ছাদ থেকে নেমে নিজের রুমে এসেছে সুবহা। প্রায় অনেকক্ষণ হলো বিছানায় পড়ে চটপট করছে, অথচ ঘুম আসছে না তার দু চোখের পাতায়। ইচ্ছে করছে গাড়ি নিয়ে লং ড্রাইভে যাবে, কিন্তু এই সময় একা যাওয়াটা কি ঠিক হবে? অনেক ভেবেচিন্তে সুবহা ঠিক করল, সে এক্ষুণি গাড়ি নিয়ে বের হবে। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে পরনে থাকা টি-শার্ট আর প্লাজো চেইঞ্জ করে সুন্দর একটি সাদা-কালো রঙের টপস এবং কালো জিন্স প্যান্ট পরে নিল। গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছে কালো রঙের একটি জরজেট স্কার্ফ। খোলা চুলগুলো একটি ক্লিপের সাহায্যে আটকে নিলো। আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে একবার দেখে নিলো সুবহা।
রাত প্রায় ১১টার কাছাকাছি। এতো রাতে বেরুচ্ছে দেখলে কেউ তাকে আস্ত রাখবে না, জানে ভালো করেই। আস্তে আস্তে হেঁটে বাড়ির সদর দরজার কাছে পৌঁছালো সুবহা। দরজাটা খুলে বাইরে চলে গেলো সে। গাড়ির চাবিটা থাকে সুবহার কাছেই, তাই আর সমস্যা হয়নি। গাড়িটা স্টার্ট দেবে, তখনই মনে হলো কেউ তাকে ডাকছে। মাথা ঘুরিয়ে বাড়ির দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো আনহাকে। আনহা একটা সুন্দর গোপালি রঙের শাড়ি পরেছে। সাজগোছও করেছে, এতো রাতে আনহাকে এভাবে দেখে বেশ অবাক হয়েছে সুবহা। সুবহা কি ভুল শুনলো? আনহা তাকে ডাকছে! যে আনহা সুবহার দিকে তাকালেও কেমন ঘৃণাভরা চোখে তাকায় সে নিজে থেকে কথা বলছে তার সাথে! অবাক হওয়ারই কথা! আনহা ততসময়ে এসেছে সুবহার কাছে, গাড়ির কাছে এসে বলল সুবহাকে —--
— ‘আমাকে ড্রপ করে দিবি? ড্রাইভার তো নেই, তাই বলছিলাম। যাচ্ছিস যখন, আমাকে লিফট দে, আসার সময় অরণ্যই দিয়ে যাবে।’
সুবহার বুঝতে বাকি নেই, আনহা যাচ্ছে অরণ্যের সাথে দেখা করতে। তাহলে কালকে বলা অরণ্যের কথাগুলো! কেন বারবার সুবহার সাথে এমন করে সে? পরক্ষণেই আবার ভাবছে সুবহা, এটা তো নতুন নয়, আগেও এমন হয়েছে। সেই বা কেন অরণ্যের সুন্দর কথায় গলে যাচ্ছিল? গাড়ির স্টিয়ারিংটা শক্ত করে চেপে ধরল সুবহা, সেদিকে তাকিয়েই বলল আনহাকে,
— ‘ উঠে বস।’
সুবহার বিরক্তিভরা মুখশ্রী দেখে মনে মনে হাসছে আনহা। মনে হলো, সে সফল হয়েছে তার কাজে। আনহা চলে এসেছিল বাসায়, এতোগুলো ডাক্টরদের মধ্যে থেকে সে কিই'বা করবে! কথা হয়েছিল, অরণ্য আজকে ফ্রেন্ডদের ট্রিট দেবে। আদ্রীশ, মিহি আর অরণ্য সেই থেকে অপেক্ষা করছে আনহার জন্য রেস্টুরেন্টে বসে।
বেশ অনেকক্ষণ হলো গাড়িতে বসে আছে সুবহা আর আনহা,এতো সময়ে আনহার বলা ঠিকানায় পৌঁছে গেছে তারা। এতক্ষণ কথা না বললেও, আনহার এখন মনে হলো কিছু বলা দরকার। মাথা ঘুরিয়ে তাকালো সুবহার পানে। মনে প্রশ্ন জাগল, সুবহা এতো রাতে যাচ্ছে কোথায়? কোনো কিছু না ভেবে প্রশ্ন করল সুবহাকে।
—‘ বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিস?’
হাসলো সুবহা, সামনের দিকে তাকিয়েই সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো সে।
—‘ হ্যাঁ। ’
—‘ বয়ফ্রেন্ড টা কে? রিফাত ভাইয়া! ’
—‘ না। ’
—‘ তাহলে?’
—‘ এতো কিছু জানতে হবে না তোকে আপু। যা তুই কেউ হয়তো অপেক্ষা করছে তোর জন্য। ’
—‘ হ্যাঁ, অরণ্য অপেক্ষা করছে। অরণ্য মেসেজ পাঠিয়ে বলল আজকে নাকি আমাকে প্রপোজ করবে সেজন্যই এসেছি। যাচ্ছি আমি,থাক তুই। ’
আনহা যেতে যেতে আবার তাকালো পিছনের দিকে গাড়িতে বসে থাকা সুবহাকে দেখে হাসছে সে, মনে মনে বলছে —--
—‘ তুই জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিস আমি জানি সুবহা।কিন্তু কি করব বল? অরণ্যকে যে আমার চাই। ’
———
রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুবহার কালো কারটি। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে কি যে ভাবছে সে! তার মন খারাপ হয়েছে! কেন হয়েছে, নিজেও জানে না। এই হুটহাট মন খারাপের কারণ খুঁজে পায় না সুবহা। মাথা তুলে তাকাতেই মনে হলো, কেউ ডাকছে তাকে। ভুল ভাবেনি সুবহা। সুবহার গাড়ির ঠিক পাশেই রাইয়ানের গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। সে ডাকছে সুবহাকে। কিছু একটা ভেবে গাড়ি থেকে নামল সে, নেমেছে রাইয়ানও। সুবহা ভালো করে রাইয়ানকে দেখলে বুঝতে পারল, লোকটা সুস্থ হয়নি এখনো। মাথায় ব্যান্ডেজ করা, হাঁটতে পারছে না ভালো করে। সুবহার কেমন মায়া হলো লোকটার জন্য। রাইয়ান মুখে হাসি টেনে ধীর পায়ে সুবহার দিকে এগিয়ে এসে বলল তাকে—
— ‘তখন কি রাগ করেছিলেন?’
মাথা নাড়িয়ে না সূচক উত্তর দিলো সুবহা। আবারও বলে উঠল রাইয়ান—--
— ‘এতো রাতে ফোন দিয়ে বিরক্ত করা আমার উচিত হয়নি, ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি সেজন্য।’
সুবহা এবার নরম হলো, লোকটার প্রতি জমানো রাগ চলে গেছে তার সুন্দর ব্যবহার দেখে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাইয়ানের হাসির উত্তরে হাসি দিয়ে সেও বলল —--
— ‘ব্যাপার না।’
— ‘ডিনার করেছেন?’
— ‘না।’
— ‘আসুন তাহলে!’
— ‘কোথায় যাব?’
— ‘ডিনার করতে।’
বেশ অনেকক্ষণ কথা বলে রেস্টুরেন্টের ভিতরে গেলো সুবহা আর রাইয়ান। পুরো সময়টা জুড়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অরণ্য ভ্রু জোড়া কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সুবহার পানে। রাগে চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে মুহূর্তেই তার। ১২টা বাজতে কিছুটা সময় বাকি, এর আগেই তাকে যেতে হবে বাসায়। কিরণের ফোনটাও লক করে রেখে এসেছে, নইলে এতক্ষণে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়ে ফেলতো অরণ্যকে। অরণ্যের আব্বু-আম্মু কয়েকবার কল দিয়েছেন, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলেছেন তাকে। কথা বলতে বলতে বেরিয়ে এসেছিল বাইরে। তখনই দেখতে পেলো সুবহাকে। অন্য একটা ছেলের সাথে এত রাতে কী করছে সে? ভালো করে দেখলে বুঝতে পারলো এটা রাইয়ান। রাইয়ান আর সুবহাকে পাশাপাশি দেখা মাত্রই মাথায় রাগ চড়ে গেলো অরণ্যের। মনে মনে ভাবছিল, সেদিন রাইয়ানকে জানে না মে/রে ভুল করছে সে। সুবহা আর রাইয়ান আসছে দেখে সরে গেল অরণ্য। তাদের যাওয়ার পানে রেগে তাকালো, পাশে থাকা নিজের গাড়িটায় জোরে লাথি মেরে বলল —--
— ‘শালা, জাউরা! সব রেখে আমার হনে ওয়ালা বাচ্চাদের মায়ের দিকে নজর দিতে হবে তোকে? তোর এই চোখ দুটো খুলে যদি ফুটবল না খেলেছি তাহলে আমিও অরণ্য নই!’
অরণ্য গটগট করে হাঁটতে হাঁটতে আবারও গেল রেস্টুরেন্টের ভিতরে। আদ্রীশ, আনহারা অপেক্ষা করছিল অরণ্যের জন্যই।
তাদের ঠিক পাশের টেবিলটাতেই বসেছে সুবহা আর রাইয়ান। আনহা বা অন্য কেউ এটা খেয়াল করেনি। তবে অরণ্য রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে। খাবার অর্ডার দেবে বলে মেনু কার্ড দেখছিল সুবহা, তখনই ভুল করে চোখ পড়ে গেল অরণ্যের দিকে। অরণ্যকে এভাবে রেগে তাকিয়ে থাকতে দেখে কেমন যেন ভালো লাগছে তার। ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেলো তার।ভাবলো— অরণ্যকে রাগানো যাক আরও! রাইয়ান কথা বলছিল, সুবহাও তার দিকে তাকিয়ে হেসে হেসে কথার উত্তর দিল। এবার রাগ সীমা ছাড়িয়েছে অরণ্যের। ইচ্ছে করছে উঠে গিয়ে রাইয়ানকে থাপ্পড় মেরে উগান্ডায় পাঠিয়ে দিতে। তারপর টাস টাস করে কয়েকটা চুমু খেতে লাভবার্ডের গালে।
এই মেয়েটা অরণ্যের। তার প্রতি শুধু অরণ্যের অধিকার থাকবে। সে হাসবে অরণ্যের জন্য, কাঁদবেও তার জন্য। অন্য কারো সাথে কেন এভাবে কথা বলবে? চোখ-মুখ কুঁচকে হাতে থাকা গ্লাসটা শব্দ করে টেবিলে রাখলো অরণ্য। পাশে থাকা মিহি কেঁপে উঠলো হঠাৎ এমন শব্দে। অরণ্যের দিকে তাকিয়ে বলল তাকে —--
— ‘জ্বীন-ভূত ভর করেছে তোকে।’
— ‘পেত্নী ভর করেছে, পেত্নী! ’
কিচ্ছুক্ষণ থেকে অস্ফুট স্বরে বলল —‘ এই পেত্নীর একটা চুমু খেলেই ঠিক হয়ে যাবে অরণ্য।’ অরণ্যের বলা কথাটা আর কেউ না শুনলেও শুনেছে মিহি। এক গাল হেসে বলে উঠেছে সে।
— ‘পেত্নীর নাম কী? কোথায় থাকে? ঠিকানা বল!’
মিহি মেয়েটা বরাবরই বেশি কথা বলে, তবে এতে অরণ্য বিরক্ত হয় না। এই মেয়েটাকে তার কিরণের মতোই লাগে। মিহির মাথায় গাট্টা মেরে বলল অরণ্য—--
— ‘চুপ করে খাবার খা।’
— ‘উপকারীর ঘাড়ে কিল।’
— ‘আমি তো মাথায় দিলাম।’
মিহি দুই হাত জোড় করে বুঝিয়ে দিল অরণ্যকে, সে পারবে না অরণ্যের সাথে কথা বলে। চুপ করে খাবার খাচ্ছে মিহি। এদিকে আদ্রীশ চুপটি করে বসে আছে আনহার ঠিক সামনের চেয়ারে। আসার পর থেকেই তার দৃষ্টি আনহার পানে। আনহা কি জানে? সে যেভাবে অরণ্যকে চায়, কেউ একজন তাকেও ওভাবে চায়। নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসে তাকে।
ঠিক-ভুল যা-ই হোক, সবসময় সাপোর্ট করে যায় বোকার মতো। বারবার নিজেকে বোঝায় আদ্রীশ— এই স্বার্থপর মেয়েটাকে নিয়ে সে ভাববে না আর। আর ভালোবাসবে না মনে মনে! কিন্তু পারে না কেন? কেন বারবার বলতে ইচ্ছা করে, —‘ আনহাকে সে ভালোবাসে!'
ওয়েটার এসেছে, জুসের গ্লাস নিয়ে যাওয়ার আগে চোখ দিয়ে ইশারা করে গেছে আনহাকে। আনহাও ইশারা দিয়ে তাকে কিছু বুঝিয়েছে। আনহাদের টেবিলে খাবার সার্ভ করেই লোকটা গেছে সুবহাদের টেবিলে। খাবারের মাঝখানে মিহি যখন একটা গ্লাস তুলবে, আনহা ধমকের স্বরে বলে উঠল —--
— ‘এটা অরণ্যের।’
সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এভাবে চিৎকার দিয়ে উঠার মানে বুঝল না কেউই। সবাই বড় বড় চোখ করে তাকিয়েছে আনহার দিকে। তিন জোড়া চোখকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা অস্বস্তি হলো আনহার। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মুখে হাসি টেনে বলল সবার উদ্দেশ্যে —--
— ‘না মানে, গ্লাসটা তো ওয়েটার অরণ্যের পাশেই রেখে গেল, তাই বলছিলাম না নিতে।’
— ‘সব গ্লাসেই তো অরেঞ্জ জুস আছে, নিলে ক্ষতি কী ছিল? ওটাতে কি স্পেশাল কিছু মিশিয়ে এনেছে?’
চোখ-মুখের ভাবভঙ্গি মুহূর্তেই পরিবর্তন হয়ে গেল আনহার। ঘাবড়ে গেল সে। কথা কাটানোর জন্য সঙ্গে সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলো।
অরণ্যের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি খেলে গেলো কিছু একটা বুঝতে পেরেছে হয়তো। তবে কথা বাড়ালো না, মাথা নষ্ট! আপাতত সুবহাকে দেখতে ব্যাস্ত সে।
———
ডিনার শেষ হলে সুবহা আর রাইয়ান উঠে চলে গেছে সেখান থেকে। অরণ্যও যেতে চাইছিল, পিছু পিছু আনহা পথ আটকে দাঁড়িয়েছে তার। বিরক্তি নিয়ে আনহার দিকে তাকিয়েছে অরণ্য। ভ্রু কুঁচকে রেগেমেগে বলছে তাকে —--
—‘সমস্যা কি? পেট খারাপ হয়েছে? বাথরুমে যা, আমার পথ আটকালি কেন?’
—‘আমি তোকে কিছু বলতে চাই, অরণ্য।’
—‘পরে শুনবো।’
অরণ্য চলে যেতে চাইলে আনহা হাত ধরে নিয়েছে তার। রাগ হলো এবার অরণ্যের। বিরক্ত হয়ে কিছু বলতে গেলে আনহা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলো—--
—‘আমি তোকে ভালোবাসি, অরণ্য। সেই কলেজ লাইফ থেকে। বারবার আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে কী বুঝাতে চাস তুই?’
অরণ্য কোনো হেয়ালি করল না, আনহার থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো তাকে —--
—‘আমি তোকে বহুবার বলেছি, আনহা। আগেও বলেছি, আর এখনো বলছি শুন— তোকে আমি সবসময় আমার বন্ধুর নজরেই দেখে এসেছি। তোদের সাথে সম্পর্কটা আমার ফ্যামিলির মতো। আমি যেমন আদ্রীশ-মিহিকে ভালোবাসি, তেমন তোকেও। ফ্রেন্ড হিসেবে আমি তোকে বরাবরই পছন্দ করি।’
—‘ভালোবাসিস না আমাকে?’
ঠোঁটের কোণে এক ছিলতে হাসি নিয়ে বলল অরণ্য —--
—‘ বাসি'তো ফ্রেন্ড হিসেবে। ’
কিছুক্ষণ থেমে আবারও বলল অরণ্য — ‘ আমার ভালোবাসায় যে ছিলো সে এখনো আছে আর পরেও থাকবে। ’
—‘কে সেই ভাগ্যবতী? সুবহা! ওর মধ্যে এমন কী আছে, অরণ্য, যা আমার মধ্যে নেই? কেন আমাকে পছন্দ নয় তোর? আমাকে বল, আমি নিজেকে চেইঞ্জ করে ফেলবো।’
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্রীশের দিকে তাকালো অরণ্য। মুখে হাসি নিয়ে আনহার উদ্দেশ্যে বলল —--
—‘তুই যেমন ঠিক তেমনভাবেই তোকে কেউ একজন পছন্দ করে। আমার জন্য নিজেকে চেইঞ্জ করতে হবে না, তার জন্য তোর সবটুকু ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখ।’
অরণ্য চলে গেছে কথাটা বলেই। আনহার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে টুপটুপ করে। কেন অরণ্য বুঝে না তাকে? পাশে থাকা চেয়ারটাতে দপ করে বসে পড়লো আনহা। আদ্রীশ দাঁড়িয়ে আছে তার পাশেই। আনহার এমন অশ্রুভেজা চোখ, বিধ্বস্ত চেহারা দেখে বুকের ভিতর কেমন চিনচিন ব্যথা হচ্ছে তার। একতরফা ভালোবাসা বোধহয় এমনই হয়। এই যে আনহাকে অরণ্য চায় না, ঠিক একইভাবে সেও আদ্রীশকে চায় না। আনহা যেভাবে পুড়ছে অরণ্যকে না পেয়ে, একইভাবে পুড়ছে আদ্রীশও। আনহা কি বুঝবে কখনো? আদ্রীশ তাকে ভালোবাসে মনে-প্রাণে।
মিহি গালে হাত দিয়ে বসে আছে এখনো। অরণ্য যে আনহাকে পছন্দ করে না, এটা মিহি জানে। তবে সুবহার প্রতিও যে অরণ্যের তীব্র রাগ, এটাও তার অজানা নয়। সেই সুবহার কথাই কি অরণ্য বলল এখন! মিহির কেমন খটকা লাগছে, সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে তার।
ওয়েটার এসে আবারও চোখ দিয়ে ইশারা করলো আনহাকে। মন-মেজাজ ভালো নেই তার, বাসায় ফিরতে হবে এক্ষুনি। আদ্রীশ আর মিহি পৌঁছে দেবে তাকে। তবে এর আগে এই ছেলেটার সাথে কথা বলে যেতে হবে। চোখের পানি মুছে ওয়াশরুমে যাবে বলে উঠেছে আনহা।
ছেলেটা এসে দাঁড়িয়েছে আনহার পাশে। পার্স থেকে কিছু টাকা বের করে আনহা তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। ছেলেটা চোখে-মুখে ভয় নিয়ে আমতা-আমতা করে বলল—
—‘ম্যাম, ভুল হয়ে গেছে।’
—‘কি ভুল হয়েছে?’
—‘আসলে, স্যারের গ্লাসটা আমি ভুল করে অন্য টেবিলে সার্ভ করে দিয়েছিলাম।’
আনহা তেমন রাগ করলো না। এমনিতেও কাজ হতো না কিছুই। পাশের টেবিলে বসে থাকা সুবহাকেও দেখেনি সে, তাই তেমন কিছুই ভাবল না। ভ্রু কুঁচকে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে—‘ইডিয়েট।’
বলে চলে গেছে সেখান থেকে।
———
রাইয়ান চলে গেছে বেশ অনেকক্ষণ হলো। সুবহা দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে। তার মাথাটা কেমন ভনভন করছে, বমি বমি পাচ্ছে। অস্বস্তি লাগছে খুব। মাথায় দুই হাত চেপে ধরেছে ভাবছে সে— কেন এমন হচ্ছে? কিছুই তো তেমন খায়নি।
অরণ্য বেরিয়ে আসতেই দেখতে পেলো সুবহাকে। কেমন টলছে সে, মনে হচ্ছে এক্ষুনি পড়ে যাবে মাটিতে। অরণ্য গিয়ে সামনে দাঁড়ালো। মাথা তুলে সামনে তাকালো সুবহা। নিজেকে কেমন মাতাল মাতাল লাগছে তার। অরণ্যের দিকে তাকিয়ে হাসছে সে।
অরণ্য অবাক হলো—সুবহা তাকে দেখে হাসছে? অরণ্যকে দেখলে তো এই মহিলা এমন মুখ করে তাকায় মনে হয় তিত করলার শরবত খেয়েছে মাত্রই। কিছু বলতে যাবে অরণ্য, তার আগেই সুবহা গলা জড়িয়ে ধরল অরণ্যের। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অরণ্যের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলে উঠল সুবহা —--
— ‘শুভ জন্মদিন, রাগী ডাক্তারবাবু।’
অরণ্য চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। সুবহার মুখ থেকে কেমন অ্যালকোহলের বাজে গন্ধ আসছে। কিন্তু এই রেস্টুরেন্টে অ্যালকোহল আসবে কোথা থেকে? রাইয়ান কিছু করেনি তো? রাগে নিজের দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করল অরণ্য। সুবহার বাচ্চামো দেখে আবার কোথায় উড়ে গেল সেই রাগ।
অরণ্যের ঠোঁটে স্লাইড করে হাসছে আর বিড়বিড় করে বলছে সুবহা— ‘এই ঠোঁট আমার। রাগী ডাক্তারবাবুও আমার।’
অরণ্য হাসল সুবহার কথা শুনে। মনে মনে খুশি হলো—সুবহার মনে আছে তার জন্মদিনের কথা?
নিজের গাড়িটা রেখে গেছে অরণ্য, চাবি দিয়ে এসেছে মিহি আর আদ্রীশের কাছে। সুবহার সাথে কীভাবে কী হয়েছে কিছুই জানে না সে, কালকে দেখে নেবে সবটা। আপাতত তার লাভবার্ডের সাথে সময় কাটাবে এখন, ঘুরবে তাকে নিয়ে।
সুবহাকে কোলে তুলে নিল অরণ্য, সেভাবেই উঠল গাড়িতে। অরণ্যের কোলে বিড়াল ছানার মতো ঘাপটি মেরে বসে আছে সুবহা। অরণ্যের গলা জড়িয়ে ধরেছে সে, একবার তার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে তো আরেকবার নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতো অরণ্যের মুখপানে তাকিয়ে দেখছে তাকে।