অন্তরালের প্রণয়িনী

পর্ব - ২৭

🟢

ফুল দিয়ে সাজানো বিছানার ঠিক মাঝখানে বসে আছে কিরণ। বিয়ের সাজটা রয়ে গেছে তার এখনও। কিরণ অপেক্ষা করছে কিয়ানের জন্য। অনেকক্ষণ পর দরজা খোলার শব্দ কানে আসল তার। তাকালো কিরণ সেদিকে। ফোনে কারো সাথে কথা বলতে বলতে কিয়ান এসেছে রুমে, কথা হলে ফোনটা হাত থেকে রেখে তাকিয়েছে কিরণের দিকে। কিরণের রাগান্বিত মুখশ্রীটা নজরে আসল কিয়ানের।

“ তোমার ওই জাউরা ভাইয়ের সাথে আমার বোনকে কেন বিয়ে দিয়েছি জানো? শুধু তোমাকে ভালোবাসি বলে। তবুও তুমি আজকের দিনে হুলো বিড়ালের মতো গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে থাকবে আমার দিকে?”

“সব সময়, সব বিষয়ে আমার ভাইয়াকে টেনে আনেন কেন আপনি?”

“ তোমার ভাই আমার শত্রু লাগে তাই।”

কিরণ রাগে মুখ ফিরিয়ে নিলো অন্য দিকে। কিয়ান পাশে বসে একের পর কথা বলে যাচ্ছে তাকে। এদিকে গায়ের শাড়ি গহনা খুব বিরক্ত করছে কিরণকে। মাথার ওড়নাটা টেনে খুলতে যাবে, কিয়ান তখন বলে উঠল

“ তুমি কষ্ট করে খুলছো কেন? এগুলো তো আমার কাজ। ”

কিরণ চোখ গরম করে কিয়ানের দিকে তাকিয়েছে। কিয়ান তেমন পাত্তা দিলো না, হেচকা টানে কাছে নিয়ে আসল ওকে। চুমু দিলো কপালে। কিরণও চুপ করে গেলো তখন। হাসল মনে মনে। কিয়ান কিরণকে ঘুরালো অন্যদিকে। মাথার ক্লিপ, ফুলগুলো খুলে দিলো এক এক করে। শাড়ির পিনটা খুলতেই কিরণ হাত চেপে ধরল কিয়ানের। কিয়ান বুঝল বউয়ের লজ্জা লাগছে। কিছু না বলে আবারও ঘুরালো ওকে সামনের দিকে। কিরণের ফর্সা পিঠে এসে পড়া চুলগুলো যত্ন করে একপাশে সরিয়ে দিলো কিয়ান। কিয়ান পর পর কয়েকটা চুমু দিয়েছে কিরণের নগ্ন পিঠে। প্রতিবারই কিয়ানের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শে কেঁপে উঠছে কিরণ। কিয়ান এগিয়ে গিয়ে নিজের দাঁতের সাহায্যে কিরণের ব্লাউজের ফিতেটা খুলতেই কিরণ ঘুরে তাকিয়েছে। কিয়ান হাসল। কিরণের ঠোঁট জোড়া চেপে ধরল ওর ঠোঁট দিয়ে। কিরণ নিজের হাত বুলালো কিয়ানের ঘন চুলের ভাঁজে। এবার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে কিরণের। কিয়ান হয়তো বুঝল এটা, ছেড়ে দিলো সে কিরণকে। ঠোঁটে স্লাইড করে কিরণের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলছে কিয়ান —--

“ রেডি তো! ”

“ কিসের জন্য? ”

“ একটা সুন্দর রাতের জন্য। ”

লজ্জাবতীর ন্যায় নুয়ে পড়ল কিরণ,মুখ লুকালো কিয়ানের বুকে। কিয়ানের মুখের শ্বাস পড়ছে কিরণের ঘাড়ে৷ মুখ তুলে তাকালো সে কিয়ানের সুন্দর মুখপানে। কিয়ানের এই মায়াভরা চাহনি আর ভালোবাসার ডাকে সায় না জানিয়ে পারলো না সে। কিরণ গলা আঁকড়ে ধরেছে কিয়ানের, প্রেয়সীর সম্মতি পেয়ে দেরি করেনি কিয়ান। উন্মাদের মতো ঝাপিয়ে পড়েছে ওর ছোট্ট শরীরটির উপরে। শরীরের শাড়িটা কবে খুলে মেঝেতে পড়ে গেছে কিরণের খেয়াল নেই সেদিকে। সে ডুবে আছে কিয়ানের ভালোবাসায়।পুরো শরীর জুড়ে কিয়ানের ঠোঁটের স্পর্শ আর হাতের অবাধ্য বিচরণ পাগল করে দিচ্ছে তাকে৷ সব ভুলে কিয়ান ডুব দিয়েছে কিরণের মধ্যে। কিরণও সায় জানাচ্ছে কিয়ানের ভালোবাসার ডাকে৷

ঘুম ভেঙেছে কিয়ানের চোখ খুলতেই কিরণের মায়াবী চেহারাটা নজরে এসেছে তার। নিশ্চিতে সে ঘুমিয়ে আছে কিয়ানের বাহুডোরে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে কিয়ানকে। কিয়ানের মনে পড়ল রাতের কথা নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠলো তার। কিয়ান নিজেও কিরণের মতো করে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে আবারও পাড়ি জমালো ঘুমের রাজ্যে।

————

“ তুমি বৃষ্টি চেয়েছো বলে

কত মেঘের ভেঙেছি মন

আমি নিজের বলতে তোমায় চেয়েছি

তুমি যাওনি কিছুই বলে

আজও পাল্টে ফেলিনি মন

শুধু নিজের বলতে তোমায় চেয়েছি

তুমি জানতেই পারো না তোমায়

কত ভালোবেসেছি....”

অন্ধকার রুমে কানে হেডফোন লাগিয়ে গানটা শুনছে আনহা। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে আপনা আপনি। মাথার মধ্যে কত চিন্তা ঘুরফাক খাচ্ছে তার। বার বার দোষারোপ করে যাচ্ছে নিজের ভাগ্যকে, কেন সবসময় তার সাথেই এমনটা হয়। আনহার খারাপ লাগে, নিজের প্রতি ঘৃণা হয়। ওর করা ভুলের জন্য একটা মানুষ পৃথিবী থেকে চলে গেছে, যিনি কিনা আনহাকে ছোটবেলা থেকে নিজের মেয়ের মতো করে বড় করে তুলেছেন, তাকেই আনহা নিজ হাতে মেরে ফেলল। ভাবতেই টুপটুপ করে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল চোখ থেকে। অন্ধকার রুমের দরজাটা কেউ ধাক্কা দিয়ে কিছুটা ফাঁক করেছে, সেই ফাঁক দিয়ে বাইরে থেকে আলো এসে পড়েছে আনহার চোখ মুখে। হঠাৎ রুমে আলো আসায় বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে বন্ধ করে নিয়েছে সে। আস্তে আস্তে চোখ খুলে আনহা তাকিয়েছে দরজার দিকে। মনে হলো চেনা পরিচিত কেউ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ভালো করে দেখলে বুঝতে পারল আনহা মানুষটা ওর বড় আম্মু। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছে আনহার, ভয়ে কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছে, চোখ বন্ধ করে চিৎকার দিয়ে উঠেছে।

কিছুক্ষণ পর মনে হলো কেউ ওর সামনে এসে বসেছে হাঁটু গেড়ে। ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে তাকালো আনহা, দেখতে পেলো অরণ্যকে। মনের মধ্যে থাকা সব ভয় ডর কোথায় যেন উড়ে গেলো ওর। মনে হলো অনুশোচনাবোধ থেকেই বার বার সব জায়গায় ওর বড় আম্মুকে দেখতে পারছে। আনহা ওর চোখের পানি মুছে তাকিয়েছে অরণ্যের দিকে। এই মানুষটাকে আনহা বড্ড ভালোবাসে, কেন ভালোবাসে সে নিজেও জানে না। কতদিন পর সে আবারও সামনে থেকে দেখছে অরণ্যকে। অরণ্যের কণ্ঠ, হাসিমাখা মুখটা মিস করছিলো আনহা। ইচ্ছে হলো দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে অরণ্যকে। আগে পরে কি হবে বা হতে পারে না ভেবেই আনহা জড়িয়ে ধরতে চাইল অরণ্যকে, কিন্তু থেমে গেলো ওর কথায়। চোখ মুখ শক্ত করে গম্ভীর কণ্ঠে আনহাকে বলে উঠেছে অরণ্য —--

“ কি পেলি এসব করে?”

আনহা ভড়কালো, শুকনো ঢোক গিলে বলল অরণ্যকে—--

“ কি... কি করেছি আমি? ”

“ কি করেছিস জানিস না? ”

আনহা কথা না বলে চুপ করে রইল। অরণ্যের কথায় বুঝতে বাকি নেই ওর, অরণ্য জেনে গেছে সবটা। সুবহা, অরণ্যের বিয়ে ভাঙা থেকে শুরু করে আগে পরে যা যা হয়েছে, সবটাই আনহার কাজ। সুবহার আম্মুর মৃত্যুর জন্য যে একটু হলেও আনহা দায়ী, এটাও কি অরণ্য জেনে গেছে? ভয় হলো আনহার, ঘামতে শুরু করেছে ও। আবারও অসহায়ের মতো তাকিয়ে বলল অরণ্যকে।

“ আমাকে ভালোবাসলি না কেন অরণ্য? খুব কি ক্ষতি হয়ে যেত আমাকে ভালোবাসলে? তুই আমাকে একটুখানি ভালোবাসলে আমি এসব কিছুই করতাম না বিশ্বাস কর।”

“ ভালোবাসা মন থেকে আসে আনহা। তোকেও কেউ একজন নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসত, নিজের করে চাইত, তুই কেন বুঝলি না তার ভালোবাসা?”

আনহা হাসল অরণ্যের কথায়। ভালোই কথা কাটাতে জানে অরণ্য, কি সুন্দর করে ওর করা প্রশ্নটাই ওকে ফিরিয়ে দিলো। অরণ্যের ফোনে রিং হচ্ছে বার বার, কেউ কোনো দরকারে কল দিচ্ছে ওকে। দেরি না করে চলে গেলো আনহার রুম থেকে, দরজার সামনে গিয়ে আবারও ফিরে তাকালো। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আনহাকে দেখে। আনহা এখনও অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে অরণ্যের যাওয়ার পানে। কি বলল অরণ্য, কে তাকে ভালোবাসে? আদ্রীশ! আনহারও এটাই মনে হলো, সত্যিই তো, আনহা বরাবর আদ্রীশকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আনহা ভুল জানা সত্ত্বেও যে আদ্রীশ ওকে সাপোর্ট করে গেছে সব অবস্থাতেই, তাকেই আনহা সবসময় অবহেলা করেছে। যেভাবে আনহাকে করেছে অরণ্য। আনহা বুঝতে পারছে, আদ্রীশের কেমন লেগেছিল তখন। কিন্তু আদ্রীশের ভালোবাসা পাওয়ার কোনো যোগ্যতাই তো ওর নেই। এই সুন্দর পৃথিবীতেও ওর মতো পাপীর বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।

————

বিয়ের পরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি অরণ্য সুবহার। কিরণ আর কিয়ানের বিয়েরও বেশ কয়েকদিন হয়ে গেছে। অরণ্যের আম্মু বার বার বলছিলেন সুবহাকে নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আসতে। কাজের চাপে অরণ্য তখন মানা করেছিল, তবে আপাতত সে ফ্রি আছে তাই ভাবলো ঘুরতে যাবে সবাই মিলে। আজকে সুবহা, অরণ্য আর কিয়ান, কিরণের ঘুরতে যাওয়ার কথা। সুবহার বরাবরই পাহাড় পছন্দ, কিরণও কিছুদিন আগে সাজেক যেতে চেয়েছিল। হুট করেই অরণ্যের মাথায় আসল কথাটা, তাই বেশি কিছু না ভেবে ঘুরতে যাবে বলে ওই জায়গাটাই সিলেক্ট করেছে। আদ্রীশকেও জোড়াজুড়ি করে সাথে নিয়েছে অরণ্য, তারা যেখানে যাচ্ছে মিহির বেড়ে ওঠা ওখানেই। আদ্রীশ না বললেও বুঝতে পারে, অরণ্য মিহিকে একটু হলেও পছন্দ করে আদ্রীশ। এখানকার সবকিছু ছেড়েছুড়ে বেশ অনেক দিন আগেই মিহি চলে গেছে। কারণটা আদ্রীশই, বুঝতে পারলেও মিহিকে আটকায়নি সে। আদ্রীশ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে মাঝেমধ্যে, সে কি মিহিকে পছন্দ করে? কিন্তু মনের মধ্যে কোথাও না কোথাও যে এখনও রয়ে গেছে আনহা। তাকে ভুলে নতুন করে নিজের জীবন সাজাবে কীভাবে আদ্রীশ! এদিকে সুবহার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে, অরণ্যকে বলেনি চিন্তা করবে তাই। কিন্তু মাথাটা ঘুরছে বার বার, বিরক্ত লাগছে ওর। আদ্রীশ ড্রাইভিং করছে, পিছনের সিটে সুবহা আর অরণ্য বসে আছে। কিয়ান আর কিরণ আসছে তাদের গাড়ি নিয়ে। অরণ্য লক্ষ্য করলো সুবহাকে, কেমন ঘামছে, বার বার মাথায় হাত চেপে ধরছে। চিন্তা হলো অরণ্যের, সুবহার মাথা নিজের বুকে চেপে ধরে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল তাকে —--

“ লাভবার্ড, কি হয়েছে তোমার? কোথায় কষ্ট হচ্ছে আমাকে বলো?”

বিজ্ঞাপন

“ কিছুই হয়নি, আমি ঠিক আছি।”

“ না তুমি ঠিক নেই।”

অরণ্য সুবহার থেকে চোখ সরিয়ে আদ্রীশের দিকে তাকিয়ে ওকে গাড়ি ঘুরাতে বলল। এদিকে সুবহাও আদ্রীশকে মানা করছে গাড়ি না ঘুরাতে। আদ্রীশ মনে মনে বকা দিচ্ছে সুবহা, অরণ্যকে। এই দুইজনের মতের অমিল হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু আক্কাসের জায়গায় আজকে আদ্রীশ বেচারা ফেঁসে গেছে। আদ্রীশ মাঝ রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে রেগে তাকিয়েছে সুবহা, অরণ্যের দিকে, গম্ভীর কণ্ঠে বলেছে তাদের —--

“তোমরা আগে ঠিক করো যাবে কি না।”

অরণ্য এখনও কথা বলেই যাচ্ছে, সুবহা মেজাজ দেখিয়ে অরণ্যকে বলে উঠেছে —--

“ থামবেন আপনি! ”

অরণ্য সুবহার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমিতে ভরা হাসি দিয়ে বলছে।

“ শুরুই তো করিনি, থামব কি? ”

আদ্রীশ বেচারা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে অন্যদিকে, এই অরণ্যের ডাবল মিনিং কথার মানে ভালো করেই বুঝে আদ্রীশ। সুবহা পাত্তা দিলো না অরণ্যের কথার, আদ্রীশকে উদ্দেশ্য করে বলল —--

“ আদ্রীশ ভাইয়া, গাড়ি স্টার্ট দিন, ডিসিশন ফাইনাল আমরা যাচ্ছি। ”

“ না, আমরা বাসায় যাব, তুমি অসুস্থ। ”

“ আমার কিছুই হয়নি। ”

বেশ অনেক্ষন তর্কাতর্কি করল দুজনে, পুরোটা সময় আদ্রীশ বেচারা মাথায় হাত ঠেকিয়ে বোকার মতো তাকিয়ে ছিলো অরণ্য সুবহার দিকে। অরণ্য হার মানল বউয়ের জেদের কাছে, আদ্রীশকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলল আবারও। সুবহার ত্যাড়ামি দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে অরণ্যের, কিন্তু আপাতত ঝামেলা করতে চায় না সে, তাই চুপই আছে। সুবহার দিকে না তাকিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে অরণ্য। সুবহার কেমন হাসি পাচ্ছে অরণ্যের রাগান্বিত চেহারাটা দেখে। অরণ্যের কাঁধে মাথা রাখলো সুবহা, শান্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল সে। অরণ্যও মুচকি হেসে সুবহার কপালে চুমু দিলো আলতো করে।

————

সময়টা শীতকাল, চারিদিকে সুন্দর আবহাওয়া বিরাজ করছে। এই সবুজে ঘেরা সুন্দর পরিবেশ আর শীতল আবহাওয়া যে কারোর মন ভালো করে দিতে বাধ্য। অরণ্যরা সবাই এসে একটা রিসোর্টে উঠেছে, এখান থেকে পাহাড় ও মেঘের অপূর্ব দৃশ্য দেখার সুযোগ আছে। সুবহা দাঁড়িয়ে আছে জানালার সামনে, চোখ বন্ধ করে শান্তির নিঃশ্বাস ছড়ল সে, বাহিরের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে সে মেঘের রাজ্যে আছে। সুবহার বরাবরই পাহাড় আর সমুদ্র পছন্দ। অরণ্য কিভাবে যেন জেনে নিয়েছে ওর সব পছন্দ অপছন্দের কথা। এই কয়েক মাসে ওদের সম্পর্কটা আগের থেকে অনেকটাই ভালো হয়েছে। মাঝেমধ্যেই মন খারাপ হলে অরণ্য সুবহাকে লং ড্রাইভে নিয়ে যায়, তার মন ভালো করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে অরণ্য। অরণ্যের এত যত্ন দেখলে মাঝেমধ্যে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী নারী মনে হয় সুবহার।

সুবহা দাঁড়িয়েই ছিল, কেউ একজন এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো ওকে। চেনা পারফিউমের ঘ্রাণ আর মানুষটির স্পর্শে বুঝতে বাকি নেই এটা অরণ্য। অরণ্য চোখ বন্ধ করে নিজের মুখ ডুবিয়েছে সুবহার গলায়, বিরক্ত হচ্ছে সুবহা। অরণ্যকে সরিয়ে দিতে চাইছে নিজের থেকে। অরণ্যও রেগে তাকিয়েছে ওর দিকে, গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠেছে —--

“ সমস্যাটা কী তোমার? ভালো লাগে না আমার ছোঁয়া? ”

“ কি চাইছেন আপনি?”

কিছু একটা ভেবে অরণ্যের মুখ থেকে রাগ সরে গেলো মুহূর্তেই, আবারও সুবহার কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু দিলো তার, কানের কাছে গিয়ে বলল—--

“ একটা বাবু চাই আমার। ”

চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল সুবহা, কিছুই বলল না অরণ্যকে। সুবহা নীরব আছে, অরণ্যের ছোঁয়ায় বিরক্ত হচ্ছে বুঝতে পেরে অরণ্য মেজাজ দেখিয়ে চলে গেছে রুম থেকে।

————

পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথ, সুবহা আর অরণ্য হাঁটছে পাশাপাশি। কিয়ান আর কিরণ অন্যদিকে গিয়েছে, আদ্রীশ সুবহাদের পিছু পিছুই আসছে, মাঝেমধ্যে আবার প্রকৃতির ছবি তুলছে। কালো রঙের একটা সুন্দর শাড়ি পড়েছে সুবহা, চুলগুলো তার কোমর পেরিয়েছে এখন। বাতাসে সুবহার খোলা চুলগুলো বারবার বিরক্ত করছে ওকে। অরণ্য হুট করেই সুবহার হাত ধরে নিজের কাছে নিয়ে এল। ওখানে দাঁড়িয়েই এলোমেলো হাতে বেনি করে দিলো সুবহার খোলা চুলে। সুবহা কথা বলেনি একটাও, রোবটের মতোই দাঁড়িয়ে ছিল যতক্ষণ না অরণ্য ওকে নড়তে বলেছে, ওভাবেই ছিল। আদ্রীশ এর মধ্যে আবার বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিয়েছে অরণ্য-সুবহার। মনে মনে হাসছে আর ভাবছে আদ্রীশ, ‘ এই মেয়েটার প্রতিই কিনা অরণ্যের এত রাগ ছিল? সব সময় কষ্ট দিতে চাইত সুবহাকে। ’ সুবহার আম্মুর মৃত্যুর পর একে একে সবটাই খোলাসা হয়েছে অরণ্যের কাছে। সুবহার প্রতি তার রাগ সরে গিয়ে এক আকাশ পরিমাণ ভালোবাসার সৃষ্টি হয়েছে। ওদের এই সুন্দর সম্পর্কটা দেখলেও ভালো লাগে আদ্রীশের।

আকাশে মেঘ ডাকছে, বৃষ্টি আসার পূর্বাভাস দিচ্ছে। অরণ্যের মনে হলো এবার তাদের রিসোর্টে ফেরা উচিত। আদ্রীশও এসে ফিরে যাওয়ার কথা বলল অরণ্যদের। চলেই যাচ্ছিলো তারা, কোথা থেকে তখন এক পাহাড়ি মেয়ে এসেছে, কান্না করতে করতে কিছু একটা বলছে অরণ্যকে। অরণ্য মেয়েটাকে শান্ত হতে বলল, কী সমস্যা হয়েছে বুঝিয়ে বলতে বলল তাকে। মেয়েটার কথায় অরণ্য বুঝলো, মেয়েটার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের সাহায্য করার মতো কাউকেই খুঁজে পাচ্ছে না মেয়েটা। অরণ্যের মায়া হলো মেয়েটার জন্য, আশ্বাস দিলো তাকে সাহায্য করবে সে। আদ্রীশকে বলল সুবহাকে নিয়ে রিসোর্টে যেতে, অরণ্য আসছে একটু পরেই। কিন্তু সুবহার মন মানছে না, অরণ্যকে একা ছাড়তে। ওর হাত ধরে বসে আছে তখন থেকে। অরণ্য হাসল সুবহার বাচ্চামি দেখে, আলতো করে কপালে চুমু দিয়ে বলল সুবহাকে —--

“ আমি যাব আর আসব, চিন্তা নেই। ”

অরণ্যের কথা শেষ না হতেই উত্তর দিলো সুবহা।

“ আমিও আপনার সাথে যাব।”

“ না, তোমার শরীর খারাপ। রিসোর্টে ফিরে খাবার খেয়ে শরীরের এনার্জি বাড়াও, তাহলে আমার একটু সুবিধা হয়। ”

আদ্রীশ কেঁশে উঠেছে অরণ্যের কথা শুনে, সুবহা লজ্জা পেয়ে মাথা নুইয়ে নিয়েছে, মনে মনে বকাঝকা দিচ্ছে অরণ্যকে।

————

মেয়েটা হাঁটছে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে, অরণ্যও আসছে তার পাশে পাশে। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে খাদের সামনে চলে এসেছে, খেয়ালই নেই অরণ্যের। এখন তার নিজেরই কেমন খটকা লাগছে মেয়েটা কি মিথ্যে বলে নিয়ে এসেছে তাকে? অরণ্য মেয়েটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, ‘ তোমার অসুস্থ ভাই কোথায়? ’ কিন্তু মেয়েটার বদলে চোখের সামনে রাইয়ানকে দেখতে পেলো অরণ্য। চোখ-মুখে রাগ নিয়ে তাকিয়ে আছে সে অরণ্যের দিকে। রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক অরণ্যের আদরে রাইয়ান তার একটা চোখ হারিয়েছে, হাতটাও অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

রাইয়ানের এই অবস্থা দেখে, অরণ্যের অনুশোচনা হচ্ছে না একটুও। ও যা করেছে, তার শাস্তি হিসেবে তো এইটুকু কিছুই না। শাস্তি এখনও বাকি রাইয়ানের। কিন্তু আজ এই নিস্তব্ধ জায়গাটাতে রাইয়ান কেন ডেকে এনেছে অরণ্যকে? অরণ্য কিছু বলবে, তার আগেই রাইয়ান ওর হাতে থাকা শক্ত স্টিলের টুকরোটা দিয়ে আঘাত করেছে অরণ্যের মাথায়। সাথে সাথে মাথা ফেটে রক্ত বের হতে শুরু করেছে। চোখ-মুখ আর গায়ের সাদা শার্টটা রক্তে লাল হয়ে গেছে অরণ্যের। চারিপাশ অন্ধকার লাগছে, মাথাটা ঘুরছে ওর। রাইয়ান হাসছে। হাসতে হাসতে বলছে অরণ্যকে—--

“উফস! কালকের খবরের কাগজের হেডলাইন থাকবে, নামি-দামি হসপিটালের নামকরা হার্ট সার্জন ডক্টর শেহরাজ অরণ্য আজ এই পৃথিবীতে নেই। তোর জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে রে, ম/রা/র আগে তোর লাভবার্ডের মুখটাও দেখতে পারলি না।”

রাইয়ানের মুখে সুবহাকে দেওয়া অরণ্যের নামটা শুনে রাগ মাথায় চড়ে গিয়েছে অরণ্যের নিজের সর্বশক্তি দিয়ে লাথি মেরেছে রাইয়ানকে। রাইয়ান গিয়ে ছিটকে পড়েছে কিছুটা দূরে।হাসছে অরণ্য,ওর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা সহ্য হচ্ছে না রাইয়ানের। উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত ছুটে গেলো অরণ্যের কাছে, খাদ থেকে ফেলবে বলে ধাক্কা দিতে যাচ্ছিলো তাকে।

————

রিসোর্ট থেকে বেরোনোর সময়ই মিহিকে মেসেজ পাঠিয়েছিল অরণ্য। মিহি তখন দেখেছিল অরণ্যদের, সঙ্গে আদ্রীশ আছে তাই কাছে গিয়ে কথা বলেনি। তবে যখনই দেখল অরণ্য মেয়েটার সাথে হেঁটে আসছে, এদিকে মিহিও তাদের পিছু নিয়েছিলো।

মাত্রই মিহি এসে দাঁড়িয়েছে অরণ্য আর রাইয়ানের সামনে। কী হয়েছে দেখে সাথে সাথেই কানে দুই হাত চেপে অরণ্যের নাম ধরে চিৎকার দিয়ে উঠেছে মিহি।

বিজ্ঞাপন
অন্তরালের প্রণয়িনী গল্পটি আফরোজা আঁখি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক গল্প