অন্তরালের প্রণয়িনী

পর্ব - ২৩

🟢

সুবহার ঘুম ভেঙেছে বহু সময় হলো। বিছানায় শুয়ে থাকা অরণ্যের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে তার অরণ্যের উপরে। অরণ্য শুয়ে আছে, মাঝেমধ্যেই আবার সুবহার দিকে তাকিয়ে হাসছে। এই সুন্দর হাসি, টোল পড়া গালটা দেখেই সব রাগ কোথায় যেন উড়ে যাচ্ছে সুবহার। সোফায় এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে সে, পরনের শাড়িটা এলোমেলো হয়ে আছে। মাথার ভিজে চুলগুলো ছেড়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর পর হাঁচি দিয়ে উঠছে। টিস্যু দিয়ে নাক মুছছে আর মনে মনে বকাবকি করছে অরণ্যকে। সুবহার ইচ্ছে করছে অরণ্যের মাথার চুলগুলো সব টেনে ছিঁড়ে ফেলতে।

অরণ্য তখন চোখ খুলে তাকিয়েছে সুবহার দিকে। চোখ খুলতেই মহারানীর রাগান্বিত মুখশ্রী নজরে এল তার। সুবহার রাগের কারণ বুঝল অরণ্য, ঠোঁট কামড়ে হাসল সে। অরণ্যের এই হাসি সহ্য হলো না সুবহার, সোফায় থাকা কুশনগুলো এক এক করে ছুড়ে মেরেছে অরণ্যের মুখের উপরে। পরিবর্তন হলো না কিছুই অরণ্য হেসে যাচ্ছে এখনও। সুবহা এবার উঠে চলে যেতে চাচ্ছিল রুম থেকে। অরণ্য দ্রুত উঠে এলো তখন, দাঁড়িয়ে থাকা সুবহাকে কোলে তুলে নিলো। বিরক্ত হয়ে বলল সুবহা,

“করছেনটা কী?”

“হাঁটতে পারবে তুমি?”

অরণ্যের কথার মানে বুঝতে পেরে লজ্জা পেলো সুবহা, মুখ লুকিয়ে নিলো তারই বুকে। হেসে বলল অরণ্য —--

“আমার কথায় লজ্জা পেয়ে আমার বুকেই মুখ লুকানো হচ্ছে? বাহ! বিয়ের পর বউ আমার চিনির মতো মিষ্টি হয়ে গেছে।”

সুবহা চুপটি করেই বসে রইলো, অরণ্যের কতার প্রতিউত্তরে কিছুই বললনা সে। অরণ্য সুবহাকে আবারও বিছানায় বসিয়ে দিলো। কাবাড থেকে একটা শার্ট বের করে পড়তে পড়তে বেরিয়ে যাচ্ছিল রুম থেকে। যাওয়ার আগে বেডসাইড টেবিলের উপর ঔষধ আর পানির গ্লাস রেখে গেছে।

———

কিরণ ছাদে দাঁড়িয়ে আছে, কী যেন ভেবে যাচ্ছে সে। ওদিকে তাদের বাসার গেটের সামনে বাইক নিয়ে এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে কিয়ান। একের পর এক ফোন দিয়ে যাচ্ছে কিরণের ফোনে। কিয়ানের রাগীনি রাগ করেছে, রাগ ভাঙাতেই সে ছুটে এসেছে এত দূর। কিন্তু রাগ ভাঙাবে কী? ফোনটাই তো তুলছে না কিরণ। কিয়ান ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা কিরণকে দেখে যাচ্ছে, ওদিকে কিরণ রেগে তাকিয়ে আছে কিয়ানের দিকে। তাদের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে বড়সড়।

কিয়ান অরণ্যকে বকাঝকা করছিল, চলচাতুরী করে সুবহাকে ঠিকই বিয়ে করব নিলো, অথচ তার বিয়ের বেলায় এক মাস দেরি কেন? এদিকে সুবহা যে অভিমান করে বসে নেই কিয়ানের উপরে, সেটাও তো জানে না কিয়ান। নইলে কাল থেকে এতবার ফোন দিলো, সুবহা একবারও রিসিভ করল না কেন? অরণ্যের জন্য তাদের ভাইবোনর মধ্যে মনে মনে দ্বন্দ লেগেছে,আবার কিরণকে কাছে পাওয়া হলোনা তার। সব দিক থেকেই কিয়ান বেচারার লস হলো। সুবহার জন্য টেনশন হচ্ছিল কিয়ানের। অরণ্যের উপরে সব রাগ তখন ঝেড়েছে কিরণের উপরে। কিরণ কষ্ট পেয়েছে তার কথায়, পণ করেছে আর ভাববে না কিয়ানকে নিয়ে।

———

মাথা ঘুরাতেই একটা কম বয়সী মেয়েকে চোখে পড়ল কিয়ানের। মেয়েটা কথা বলতে চাইছে তার সাথে। কিয়ান মেয়েটাকে ভালো করে দেখে বুঝল, এটা রিফাতের চাচাতো বোন। কিন্তু এই মেয়ে এদিক দিয়ে যাচ্ছে কোথায়? বেশি কিছু না ভেবে মেয়েটার কথার উত্তর দিলো কিয়ান। এদিকে কিরণ ছাদে দাঁড়িয়ে সবটাই দেখছে। রাগে চোখমুখের ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে গেছে মুহূর্তেই। ছাদে থাকা ফুলের একটা টব লাথি মেরে ভেঙে ফেলেছে কিরণ। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নেমেছে নিচে।

কিরণ এসেছে তাদের বাড়ির গেটের সামনে। এদিকে এখনও কিয়ান কথা বলে যাচ্ছে ওই মেয়েটার সাথে। কিরণ গিয়ে কিছু না বলেই কিয়ানের হাতে থাকা হেলমেটটা কেড়ে এনে এক আছাড় দিয়ে ফেলেছে মাটিতে। পাকা রাস্তায় পড়ার কারণে হেলমেটটা আধভাঙা হয়ে গেছে। কিয়ান হাঁ করে একবার তাকাচ্ছে তার প্রিয় হেলমেটের দিকে, তো আরেকবার তাকাচ্ছে কিরণের দিকে। কিয়ান কিছু বলতে যাবে, কিরণ এসে ওর মাথার চুল টেনে ধরেছে। বেচারা কিয়ান বলে উঠেছে তখন—--

“কি করছো রাগীনি? হবু স্বামীর গায়ে হাত তুলতে নেই, আল্লাহ পাপ দেবেন।”

“হবু বউকে পাত্তা না দিয়ে যে অন্য মেয়ের সাথে ইটিশ পিটিশ করছেন, এসব দেখে আল্লাহ পাপ দেবেন না?”

“ভুল ভাবছো তুমি। এই মেয়েকে আমি চিনি না, আজকেই দেখলাম।”

“চিনেন না?”

“না।”

এবার কিরণের মেজাজ বিগড়ে গেলো কিয়ানের মিথ্যা কথা শুনে। দুই হাতে কিয়ানের মাথার চুলে টান দিয়ে বলল—--

“চিনিস না? তাহলে এতক্ষণ দাঁত কেলিয়ে কী কথা বলছিলি?”

“কালনাগিনী, ছাড় বলছি! জোয়ান বয়সে টাকলা বানিয়ে দিবি আমাকে!”

কিরণ কিয়ানকে ছেড়ে দিয়ে মুখ ভেংচি দিয়ে বলে উঠল —--

“হুহ! তোকে ধরার জন্য বসে আছি আমি? যাহ, ছেড়ে দিলাম।”

কিয়ান তখন কিরণের হাতটা ধরে তার বুকে রাখলো, ঘাড় কাত করে কিরণের দিকে তাকিয়ে বলল—--

“তুমি ছেড়ে দিলে আমি মরে যাব রাগীনি।”

কিছু না বলে কিরণ মুখ ঘুরিয়ে নিলো অন্যদিকে। এদিকে কিরণ আর কিয়ানের ঝগড়া দেখে মেয়েটা পালিয়েছে তখনই। কিরণ রেগে তাকিয়ে আছে মেয়েটার যাওয়ার দিকে। কিয়ান কিরণের রাগ ভাঙাতে চাইছিল। বাইক থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে এসে কিরণের সামনে। কিরণ প্রচণ্ড রেগে আছে, পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলো কিয়ানকে। কিন্তু যাওয়ার আগেই কিয়ান ধরে নিলো হাত, এক টানে নিজের কাছে নিয়ে আসলো কিরণকে। বাচ্চাদের মতো ইনোসেন্ট মুখ করে বলল—--

“ রাগীনি কি রাগ করেছে? ”

“ রাগীনি কি এমনি এমনি রাগ করে?”

“ তাছাড়া কি? রাগীনির স্বভাবটাই তো কারণে অকারণে রাগ আমাকে দেখানো। ”

কিরণ রেগে তাকালো কিয়ানের দিকে বুকে ঘুষি মেরে বলল —--

“ যাচ্ছি তাহলে ওই মেয়ের সাথে গিয়ে ইটিশ পিটিশ করুন। ”

কিয়ান আবারও টান দিলো কিরণের হাতে মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরল তার বুকে, আদুরে কন্ঠে বলে উঠল তাকে।

“ আমার যে রাগীনিকেই লাগবে। ”

কিরণের রাগ অভিমান সব কোথায় যেন উড়ে গেলো মুহূর্তেই সেও মুচকি হেসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো কিয়ানকে।

———

ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা সুবহা কিয়ান আর কিরণকে স্পষ্ট দেখতে পারছে। দুজনের এমন দুষ্টুমিষ্টি ঝগড়া দেখতে ভালোই লাগে তার। সুবহা খেয়াল করলো কেউ আসছে। তার পেছনে তাকাতেই দেখতে পেলো অরণ্যকে। কিয়ান আর কিরণকে এভাবে দেখে নেবে তাই অরণ্যের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো তাকে অন্যদিকে। অরণ্য হাসলো সুবহার কাজে, কিছু না বলেই কোলে নিলো বউকে।

“দেখলে, বলেছিলাম না আমার আদরের ডোজ হোমিওপ্যাথিক ঔষধের মতো কাজ করবে? আমার আদরের অভাবেই তুমি বুড়িদের মতো কিটকিটে মেজাজ নিয়ে ঘুরতে। বুঝতে পারলে তো এখন?”

সুবহা দাঁত কিড়মিড় করে মনে মনে বলছে— যখন তখন, যেখানে-সেখানে আমাকে কোলে নিতে হবে কেন আপনাকে? সুবহা থেমেছে তার কিছুক্ষণ না যেতেই বলে উঠেছে অরণ্য—--

“বউ আমার, বাড়িটাও আমার, কখন কোথায় কোলে নেবো এটাও আমার ইচ্ছা।”

সুবহা হাঁ করে চেয়ে রইলো অরণ্যের মুখপানে, তার মনের কথা বুঝে নিলো কীভাবে এই লোক? সুবহার এমন বোকা বোকা চাহনি দেখে হেসে বলল অরণ্য—

“দেখলে, বলেছিলাম না আমার আদর হোমিওপ্যাথিক ডোজের মতো কাজ করবে? আমার আদরের অভাবেই তুমি বুড়িদের মতো কিটকিটে মেজাজ নিয়ে ঘুরতে। বুঝতে পারলে তো এখন?”

সুবহা একটা ক্যাবলা মার্কা হাসি দিয়ে বলল,

“হিহি, খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছি।”

অরণ্য কোলে থাকা অবস্থাতেই সুবহার ঠোঁটে চুমু দিয়ে বলল—--

“ চলো, রুমে যাই,বাকি আদরটা পুষিয়ে দিই।”

সুবহা ঘুষি মারলো অরণ্যের বুকে, বিড়বিড় করে কী যেন বলল। অরণ্য তেমন পাত্তা দিলো না, হাঁটা ধরল নিজের রুমের দিকে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে সুবহা তখন আঁকড়ে ধরলো অরণ্যের গলা।

———

কিয়ান আর কিরণের বিয়ের দিনটি এগিয়ে আসছে। এদিকে অরণ্য আর সুবহার বিয়ের দুই সপ্তাহ হতে চললো, সম্পর্কটা এখনও আগের মতোই আছে। দিন দিন অরণ্যের টক্সিসিটি বেড়েই চলেছে, সুবহা ভারী বিরক্ত অরণ্যের কাজে। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে অরণ্য তাকে ভালোবাসে না মোটেও। মনে তখন প্রশ্ন জাগে— ভালো না বাসলে এত কিছু করে, অরণ্য তাকে বিয়েটা কেন করলো? প্রতিশোধ নেবে বলে? কিন্তু সুবহা কি তখন ভুল ছিলো? ওর জায়গায় অন্য কেউ থাকলে কি এমন করতো না?

এই দুই সপ্তাহে কতটা পরিবর্তন হয়ে গেছে সুবহা ভাবলেও অবাক লাগে তার। অরণ্যের করা পাগলামোগুলোতে বারবার সায় জানাতে ইচ্ছে হয়। রাগ দেখিয়ে কিছু বললেও সয়ে নেয় বাধ্য মেয়ের মতো। কেন হচ্ছে এমন? এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেজ তার। চোখ বন্ধ করে একটা শ্বাস ছাড়লো সুবহা। গাল ফুলিয়ে অনেকক্ষণ হলো বসে আছে বিছানার এক কোণে, হাতে থাকা অরণ্যের ফোনটাতে কী যেন দেখছে। মিহি, আদ্রীশের সাথে অনেকগুলো ছবি, অরণ্যের। সবগুলো ছবিতে একেকজনের মুখের ভঙ্গিমা আর দাঁড়ানোর স্টাইল দেখে মন খারাপের মধ্যেও হাসি পাচ্ছে পাচ্ছে সুবহার।

ফোনটা রেখে দেবে, তখনই চোখে পড়লো একটা ছবি। মুখটা তার কেমন যেন হয়ে গেলো মুহূর্তেই। মনে মনে রাগ লাগলো— অরণ্যের হাত ধরে কী সুন্দর করে দাঁড়িয়ে আছে আনহা, দুজনেই তাকিয়ে আছে দুজনের মুখের দিকে। ছবিটা দেখে মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো সুবহার। পরক্ষণেই আবার অন্য ছবিগুলো লক্ষ্য করলো, কোনো ছবিতেই কাছাকাছি নেই অরণ্য আর আনহা। তবে প্রতিটিতেই অরণ্যের দিকে মায়াভরা তাকিয়ে আছে সে। এই চাহনি আর আনহার মুখের হাসিই বলে দিচ্ছে, সে কতটা পছন্দ করতো অরণ্যকে। এবার নিজের ওপরেই নিজে রাগ লাগলো সুবহার। সে কি ভুল করেছে অরণ্য আর আনহার মাঝখানে এসে?

বিছানায় ফেলে রাখা ফোনের রিংটোনের আওয়াজ কানে আসতেই ধ্যান ভাঙলো সুবহার। অরণ্যের ফোনটা রেখে দিয়ে নিজের ফোনটা তখন হাতে তুলে নিল। সাব্বির ফোন দিয়েছে তাকে, বুঝতে বাকি নেই কারণটা কী! অফিসের পেন্ডিং কাজগুলোর জন্য সাব্বির বারবার ফোন দেয় তাকে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হলে তাকে ছাড়া সামলাতে পারে না সবটা। কিয়ান অসুস্থ হয়ে পড়ায় যেতে পারছে না অফিসে, আগের মতো দশা হয়েছে আবারও। সুবহা যেতে চাইলে অরণ্য তাকে মানা করে বারবার, কেন যেতে দেয় না— কারণটা অজানা তার। এই বন্দী জীবন ভালো লাগছে না সুবহার।

বিছানা থেকে উঠে গিয়ে যেতে চাইছিলো রুমের বাইরে, ওয়াশরুম থেকে তখন বেরিয়ে এসেছে অরণ্য। গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠেছে সুবহাকে—--

“রুম থেকে বেরোতে বলেছি আমি তোমাকে?”

পা জোড়া থেমে গেলো সুবহার। ভ্রু কুঁচকে অরণ্যের দিকে তাকালো সে। মেজাজ দেখিয়ে বলে উঠল —--

“নিজেকে কী ভাবছেন আজকাল? ওয়াশরুমে যেতে হলেও আমাকে আপনার পারমিশন নিতে হবে কেন?”

বিজ্ঞাপন

অরণ্য বাঁকা হেসে এগিয়ে এলো তার কাছে। হুট করেই সুবহার কোমর চেপে তাকে নিয়ে এলো নিজের কাছে। সুবহার হাত দুটো আপনা-আপনি চলে গেলো অরণ্যের কাঁধে। সুবহা কিছু বলতে নিলে অরণ্য তাকে থামিয়ে দিলো, সুবহার ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে বলল—--

“বিকজ ইউ আর মাই পার্সোনাল প্রোপার্টি। আমার অনুমতি ছাড়া এক পা নড়লেও শাস্তি দিব তোমাকে।”

“দিন দিন আপনি এমন হয়ে যাচ্ছেন কেন? ”

“আমি শুরু থেকেই এমন ছিলাম। তুমি ভুল ভেবেছ।”

সুবহার কী যেন হলো। অরণ্যের দুই গালে হাত রেখে ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—--

“ভালোবাসেন আমাকে?”

চুপ রইলো অরণ্য। চোখ মুখ তার স্বাভাবিক, সেই আগের মতোই। সুবহাকে ছেড়ে দিয়ে বলল —--

“শার্টের বোতাম লাগিয়ে দাও।”

“কথা কাটালেন?”

অরণ্য সুবহার এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে গুজে দিলো। কাছে টেনে পরপর কয়েকটা চুমু দিলো তার পুরো মুখজুড়ে। ভারী শ্বাস ফেলছে সুবহা, অরণ্যকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে সে। অরণ্য এবার সুবহার কানের কাছে গিয়ে, শান্ত কণ্ঠে বলল তাকে—--

“এরপরও উত্তর চাই তোমার?”

সুবহা কিছু বলল না, চুপচাপ মাথা রাখলো অরণ্যের বুকে। অরণ্য হেসে হাত বুলিয়ে দিলো তার মাথায়।

———

কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে হসপিটালের জুনিয়র ডাক্তাররা সবাই সিলেট যাচ্ছে, গাইড করার জন্য যেতে হবে অরণ্যকে। যদিও যাওয়ার কথা ছিল আদ্রীশের, তবে হাবাগোবা আদ্রীশের অরণ্যকে ছাড়া চলেই না! সকাল থেকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করে যাচ্ছে তাকে। না পেরে সিদ্ধান্ত নিয়েছে অরণ্য—সেও যাবে আদ্রীশদের সাথে। সুবহা শুনে মনে মনে খুশি হয়েছে, ভেবে রেখেছে অনেক কিছুই। অরণ্য চলে গেলে একবার নিজের বাসায় যাবে, কিয়ান কেমন আছে দেখে আসবে। কতদিন হলো বাড়ির লোকগুলোকে দেখে না সে। অফিসের সব কাজগুলো বুঝিয়ে দিয়ে আসতে হবে সাব্বিরকে।

সুবহা অন্যদিন মন খারাপ করেই থাকে, তবে আজকে তার খুশির কারণ বুঝতে পারছে না অরণ্য। অরণ্য চলে যাচ্ছে কোথাও, বাড়ি ফিরবে না দুই একদিন—এই জন্য কি এত খুশি সুবহা? কথাটা মাথায় আসা মাত্রই রাগে চোখ মুখ লালচে বর্ণ ধারণ করলো অরণ্যের। রেগে বলল—--

“অন্যদিন তো এত খুশি থাকো না তুমি! আমি কতোকি বলি, একটু তো হাসো না। আজকে কী হলো তোমার? আমি কোথাও যাচ্ছি শুনে খুশি হয়েছ?”

সুবহা চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল। অরণ্যের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়াতে চাইলো। অরণ্যের এমন ব্যবহারগুলোই অপছন্দ সুবহার। মাঝেমধ্যে মনে হয় নিঃশ্বাস ছাড়ার আগেও অরণ্যের পারমিশন নিতে হবে তাকে। অরণ্য রেডি হচ্ছিল, পরনে থাকা শার্টটা তখন খুলে নিয়েছে, সুবহাকে ছেড়ে দিয়ে সোফায় গিয়ে বসেছে সে। সুবহা তখন বেরিয়ে যেতে চাইলো রুম থেকে, আটকা পড়লো আবারও।

সুবহা চলে যাচ্ছে বুঝতে পারা মাত্রই অরণ্য এসে পাজকোলে করে নিয়ে গেলো তাকে বিছানায়। সুবহাকে একপ্রকার ছুড়ে ফেলল বিছানায়। বিরক্ত হয়ে উঠে যেতে নিলে অরণ্য আবারও বাধা দিল তাকে। রাগে হুশজ্ঞান সব হারিয়ে সুবহা চড় বসিয়ে দিল অরণ্যের গালে। অরণ্য ঠিক আগের মতোই আছে। কিছুক্ষণ স্বাভাবিক থাকলেও নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলো সে। শক্ত করে সুবহার চোয়াল চেপে ধরে রাগমিশ্রিত কণ্ঠে বলল—--

“আমার ছোঁয়া ভালো লাগে না তোমার?”

সুবহা অরণ্যকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিতে দিতে কিছু বলতে চাইলো, অরণ্য সুযোগ দিল না তাকে। আঁকড়ে ধরলো তার গোলাপসম পাতলা ঠোঁটজোড়া। সুবহা ছটফট করলে তার দুহাত চেপে ধরল অরণ্য। ঠোঁটের ছোঁয়া গভীর হলো তার।

সুবহার এতটা কাছে গিয়ে অরণ্য যখন তার হুশজ্ঞান হারালো, পাগলের মতো পেতে চাইলো তাকে—তখনই দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। বারবার ডাকলো সুবহা আর অরণ্যকে। অরণ্য না শুনলেও সুবহা এটা শুনতে পেয়েছে স্পষ্ট। অরণ্যের মুখ চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠেছে—--

“কিরণ ডাকছে আমাদের।”

অরণ্য তার মুখ থেকে সুবহার হাত সরিয়ে, নেশালো দৃষ্টিতে তাকালো তার মুখপানে। পুরো মুখজুড়ে তার ঠোঁটের ছোঁয়া দিয়ে বলল—--

“ডাকুক।”

“খারাপ কিছু হয়েছে হয়তো।”

“দুনিয়া উলটে যাক, আমার এখন তোমাকে লাগবে।”

কান্না পাচ্ছে এবার সুবহার। ভালোভাবে বললে তো শুনেই না, রাগ দেখালে উল্টো তার ওপরেই নিজের সব রাগ ঝাড়ে। অরণ্য হারিয়ে গেছে সুবহার মধ্যে। ভালোবাসায় বুকে টেনে নিয়ে নিয়েছে তাকে।

———

এলো মেলো হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে সুবহা। পরনের শাড়িটা এখন আর নেই। শাড়িটা খুলে কখন যে অরণ্য নিজের শার্ট পড়িয়ে দিয়েছে তাকে, খেয়াল নেই সুবহার সেদিকে। এত সময় হলো অরণ্য একবারের জন্যও উঠতে দেয়নি তাকে। এত জুড়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে, মনে হচ্ছে ছাড়লেই সে পালিয়ে যাবে।

সুবহাকে যে এবার যেতে হবে, এই ভেবে—অরণ্যের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য নড়েচড়ে ব্যথা পাওয়ার ভান করে পেটে দুহাত চেপে বলে উঠল সুবহা—--

“আহ্! পেট ব্যথা করছে আমার।”

অরণ্য দ্রুত উঠে বসল। সুবহাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, ওর পরনে থাকা নিজের শার্টটার নিচের দিকের কয়েকটা বোতাম খুলে সুবহার ফর্সা মেদহীন পেটে পরপর কয়েকটা চুমু দিল।

সুবহা খুবই বিরক্ত হলো অরণ্যের বাচ্চামিতে। দাঁত কিড়মিড় করে মাথায় হাত ঠেকিয়ে তাকিয়ে আছে অন্য দিকে। অরণ্য লক্ষ্য করল এটা। উঠে গিয়ে সুবহার এলোমেলো চুলগুলো সব কানের পাশে গুজে দিয়ে বলল—--

“লাভবার্ড, আর কোথায় কোথায় ব্যথা করছে বলো?”

“বললে কী করবেন...”

পুরো কথাটা শেষ করার আগেই সুবহার ঠোঁটে টুপ করে একটা চুমু দিয়ে বলে উঠল অরণ্য—--

“মেডিসিন লাগিয়ে দিব।”

“আপনি কি আসলেই ডাক্তার?”

“সন্দেহ আছে তোমার?”

“তা নয় তো কী?”

অরণ্য তখন হাসল। সুবহার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল—--

“আমি ডাক্তার, তবে রোগীটা যদি হও তুমি, মেডিসিন হবে আমার ঠোঁটের স্পর্শ।”

সুবহা মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে, বিরক্ত হয়ে বলল—--

“এবার তো যেতে দিন, আর ভালো লাগছে না আমার।”

অরণ্য তো সুবহাকে ছাড়লই না, বরং আরও কাছে গেল তার। সুবহার বুকে মাথা রেখে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল তাকে—--

“উঁহু, ছাড়ব না। তুমি আমার থেকে পালাতে চাইছো, আমি ভালোই বুঝতে পারছি। এমন করলে আমার সন্টু মন্টুরা আসতে আসতে আমি বুড়ো হয়ে যাব।”

সুবহা আর কথা বললনা চুপটি করে শুয়ে থাকল সেখানে, অরণ্য তার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো নিশ্চিতে।

———

আজকে প্রথম রান্নাঘরে ঢুকেছে সুবহা। তার দেখাদেখি গিয়েছে কিরণও। যদিও কাজেকর্মে দুজনেই পারদর্শী নয়, তবুও আজকে রান্না করবে বাড়ির সবার জন্য। রান্নাঘরে রান্না করতে থাকা গৃহকর্মীরা যখন সুবহাকে সেখানে যেতে দেখলেন, বারবার মানা করলেন আসতে। তার নাকি এখানে আসা বারণ আছে। সবার এতো জোড়াজোড়িতেও থামেনি সুবহা। সে ঠিক করে নিয়েছে আজ রান্না করেই ছাড়বে।

সেই যে সকালে রান্নাঘরে ঢুকেছিলো, বেরিয়েছে মাত্রই। রুমে আসতেই দেখতে পেলো অরণ্য রেডি হয়ে বেরিয়ে গেছে কোথাও। সুবহা এটা বুঝতে পারা মাত্রই সাব্বিরকে ফোন দিয়ে গাড়ি নিয়ে আসতে বলেছে। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে তাড়াতাড়ি করে।

আয়নার সামনে গিয়ে চোখ বুলালো সুবহা। আজকে তাকে লাগছে ঠিক আগের মতো। পরনে কালো রঙের প্যান্ট স্যুট, হাতে একটা দামী ওয়াচ আর পার্স। মাথার সিল্কি চুলগুলো খুলে রেখেছে সে।

কিরণকে তখনই মেসেজ দিয়ে বলেছিল সবটা। সে বলেছে, বুঝিয়ে বলবে তার আম্মুকে সুবহা বেরিয়েছে বলে কিছুই বলবেন না তিনি। কিরণের কথা শুনে খুশি হলো সুবহা। এখানে আসার পর সম্পর্কটা তাদের আগের থেকেও ভালো হয়ে গেছে। এই বাড়িতে এসে আর কিছু পাক না পাক, কিরণের মতো একটা বোন আর তার বাবার মতো একজন ভালো শ্বশুর পেয়েছে।

সুবহা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছিলো। এতো সময়ে হয়তো সাব্বিরও এসে পড়েছে গাড়ি নিয়ে। বাড়ির সদর দরজাটা খুলে বাইরে বেরুবে, তখনই রাগান্বিত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো কাউকে।

হাতের কাঁপুনিতে হাতে থাকা সুবহার ফোনটা দপ করে পড়ে গেলো মেঝেতে। কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে শুকনো ঢোক গিলে নিলো সুবহা। নিজেকে স্বাভাবিক করল সে। যাই হয়ে যাক, আজকে বেরুবেই ঠিক করে নিয়েছে এটা।

বিজ্ঞাপন
অন্তরালের প্রণয়িনী গল্পটি আফরোজা আঁখি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক গল্প