অরণ্যের মনে হলো, কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে তাকে। দরজার সামনে কারোর ছায়া দেখতে পাচ্ছে সে। কে আছে বোঝার জন্য প্রশ্ন করল অরণ্য —--
‘কে ওখানে?’
ছায়াটা দ্রুত সরে গেল। অরণ্যের মনে সন্দেহ জাগল। উঠে গিয়ে আধখোলা দরজাটা ধাক্কা দিয়ে পুরোটা খুলে দিল। আশেপাশে তাকালো ঠিকই, তবে কাউকেই তেমন চোখে পড়ল না তার। চলে আসছিলো, তখন চোখ গেল নিচের দিকে। অরণ্যের রুমের লাইট অফ থাকলেও বারান্দার লাইট জ্বালানো ছিল, তাই কি আছে দেখতে সমস্যা হয়নি তার। ছোট্ট একটা হাতে বানানো চকোলেট কেক আর একটা ফুলের বুকেট রাখা। ফুলগুলো আবার কিরণের পছন্দের রজনীগন্ধা ফুল। অজান্তেই অরণ্যের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। কেক আর ফুলের বুকেটটা হাতে নিল সে।
অরণ্য কেকটা নিয়ে রুমের দিকে যাচ্ছিল, কানে আসে তখন কারোর কথা। পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেলো কিরণকে। বাচ্চাদের মতো মুখ করে কান ধরে দাঁড়িয়ে বলছে কিরণ—--
‘আমার ভুল হয়ে গেছে ভাইয়া, তখন ওভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি আমার। ক্ষমা করবে না আমাকে?’
কিরণের কথা শুনে অরণ্যের নিজেরও এবার খারাপ লাগল। ভুল তো সে-ও কম করেনি। নিজের ভালোবাসাকে পেতে গিয়ে বোনকে কষ্ট দিয়ে ফেলছে না তো বারবার? কিন্তু কী করবে অরণ্য! মনে মনে জানে, সে ভুল করছে—তবুও তার ভালোবাসাকে চাই। কিরণকে ধমকাধামকি করলেও সে বুঝতে পারে, কিরণ কিয়ানকে পছন্দ করে। কোনোভাবেই তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য কারো সঙ্গে বিয়ে দেবে না বোনকে। কিন্তু বাইরে থেকে যে নিজেকে কঠোর দেখাতেই হবে তাকে।
ভাইয়ের উত্তর না পেয়ে কিরণ বুঝল, এখনো অরণ্য রেগে আছে তার উপর। কথা না বলে চলে যেতে নিচ্ছিল, তখনই গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে অরণ্য—--
‘যেতে বলেছি আমি তোকে? আজকাল আমার কথার খুব অবাধ্য হচ্ছিস তুই।’
কিরণ তাকালো ভাইয়ের দিকে, চোখ দুটো ছলছল করছে মেয়েটার, এই বুঝি কেঁদে দেবে এমন অবস্থা। নিজেকে সামলে উত্তর দিল অরণ্যের কথার—
‘তুমি যে আমার সাথে কথা বলছ না, থেকে কী করব এখানে?’
‘এদিকে আয়।’
কিরণ হেঁটে গেল অরণ্যের কাছে। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগে অরণ্যই বলে উঠল—
‘রাগ করেছিস?’
কিরণ মাথা এদিক সেদিক নাড়িয়ে বুঝাল, সে রাগ করেনি। অরণ্য জানে কিরণের মনের কথা, তবুও চুপ রইল, আপাতত কথা বাড়াবে না আর। অরণ্য কিরণের আনা কেকটা কেটে তাকে খাইয়ে দিল। কিরণও এক টুকরো কেক হাতে তুলে নিয়েছে, ভাইয়ের মুখের সামনে ধরে মুখে হাসি নিয়ে বলছে তাকে—
‘শুভ জন্মদিন ভাইয়া।’
‘ধন্যবাদ। গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।’
অরণ্যের কথায় মাথা নাড়িয়ে চলে যাচ্ছিল কিরণ। আবারও অরণ্য ডেকে ওঠে তাকে। কিরণ তাকায় পেছন ফিরে। অরণ্য হেঁটে গিয়ে ড্রয়ার থেকে কিরণের ফোনটা বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। কিরণ অবাক হলো বটে—এত তাড়াতাড়ি অরণ্য ফোনটা দিয়ে দিচ্ছে তাকে! কিরণ প্রথম চুপ থাকলেও অরণ্য রাগ করবে তাই বলল —--
‘ রেখে দাও ভাইয়া, আমার আর এটা লাগবেনা। ’
‘ লাগবে কেন? আম্মুর ফোন তো লুকিয়ে লুকিয়ে ঠিকই চালাস।’
কিরণ কথা না নাড়িয়ে ছট করে অরণ্যের থেকে ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে গেছে রুম থেকে। যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলছে — হুহ নিজের বেলায় ষোলো আনা আমার বেলায় চার আনা কেন? নিজে ঠিকই ভালোবেসে বিয়ে করবে আর আমাকে দেখো কেমন বন্দী পাখির মত রাখছে সবসময়।
———
আজকে সুবহাকে নিতে সাব্বির এসেছে। কিয়ান বাসায় নেই, ড্রাইভার ছুটিতে গেছে। এদিকে নিজেরও ড্রাইভ করতে ইচ্ছা করছেনা। ভেবেছিলো, আজকে অফিস যাবেই না —এমনিতেও সুবহার চাচ্চু সামলে নিচ্ছেন সবটা। সাব্বির নিতে আসায় সুবহা যাচ্ছে, নইলে আজকে আর যাওয়া হতো না।
অফিস যাওয়ার পথে সেই রেস্টুরেন্টটা চোখে পড়লো। সুবহা গাড়ি থামাতে বলল সাব্বিরকে। সাব্বির সুবহার কথা শুনে গাড়িটা থামালো। সুবহার কথামতো তার সাথে রেস্টুরেন্টের ভিতরে গেল। ম্যানেজারের সাথে কথা বলে সেদিনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখতে চাইলো। চেনাজানা থাকায় প্রথমবার বলাতেই ম্যানেজার রাজি হয়ে গেল সুবহাদের ফুটেজ দেখাতে।
মনিটরের ভিডিওটা দেখে সাব্বির হাঁ করে একবার তাকাচ্ছে সুবহার দিকে, তো আরেকবার তাকাচ্ছে ভিডিওটার দিকে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, সুবহা নিজে থেকেই অরণ্যের কাছে গিয়েছে, তাকে জড়িয়ে ধরেছে। অরণ্য দূরে সরিয়ে দিতে চাইলেও সুবহা সেটা হতে দেয়নি। সবটা দেখে নিজেই বোকা বনে গেছে সুবহা।
সাব্বিরের দিকে চোখ যেতেই দেখলো, মিটিমিটি হাসছে সাব্বির। কেমন যেন লাগল সুবহার কেন এসেছিল এখানে? এখন তো নিজের উপরেই নিজে বিরক্ত হচ্ছে সে। সাব্বির আর সুবহার চোখাচোখি হতেই বলে ওঠেছে সুবহা —--
‘কি হয়েছে, সাব্বির ভাই?’
‘না না, কিছুই হয়নি।’
‘চলুন, আমাদের যেতে হবে।’
সাব্বির আর কিছু বলল না,সুবহা চলে গেলো সেখান থেকে পিছু পিছু গিয়েছে সাব্বির নিজেও।
———
অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অরণ্য। হাতের গ্লাভসজোড়া খুলে ধীরে ধীরে ডাস্টবিনে ফেলল। সেদিকে না তাকিয়েই পাশে থাকা নার্সের হাতের ‘ নার্সিং ট্রলি'টা’ রাখা স্যানিটাইজারটা ব্যবহার করল সে। ক্লান্ত চোখে একবার ঘড়ির দিকে তাকাল—বিকেল পাঁচটা পঁচিশ। মনে পড়ল তখনই আজকে অরণ্য আর তার আব্বুর যাওয়ার কথা সুবহাদের বাসায়। ইনভাইট করেছেন জাহিদ হোসেন নিজেই। কিন্তু এখনো হসপিটালের আরও কাজ বাকি অরণ্যের সোজা হাঁটতে শুরু করল ওয়ার্ডের দিকে। পথিমধ্যে নার্সদের সাথে দেখা হলে সবাই তাকে সালাম করলো অরণ্যও হেসে উত্তর দিলো তাদের সালামের। দুইপাশে তার মিহি আর আদ্রীশ। তারাও কম ক্লান্ত নয় মিহির যদিও টুকটাক কাজ এখনো বড় কোনো অপারেশনে হাত দেয়নি সে৷ অরণ্য আর মিহি প্রতিটি বেডের কাছে গিয়ে নিজ হাতে রোগীদের খোঁজখবর নিলো। কারও স্যালাইন ঠিক করে দিল, কারও রিপোর্ট দেখে আবার লিখে দিল নতুন প্রেসক্রিপশন।
অরণ্যকে দেখে রোগীদের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে আলাদা এক প্রশান্তি। শরীরে অসুখ নিয়েও সকলেই হেসে হেসে কথা বলছে অরণ্যের সাথে। মিহি অবাক হচ্ছে সবটা দেখে, ভাবা যায়! ডক্টর অরণ্যকে কতোটা পছন্দ করে রোগীরা। পরক্ষণেই আবার ভাবছে অরণ্য মানুষটাই তো এমন সে সবাইকে নিজের সবটুকু দিয়ে মন উজার করে ভালোবাসতে জানে। সবার চোখ মুখের প্রশান্তি ছোঁয়া আর অঘাত বিশ্বাসে মিহি বুঝতে পারছে সকলের মনের কথা সবাই যে এটাই বলছে মনে মনে —ডাক্তার অরণ্য এসেছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে এখন। মুচকি হাসলো মিহি অরণ্যের কাঁধে আলতু করে ধাক্কা দিয়ে মনে করিয়ে দিলো তাকে।
‘ তোর না আজকে কনে দেখতে যাওয়ার কথা?’
‘ হ্যাঁ তুইও চল। কনেকে আজকে রাজি করাতে না পারলে আমি তুলে আনব তুই হলি আমার প্রধান ক্রাইম পার্টনার সাথে থাকা চাই।’
‘ তা তো অবশ্যই, আমি রেডি চল তাড়াতাড়ি। ’
অরণ্য আর মিহি সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে যাচ্ছিলো। অরণ্য খেয়াল করলো আদ্রীশ ভিতরে না এসে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। গিয়ে দেখলো আদ্রীশ ফোনে কথা বলছে কারোর সাথে। অরণ্য গিয়ে কাঁধে হাত রাখে আদ্রীশের দ্রুত ফোন কলটা কেটে আদ্রীশ ঘুরে তাকায় অরণ্যের পানে। অরণ্য আদ্রীশকে ভড়কে দিবে বলে ভ্রু জোড়া কুঁচখে বলে —--
‘ তুই কি ভেবেছিস, আমি কিছুই জানিনা?’
নিজের কাজে সফল হলো অরণ্য আদ্রীশ ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠলো —--
‘ কি..কি জানিস তুই?’
‘ সবকিছু।’
আদ্রীশের মনে হলো সেদিন আনহার সাথে তাল মিলিয়ে সুবহাকে বলা তার ব্যাপারে মিথ্যা কথা গুলো সম্পর্কে জেনে গেছে অরণ্য। এতোদিন বলেনি তাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হবে বলেই কিন্তু এখন! এখন যে আদ্রীশকে বুঝিয়ে বলতে হবে সবটা অরণ্যকে। আদ্রীশ নিজেকে স্বাবাভিক করে বলে অরণ্যকে —--
‘ দেখ অরণ্য, ভাই তুই আমার সব কথা শুন আগে, আমি... ’
এইটুকু বলতেই শব্দ করে হেসে উঠেছে অরণ্য সাথে মিহিও আদ্রীশ বোকার মত তাকিয়ে রইল তার বন্ধুদের দিকে ওরা এভাবে হাসছে কেন? বুঝতে পারছে না বিধায় প্রশ্ন করল অরণ্যদের —--
‘ তোরা পাগলের মত হাসছিস কেন? ’
‘ হাসছি কারণ তুই এখনও আগের মত ভোলাবালা মদনই আছিস। ’
মিহির কথার উত্তরে রেগে বলল আদ্রীশ —--
‘ মিহি দিন দিন তুই অরণ্যের মত হয়ে যাচ্ছিস। ’
অরণ্য হাসি থামিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে বলল —--
‘ আমার মত হলেই ওর জীবনে উন্নতি হবে। তোর মত হতে গেলে ভবিষ্যতে লাল বাতি জ্বলবে। কথা না বলে আয় তো আমার হনে ওয়ালা বাচ্চার মা অপেক্ষা করছে আমার জন্য। ’
অরণ্য বেরিয়ে গেলো পিছু পিছু গিয়েছে আদ্রীশ আর মিহিও।
অরণ্য এসে তার গাড়ির কাছে দাঁড়িয়েছে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা আক্কাস বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। অরণ্য আক্কাসের কানের কাছে গিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে উঠেছে।
‘ ঝাক্কাসের বাপ তাড়াতাড়ি ওঠ তোর বউ নতুন ড্রাইভার কাশেমের সাথে পালিয়েছে। ’
আক্কাস ভয়ে লাফ দিয়ে উঠলো, অরণ্যের থেকেও আরও জোরে চিৎকার দিয়ে বলে উঠেছে —--
‘ ভূত..ভূত! কেউ বাঁচাও আমাকে! ’
অরণ্য সরে গিয়েছে ভ্রু কুঁচকে কানে হাত চেপে আক্কাসের দিকে তাকিয়ে বলছে।
‘ হতচ্ছাড়া! আমার কানের পোকা সব বেরিয়ে গেছে আরও জোরে চিৎকার দিতে পারলি না?’
আক্কাসের বুঝতে বাকি নেই তার কানের কাছে গিয়ে ঢোল বাজিয়েছে অরণ্যই। আক্কাস ভালো করে এদিক সেদিক তাকিয়ে পরে আবার অরণ্যের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলো —--
‘ আপনি তো আমার থেকে আরও জোরে চিৎকার দিলেন স্যার। ’
‘ কিহহ! এতো বড় সাহস আমার ভুল ধরছিস তুই?‘
আক্কাস মুখে একটা ক্যাবলা মার্কা হাসি টেনে উত্তর দিলো অরণ্যের কথার —--
‘ না না, আপনি যা করেছেন বেশ করেছেন। আপনি কোনো ভুল করতেই পারেননা। ’
‘ এই তো ভালো ছেলের মতো কথা, দোয়া করে দিলাম বছর না ঘুরতেই আরেকটা বাচ্চার বাবা হবি তুই।’
আক্কাস কোনো কথা বলল আর চুপচাপ বসে রইল সে। আদ্রীশ আর মিহি বসেছে পিছনের সিটে অরণ্য বসেছে ডাইভিং সিটে আক্কাসের পাশে। এখন অরণ্যদের বাসায় যাবে সবাই পরে সুবহাদের বাড়িতে। ফোনটা এতো সময় অফ ছিলো অন করতেই বাবার অনেক গুলো কল পেয়েছে অরণ্য ওনাকে বুঝিয়ে বলেছে চলে যেতে ফ্রি হলে সেও চলে আসছে।
———
সুবহা বসে আছে নিজের রুমে। মা, চাচি আর বোনের কাজগুলো শুধু দেখে যাচ্ছে সে। সবাই মিলে আজকে তার রুমে হাজির হয়েছে। অফিসের পেন্ডিং কাজগুলো ফেলে রেখে ছুটে এসেছে কিয়ানের ফোন পেয়ে। এমনভাবে বলেছে বাসায় আসতে, মনে হয়েছে বাড়িতে কোনো অঘটন ঘটেছে আবারও!
কিন্তু আসার পর থেকে সেই যে সুবহার রুমে এসে তার আম্মু আর চাচি বসেছেন শাড়ি-চুড়ি হাতে নিয়ে, আর যাওয়ার নাম নেই ওনাদের। বারবার সুবহাকে বলছেন, বাসায় মেহমান আসবেন, সেজেগুজে তৈরি হতে। সুবহা বুঝল না, মেহমান আসার সাথে তার সাজগোজ করার কী সম্পর্ক? আগে তো সুবহার আম্মু আর চাচি ছিলেন, এখন আবার এসেছে আনহা একপ্রকার জোর করেই রেডি করেছে সুবহাকে।
সুবহার আম্মু আর চাচি, দুজনের মুখে চিন্তার চাপ বারবার মনে হচ্ছে এক মেয়ের ভালো করতে গিয়ে অন্য মেয়ের ক্ষতি করছেন তারা। পরক্ষণেই আবার ভাবছেন, আনহা তো স্বইচ্ছায় তার সাথে অরণ্যের বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে।
———
নীল রঙের একটা সুন্দর জামদানী শাড়ি পড়েছে সুবহা। নীল শাড়িটার উপরে চকচকে সোনালি সুতোর কাজ। সুবহার ফর্সা শরীরে নীল শাড়িটা মানিয়েছে ভালো। মুখে হালকা প্রসাধনীর ছোঁয়া আর ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক এইটুকুতেই অপূর্ব লাগছে সুবহাকে। আনহা এই মাত্র বেরিয়ে গেল তাকে রেডি করে। সুবহা তাকিয়ে আছে বোনের যাওয়ার পানে। আনহার এমন পরিবর্তনের কারণ অজানা তার কাছে। খুশি হয়েছে, সাথে অবাকও হচ্ছে খুব একদিনেই এত পরিবর্তন সম্ভব কি? সুবহা কি বেশি ভাবছে? হয়তো আনহা সত্যিই আগের মতো হয়ে গিয়েছে।
কিয়ান আজকে খুবই খুশি। বাবা, চাচা যে তার বিয়ে ঠিক করবেন বলেই অরণ্যদের আসতে বলেছেন, এটা জানে ভালো করেই। কিরণের সাথে সকাল থেকে বেশ কয়েকবার কথাও হয়েছে। কোনো একটা কারণে অরণ্যকে গালমন্দ করেছে অনেক, এর জন্য আবার কিরণ ব্লক করে রেখেছিল তার নাম্বার। কিয়ান অন্য নাম্বার থেকে ট্রাই করে বুঝিয়ে-সুজিয়ে ব্লকটা খুলিয়েছে আবারও। সকাল থেকে কিয়ানের একটাই কাজ ছিল,রাগীনির রাগ ভাঙানো! সেই কাজে কিয়ান সফল হয়েছে বটে।
কিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। হেঁটে যাচ্ছিল গেটের দিকে পাঠিয়েছেন তার আব্বু আর চাচ্চু, অরণ্য নাকি আসছে। জামাই আদর করে তাকে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসতে হবে। কিয়ান হাঁটছে আর ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কিরণের ছবি দেখছে। ঠিক তখনই একটা কালো রঙের কার গেট পেরিয়ে তাদের বাড়িতে ঢুকেছে। কিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে গাড়িটার দিকে। অরণ্যও একইভাবে তাকিয়ে দেখছিল কিয়ানকে।
গাড়িটা থামাতেই অরণ্য, মিহি আর আদ্রীশ বেরিয়েছে গাড়ি থেকে। মিহি কিয়ানকে দেখে বুঝলো এটা সুবহার ভাই। আনহার থেকেও শুনেছিল ওর কথা, তাই সমস্যা হয়নি বুঝতে। কিন্তু কিয়ান আর অরণ্য দুজনে দুজনের দিকে এভাবে রেগেমেগে তাকিয়ে আছে কেন? মিহি একবার তাকাচ্ছে কিয়ানের দিকে, তো আরেকবার তাকাচ্ছে অরণ্যের দিকে। দুজনের এমন রাগে ভরা চাহনি দেখে মনে হচ্ছে, একে অপরের শত্রু তারা একক্ষণেই একজন অন্যজনকে অজগর সাপের মতো ধরে আস্ত গিলে খাবে।
কৌতূহলী হয়ে মিহি প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল অরণ্যকে, কিন্তু সুযোগ পায়নি সে। কিয়ান এসে আদ্রীশ আর মিহিকে উদ্দেশ্যে বলেছে তার সাথে ভিতরে আসতে। তারাও হেসে উত্তর দিয়েছে, ‘আসছি।’
———
রুম ভর্তি মানুষের সামনে মাথায় ঘোমটা টেনে বাধ্য মেয়েদের মতো এতক্ষণ বসে ছিলো সুবহা। কিন্তু অরণ্যকে দেখে আর সবার কথা শুনে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে তার। অরণ্যের আব্বু আর ভাই-বোনেরা সবাই মিলে এসেছেন। অরণ্য তখন থেকেই কি যেন ভেবে চলেছে সামনে বসে থাকা সুবহার থেকে নিজের দৃষ্টি সরায়নি একবারের জন্যেও।
এদিকে সবার কথাবার্তায় বিরক্ত হচ্ছে সুবহা। তার শুরুতেই কেমন একটা খটকা লেগেছিল কিয়ানের সাথে কিরণের বিয়ের কথা হবে, সবাই এভাবে ধরে বেঁধে তাকে কেন নিয়ে আসলো? অরণ্য আসার পর যখন কিয়ান কিরণের বিয়ের কথা বাদ দিয়ে অরণ্যের সাথে তার বিয়ের কথা বলা হচ্ছিল, অবাকের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছালো তখন সে। সুবহার ধারণাতেও ছিল না, আনহা বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে বলে তারা অরণ্যের ঘাড়ে তাকে গছাতে চাইবেন যে বিয়ে কিনা সুবহা নিজেই একদিন ভেঙে দিয়েছিলো তার বোনের জন্য।
এই বিয়ে সুবহা করবে না! কোনো ভাবেই না! সবার কথা বলার মাঝখানেই উঠে দাঁড়িয়েছে সুবহা। মাথার কাপড়টা ফেলে গটগট করে হেঁটে চলে গেছে নিজের রুমে। জাহিদ হোসেন রেগে তাকিয়েছে মেয়ের যাওয়ার দিকে। ওনার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এসেছে আপনা-আপনি। প্রতিবার এমন অন্যায় তিনি বরদাস্ত করবেন না। হুংকার ছেড়ে সুবহার আম্মুকে ডেকে বলছেন জাহিদ হোসেন—--
‘আদরে আদরে এই মেয়েকে বাদর বানিয়েছ তুমি। গিয়ে জিজ্ঞেস করো, অসভ্যতামো করে চলে গেলো কেন এখান থেকে?’
সেলিনা বেগমসহ বাকিরাও ভয় পেয়ে গেছেন ওনার এমন চিৎকারে। কিয়ান দ্রুত দাঁড়িয়ে বলছে—--
‘চাচ্চু, ওর মাথা ব্যথা করছিল সকাল থেকে, বেড়েছে হয়তো। এজন্য এমন করছে। আমি দেখছি, আপনারা সবাই কথা বলুন।’
কিয়ান আর দাঁড়ায়নি, সুবহার রুমের দিকে পা বাড়িয়েছে সে। অরণ্য পায়ের উপর পা তুলে, দু'হাত বুকে ভাঁজ করে কাউচে বসে আছে। ঠোঁটের কোণে রহস্যেভরা হাসি থাকলেও তার চোখে তার ক্রোধ। সুবহার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলছে অরণ্য—-- “ইউ ডিড ইট এগেইন দ্য সেইম মিস্টেইক? বারবার ক্ষমা করা অরণ্যের ডিকশনারিতে নেই, লাভবার্ড। তুমি না চাইলেও এই বিয়েটা হবে।”
মিহি আর আদ্রীশ অরণ্যের দিকে তাকিয়ে একসাথে প্রশ্ন করে উঠেছে —--
‘ কি বলছিস বিড়বিড় করে? '
অরণ্যের উত্তর পেলোনা তারা কিছুক্ষণ পর মিহি আবার অরণ্যের কানের কাছে এসে বলছে — ‘ সুবহা তো চলে গেলো, এখন কি সিনেমার বর পক্ষের মত আমাদেরও রাগ দেখিয়ে চলে উচিত!’
‘ আজকে আমি ওকে নিয়েই যাব, নিজে থেকে না আসতে চাইলে জোড় করে নিয়ে যাব “ স্টিল, আই ওয়ান্ট হার। ”
অরণ্যের শেষের কথায় বুঝলো মিহি অরণ্য রেগে আছে খুব এখন আবার কিছু বললে সব রাগ মিহির উপরেই ঝাড়বে আপাতত তাই চুপ করেই বসে রইল সে।
———
সুবহা দরজা লাগাবে, তখনই উপস্থিত হয়েছে কিয়ান। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকেছে সে। সুবহার রাগ হলো এবার, চোখ-মুখে বিরক্তি নিয়ে বলল কিয়ানকে—--
‘কি চাই ভাইয়া?’
‘চলে আসলি কেন?’
‘আমি ওই লোকটার সাথে বিয়ে করব না।’
‘তাহলে কিরণের সাথেও আমার বিয়েটা হবেনা।’
‘নিজের খুশির জন্য আমাকে বলির পাঠা বানাতে চাইছ?’
‘না, তুই অরণ্যকে পছন্দ করিস, আমি জানি সুবহা। আনহাকে অরণ্য ভালোবাসে না। এখন তো আনহা নিজেই বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে, তাহলে সমস্যা কোথায় তোর?’
‘সমস্যা অনেক। তুমি এখন যাও, বলে দাও সবাইকে আমি কখনোই এই বিয়ে করব না।’
সুবহা রেগে আছে খুব। চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে তার। কিয়ান কিছু না বলেই মেঝেতে বসে পড়েছে, সুবহার দুই পা জাপটে ধরে বলছে—--
‘বিয়েটা করে নে লক্ষ্মী বোন আমার, নইলে কিরণকে ওরা অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দেবে।’
‘করছোটা কি! ছাড়ো!’
‘আগে বল, বিয়ে করবি।’
‘দরকার পড়লে কিরণকে নিয়ে তুমি পালিয়ে যাও, তবুও আমাকে এই বিয়ে করতে বলো না।’
‘ওই টিউবলাইট পালাতে রাজি হচ্ছেনা! তুই রাজি হয়ে যা অরণ্যের সাথে বিয়েতে, নইলে আমি এক্ষুণি ছাদ থেকে পড়ে সুইসাইড করব। বিয়ে করতে হবে না শুধু একবার রাজি হয়ে যা।’
সুবহা বিরক্ত হচ্ছে কিয়ানের কাজে। বারবার বলার পরও কিয়ান পা ছাড়ছে না তার। বাধ্য হয়েই বলেছে সুবহা—--
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে! পা ছাড়ো আমার।’
কিয়ান স্বস্তি পেলো, উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে সুবহার মাথায় শাড়ির আঁচলটা তুলে দিলো। হাত ধরে বাহিরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল—-- “তুই বিয়েতে রাজি হয়ে যা, শেষ মুহূর্তে গিয়ে আমি যেভাবেই হোক বিয়েটা আটকে দেবো। তার আগে কিরণের সাথে নিজের বিয়েটা সেরে ফেলতে হবে।”
সুবহা চোখ-মুখ শক্ত করে তাকিয়ে আছে কিয়ানের দিকে। রাগে কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না সে। সবার সামনে আবারও বসেছে কিয়ান আর সুবহা। কিয়ান সবাইকে আজগুবি একটা কাহিনী শুনিয়েছে, কিয়ানের কথা আবার বিশ্বাসও করে নিয়েছে সবাই।
বিয়ের কথা প্রায় শেষের দিকে কিয়ান আর কিরণের বিয়ে হবে এক মাস পরে, তার আগে হবে সুবহার সাথে অরণ্যের। আজ থেকে ঠিক এক সপ্তাহ পরে অরণ্য আর সুবহার বিয়ের দিন ঠিক করা হয়েছে। সুবহা সবার মাঝখানেই রেগে তাকিয়েছে কিয়ানের দিকে। কিয়ান বেচারা নিজেই শকড! ভেবেছিল আগে তার আর কিরণের বিয়েটাই হবে, পরে যেভাবেই হোক অরণ্যের সাথে সুবহার বিয়েটা সে আটকে দেবে। কিন্তু তা আর হলো কই! পরিস্থিতি বেগতিক বুঝতে পেরে কিয়ান তখনই পালিয়েছে।
———
অরণ্যদের চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। বড়রা রয়ে গেছেন, বাকি কথাবার্তা শেষ করে তবেই আসবেন। অরণ্য আর তার বন্ধুরা বেরিয়ে পড়েছে। বাহিরে আসতেই অরণ্যের ধাক্কা লেগেছে কিয়ানের সাথে। ভ্রু কুঁচকে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আছে। পরক্ষণেই আবার কি যেন ভেবে অরণ্য আর কিয়ান দুজনেই হেসে হাত মিলিয়েছে একে অপরের সাথে। মুখে হাসি থাকলেও, মনে মনে একে অন্যের প্রতি রাগ পুষে রেখেছে তারা।
কিয়ান অরণ্যের হাত শক্ত করে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলছে তাকে—--
“ অভিনন্দন, সম্মন্ধি সাহেব! দোয়া করি আপনার নতুন জীবনটা যেন দুঃখে-দুঃখে পরিপূর্ণ হয়!”
অরণ্য ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গাত্মক হাসি টেনে কিয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরে নিজেও বলে —--
“ ধন্যবাদ! আপনাকেও শুভেচ্ছা। আমার বোনের সঙ্গে আপনার দাম্পত্য জীবনটা যেন নিমপাতার মিষ্টি স্বাদে ভরে থাকে!”
কিয়ান ভ্রু কুঁচখে অরণ্যের পানে তাকিয়ে মনে মনে বলছে —“হিটলার কোথাকার! তোর বোনের সঙ্গে বিয়েটা একবার হয়ে যাক, তারপর দু'জনকেই বুঝিয়ে দেব আমি কী জিনিস! তোর হিটলারগিরি যদি না ছাড়িয়েছি, তাহলে আমিও নিজের নাম পালটে দেব! ”
এদিকে অরণ্য মনে মনে বলছে — “ শালা জাউরা, একবার তোর বোনকে পটিয়ে-পাটিয়ে বিয়েটা করে নিই, তারপর বুঝবি কত ধানে কত চাল! তোকে যদি মেরে শুটকি বানিয়ে রোদে না শুকিয়েছি, তাহলে আমিও শেহরাজ অরণ্য নই।”
অরণ্য আর কিয়াবের চোখে চোখে যুদ্ধ দেখে কেমন যেন হাসি পাচ্ছে মিহির। হাসি থামাতে ব্যার্থ হলো সে মিহি হেসে যাচ্ছে মাঝেমধ্যে আবার পাশে থাকা আদ্রীশের কাঁধে ধাক্কা দিচ্ছে আদ্রীশ ওদিকে আনহাকে দেখছিলো আনহা এতটা চেঞ্জ হয়ে গেছে একদিনে এটা কোনো ভাবেই বিশ্বাস হচ্ছে যেন তার। মিহির কাজে বিরক্ত হলো আদ্রীশ রেগে গিয়ে বলল —--
‘ হাসছিস ভালো কথা আমাকে এভাবে ধাক্কাচ্ছিস কেন?’
‘ ধাক্কা না দিলে হেসে মজা পাইনা রে পাগলা। ’
‘ ইটিয়েট কোথাকার। ’
কথাটা বলেই রাগ দেখিয়ে চলে গেলো আদ্রীশ। মিহু একটা মুখ ভেংচি বলে উঠেছে তখনই —--
‘ এইজন্যই তোর এই অবস্থা শালা ফাটাকেস্ট। ’
———
অরণ্য আর সুবহার বিয়ের দিনটি এগিয়ে এসেছে। এই সাত দিনে সুবহা অফিস গিয়েছে একদিনই। কিয়ান এখন অনেকটাই মন দিয়েছে অফিসের কাজে। কিরণকে যেভাবেই হোক পেতেই হবে তাকে এখন সব আজাইরা কাজ ফেলে রেখে অফিসের কাজেই মন দিয়েছে এই ভেবে।
কিয়ান এসেছে কিছুক্ষণ হলো। আসার সময় আনহা আর সুবহার জন্য নিজে পছন্দ করে দুটো ড্রেস নিয়ে এসেছে। শপিংমলে কিয়ানের সাথে গিয়েছিলো কিরণও। বিয়ে ঠিক হলে কি হবে! সেই তো আগের মতোই বাড়িতে মিথ্যা কথা বলে দেখা করলো দুজনে।
আজকে আবার কিয়ান দ্বিতীয় বারের মতো বিয়ের জন্য প্রপোজ করেছে কিরণকে। কিরণ তো আগে থেকেই কিয়ান বলতে অজ্ঞান, সে আর মানা করবে কী! সাথে সাথে কিয়ানের দেওয়া প্রপোজাল এক্সসেপ্ট করে নিয়েছে সে।