অন্তরালের প্রণয়িনী

পর্ব - ১৮

🟢

অরণ্যের কথায় জাহিদ হোসেন আর ওনার ভাই দুজনেই একে অপরের দিকে তাকালেন। কি যেন ভেবে জাহিদ হোসেন অরণ্যের কাছে গেলেন, কাধে হাত রেখে বললেন—--

—‘তুমি অন্যায় করছো না তো, অরণ্য?’

জাহিদ হোসেনের কথায় সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো অরণ্য।

—‘একেবারেই না।’

অরণ্য চলে যাবে বলে পা বাড়িয়েছে, আবারও তাকালো সে সিঁড়ির দিকে; এখনো সুবহা দাঁড়িয়ে আছে তার আগের জায়গাতেই, পা দুটো চলছেনা তার। অরণ্য হেঁটে সুবহার কাছে গেলো; অরণ্যকে দেখেই কিয়ান চলে গেছে অন্যদিকে।অরণ্য মুচকি হেসে বলল সুবহাকে —--

—‘নিজের যত্ন নিও, লাভবার্ড, সুখবরটা সবার আগে আমাকেই জানাবে— যতই হোক বাচ্চার বাবা বলে কথা। ’

সুবহা দাঁত কটমট করে বলে উঠেছে—--

—‘যাবেন আপনি!’

—‘যাচ্ছি, তবে আবার আসবো, বর সেজে তোমাকে বউ বানিয়ে নিয়ে যেতে।’

কথাটি বলেই অরণ্য চলে গেলো সেখান থেকে। তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে কৌতুহলী তিনজোড়া চোখ। সুবহা আর দেরি করেনি, চলে গেছে নিজের রুমে। যাওয়ার সময় আনহার সাথে তার চোখাচোখি হয়েছে, তবে কেউই কোনো কথা বলেনি। এখানে বেশিক্ষণ থাকলেই সবার নানা প্রশ্নে জর্জরিত করবে সুবহাকে; সেজন্যই চলে গেলো সে। রিফাত আর জাহিদ হোসেনের বোন দুজনেই এতো সময় দাঁড়িয়ে সবটা দেখলেন। রিফাত ভালো করেই জানে—সুবহা কোনোদিনও বিয়ে করবেনা তার সাথে, কিন্তু তার আম্মুকে কে বুঝাবে? তিনি যে রেগে গেছেন, অরণ্যের বলা কথা শুনে, রিফাতের আম্মু ওনার ভাইয়ের কাছে গিয়ে চোখ-মুখ শক্ত করে প্রশ্ন করলেন ওনাকে।

—‘ছেলেটা কি বলে গেলো, বুঝতে পারলেন ভাইজান?’

ফুফির কথায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ান বলে ওঠেছে।

—‘ছেলেটা তো বাংলায় কথা বলেছে, বুঝতে না পারার কি আছে, ফুফি?’

—‘চুপ কর, কিয়ান, আমি তোর বাপ চাচার সাথে কথা বলছি, তোর সাথে নয়।’

কিয়ান আর কথা বলেনি; চুপচাপ খাবারের টেবিলে গিয়ে বসেছে সে। সুবহার আম্মু আর চাচি অরণ্যের জন্য চা নাস্তা বানিয়ে নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু এসে অরণ্যকে আর পেলেন না তারা। অরণ্য চলে গেছে, তাতে কি হয়েছে? কিয়ান তো আছে। মায়ের হাত থেকে খাবারের প্লেটটা নিয়ে, ডায়নিং টেবিলে গিয়ে বসেছে সে। চলেই যেতো, কিন্তু সবার কথা শুনবে বলে খাবার খাওয়ার ভান ধরে বসে পড়ল সেখানে। কালকে যে সবাই মিলে কিরণদের বাসায় গেলেন, কি হয়েছে না হয়েছে—এটাও তো জানতে হবে তাকে।

—‘ অরণ্য কি চায় তোমাদের কাছ থেকে? কিসের কথা বলে গেলো ছেলেটা? ’

বোনের কথায় চুপ রইলেন জাহিদ হোসেন। বাকিরাও চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন, কারোর মুখেই কোনো কথা নেই। সিঁড়ি দিয়ে দোতলা থেকে নিচে নামতে নামতে বলল আনহা —--

—‘ অরণ্য কি এটাই বলেছে চাচ্চু! কিরণকে কিয়ানের সাথে বিয়ে দিবে যদি সুবহাকে তার হাতে তুলে দেও। ’

আনহার কথা শুনে সবাই তাকালো তার দিকে; বাড়ির দুই বউ একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে কি যেন কথা বললেন। কিয়ান স্তব্ধ হয়ে বসে রইল, সেখানেই মনে মনে ভাবছে সে—অরণ্য কি সত্যিই এমন কিছু বলেছে? সুবহার আম্মু এগিয়ে গেলেন আনহার কাছে, ভালো করে লক্ষ্য করলেন মেয়েটাকে চোখ-মুখ কেমন ফুলে আছে; আনহার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন তাকে —--

—‘অরণ্য কি বলেছে, আমার জানা নেই; তবে ছেলের খুশির জন্য মেয়েকে আমরা কষ্ট পেতে দিবোনা।’

আনহা হাসলো তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল —--

—‘তোমার মেয়ে তো খুশি থাকবে, বড়মা।’

—‘এভাবে বলছিস যে? তুই আর সুবহাকে কখনো আমি আলাদা করে দেখেছি?’

আনহা মুচকি হাসলো; কথা বললনা তেমন। কিছুদূরে চিন্তিত মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার বাবা-চাচার কাছে গেলো। হাসিমুখ করে বলল তাদের—--

—‘অরণ্যের বিয়েটা সুবহার সাথেই হওয়ার কথা ছিলো; মাঝখানে আমি ঢুকে পড়েছি। খুব অনুশোচনা হয় আজকাল; আমি ঠিক করে নিয়েছি এই বিয়েটা আমি করব না। তোমরা অরণ্যের সাথে আমার বিয়েটা ভেঙে দাও, চাচ্চু।’

দুই ভাই একে অপরের দিকে তাকালেন, কি যেন ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন জাহিদ হোসেন—--

—‘এটা হয়'না মামুনি।’

—‘কেন হবেনা চাচ্চু? আল্লাহ হয়তো এটাই চান সুবহার সাথে বিয়েটা অরণ্যেরই হোক৷ আমি বরং ওদের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়েই থাকব।’

আহনার এমন উদারতা দেখে বড্ড খুশি হলেই জাহিদ হোসেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন আনহাকে।

—‘তুমি ভেবে বলছো তো, মা?’

—‘আমি ভেবেই বলছি, চাচ্চু। অরণ্য আমাকে পছন্দ করেনা; কেবল আমার পছন্দে কিছু যায় আসে না। এই বিয়েটা হলে আমাদের সুন্দর বন্ধুত্ব নষ্ট হবে। আমি নিজের ইচ্ছায় বিয়েটা ভেঙে দিলাম,ওদেরকে জানিয়ে দিও।’

কিয়ান চলে যাচ্ছিলো, কিন্তু আনহার বলা কথাগুলো শুনে আজকে খুব খারাপ লাগলো তার। পরক্ষণেই আবার ভাবলো—“দুই বছর আগে সুবহা আর অরণ্যের বিয়েটা তো ভেঙেছিলো; আনহাই নিজের ভুল বুঝতে পেরে শুধরে নিয়েছে এই অনেক।” তবুও বলা যায়'না মনে মনে কি ভেবে রেখেছে নিজের মায়ের পেটের বোন তো সে হাড়ে হাড়ে চেনে আনহাকে।

কিয়ান যাওয়ার পরেই আনহা চলে গেলো সেখান থেকে; রিফাতের আম্মু তখনই বের হয়ে গিয়েছিলেন, যখন বুঝতে পেরেছিলেন ভাইয়েরা ওনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তিনিও দেখে নিবেন, ওনার ছেলের সাথে বিয়ে না দিয়ে অরণ্যের সাথে বিয়ে হলে সুবহা কতোটা ভালো থাকে। মাকে বুঝাতে পিছু পিছু চলে গিয়েছিলো রিফাতও।

———

আয়নার সামনে গিয়ে পেটের উপর থেকে শাড়িটা সরিয়েছে সুবহা। লালচে জকমের দাগ স্পষ্ট, কারোর পাঁচ আঙুলের নখের আছড় বসে গেছে সেখানে। হাত দিয়ে ছুঁতেই তীব্র জ্বলুনি অনুভব হলো তার। চোখ-মুখ কুঁচখে বন্ধ করে নিয়েছে, সাথে সাথে রাগে মাথায় আগুন জ্বলছে; সুবহার ইচ্ছে করছে এক্ষুণি গিয়ে অরণ্যের হাতে একটা কামড় বসিয়ে দিতে। এই হাতেই তাকে আঘাত করেছে অরণ্য; সুবহাও ছেড়ে দিবেনা অরণ্যকে। কথাটা বলেছে কিনা মনে পড়ে গেছে, গাড়িতে বলা অরণ্যের কথাটা।

আবারও কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো সুবহার—“সত্যিই কি অরণ্যের সাথে কিছু হয়েছে তার? কি অঘটন ঘটিয়েছে সে! নাকি অরণ্য ইচ্ছে করেই সুবহাকে ভয় দেখাতে এসব বলছে?” কারোর পদধ্বনি কানে আসলো সুবহার; তাকালো দরজার দিকে। দেখতে পেলো আনহাকে। আজকে আনহাকে অন্যদিনের মতো লাগছে; বার বার মনে হচ্ছে সেই আগের আনহাকে চোখের সামনে দেখছে সুবহা। চোখ-মুখে সুবহার প্রতি কোনো রাগ নেই; তার মুখের সেই চেনা হাসিটা আবারও ফিরে এসেছে। হঠাৎ এমন পরিবর্তনের কারণটা কি? সুবহার প্রতি সব রাগ কি চলে গেছে আনহা? বেশিকিছু ভাবলোনা সে। শাড়িটা ঠিক করে ভিতরে আসতে বলল আনহাকে।

আনহা এসে, সুবহার ঠিক সামনে দাঁড়িয়েছে, মুখে হাসি টেনে, সুবহাকে উদ্দেশ্য করে বলছে—--

—“কেমন আছিস তুই, সুবহা?”

সুবহার কেমন খটকা লাগছে; আনহা তো কখনোই তার সাথে ভালো-মন্দ কোনো কথাই বলেনা। আজকে নিজে থেকেই কথা বলতে আসলো যে! সুবহা কিছু ভাবছে, বুঝতে পারছে আনহা; সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই, নিজে বলে ওঠেছে—“তুই তো ভালোই থাকবি, সুবহা; এই বড় বাড়ি, অফিস, অরণ্য সবই তোর। তোর তো ভালো থাকারই সময়, আমি ভুল প্রশ্ন করলাম, তাই না?”

এবার কিছুটা নিশ্চিত হলো সুবহা—আনহা আবারও নিজের আগের রূপে ফিরে এসেছে দেখে। মনে মনে বলছে, “কুত্তার লেজ এত তাড়াতাড়ি সোজা হয় না।” আনহার মনে হলো, সুবহা বিড়বিড় করে কিছু একটা বলেছে; বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করলো তাকে।

—‘ কিছু বললি আমাকে?'

—‘শুন আপু, এই বাড়ি আর অফিস যতোটা আমার, ঠিক ততোটাই তোর আর ভাইয়ার। এটা নিয়েও পিঞ্চ মারছিস আমাকে? আর রইল বাকি অরণ্যের কথা— আমি একবার যাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি, তাকে আর কাছে ঘেঁষতে দেব না।

আনহার হাসি পেলো সুবহার কথা শুনে। হাসতে হাসতে বলল—-

—‘তুই কি বলতে চাইছিস? তোদের মধ্যে কিছুই নেই?’

—‘না, নেই।’

—‘তোর শাড়িটা চেঞ্জ হলো কিভাবে, সুবহা? কালকে যখন বেরিয়েছিলি, এটা তো ছিল না! তোকে অরণ্য নিজে এসে পৌঁছে দিলো, সারারাত একসাথে ছিলিস দুজন, তবুও আমাকে বলবি তোদের মধ্যে কিছু নেই?’

আনহার মুখ থেকে কথাটা শোনামাত্রই কয়েক পা পিছিয়ে গেলো সুবহা। চোখ-মুখে তার চিন্তারা ভীড় জমিয়েছে। এটারই তো ভয় পাচ্ছিলো এতোক্ষণ— এখন কিভাবে বুঝাবে আনহাকে, সে কিভাবে অরণ্যের ফ্ল্যাট পর্যন্ত গেলো, নিজেও জানে না। সুবহা কেমন ঘামছে, কী বলবে বুঝতে পারছে না সে। বিছানায় রাখা সুবহার ফোনটাতে নোটিফিকেশন আসে, দেখেও রেখে দিয়েছে চেক করে দেখেনি আর কি এসেছে। সুবহা ফোনটা না তুললেও, তুলেছে আনহা। ফোনের স্ক্রিনে কী যেন দেখলো সে, হাসলো কিছুক্ষণ— সুবহা বুঝতে পারছে না কিছুই, আনহার এই হাসির কারণ কী? আনহা ফোনটাকে সুবহার দিকে ঘুরিয়ে বলে —--

—‘ এরপরও তুই বলবি তোদের মধ্যে কিছুই নেই?’

সুবহা ঘাবড়ালো আনহার এমন কথায়, আস্তে আস্তে চোখ তুলে তাকালো ফোনের দিকে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে তার। এসব কি? কখন হলো? স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে অরণ্য আর সুবহা কতোটা কাছাকাছি। উদোম শরীরে দাঁড়িয়ে থাকা অরণ্য সুবহার পরনে তার শার্টটা, সুবহা নিজে থেকেই অরণ্যে গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে৷ সবকিছু দেখে নিজের প্রতিই নিজের ঘৃণা হচ্ছে তার। সুবহা ফোনটাকে আনহার হাত থেকে নিয়ে বিছানায় ছুড়ে ফেলেছে আনহার হাত ধরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলছে —--

—‘ আপু আমার কথা শুন এসব কিভাবে হলো আমি জানিনা...’

এইটুকু বলতেই সুবহাকে থামিয়ে দিলো আনহা মুখে হাসি টেনে শান্ত কন্ঠে বলল —--

—‘তুই শুন সুবহা, আমি তোদের মাঝখানে এসে পড়েছিলাম ভুল করে। আমিই আবার সরে যাচ্ছি। তোরা বিয়ে করে ভালো থাক, আমি দোয়া করি তোদের জন্য। আমাকে এতো কৈফয়ত দিতে হবেনা।’

বিজ্ঞাপন

—‘তুই আমাকে ভুল ভাবছিস আপু।’

—‘তুই এতো ভয় পাচ্ছিস কেন? আগে তো এমন ভয় পেতি না। আমাকে কতো সুন্দর করে “আপু” বলে ডাকতি; সারাদিন আমার সাথে সাথে থাকতি। বড় হওয়ার সাথে সাথে আপুকেও ভুলে গেছিস তুই, সুবহা?’

আজকে সুবহার ভালো লাগছে খুব—আনহা নিজে থেকে কথা বলতে এসেছে তার সাথে। কতোদিন পর পুরোনো আনহাকে দেখছে মনে হলো। ভালো লাগছে ঠিকই, তবে খারাপটাও কম লাগছে না আনহা যে সুবহা আর অরণ্যকে নিয়ে ভুল ভাবছে। কী যেন ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুবহা, বলল আনহাকে —--

—‘আমি আমার পুরোনো আপুকে অনেক মিস করি।’

আনহা কী যেন ভেবে হুট করে জড়িয়ে ধরলো সুবহাকে। পিঠে হাত বুলিয়ে বললো—--

—‘এখন থেকে তোর পুরোনো আপুকেই দেখতে পাবি, সুবহা।’

সুবহার বিশ্বাস হচ্ছেনা এতো কিছু—সত্যিই কি আনহা চেঞ্জ হয়ে গেছে? নাকি অন্য কোনো ব্যাপার আছে? মুখে সুবহাকে এটা সেটা বললেও নিজের চোখ-মুখ শক্ত করে রেখেছে আনহা—দেখে বুঝার উপায় নেই তার মনে ঠিক কী চলছে। সুবহার রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ান হাঁ করে তাকিয়ে আছে বোনেদের দিকে। সুবহা আর আনহার মধ্যে এতো ভাব হলো কখন আর কিভাবে? আনহার এই হুট করে বদলে যাওয়া খুব ভাবাচ্ছে কিয়ানকে। ঠিক কী চায় আনহা? কেনই বা করছে এসব?

সুবহার সাথে কথা বলে চলে গেছে আনহা। কিয়ান তখন সুবহার রুমে ঢুকেছে, সোফায় বসে বুকে হাত ভাঁজ করে বলছে—--

—‘কাহিনীটা কী বল তো?’

—‘কিসের কাহিনী?’

—‘আনহার ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছিনা—হঠাৎ করে এতো ভালো হয়ে গেলো কিভাবে? এতোদিন কি ওর উপরে কেউ কালো জাদু করে রেখেছিলো?’

কিয়ানের কথা শুনে হাসলো সুবহা। কিয়ান বরাবরই এমন আনহার সাথে ঝগড়া তার লেগেই থাকতো ছোট বেলায় এখনো পরিবর্তন হয়নি কিছুই। তবে এই কালো জাদুর কথা শুনে কেমন হাসি পেলো সুবহার। হঠাৎই মনে পড়ল কাল বাড়ির সবাই কিরণদের বাসায় গিয়েছিলেন তারা কি বলে দিয়েছেন জানতে প্রশ্ন করল কিয়ানকে —--

—‘ওর কথা রাখো। চাচ্চু আর আব্বু কী বলেছেন?’

—‘কোন বিষয়ে?’

—‘কিরণ আর তোমার বিয়ের!’

—‘তুই চাইলেই হবে।’

সুবহা বুঝল না কিয়ানের কথা। ভ্রু জোড়া কুঁচখে কিয়ানের পানে তাকিয়ে প্রশ্ন করল তাকে—--

—‘আমি চাইলেই হবে মানে?’

—‘তুই অরণ্যের সাথে বিয়েতে রাজি না হলে কিরণকেও আমি এ জীবনে পাব না। আর কিরণ অন্য কারো হলে আমি ছাদ থেকে পড়ে সুইসাইড করব।’

কিয়ানের কথা তেমন পাত্তা দিলো না সুবহা। কী হয়েছে সবটা সে নিজেই জেনে নিবে বলে ঠিক করেছে। কিয়ান সুবহাকে কিছু বলতে এসেছিল, তখনই ফোনে কল এসেছে। তার ফোনটা তুলে কানে নিয়েছে, সেখানে বসেই—নাম্বারটা কেমন অচেনা লাগছে নিজের কাছে। কিছু না ভেবেই রিসিভ করেছে কলটা।

—‘কে বলছেন?’

—‘ আমি। ’

কন্ঠস্বরটা খুব চেনা লাগলো কিয়ানের নিশ্চিত হতে প্রশ্ন করল ফোনের ওপর প্রান্তে থাকা মানুষটিকে।

—‘রাগীনি ম্যাডাম?’

—‘ হুম। ’

কিয়ান এবার নিশ্চিত হলো এটা কিরণ। কিরণের কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই মনটা ভালো হয়ে গিয়েছে কিয়ানের, দ্রুত উঠে বেরিয়ে গেছে সুবহার রুম থেকে। কিয়ানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল সুবহা—ভাই তার পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে কিরণের জন্য। ভাবা যায়! এই দুইজনই আগে দেখা হলে ঝগড়া লাগিয়ে দিত।

ক্যাবিনেট থেকে একটা টি-শার্ট আর প্লাজো বের করে ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছিলো সুবহা। হুট করেই মনে পড়লো তখন তার ফোনে আসা ভিডিওটার কথা। কে পাঠিয়েছে ওই ভিডিওটা? দেখবে বলে ফোনটা হাতে নিলো সুবহা।সহসাই কুঁচখালো ভ্রু জোড়া, ভিডিওটা পাঠিয়েছে অরণ্য নিজেই। রাগ হলো, তার ফোনটা ছুড়ে ফেলতে চাইলো—পরক্ষণেই আবার নিজেকে সংযত করে নিল। কল দিলো অরণ্যের নাম্বারে, প্রথমবার রিংটোন বাজতেই অরণ্য ফোনটা ধরে নিয়েছে। রেগে প্রশ্ন করলো সুবহা —--

—‘এসবের মানে কী?’

—‘কোন সবের?’

—‘নাটক করছেন?’

—‘এসব সস্তা কাজ অরণ্য করেনা।’

—‘ভিডিওটা কেন পাঠিয়েছেন আপনি? আর এসবের মানে কী? আমি ভালো করেই জানি এটা ফেক।’

—‘লাভবার্ড, তুমি নিজেও জানো এটা সত্যি। নিজেকে চালাক প্রমাণ করতে এমন বোকা বোকা কথা বলা তোমাকে মানায় না। ভিডিওটা দিয়ে আমাদের স্পেশাল মোমেন্টের কথা আরও একবার মনে করিয়ে দিলাম তোমাকে।’

—‘আমি এগুলো বিশ্বাস করি না। আপনি আমাকে মিথ্যে মিথ্যে ভয় দেখাচ্ছেন, আমি বুঝতে পারছি ভালো করেই।’

—‘তোমাকে আমি ভয় দেখাতে পারি? এখন বিশ্বাস করছো না, তবে কিছুদিন গেলে এমনিতেই বিশ্বাস করবে। রাখলাম, পেশেন্ট দেখছি।’

অরণ্য কল কাটার আগে সুবহা নিজেই কেটে দিয়েছে। মাথাটা ঠান্ডা করতে হবে তাকে আর নিতে পারছেনা এসব ঝামেলা। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে দ্রুত। আজকে আর কোথাও যাওয়া হবেনা, তবে কালকে অফিস থেকে ফেরার সময় রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আসবে অবশ্যই। নিজের উপরই এখন সন্দেহ হচ্ছে তার— ভুলভাল কিছু তো খেলো না, তাহলে এতো বড় আকাম করে বসলো কিভাবে সে?

———

মাথায় দু'হাত চেপে বসে আছে অরণ্য, নিজের উপরেই নিজের রাগ হচ্ছে এখন। যে কিরণের সাথে কোনোদিন ধমক দিয়ে কথা বলেনি, আজকে তাকে চড় মারতে যাচ্ছিলো। কিরণ রাগ করেছে জানে অরণ্য, তবুও বোনের রাগ ভাঙাতে যায়নি সে। অরণ্যকে দেখে বুঝার উপায় নেই—তার মন-মস্তিষ্কে কী চলছে। অন্ধকার রুমে টি-টেবিলটার উপরে পা তুলে একা বসে আছে অরণ্য। সময় প্রায় ৮টার কাছাকাছি, সুবহাকে ড্রপ করে দিয়ে বাসায় এসেছিলো বটে, তবে বেশি সময়ের জন্য নয়। মায়ের বানানো পায়েশ আর বাবার কিছু বকাঝকা শুনে চলে গিয়েছিলো হসপিটালে। এসেছে কিছুক্ষণ হলো, কিরণকে তখন গেটের কাছে দেখতে পেয়েছিলো—কারোর সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো কিরণ। দেখেই মাথায় রাগ চড়ে গিয়েছিলো অরণ্যের, সে গাড়ি থেকে নামতে নামতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বাইকটা নিয়ে তাদের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছিলো ছেলেটা। হেলমেট পড়া থাকলেও অরণ্যের বুঝতে সমস্যা হয়নি এটা কিয়ান। কিরণের সাহস দেখে অবাক হচ্ছে অরণ্য—কিয়ানের সাথে ওর সম্পর্ক এত দূর চলে গেছে যে মানা করার পরও সবাইকে লুকিয়ে দেখা করে যাচ্ছে বারবার!

অরণ্য ড্রয়িংরুমে এসেছে, ততোক্ষণে কিরণ নিজের রুমে চলে যাচ্ছিলো। কারো গম্ভীর কণ্ঠ শুনে থমকে গেলো তার পা-জোড়া। ভয়ে ভয়ে তাকালো সেদিকে। অরণ্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো তখনই। চোখ-মুখ দেখে ভালোই বোঝা যাচ্ছে কোনো কারণে খুব রেগে আছে অরণ্য। কিরণ আমতা আমতা করে বলল—--

—‘কি...কি হয়েছে ভাইয়া? এভাবে ডাকলে যে!’

—‘গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কার সাথে কথা বলছিলি তুই?’

কিরণ ভয় পাচ্ছিলো এটারই। কথা কাটানোর জন্য ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলো ভাইয়ের কথার—--

—‘তুমি ভুল দেখেছো ভাইয়া, আমি তো গার্ডেনে গিয়েছিলাম।’

—‘রাত ৮টায় তুই গার্ডেনে গিয়েছিলি কি করতে?’

—‘ভালো লাগছিলো না তাই হাঁটতে গিয়েছিলাম।’

—‘তোতলাচ্ছিস কেন? মিথ্যে বলছিস বলে?’

—‘মিথ্যে বলিনি তো।’

মুখে মুখে তর্ক করা, তার উপর এতগুলো মিথ্যে কথা শুনে রেগে গেছে অরণ্য, ধমকের স্বরে বলে উঠেছে কিরণকে—--

—‘কিরণ, আরেকটা মিথ্যে কথা বললে থাপ্পড় মেরে দাঁত সব কয়টা ফেলে দিবো।’

ভাইয়ের এত বড় ধমক খেয়ে কেঁপে উঠেছে কিরণ, কয়েক পা পিছিয়ে গিয়েছে সে। তারও রাগ কম হচ্ছে না—ভাই তো তার কোনো কালেই এতোটা কঠোর ছিল না! নাকি কিরণ ভুল ভাবছে? বাকিদের জন্য অরণ্যের এত ভালোবাসা, আর কিরণের সাথে এমন ব্যবহারের মানে কি? রেগে বলেছে কিরণ নিজেও—-

—‘তুমি আজকাল আমার সাথে এরকম ব্যবহার কেন করছ ভাইয়া? আমি কী তোমার সৎ বোন হই?’

—‘মুখে মুখে তর্ক আমার একদম পছন্দ না, আমাকে না রাগিয়ে চুপচাপ এখান থেকে যা।’

—‘যাবো না, কি করবে? এটা আমারও বাড়ি, আমার যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাবো। সবসময় সবকিছু তোমাকে বলতে হবে কেন?’

অরণ্যের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে, প্রচণ্ড রাগে নিজের হাত তুলেছে কিরণের গালে চড় দিতে। কি যেন ভেবে থেমে গেছে অরণ্য। রান্নাঘর থেকে অরণ্যের আম্মু মিসেস জাহানারা সুলতানাও দৌড়ে এসেছেন ছেলে-মেয়ের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে। কিরণকে এসে নিজের কাছে টেনে নিয়ে গেছেন তিনি।বুঝতে সমস্যা হয়নি কিরণ আবারও কোনো ভুল করেছে। ছলছল চোখে কিরণ তাকিয়ে আছে ভাইয়ের দিকে। অরণ্য নিজের হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে—নিজের রাগ নিবারণের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সে।

বিজ্ঞাপন
অন্তরালের প্রণয়িনী গল্পটি আফরোজা আঁখি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক গল্প