অরণ্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কিরণ কিছুদুরেই সুবহা আর কিয়ান। কিরণের মুখজুড়ে ভয়ের চাপ। ভাইয়ের এমন রাগান্বিত চেহারা দেখে ভয় পেয়ে গেছে সে। অরণ্য এদিকে রেগে আগুন কিরণের দিকে তাকিয়ে তাকে আসতে বলে চলে যাচ্ছিলো। তখনই শুনতে পেলো কিয়ানের কথা। সুবহাকে রাগ দেখিয়ে বলছে কিয়ান —--
—‘ এই অহংকারী ছেলেটার সাথে দেখা করতে আসার কারণ কি সুবহা? ভুলবাল বুঝিয়েছে নিশ্চয়ই! তোর কি মনে নেই এই ছেলেটা কি করেছিল?’
সুবহা বুঝলো ঝামেলা হবে ভাইয়ের হাত ধরে তাকে বলছে —--
—‘ ভাইয়া, বাড়ি চলো। ’
—‘ তুই আগে বল এই ছেলেটার সাথে কেন দেখা করতে এসেছিস?’
কিয়ানের দিকে ভ্রু কুঁচখে তাকিয়ে আছে অরণ্য। ধীর পায়ে কিয়ানের কাছে এগিয়ে এসে গম্ভীর কন্ঠে বলে —--
—‘ তুই কেন আমার বোনের সাথে দেখা এসেছিস? ’
কিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে কিরণের পানে তাকালো, মেয়েটা কেমন ভয় পেয়ে আছে। কিন্তু কিরণকে সে পছন্দ কিরণও তাকে পছন্দ করে এতো লুকোচুরি কিসের? কিয়ান এবার কিরণের থেকে চোখ সরিয়ে অরণ্যকে বলল —--
—‘ আমি কিরণকে পছন্দ করি। কিরণও আমাকে পছন্দ করে জিজ্ঞেস কর ওকে। ’
—‘ তোর বোনও মনে মনে আমার বাচ্চার মা হয়ে গেছে। সেজন্যই বাচ্চার বাবার সাথে দেখা করতে এসেছে। ’
কিয়ান রেগে তাকিয়েছে অরণ্যের দিকে অরণ্য পাত্তা দিলোনা তেমন চলে যেতে যেতে বলল —--
—‘ এমনিতেই কি তোকে আমি বা/ল পাকনা বলি? ভবিষ্যৎ বাচ্চাদের মামা হবি তাই কিছু বললাম না। ’
অরণ্যের পিছু পিছু কিরণও চলে গেছে। বেচারির মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছেনা বাড়িতে গিয়ে অরণ্য কি লংকা কান্ড বাধাবে এটা নিয়ে বেশ চিন্তিত সে। সুবহা কিয়ানকে বুঝিয়ে সুজিয়ে নিয়ে এসেছে গাড়ির কাছে। সাথে করে বাইক নিয়ে এসেছিলো বিদায় সুবহার সাথে যেতে পারেনি কিয়ান সে চলে গেছে আগেই। গাড়িতে উঠবে তখনই কেউ শাড়ির আঁচল টেনে ধরলো সুবহার। থেমে গেলো তার পা জোড়া। ঘুরে তাকালে দেখতে পেলো সেই পরিচিত মুখ, পরিচিত হাসি। অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে সুবহার সামনে সুবহা কিছু বলতে গেলে থামিয়ে দেয় অরণ্য তাকে কানের কাছে এসে বলে —--
—‘ বিয়ের কথাটা ভেবে দেখবে লাভবার্ড। আমি অন্য কারো হয়ে গেলে পরে কিন্তু কান্না করবে!’
সুবহার দিকে একটা ফ্লাই কিস ছুঁড়ে দিয়ে চলে গেলো অরণ্য। সুবহা শুধু তাকিয়ে দেখলো। এই অরণ্য পুরোপুরি অচেনা তার কাছে। বছর দুয়েক আগেও যখন অরণ্যকে দেখতো! সবসময় লুকিয়ে লুকিয়ে অনুসরণ করতো, তখন তো অরণ্য এমন ছিলোনা! সুবহা চলে গেলো, নিজের মনকে শতো কষ্টে বুঝালো সে অরণ্যকে ভালোবাসেনা। অরণ্য তার বোনের ভালোবাসা। কিন্তু সেই তো সুবহা দূর্বল হয়ে পড়ছে অরণ্যের প্রতি।
———
সোফার এক কোণে বসে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে কিরণ। মা বাবা দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন পাশে। ওনাদেরও কিয়ানকে পছন্দ, কিন্তু অরণ্যের অমথ তাকায় চুপই আছেন। বাড়িতে এসেই কিরণকে বড়সড় কয়েকটা ধমক খেতে হয়েছে। অরণ্যের এমন ব্যাবহারের কারণ অজানা কিরণের কাছে। অরণ্য তো কোনোকালেই এতো কড়া ছিলোনা! কিরণ হুট করেই উঠে দাঁড়িয়েছে মা বাবার দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলছে —--
—‘ আম্মু, আব্বু কি হচ্ছে এসব! তোমরা কিছু বলছোনা কেন ভাইয়াকে?’
—‘ আম্মু আব্বু কিছুই বলবেনা, আমি বলছি শুন। ওই অকর্মা কিয়ানের সাথে তুই যদি আরেকবার দেখা করতে গিয়েছিস পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখব আমি।’
—‘ কেন ? আগে তো কিয়ান ভাইয়ার সাথে আমি কথা বলতাম তারা আমাদের বাড়িতে আসতো। আমরা তাদের বাড়িতে যেতাম কই তখন তো কিছু বলতে না?’
—‘ কিরণ, তুই আমার মুখে মুখে তর্ক করছিস! ’
—‘ না, আমি বুঝানোর জন্য বলেছি শুধু। ’
—‘ এতো বুঝাতে হবেনা আমাদের। আমরা তোর জন্য যে ছেলে ঠিক করেছি বিয়েটা তার সাথেই হবে। আর খুব তাড়াতাড়ি, বিয়ের আগে ওই কিয়ানের সাথে তুই দেখা কর এটা আমি চাই'না। চুপচাপ গিয়ে ঘরে বসে থাক! ’
কিরণ অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো তার আম্মু আব্বুর দিকে। দুজনেই চোখ সরিয়ে নিয়েছেন সাথে সাথে। কি বলবেন ওনারা? অরণ্য যে আগেই বারণ করে দিয়েছে এই বিষয়ে কোনো কথা না বলতে। কিরণের এমন মিথ্যা বলে কিয়ানের সাথে দেখা করার বিষয়টা তাদেরও পছন্দ হয়নি। কিরণ চলে গেলো সেখান থেকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলছে সে —--
—‘ যা ইচ্ছে করো তোমরা। ’
অরণ্যের কি যেন মনে হলো, ডাক দিলো কিরণকে। কিরণ মনে মনে খুশি হলো ভেবেছে ভাই তাকে সরি বলবে নিজের ব্যাবহারের জন্য। ছোট বেলায়ও অরণ্য এমনটাই করতো, কোনো ভুল করলেই আবার কিরণের সামনে এসে কান ধরে বলতো — ‘ ভুল হয়েছে সেনোরিটা,এইবারের মত ক্ষমা করে দে আমাকে। ’ ওসব ভাবলেও এখন হাসি পায় কিরণের। কিরণ এসে অরণ্যের সামনে দাঁড়িয়েছে কিনা, চোখ মুখের গম্ভীর ভাব বজায় রেখেই কিরণের দিকে হাত বাড়িয়ে অরণ্য বলছে —--
—‘ ফোনটা দে। ’
কিরণের হাসিমাখা মুখটা চুপসে গেলো মুহূর্তেই। হাতে থাকা ফোনটা পিছনে নিয়ে গিয়ে বলছে।
—‘ কেন? আমি ভুল করেছি তাই বকাঝকা করলে। ফোন কি করেছে! আমার নতুন ফোন মার্ডার করলে কিন্তু ভালো হবেনা ভাইয়া।’
—‘ কিরণ, বেশি কথা না বলে ফোনটা দে।’
অরণ্যের এমন ধমকে কেঁপে উঠেছে কিরণে। ছেলের এমন কাজে এবার অরণ্যের আম্মুরও রাগ হচ্ছে কিছু বলতে গেলে অরণ্যের আব্বু থামিয়ে দিলেন ওনাকে। ভয় পেয়েছে কিরণ! কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা এগিয়ে দিয়েছে ভাইয়ের দিকে। এক মিনিটও দেরি করেনি সে তখনই উপরে চলে গেছে মনের মধ্যে জমানো একরাশ রাগ আর অভিমান নিয়ে।
———
অরণ্যের ফোনে কল আসছে বার বার, হসপিটাল থেকে অন্য ডক্টররা একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছে তাকে। মনে হলো ইমারজেন্সি কিছু হয়ছে, ড্রাইভার আক্কাসকে ফোন দিয়ে আসতে বলেছে অরণ্য— ইমিডিয়েটলি তাকে হসপিটালে যেতে হবে।
আক্কাসকে ফোন দিয়েছে অরণ্য বেশ অনেক্ষন হয়ে গিয়েছে এখনো আসার নাম নেই তার। মাঝেমধ্যে রাগ হয় অরণ্যের এই আক্কাস নামক কচ্ছপকে ড্রাইভার বানিয়ে ভুল করেছে সে।
অবশেষে দেখা মিললো আক্কাসের সে এসেছে এইমাত্র। একটা ক্যাবলা মার্কা হাসি দিয়ে বলল অরণ্যকে —--
—‘ আমি এসে গেছি স্যার। ’
আক্কাস গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে গাড়ির গেইটটা খুলে দিয়েছে অরণ্যকে। অরণ্য ভ্রু কুঁচখে আক্কাসের দিকে তাকিয়ে বলছে।
—‘ খুব ভালো কাজ করেছিস! কাশেমের বিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চা হয়ে হাঁটতে শিখে গেছে। আর তুই এখন এসে ক্যাবলা মার্কা হাসি দিয়ে বলছিস এসে গেছি!’
অরণ্যের থেকে কিছুদুরে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন ড্রাইভার কাশেম হাঁ করে তাকিয়ে আছে অরণ্যের মুখের দিকে। সে বিয়ে করে বাচ্চার বাবা হয়ে গেছে অথচ নিজেই জানেনা! কাশেম কিছু বললনা, চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই৷ এই কয়দিনে অরণ্যের আজগুবি কথা গুলো শুনে একটা কথাই বেচারার মাথায় ঘুরফাক খাচ্ছে এই অরণ্য কি আসলেই ডাক্তার? আক্কাস একবার কাশেমের দিকে তাকালো পরে অরণ্যের দিকে তাকিয়ে বলে —--
—‘ ধীরে ধীরে আসলাম স্যার তাড়াহুড়ো করলে...
কথাটা পুরোপুরি বলে শেষ করতে পারেনি বেচারা, তার আগেই চোখ মুখ শক্ত করে বলে উঠেছে অরণ্য —--
—‘ ধীরে ধীরে করলার শরবত খেয়ে মরে যা হতচ্ছাড়া। তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠ। ’
দেরি করলোনা আক্কাস দ্রুত গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিলো সে।
অরণ্য এইমাত্র নিজের কেবিনে আসলো, অবাক হয়েছে বটে হসপিটালের সব ডক্টররা তাদের ডিউটি রেখে এখানে কি করছে? সাথে আবার আনহাও। কাহিনী কি! সবার দিকে অরণ্যের প্রশ্নবোধক চাহনি দেখে মুখ টিপে হাসছে উপস্থিত সবাই। হঠাৎই মনে পড়লো অরণ্যের আজকে হসপিটালের নতুন ইন্টার্ন আসবে তার জন্যই কি এখানে আসা? অরণ্য কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে বলছে সবাইকে উদ্দেশ্য করে —--
—‘ কাহিনী কি? বিয়ে করলামনা এখনও তোমরা টাকা নিতে হাজির!’
কেউ কিছু বলার আগেই পিছন থেকে এক মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে আসলো অরণ্যের কানে। সবার তাকানো অনুসরণ করে অরণ্যও তাকালো সেদিক পানে।
থ্রি পিছের উপরে এপ্রোন পড়া একটা মেয়ে হাতে ছোট্ট একটা চকোলেট কেক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্যের সামনে। হবে সে আনহার বয়সীই মুখে মিষ্টি হাসি মেয়েটার। এই মুখ এই হাসি সবই পরিচিত অরণ্যের এই মেয়েটা যে তারই ফ্রেন্ড। অরণ্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার নাম #মিহি। ভার্সিটি লাইফে বেশ কয়েকজন বন্ধু হয়েছিলো অরণ্যের আদ্রীশ আর আহনা তো সেই ছোট বেলা থেকেই তার সাথে আছে মিহির সাথে পরিচয়টা হয়েছিল পরেই তবে এই অল্পদিনে অরণ্যেদের বন্ধু তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল মেয়েটি। মিহি অরণ্যের দিকে এগিয়ে এসে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলে —--
—‘ সারপ্রাইজ টা কেমন দিলাম? ’
—‘ তুই এই হসপিটালে ইন্টার্নশীপে আসছিস আগে বলিস নি আমাকে। ’
—‘ আগে বললে কি ডক্টর শেহরাজ অরণ্য এমন ভূত দেখার মতো চমকে যেতো ? ’
অরণ্য কথা বলল না আর মিহির হাসির উত্তরে সে ও হাসলো। সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো মিহিকে। হাতে থাকা কেকটা অরণ্যের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মিহি আর বাকি সবাই একসাথে বলে উঠলো অরণ্যকে। —-- “ শুভ জন্মদিন ডাক্তার সাহেব। ”
অরণ্য অবাক হলো খুব। নিজের জন্মদিনের কথা নিজেরই মনে নেই তার। প্রতিবারই তার কলিগরা জন্মদিনের আগের দিন এমন করে। মাথাতেই ছিলোনা অরণ্যের। তভে ঠিক রাত ১২ টার সময় কিরণ আর আদ্রীশ তাকে মনে করে করে ইউশ করে। এখনো অনেক সময় বাকি তার আগেই সবাই এমনভাবে অরণ্য অবাক করে দিবে ভাবেনি সে। সবার সাথে কেক কাটলো অরণ্য কলিগরা সবাই গিফট এনেছে তার জন্য। নিজের প্রতি সবার এতো ভালোবাসা দেখে অরণ্যের মনটা ভালো হয়ে গেছে মুহূর্তেই।
যে যার মতো চলে গেছে ডিউটিতে, রয়েছে শুধু তারা ৪ বন্ধু। অরণ্য হেসে হেসে কথা বলছে আদ্রীশের সাথে পাশেই বসে আছে মিহি আর আনহা। সবাই কথা বললেও চুপটি করে আছে আনহা মনে মনে সে ভাবছে কিছু — আনহার সাথে অরণ্যের বিয়েটা ঠিক করেছেন দুই পরিবারের মানুষরাই অরণ্যকে এখনো পর্যন্ত ভালোবাসি কথাটা বলা হয়নি তার। অরণ্য সুবহার প্রতি দূর্বল হয়ে যাচ্ছে আবারও এটা লক্ষ্য করছে আনহা। সেদিন নিশ্চয়ই সেজেগুজে সুবহা অরণ্যের সাথেই দেখা করতে গিয়েছিল। আনহার মনে হলো এবার তাদের বিয়েটা করে নেওয়া দরকার কোনো ভাবেই অরণ্যকে হারাতে চায় না সে। আজকে অরণ্যকে সে বলবে নিজের ভালোবাসার কথা।
———
দরজার সামনে আসতেই অরণ্য দেখা পেলো সেই পিচ্ছি মেয়েটার যার আব্বুকে সেদিন নিয়ে এসেছিল হসপিটালে। ওনাকে চেক করতেই অরণ্য যাচ্ছিলো এখন। মেয়েটাকে দেখে চিন্তা হলো তার। মনে মনে ভয় পেলো, মেয়েটার বাবার শরীর খারাপ হয়নি তো আবারও! কিন্তু না, এমন কিছুই হয়নি তার বাবা এখন পুরোপুরি সুস্থ তবে বেড রেস্টেই আছেন দুই একদিন পরে হসপিটাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে ওনাকে। মেয়েটা নিজের হাতে করে কিছু নিয়ে এসেছে অরণ্যের জন্য। অরণ্য জিজ্ঞেস করলো তাকে।
—‘ কি লুকিয়ে রেখেছ মিষ্টি?’
—‘ আপনার জন্য উপহার এনেছি।’
অরণ্য হাত বাড়িয়ে বলল মেয়েটাকে —--
—‘ দাও তাহলে। ’
মেয়েটা এবার সাহস পেলো একটা সুন্দর ফুলের চারাগাছ এনেছে সে ছোট্ট একটা টবে করে। অরণ্যের দিকে সেটা এগিয়ে দিয়ে মুখে মিষ্টি হাসি টেনে বলল —--
—‘ শুভ জন্মদিন ডাক্তার সাহেব। ’
অরণ্য হাসলো। মেয়েটার থেকে ফুলের চারাগাছটা নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ধন্যবাদ জানালো মেয়েটাকে। অরণ্যের মুখে হাসি দেখে খুশি হলো মেয়েটা।
———
দিনের আলো কেটে গিয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে চারিদিকে। ছাদের রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুবহা। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে কিয়ান। কেউই কোনো কথা বলছেনা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দুজনেই। এসেছিলো প্রথমে সুবহাই পরে কিয়ান। কিয়ান কেমন মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে, সুবহা লক্ষ্য করেছে এটা। নিরবতা ভেঙে কথা বলেছে সে নিজেই।
—‘ কিরণের সাথে কথা হয়েছে ?’
সুবহার কথা শুনতে পেয়েছে কিয়ান। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বোনের মুখপানে তাকালো সে। চোখ মুখে তার চিন্তারা ভীর করেছে। বাসায় এসেছে পর থেকেই ভেবে যাচ্ছে কিরণের কথা। নিজেকে স্বাভাবিক করে সুবহার কথার উত্তর দিলো কিয়ান।
—‘ না, ওর ফোন বন্ধ অনেকবার ট্রাই করেছি ঢুকতে পারছিনা কোনোভাবেই।’
—‘ কিরণ কি তোমাকে পছন্দ করে ভাইয়া?’
—‘ কি মনে হয় তোর? কিরণকে আমি বহুবার বলেছি, আমার কথা দিয়ে বুঝিয়েছি আমি ওকে ভালোবাসি। আজকে ওর চোখে আমার প্রতি ভালোবাসা দেখেছি সুবহা। অরণ্যের সামনে যখন বললাম ওকে পছন্দ করি কোনো রিয়েক্ট করলোনা কেন? তার মানে তো এটাই কিরণ আমাকে পছন্দ করে।’
সুবহা শুনলো ভাইয়ের সব কথা। কিয়ান কেমন পাগল পাগল হয়ে গেছে। কথা বলার সময় সুবহা লক্ষ্য করেছে এটা। কিয়ান বার বার বলছে সুবহাকে যেভাবেই হোক কিরণের বিয়েটা আটকাতে নইলে মরে যাবে সে। কিরণ ভাইকে আশ্বস্ত করেছে এই বিয়ে সে হতে দিবেনা যেভাবেই হোক আটকাবে। কিয়ানের চোখ মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছেনা সবসময় হাসি ঠাট্টা করা কিয়ান কেমন চুপচাপ হয়ে বসে থাকে আজকাল। সুবহা ভাইয়ের কাঁধে হাত দিয়ে বলে।
—‘ যাও গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কিরণ তোমারই হবে চিন্তা করোনা।’
—‘ কথা দিচ্ছিস তো। ’
—‘ দিলাম।’
বোনের কথা শুনে মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠেছে কিয়ানের। সুবহাও হাসলো কিয়ানের হাসির উত্তরে।
———
সুবহার মনে হলো আবারও অরণ্যের সাথে কিয়ান আর কিরণের বিষয়টা নিয়ে কথা বলা দরকার৷ অরণ্যই হয়তো কিরণেএ ফোনটা নিয়ে অফ করে রেখেছে। নইলে এতো সময়ে একবার হলেও কিরণ ফোন দিতো তাকে। কললিস্ট থেকে অরণ্যের নাম্বারটা বের করে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে সুবহা। কল দিবে কি দিবেনা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে সে। কিন্তু অরণ্যের সাথে কথা বলাটাও যে জরুরি। অনেক ভেবে ঠিক করলো, কল দিবে অরণ্যের নাম্বারে ঠিক তখনই রাইয়ানের নাম্বার থেকে ফোন আসে তার কাছে। নাম্বারটা সেইভ করাই ছিলো তাই সুবহার বুঝতে সমস্যা হয়নি এটা কে। ফোনটা ধরে কানে নিতেই রাইয়ানের কন্ঠস্বর কানে আসলো তার।
—‘ কেমন আছেন মায়াবতী? ’
সুবহার ঠিক পছন্দ হলোনা রাইয়ানের কথা। তবুও কিছু বললনা সে। লোকটা অসুস্থ, খোঁজ নিয়ে জেনেছে সুবহা আজকেই ওনি নিজের বাসায় ফিরেছেন। যত যাই হোক এই এক্সিডেন্টে সুবহা কিছুটা হলেও দায়ী ছিলো, তাই তেমন রাগ দেখালো সে। সুন্দর ভাবেই উত্তর দিলো রাইয়ানের কথার।
—‘ ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?’
—‘ ভালো লাগছে এখন। ’
—‘ কি বলতে ফোন দিয়েছেন? ’
—‘ দেখা করবেন আমার সাথে?’
—‘ এখন! ’
—‘ হ্যাঁ। ’
—‘ আপনার সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ কোনো সম্পর্ক এখনো গড়ে উঠেনি। কাজের বাহিরে আপনার সাথে আমার কথাও হয়নি কখনো। এভাবে রাত বিরাতে দেখা করতে বলাটা খারাপ দেখায় না?’
—‘ রেগে গেলেন?’
—‘ হুটহাট রাগ করা আমার স্বভাবে নেই মি.রাইয়ান চৌধুরী। তবে আপনার কথাটা ছিলো রাগ করার মতোই। ’
কলটা কেটে দিলো সুবহা। লোকটার কথায় মেজাজ বিগড়ে গিয়েছে তার। জানা নেই শুনা নেই দেখা হয়েছে মাত্র একবার তাও অফিসিয়াল কাজে এই অল্প পরিচয়ে দেখা করতে বলাটায় বিরক্ত হয়েছে সুবহা। অরণ্যকে আর ফোন দেওয়া হবেনা আজকে এই ভেবে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো সে।