অন্তরালের প্রণয়িনী

পর্ব - ২৫

🟢

কিয়ান আর কিরণের বিয়ের দিনটা এগিয়ে এসেছে, হাতে মাত্র আর এক সপ্তাহের মতো সময় আছে। দুই বাড়ির মানুষদের যাতায়াতও বেড়েছে এখন। আজকে সুবহা আর কিরণ শপিং মলে যাবে বলে ঠিক করেছে। সকাল থেকে অরণ্যের পিছু পিছু হেঁটে রাজি করিয়েছে তাকে। হসপিটালে যাওয়ার আগে ড্রাইভারকে বলে দিয়েছে অরণ্য—সুবহা আর কিরণকে নিয়ে শপিং মলে যেতে, যতক্ষণ না সে আসবে যেন তাদের সাথেই থাকে।

সুবহা এদিকে মনে মনে ভেবে যাচ্ছে, আজকে একবার অফিসে যাবে, সাব্বিরকে সবটা বুঝিয়ে দিয়ে আসতে হবে। সুবহার চাচ্চুও বেশ কয়েকবার ফোন দিয়ে বলেছেন কথাটা।

———

শপিং মলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সুবহাদের গাড়িটা। গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে যাবে, তখনই কারো সাথে ধাক্কা লাগলো। সুবহার, মুখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেলো রাইয়ানকে কয়েক পা পিছিয়ে গেলো সাথে সাথে। রাইয়ান হেসে জিজ্ঞেস করলো সুবহাকে—--

“কেমন আছেন, মিস মেহরিন?”

সুবহা আর কিরণ একে অপরের দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে চারিপাশে চোখ বুলিয়ে উত্তর দিলো সুবহা—--

“ মিসেস মেহরিন। আর হ্যাঁ, আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”

সুবহার কথায় ভ্রু কুচঁকালো রাইয়ান পরক্ষণেই আবার কি যেন ভেবে মুচকি হেসে উত্তর দিলো।

“আমি ভালো নেই।”

রাইয়ান কেমন করে তাকিয়ে আছে সুবহার দিকে, বিষয়টা মোটেও পছন্দ হলো না কিরণের। এমনিতেই ড্রাইভার ভালোভাবে নজর রাখছে তাদের উপরে, অরণ্যকে হয়তো এতক্ষণে বলেও দিয়েছে সুবহা কারো সাথে কথা বলেছে। ভাইয়ের রাগ কেমন, কিরণ জানে ভালো করেই। সুবহার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো সেখান থেকে; সুবহাও চলে যাচ্ছিলো, কথা বলে নতুন করে কোনো সমস্যার সৃষ্টি করতে চায় না সে। সুবহার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল রাইয়ান—--

“কেন ভালো নেই জানতে চাইবেন না?”

কিরণ রাগে দাঁত কিড়মিড় করে তাকিয়েছে রাইয়ানের দিকে। সুবহাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কিরণ বলে উঠেছে রাইয়ানকে—--

“ডাক্তার দেখিয়ে ভালো থাকার মেডিসিন নিয়ে আসুন। তাহলে আর জনে জনে সবাইকে ভালো না থাকার কারণ বলতে হবে না।”

কিরণের এমন কথা শুনে হাসি পেলো সুবহার। কিরণ তখন সুবহার হাত ধরে নিয়ে গেলো তাকে শপিং মলের ভেতরে।

———

কিরণ শাড়ি পছন্দ করছে, সুবহা এদিকে সাব্বিরকে ফোন দিয়ে আসতে বলেছে। ফোনে কথা বলতে বলতে সুবহা বেরিয়ে যাচ্ছিলো শপিং মল থেকে। কিরণকে অবশ্য বলেই যাচ্ছে। এতোদিন পর বেরিয়েছে তাই কিরণও বাধা দেয়নি আর।

কিরণ একের পর এক শাড়ি দেখছে কোনোটাই পছন্দ হচ্ছে না তার। আসার আগে কিয়ানের সাথে কথা হয়েছিলো, ওর আম্মু আর চাচিকে নিয়ে আসবে বলেছিলো এদিকেই। কিরণ কি যেন ভেবে ফোন দিলো কিয়ানকে, কিন্তু কিয়ান কল রিসিভ না করে বারবার কেটে দিচ্ছিলো। কিরণের মনে হলো কিয়ান হয়তো কোনো সমস্যায় আছে, তাই আর বিরক্ত করল না তাকে।

আচমকা কেউ কিরণের মাথার বেনি ধরে টান দিলো। বিরক্ত হয়ে রাগান্বিত চেহারা নিয়ে ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেলো কিয়ানকে ঘাড় কাত করে মুখে সুন্দর হাসি নিয়ে কিয়ান তাকিয়ে আছে তার দিকে।কিরণ তার হাতে থাকা শাড়িটা কিয়ানকে দেখিয়ে বলল—--

“এটা কেমন?”

“সুন্দর, তবে আমার রাগীনিকে মানাবে না।”

কিরণের হাসিমাখা মুখটা চুপসে গেলো মুহূর্তেই। সে যে এত সময় ধরে বেছে বেছে এটা নেবে বলেই ঠিক করেছিল। কিয়ান একটা মেরুন রঙের সুন্দর জামদানি শাড়ি হাতে নিয়েছে। শাড়িটা মেলে, পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কিরণের মাথায় ঘোমটা টেনে দিলো। সামনে আয়না, কিয়ান কিরণের কাঁধে হাত রেখে ঘুরিয়ে দিলো তাকে। কিরণের ঘাড়ে নিজের থুতনি রেখে বলল—--

“এবার মানিয়েছে। বউ-বউ লাগছে।”

কিয়ানের কথায় লজ্জা পেলো কিরণ। কিয়ান দেখল তার লজ্জাবতীর লজ্জায় রাঙা মুখটি।

———

কিয়ানের আম্মু আর চাচি দুজনেই গিয়েছেন জুয়েলার্সের দোকানে বাড়ির একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা, আয়োজন করছেন বড় করেই। কিরণের বাড়িতেও বিয়ের আয়োজনে কোনো কমতি রাখতে চান না তার বাবা আর ভাই। অন্য সময় হলে কিরণকে একা শপিং মলে আসতে দিত না অরণ্য। বিয়ে করে বোন চলে যাবে শ্বশুরবাড়ি, তাই যা চাইছে সবটাই মেনে নিচ্ছে।

কিরণ কিয়ানের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটছিলো, তখনই চোখ পড়লো রাস্তার অপর প্রান্তে রাইয়ানের সাথে একটা মেয়ে কথা বলছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। মেয়েটাকে স্পষ্ট দেখা না গেলেও কিরণের মনে হলো এটা আনহা। কিয়ানের শার্টের হাতা ধরে টেনে বলতে চাইলো কথাটা, কিন্তু কিয়ান তখন ব্যস্ত হয়ে কারো সাথে ফোনে কথা বলছে। রাগ হলো কিরণের, কিয়ানের কানে থাকা ফোনটা একটানে কেড়ে নিয়ে বলল—--

“বিয়ে ঠিক হয়েছে, পর থেকে আপনি আমাকে পাত্তা দিচ্ছেন না কেন?”

“ রাগীনি,ফোনটা দাও।”

“আমার কথার উত্তর এটা নয়।”

“পাত্তা দিই না তোমাকে? একবার কল না ধরলে তোমার বাসার গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। তোমাকে ভালোবাসি বলেই তোমার ওই জাউরা ভাইয়ের হাতে আমার বোনকে তুলে দিয়েছি। তবুও বলবে, পাত্তা দিই না?”

কিরণ প্রথমে মুখ বেজার করে দাঁড়িয়ে ছিলো, কিয়ানের কথা শেষ হতেই এক গাল হেসে কাছে গেলো তার। দুই গাল টেনে হেসে হেসে বলল—--

“রাগলে আপনাকে একেবারে হুলো বিড়ালের মতো লাগে।”

কিয়ানের সত্যিই রাগ হয়েছিলো। কিরণের কথা শুনে এখন হাসি পাচ্ছে তার।

দুজনেই কথা বলছিল, তখনই কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ানের চাচি আর আম্মু ডেকে উঠলেন তাদের। দুজনেই শুনলো তাদের ডাক।এদিকে কিয়ানের সাথে এত সময় কথা বলতে বলতে কিরণের মাথা থেকে আনহার কথা বেরিয়ে গেছে।

কেনাকাটা এখনও বাকি, কিরণের পেয়েছেন তাই সাথে করেই নিয়ে যেতে চাইছেন কিয়েনার আম্মু আর চাচি দুজনে। সড়কে খুব একটা গাড়ি নেই দেখে, সবাই মিলে অপেক্ষা না করেই রাস্তা পার হচ্ছিলো। ঠিক তখনই ফুল স্পিডে কোথা থেকে একটা গাড়ি ছুটে এলো। কেউ না দেখলেও দেখেছেন সুবহার আম্মু। কিরণ আর উনি ছিলেন পিছনে দুজনেই হাত ধরে হাঁটছিলেন। গাড়িটা এসে কিরণকে ধাক্কা মারতে যাবে, ঠিক তখনই তিনি দু'হাত দিয়ে ঠেলে সামনে পাঠিয়ে দিলেন কিরণকে। গাড়ির ধাক্কাটা লাগে ওনার নিজের শরীরে। এত জোরে ধাক্কা লাগে যে রোডের ওপর পাশে গিয়ে ছিটকে পড়লেন তিনি।

কি হয়েছে বুঝা মাত্রজ সেখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে উঠেছে কিরণ। চিৎকার শুনে কিয়ান আর তার আম্মু তাকালো পিছনের দিকে। চাচিকে দেখতে না পেয়ে কিয়ান ছুটে এসে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো কিরণকে।

“ আমার বড় আম্মু কোথায় কিরণ?”

কিরণের চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে, ভয়ে হাত-পা কাঁপছে ওর। হাতের আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়েছে কিয়ানকে। কিরণের ইশারা অনুসরণ করে কিয়ান আর ওর আম্মুও তাকালেন সেদিকে। দেখলেন, মানুষ জড়ো হয়েছে জায়গাটাতে। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠেছে কিয়ানের—ওর বড় আম্মুর কি কোনো ক্ষতি হলো?

কিয়ান দৌড়ে চলে গেছে রাস্তার ওনার কাছে, পেছনে পেছনে এসেছেন কিরণ আর কিয়ানের আম্মু; দুজনেই। লোকজন ঠেলে কিয়ান ভেতরে ঢুকেছে। চোখের সামনে তার রক্তাক্ত বড় আম্মুকে দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠেছে কিয়ানের। হাত, পা, মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছেন তিনি। মাথা থেকে রক্ত বেরিয়ে পুরো রাস্তাটা ভিজে গেছে।

কিয়ানের আম্মু আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না; ছেলের সাথে সাথে তিনিও আহাজারি করে ছুটে গেছেন জায়ের কাছে। কিয়ান দেরি না করে অন্যদের সাহায্যে দ্রুত গাড়িতে তুলে নিয়েছে ওনাকে। নিজে ড্রাইভিং সিটে বসেছে, আর পেছনে কিরণ আর কিয়ানের আম্মু—কান্না করছেন দুজনেই। কিরণের খুব খারাপ লাগছে, কষ্ট পাচ্ছে মনে মনে। তার জন্যই তো ওনার এত বড় একটা এক্সিডেন্ট হয়ে গেলো! নিজেকে কীভাবে ক্ষমা করবে সে?

———

রাইয়ান গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে মাথায় হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিন্তিত মুখ নিয়ে। সামনে থাকা আনহার দিকে রেগে তাকিয়ে আছে। আনহার এত বড় সাহস—রাইয়ান চৌধুরীর গায়ে হাত তুলেছে সে? রাইয়ানের ইচ্ছে করছে আনহাকে মেরে ফেলতে; পারছে না শুধু ফেঁসে যাবে বলে।

আনহার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে, বারবার বলেও যখন উত্তর পেলো না রেগে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল তখন—--

“কি করেছেন বুঝতে পারছেন আপনি?”

রাইয়ানও একই ভাবে বলল।

“আমি বুঝিনি এমনটা হবে।”

“এখন বুঝিনি বললে হবে? মাথামোটার মতো কাজ করেছেন আপনি।”

“আরে আমি কি জানতাম নাকি অরণ্যের বোনের জায়গায় ওনি চলে আসবেন? আমি তো জাস্ট ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম, এমনটা হবে ভাবিনি।”

“চুপ করুন। গাড়িতে তখন আমিও ছিলাম। আমি ফাঁসলেও আপনাকে নিয়েই ফাঁসব; মনে রাখবেন।”

রাইয়ান হাসল, কিছুক্ষণ পর আনহাকে বলল—--

“রাইয়ান চৌধুরীকে ফাঁসানো এত সহজ নয়, মেয়ে। ভালো পরামর্শ দিচ্ছি শুনো, তুমি যদি আমার সাথে থাকো তাহলে বেঁচে যেতে পারো, নইলে কী হবে আমি নিজেও জানি না।”

আনহা চলে যাচ্ছিলো রাইয়ানকে রাগ দেখিয়ে, যেতে যেতে বারবার বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে—-- “এখন যদি বড় আম্মুর ভালো-মন্দ কিছু হয়ে যায়, আমি নিজেকে ক্ষমা করব কীভাবে?”

রাইয়ান কী যেন ভেবে হাসছে, আনহার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে। বড় একটা ভুল করে ফেলেছে সে, কিন্তু অনুশোচনা হচ্ছে না মোটেও। যেভাবেই হোক রাইয়ানের সুবহাকে লাগবে, অরণ্যকেও তার ভুলের শাস্তি দেবে। ইচ্ছাকৃত সেদিন গাড়ি দিয়ে ধাক্কা মেরেছিলো অরণ্য তাকে,ব্যাপারটা তখন ঘাটাঘাটি করে দেখেনি রাইয়ান। কিন্তু পরে যখন অরণ্য আর সুবহার রিসেপশনের দিন তাকে অপমান করল, থ্রেট দিলো ওভাবে; রাগ মাথায় চড়ে গিয়েছিল রাইয়ানের।

তখনই অ্যাসিস্ট্যান্টের থেকে খুঁজ নিয়ে জানতে পারলো সেদিন যে গাড়িটার সাথে তার এক্সিডেন্ট হয়েছিল, সেটা ছিল অরণ্যের গাড়ি। অপেক্ষা করছিল শুধু সঠিক সময়ের জন্য। আজকে এখানে আসার কারণ সে জানত, সুবহা আর কিরণ এখানে আসবে।

অরণ্যের সবচেয়ে প্রিয় হলো তার একমাত্র আদরের বোন—রাইয়ান এটা শুনেছে আনহার থেকেই। রাইয়ানের মাথায় তখন শয়তানি বুদ্ধি এলো—ভাবলো অরণ্যকে জব্দ করতে কিরণকেই সে ব্যবহার করবে। রাইয়ানের টার্গেট ছিল কিরণই, কিন্তু কোথা থেকে সুবহার আম্মু চলে এসেছেন সামনে—গাড়ির ধাক্কাটা গিয়ে কিরণের বদলে লেগেছে ওনার শরীরে।

———

সুবহার আম্মুকে হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছে অনেক আগেই। কিরণ গাড়িতে ওঠার সময়ই মেসেজ করে জানিয়েছিল অরণ্যকে সবটা। ইতিমধ্যেই বাড়ির সবাই এসে উপস্থিত হয়েছেন সেখানে। আনহাও দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে। কান্না করছেন কিয়ানের আম্মু, কিরণেরও একই অবস্থা বারবার নিজেকে দোষারোপ করে যাচ্ছে ও। অরণ্যের আম্মু-আব্বুও এসেছেন অনেকক্ষণ আগে। সবার কপালেই চিন্তার ভাঁজ।

সুবহার আব্বু জাহিদ হোসেনের আবার হার্টের সমস্যা—ওনাকে বলা হয়েছে মাথায় সামান্য আঘাত লেগেছে ওনার স্ত্রীর, সেরে যাবেন দ্রুতই। কিন্তু কিয়ান তো জানে ওর বড় আম্মুর অবস্থা। এসে থেকে পায়চারি করে যাচ্ছে হসপিটালের করিডরে। সাদা রঙের শার্টটা রক্তে লাল হয়ে আছে কিয়ানের।

কিয়ান ভাবলো সুবহাকে আবারও ফোন দেবে, তখনই কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে সুবহা। কিয়ানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাপাতে হাপাতে বলছে তাকে—--

“আ..আম্মু, আমার আম্মুর কী হয়েছে ভাইয়া?”

কিয়ান চুপ রইলো কিছুক্ষণ, একবার ওর চাচ্চুর দিকে তাকালো, তারপর সুবহার হাত ধরে কিছু দূরে নিয়ে গেলো তাকে। সুবহা চিন্তিত হয়ে আছে, বারবার একই কথা জিজ্ঞেস করছে কিয়ানকে। কিয়ান সবটা বুঝিয়ে বলল ওকে এখন আরো বেশি টেনশন হচ্ছে সুবহার। ওর আম্মু কেমন আছেন? ঠিক আছেন তো?

মাথায় হাত চেপে কেবিনের দিকে যাচ্ছিলো সে, নার্স এসে থামিয়ে দিয়েছে ওকে। কিন্তু সুবহার অশান্ত মন যে মানছে না ওর আম্মু ভালো আছেন কিনা না জানলে শান্তি পাবে না কোনোভাবেই।

কিছুক্ষণ পর মিহি বেরিয়ে এসেছে অপারেশন থিয়েটার থেকে। সুবহা দেখা মাত্রই ছুটে গেছে ওর কাছে। মিহি বুঝলো সুবহার চিন্তার কারণ কিছু বলতে যাবে, তার আগেই বলে উঠেছে সুবহা

“মিহি আপু, আমার আম্মু ঠিক আছেন তো?”

মিহি কিছুক্ষণ চুপ থেকে, সবার দিকে একবার তাকিয়ে, আস্তে করে বলল সুবহাকে—--

বিজ্ঞাপন

“চিন্তা করো না সুবহা, সব ঠিক হয়ে যাবে। অরণ্য দেখছে ওনাকে।”

কথাটা বলে আর দেরি করেনি মিহি, চলে গেছে সেখান থেকে। অরণ্য তাকে পাঠিয়েছে কোনো একটা ঔষধ আনতে তাই আর কথা বলে সময় নষ্ট করেনি।

———

যত সময় যাচ্ছে, সুবহার আম্মু সেলিনা বেগমের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। হাত-পা আর মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছেন ওনি। অরণ্য আদ্রীশকে জানালো, ওনাকে ইমিডিয়েটলি আইসিইউ-তে শিফট করতে হবে। অরণ্য একটা ইনজেকশন আনতে যাচ্ছিলো, তখন নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা দিয়ে ওর হাতের আঙুল ধরলেন সেলিনা বেগম। ওনার জ্ঞান ফিরেছে বুঝা মাত্রই তড়িৎ গতিতে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়েছে অরণ্য। নিভু নিভু চোখে অরণ্যের পানে তাকিয়েছেন সেলিনা বেগম, কিছু বলতে চাইছেন অরণ্যকে। বুঝতে পেরে অরণ্য ওনার হাতটা শক্ত করে ধরলো, চোখ ইশারায় আশ্বাস দিলো ওনি ঠিক হয়ে যাবেন। চোখ দিয়ে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল সেলিনা বেগমের। অরণ্যের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে আস্তে আস্তে মুখে থাকা অক্সিজেন মাস্কটা খুলে বললেন অরণ্যকে—--

“তোমার বোনের সাথে আমার কিয়ানের বিয়ে দিও, বাবা। আমার মেয়েটাকে কষ্ট দিও না; মুখে না বললেও আমার মেয়েটা মনে মনে তোমাকে অনেক ভালোবাসে—মা হয়ে আমি বুঝতে পারি এটা।”

কথাটা বলেই কষ্ট করে শ্বাস নিচ্ছেন সেলিনা বেগম। চোখটা বার বার বন্ধ হয়ে আসছে সেলিনা বেগমের, অরণ্য ভয় পেয়ে দ্রুত মাস্কটা লাগিয়ে দিয়েছে ওনার মুখে। অরণ্য ওনাকে চুপটি করে শুয়ে থাকতে বলল, কিন্তু শুনলেন না তিনি। আবারও কিছু একটা বলতে চাইলেন অরণ্যকে। মুখের মাস্কটা খুলে ওর হাতটা ধরে বললেন।

“আমার মেয়েটাকে কষ্ট পেতে দিও না, বাবা। ও চুপচাপ নিজের কষ্টগুলো কাউকে বলেনা, তুমি বুঝে নিও। তোমরা সুখে আছো দেখলে আমি মরেও শান্তি পাবো।”

অরণ্যের খুব কষ্ট হচ্ছে কথাগুলো শুনে। ওনাকে যে সে দেখে আসছে ছোট থেকেই। কিয়ান আর তাকে কখনোই আলাদা করে দেখেননি তিনি। অরণ্য নিজের ভাবনা থেকে বেরুলো এই মুহূর্তে যেভাবেই হোক, সুস্থ করে তুলতে হবে ওনাকে। পালস রেট কমে আসছে সেলিনা বেগমের, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে ওনার। ওনাকে আইসিইউ-তে শিফট করবে, তখনই আদ্রীশ খেয়াল করল ওনাকে, শুধু শরীরটাই পড়ে আছে বেডে, প্রাণপাখিটা যে উড়ে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু অরণ্য কোনো দিকে খেয়াল না করেই প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে, ওনাকে বাঁচাবে বলে। আদ্রীশ আলতো করে অরণ্যের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল তখন—--

“অরণ্য, আন্টি আর নেই। তাকিয়ে দেখ ওনার দিকে।”

হুঁশ ফিরল অরণ্যের, সেও এবার খেয়াল করলো বেডে শুয়ে থাকা সেলিনা বেগমকে। শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে না ওনার, শরীরটা নিথর হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো অরণ্যের, কয়েক পা পিছিয়ে গেল সে। কিছুক্ষণ পর আবার কী যে ভেবে, ওনার প্রাণহীন দেহটার কাছে আসল অরণ্য। তার কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে ওনার খোলা চোখ দুটো বন্ধ করে দিলো।

———

অরণ্য অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরুতেই সবাই ছুটে চলে গেছে ওর কাছে। গিয়েছে সুবহাও, বারবার জিজ্ঞেস করছে ওর আম্মু কেমন আছেন? অরণ্য চুপ করে আছে। এই চুপ থাকার মানেটা বুঝতে বাকি নেই কারোর। সুবহার আব্বুর বুকটা ভার হয়ে আসছে, চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার ঠেকছে ওনার। ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ানের আব্বু জিহাদ হোসেন ধরে ওনাকে নিয়ে গেছেন সেখান থেকে। অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে বুঝতে পেরে, আদ্রীশ আর মিহি নার্স ডেকে কেবিনে নিয়ে গেলো ওনাকে।

পাশে থাকা ব্রেঞ্চটাতে দপ করে বসে পড়েছে সুবহা। চিৎকার দিয়ে কান্না করতে ইচ্ছে করছে তার। পরনের শাড়িটা এলোমেলো হয়ে আছে, আঁচল গড়াচ্ছে মাটিতে। সুবহার আম্মু আর নেই? সে কাকে আম্মু বলে ডাকবে? খাবার না খেলে কে সুবহার দরজার সামনে এসে বারবার ডাকাডাকি করবে? চারদিকটা অন্ধকার লাগছে সুবহার। মনে হচ্ছে, মাথা ঘুরে পড়ে যাবে এক্ষুনি। অরণ্য দূর থেকে দেখছে তাকে, বিধ্বস্ত সুবহাকে দেখে বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছে ওর। কষ্ট হচ্ছে খুব! অরণ্য হেঁটে সুবহার কাছে গেল। সুবহা তখন মাথা তুলে তাকালো ওর দিকে, উঠে দাঁড়িয়ে কান্নারত কণ্ঠে অরণ্যকে বলছে বারবার—--

“আমার আম্মুকে এনে দিন, আপনি যা বলবেন আমি তাই করব।”

অরণ্য বুঝলো সুবহার মনের অবস্থা। কান্নারত সুবহার মাথাটা চেপে ধরলো নিজের বুকে, মাথায় হাত বুলিয়ে বলল—--

“মৃত মানুষকে জীবিত করা যায় না, লাভবার্ড।দোয়া করো ওনার জন্য। তোমাকে ঠিক থাকতে হবে,আঙ্কেলকে সামলাতে হবে।”

সুবহার কান্নার বেগ বাড়ল। অরণ্যকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্না করে যাচ্ছে সে। বিড়বিড় করে বারবার বলে যাচ্ছে—--“আমি এখন কাকে আম্মু বলে ডাকব? কে আমাকে আম্মুর মতো যত্ন করে খাইয়ে দিবে? আমাকে ভালোবাসবে, বকবে?”

কিয়ান নীরবে কাঁদছে। তার তো উচিত ছিল সুবহাকে সান্ত্বনা দেওয়া! কিন্তু কিয়ানের নিজেরই বা কষ্ট কম হচ্ছে কিসে? তার বড় আম্মু চলে গেছেন সবাইকে ছেড়ে কথাটা এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না কিয়ানের। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা জাহানারা সুলতানা দেখছেন সবটাই, খুব কষ্ট হচ্ছে ওনার। বারবার সুবহার জায়গায় কিরণকে বসিয়ে ভাবছেন, বুঝতে পারছেন মেয়েটা কতটা কষ্ট পেয়েছে। আজকে ওনার ইচ্ছে করছে সব মান-অভিমান দূরে ঠেলে দিয়ে, নিজের মেয়ের মতোই মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে সুবহাকে।

অরণ্য সুবহাকে বুঝিয়ে বলল ওর আব্বুর সুস্থতার জন্য ওকে স্ট্রং থাকতে হবে। সুবহাও হয়তো বুঝেছে,নিজের আম্মুকে হারিয়ে দিশেহারা সে, আব্বুকেও হারাতে চায় না। বাইরে থেকে নিজেকে শক্ত দেখালেও, যে ভেতরে ভেতরে দুমড়ে-মুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে, সে।

অরণ্য চলে যাবে, তখনই চোখ পড়লো আনহার দিকে। খটকা লাগল ওর সবাই কান্নাকাটি করছে, আর আনহা এভাবে ভয়ার্ত মুখশ্রী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে? কী যেন ভেবে যাচ্ছে তখন থেকে। অরণ্য যা ভাবছে, সেটাই কি সত্যি? মিহি আর আদ্রীশের ডাকে আনহার থেকে নিজের মনোযোগ সরিয়ে ওদের দিকে তাকালো অরণ্য। কথা বলল কোনো বিষয় নিয়ে। ততসময়ে আনহাও চলে গেছে সেখান থেকে।

———

সুবহার আম্মু মারা যাওয়ার বেশ অনেকগুলো দিন হয়ে গেছে প্রায় তিন মাসের মতো। সুবহা আজ তার আব্বুকে দেখতে এসেছে। ওনার শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না, ভয় হয় সুবহার মায়ের মতো বাবাকেও হারাতে চায় না সে। সেজন্যই কয়েকদিন পর পর এসে দেখে যায় নিয়ম করে খুঁজ নেয় প্রতিদিন ওনার।

জাহিদ হোসেন তখন সোফায় বসে পুরোনো অ্যালবামটায় চোখ বুলাচ্ছিলেন। প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যুতে নিজেকে সামলেছেন খুব কষ্ট করে। ওনারও ইচ্ছে হয়, সব ছেড়েছুড়ে চলে যেতে পরপারে। নিজেকে ঠিক রাখছেন শুধু মেয়ের জন্য।

সুবহা বাবার রুমে এসেছে খাবার নিয়ে। মেয়েকে দেখে অ্যালবামটা হাত থেকে নামিয়ে রাখলেন তিনি। মুচকি হেসে মেয়েকে পাশে বসতে বললেন। সুবহাও শুনল বাবার কথা, খাবারের প্লেটটা রেখে বসল ওনার পাশে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বাবার পানে তাকিয়ে বলল সুবহা—--

“তুমি কি এখনও আমার ওপর রেগে আছো, আব্বু?”

জাহিদ হোসেন তাকালেন মেয়ের দিকে, কি যেন ভেবে হাসলেন তিনি। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে কণ্ঠে বললেন—--

“তোমার ওপর আমার কোনো রাগ নেই, প্রিন্সেস।”

সুবহা হাসল বাবার কথা শুনে, জড়িয়ে ধরল ওনাকে। আজকে নিজের আম্মুকে খুব মিস করছে সুবহা। বাড়িতে এসেছে পর, কখনো তিনজনে একসাথে বসে গল্প করেনি, খাবার খায়নি। আজকে সুবহা আর তার আব্বু একসাথে আছেন, কিন্তু সুবহার আম্মু নেই। কথাটা ভাবতেই চোখ গড়িয়ে দু’ফোঁটা পানি পড়ে গেল তার। নিজেকে সামলে, অন্য হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে নিলো চোখের পানি।

অরণ্য সুবহাকে ফোন দিয়ে বলেছে, রেডি থাকতে, সে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিতে আসবে তাকে। সুবহা তাড়াতাড়ি বাবাকে ওষুধ দিয়ে চলে গেল সেখান থেকে। রেডি হতে হবে, এক মিনিট দেরি হলেই ডাক্তার সাহেব আবার রাগ দেখাবেন। বাবাকে বিদায় জানিয়ে নিজের রুমে চলে গেল সুবহা।

আজকে সে সুন্দর একটা ধূসর রঙের শাড়ি পরেছে। গলায় আর কানে অরণ্যের দেওয়া সুন্দর একটা ডায়মন্ড পেন্ডেন্ট। সুবহা রেডি হয়ে নিচে এসেছে মাত্রই, ওর চাচি তখন থেকেই অপেক্ষা করছেন ওর জন্য। সুবহাকে দেখেই হাত ধরে টেনে ডাইনিং টেবিলে বসালেন। সুবহার পেটে খিদে নেই একটুও। এসেছে পর থেকেই এটা-সেটা রান্না করেই যাচ্ছেন ওর চাচি। সুবহা একবার পুরো টেবিলজুড়ে চোখ বুলালো—কতো রকমের রান্না! সবগুলোই ওর পছন্দের, কিন্তু পেটে যে খাবার রাখার জায়গা নেই!

ঠিক তখনই কিয়ান কোথা থেকে এসে বসল সুবহার পাশে। অনেক হলো ভাইবোনের মধ্যে আগের মতো কথা হয় না। দুজনেই নিজেদের মতো করে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিয়ান তো এখন অফিস সামলাতে ব্যস্ত। কিয়ান কাজে মন দিয়েছে দেখে ভালোই লাগে সুবহার। এখন আর অফিসের ঝামেলায় নিজেকে জড়ায় না সে, সবটা কিয়ানই দেখে নেয়।

কিয়ান সুবহার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ভাইয়ের হাসির উত্তরে সুবহাও হেসে বলল—--

“কিরণের সাথে কথা হয়?”

“তোর ননদ আমাকে পাত্তা দেয়?”

সুবহা কিছুক্ষণ চুপ থাকল, পরে আবার কিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল।

“অফিসের কাজে মন দিয়েছ দেখে ভালো লাগছে। তবে এতটা ব্যস্ত হয়ে পড় না যে তোমার এই ব্যাস্ততার জন্য কাছের মানুষগুলো দূরে সরে যায়।”

কিয়ান খাওয়া থামিয়ে সুবহার দিকে তাকালো। ভাবল মনে মনে—--“ সত্যিই তো, আজকাল আর আগের মতো খোঁজ নেওয়া হয় না কিরণের। কিরণের কি রাগ আছে আমার ওপর?”

সুবহা হয়তো কিছু বুঝল। কাঁধে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে ভাইকে জিজ্ঞেস করল আবারও—--

“কি ভাবছো ভাইয়া? কিরণ রাগ করেছে কিনা?”

“বুঝলি কীভাবে?”

সুবহা হেসে উত্তর দিলো ভাইকে—--

“মেয়েরা অভিমান করলে চুপ হয়ে যায়, যেমনটা হয়েছে কিরণ। তোমার প্রতি ওর মনে অভিমান জমেছে। যত দ্রুত সম্ভব এই অভিমানের দেয়াল ভেঙে, আবারও কাছে টেনে নিও ওকে।”

কিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাসল, মাথা নাড়িয়ে সায় জানাল বোনের কথায়।

সুবহার খাওয়া শেষ। এবার তাকে উঠতে হবে, বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য, বারবার কল দিচ্ছে তাকে। ব্যস্ত হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠেছে সুবহা—এবার তাকে ফিরতে হবে।

কিয়ানের কী যেন মনে হলো, গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল সুবহাকে—-

“আমাদের বাড়িতে আসলে কি তোর বড়লোক ডাক্তার বরের সম্মান কমে যাবে?”

“তা হতে যাবে কেন? তোমাদের এই মেয়েদের মতো চুলোচুলি করার অভ্যাসটা কি কোনো কালেই যাবে না ভাইয়া?”

“এখন তো বরের পক্ষ নিবিই।”

হাসলো সুবহা কিয়ানের কাছে এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে বলল।

“তোমার রাগের কারণ আমি বুঝতে পারছি। অতি শিগগিরই শুভদিনটি আসতে চলেছে রেডি হও।”

কিয়ান ভ্রু কুঁচকে একবার সুবহার দিকে তাকিয়ে আবার খাওয়ায় মন দিল। সুবহাও আর কথা বাড়াল না, শুধু হাসল মনে মনে। এই দু’জনের চোখে চোখে ঝগড়া দেখতে ভালোই লাগে সুবহার। দেখা হলেই মেয়েদের মতো একজন অন্যজনকে খোঁচা মেরে কথা বলে। এগুলো দেখলে শব্দ করে হাসতে ইচ্ছে করে পারে না শুধু, দুজনেই রেগে যাবে বলে।

———

ড্রাইভিং সিটে বসে আছে অরণ্য পাশেই বসে আছে সুবহা দুজনেই চুপ করে আছে।বাহিরের দিকে তাকিয়ে সুবহা ভাবছে মনে মনে ওর আম্মুর মৃত্যুর পর সবকিছু কেমন পরিবর্তন হয়ে গেছে। সুবহার সাথে অরণ্যের আম্মু জাহানারা সুলতানার সম্পর্কটা এখন আগের থেকে অনেক ভালো হয়েছে। বউমার খেয়াল রাখেন তিনি মেয়ের মতই, আদর করেন সুবহাকে। বার বার নিজের মেয়ের জায়গায় সুবহাকে বসিয়ে ভাবেন বুঝতে পারেন মাকে হারিয়ে কতোটা কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা।ওনার এতো যত্ন পেয়ে ভালোই লাগে সুবহার এক মাকে হারিয়ে আরেক মা পেয়েছে সে। অরণ্যের টক্সিসিটি মাঝেমধ্যে বিরক্ত লাগে তার পরক্ষণেই আবার মায়া হয় অরণ্যের জন্য ভেঙে পড়া সুবহাকে খুব যত্ন করে বুকে আগলে নিয়েছে অরণ্য। এখন আর অরণ্য রাগলেও ভয় হয় না তার বিশ্বাস তাকে কিছুক্ষণ না যেতেই আবার অরণ্য বুকে টেনে নিবে তাকে।

———

বাড়িতে যাওয়ার বদলে অরণ্য সুবহাকে নিয়ে এসেছে নিজের ফ্ল্যাটে। আদ্রীশ আর মিহিকেও আসতে বলেছিলো সেখানে। তারা তো অরণ্য আর সুবহা আসার আগেই এসে হাজির হয়েছে। অরণ্য সেই তখন থেকেই কোনো প্রয়োজনীয় কথা বলে যাচ্ছে ওদের সাথে৷ সুবহাকে অরণ্য নিজেই রুমে যেতে বলেছে। সুবহাও বুঝল অরণ্য চায় না তাদের কথা সে শুনুক তাই নিজে থেকেই চলে গেছে।

আজকে আকাশে মেঘ ডাকছে, মুষুলধারে বৃষ্টি হচ্ছে বাহিরে।নিজের রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে সুবহা বাহিরের বৃষ্টির পানি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে সে। অরণ্যের জন্য অপেক্ষা করছিলো এতোসময়, মাত্রই এসে দাঁড়িয়েছে এখানে। বৃষ্টির পানি এসে ভিজিয়ে দিয়েছে ওর পুরো মুখ শরীরের পাতলা শাড়িটাও ভিজে লেপ্টে আছে গায়ের সাথে। আচমকা তলপেঠে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করলো সুবহা কিছু না বলেই চোখ বন্ধ করে নিলো সে। সুবহা ভালো করেই জানে মানুষটা অরণ্য তাই চুপটি করেই দাঁড়িয়ে আছে সে। সুবহার ফর্সা পিঠে এসে পড়া চুলগুলো অরণ্য সরিয়ে দিয়েছে একপাশে। মুখ ডুবিয়েছে ওর গলায়। অরণ্যের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শে বার বার কেঁপে উঠছে সুবহা। ঘুরে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে কাছে আসতে বারণ করলো অরণ্যকে। অরণ্য শুনলো না তার কথা বাঁকা হেসে সুবহার কোমরে দুই হাত চেপে নিয়ে আসলো নিজের কাছে। টুপ করে ঠোঁটে একটা চুমু দয়ে বলল অরণ্য।

“ সব সময় এমন পালাই পালাই করো কেন?তোমার জন্য আমার বাচ্চাদের পৃথিবীতে আসতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

“আমার জন্য বাচ্চাদের পৃথিবী আসতে দেরি হয়ে যাচ্ছে মানে?”

“ তুমিই তো আমার কাছে আসো না। মন দিয়ে কাজ না করলে দ্রুত রেজান্ট আসবে কি করে?

বলেই অরণ্য সুবহার হাত ধরে তাকে রুমে নিয়ে যেতে যেতে বলল —“ তাড়াতাড়ি চলো লাভবার্ড আমার মুড এসেছে আজকে।”

সুবহা একটা মুখ ভেংচি দিয়ে অরণ্যের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল।

“ আপনি মুডে থাকেন না কখন শুনি?”

“ কি করব বলো তুমি কাছে আসলেই অটোমেটিকালি আমার মুড চলে আসে। চেয়েও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনা আমি।”

সুবহা অরণ্যের কথা শুনে হাসল নিরবে আবারও চলে গেলো বেলকনিতে। অরণ্য এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরেছে সুবহাকে শাড়িটা ভেদ করে হাত দিয়েছে ওর ফর্সা মেদহীন পেটে। অরণ্যের মুখের গরম শ্বাস আছড়ে পড়ছে সুবহার ঘাড়ে হাতের অবাধ্য বিচরণ পাগল করে দিচ্ছে ওকে। কিছু বলতে গেলে অরণ্য এক অদ্ভুত আবদার করে বসল সুবহাকে।

“ লাভবার্ড আমার একটা বাবু লাগবে। দিবে আমাকে?”

সুবহার কি যেন হলো চোখ খুলে তাকালো সাথে সাথে। ঘুরে মুখ লুকালো অরণ্যের বুকে। শাড়ির আচঁল টা শরীর থেকে পড়তেই হুশ ফিরল ওর কিছু বলতে নিলে অরণ্য সুযোগ না দিয়েই আকঁড়ে ধরলো সুবহার গোলাপরাঙা অধর। বাইরে তখন প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে মাঝে মাঝেই বিদুৎ চমকাচ্ছে জুড়ে বাজ পড়তেই কেঁপে উঠেছে সুবহা শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে অরণ্যকে। অরণ্য নিজের হুশে নেই সে কবেই হারিয়ে গেছে সুবহার মধ্যে। শাড়িটা কখন যে খুলে মেঝেতে পড়ে গেছে খেয়ালও করেনি সুবহা। হুট করেই অরণ্য কোলে তুলে নিলো তাকে এগিয়ে গেলো নিজের বিছানার দিকে। উন্মাদের মতো নিজের ঠোঁটের স্পর্শ এঁকে দিলো সুবহার পুরো শরীর জুড়ে। সুবহাও নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে দিলো অরণ্যের হাতে। রাত বাড়ছে বাড়ছে, অরণ্যের পাগলামি।আজকে আর সুবহা বাঁধা দিচ্ছে না অরণ্যকে। সেও সায় জানাচ্ছে অরণ্যের ভালোবাসার ডাকে।

বিজ্ঞাপন
অন্তরালের প্রণয়িনী গল্পটি আফরোজা আঁখি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক গল্প