘ আমি আমার ফ্রেন্ডের বাসায় ছিলাম, ফুপি।’
— ‘ ফ্রেন্ডের বাসায় গিয়েছিকি তাহলে ফোন তুলছিলা কেন? অন্য কোথায় ছিলিস বুঝি?’
—‘ না না, অন্য কোথায় থাকবো ফুফি?আমার ফ্রেন্ডের বাসাতেই ছিলাম।’
—‘ মিথ্যা বলছো কেন লাভবার্ড? তুমি তো আমার সাথে ছিলে।’
ঘাবড়ালো সুবহা, চমকে তাকালো দরজার দিকে। অরণ্যের কণ্ঠস্বর কানে আসা মাত্রই বাকিরাও তাকিয়েছে সেদিকে। দরজার সাথে হেলান দিয়ে বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য। ঠোঁটের কোণে তার হাসি লেগে আছে। অরণ্যের আসাতে সবাই খুশি হয়েছে বটে, তবে তার এরূপ কথার মানে বোধগম্য হলো না কারোর। আনহা আর কিয়ান দুজনেই তখন নিচে নামছিলো, কিয়ান অরণ্যের কথাটা শুনে দ্রুত সুবহার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, হাঁ করে তাকিয়ে আছে বোনের ভয়ার্ত মুখের দিকে। এত ভয় কেন পাচ্ছে কেন সুবহা! অরণ্যের বলা কথাটা কি তাহলে সত্যি? কিয়ান নিযে গিয়ে কালকে সব পরিচিত, ফ্রেন্ড, আত্মীয়সহ অফিসের সবার থেকে খুঁজ নিয়েছে, কেউই জানে না সুবহা কোথায়। আজকে এভাবে আসলো তাও অরণ্যের সাথে করে। খটকা লাগছে কিয়ানের, কিছু না বলে দাঁড়িয়ে আছে সে। আনহার পা দুটো থেমে গেছে, সে এখনো আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। অরণ্য ভিতরে আসতেই সুবহার আম্মু আর চাচি তাকে গিয়ে বসতে বললেন। অরণ্য গিয়ে জাহিদ হোসেন আর ওনার ভাইয়ের পাশে বসলো। ভালো-মন্দ কথাও হলো। কিয়ানের আব্বু বলে উঠলেন অরণ্যকে।
—‘ সুবহা, তোমার সাথে ছিলো মানে?’
অরণ্য বিড়বিড় করে বলল —--
—‘ আমার জিনিস, আমার কাছেই তো থাকবে।’
—‘ কিছু বললে?’
—‘ কই না তো।’
সন্দেহ হলো সুবহার চাচ্চুর, অরণ্যের কথার মানে বুঝতে পারছেন না তিনি। সুবহা অরণ্যের সাথে ছিলো মানে! যে মেয়ে এই ছেলেকে দু চোখে দেখতে পারেনা, তার সাথে ছিলো কালকে থেকে, এটাও ওনাকে বিশ্বাস করতে হবে! এই বিষয়টা ওনাকে ভাবাচ্ছে না, ভাবাচ্ছে কালকে বলা অরণ্যের কথাটা। এই বিষয়টা নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে বললেন তিনি।
—‘ কালকে আমরা তোমাদের বাসায় গিয়েছিলাম, জানো নিশ্চয়ই?’
—‘ হ্যাঁ।’
—‘ তোমার বোনকে আমার ছেলের জন্য চাইতে গিয়েছিলাম, যা শুনলাম সেটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমরা কেউই।’
অরণ্য উঠে দাঁড়ালো, একবার সুবহার দিকে তাকিয়ে আবার কিয়ানের আব্বুর দিকে তাকালো। বাঁকা হেসে বলল ওনাকে ——
—‘ আমি যা চেয়েছি, আমাকে দিয়ে দিন, তবেই আমি কিরণকে এ বাড়িতে পাঠাবো, তার আগে নয়।’