মুক্ত বাতাস আর খোলা আকাশের নিচে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে সুবহা। সময় প্রায় ৯টার কাছাকাছি। পুরো বাড়ি ভর্তি মেহমান তাদের। হৈচৈ করছে সবাই মিলে। বিয়েটা ঘরোয়া ভাবে হবে বিধায় তেমন কাউকেই দাওয়াত দেননি সুবহার আম্মু আর চাচ্চু। সবাই তাদের কাছের আত্মীয়—কিয়ান আর সুবহার নানার বাসার লোকজনেরা আর কিয়ানের বন্ধু-বান্ধব। এই বিয়েতে সবাই থাকলেও জাহিদ হোসেনের একমাত্র বোন বা ওনার ছেলে রিফাত কেউই নেই। সুবহা আনমনে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে, কী যেন ভেবে চলেছে সে। আনহার সাথে কি অন্যায় হলো? সুবহা কি আনহার থেকে অরণ্যকে কেড়ে নিল? সে তো চায়নি এমনটা। চায়নি বলেই তো সেদিন চলে গিয়েছিল বাড়ি ছেড়ে বহুদূরে। ইচ্ছে করেই তো সেদিন বিয়েটা ভেঙে দিয়েছিলো সুবহা। ঘুরেফিরে আবারও তাকে অরণ্যের সাথেই নিজের জীবন জুড়ে দিতে হবে—ভাবেনি তো এটা।
আনহার সাথে সুবহার সম্পর্কটা এখন যেন ঠিক আগের মতো হয়ে গেছে। সেই আগের আনহাকেই এখন দেখতে পায় সুবহা। সেজন্যই বোধহয় আনহার জন্য এত মন খারাপ হচ্ছে তার।
সুবহার ধ্যান ভাঙে আনহার ডাকে। পিছু ফিরে তাকাতেই আনহা তার হাত ধরে নিয়ে যায় সুবহার রুমে। সুবহা কথা না বলে চুপচাপ হেঁটে গেল। আনহা তাকে রুমে দিয়ে ঘুমাতে বলে চলে যাচ্ছিল, সুবহা তার হাত ধরে আটকালো। সুবহার কিছু বলতে চায় ভেবে প্রশ্ন করল আনহা —--
“ কি হলো সুবহা! কিছু লাগবে তোর?”
সুবহা কী যেন ভেবে জড়িয়ে ধরল আনহাকে, কিছুক্ষণ পর আবার ছেড়ে দিয়ে বলল তাকে—--
“ তুই কি আমার ওপর রেগে আছিস আপু?”
“ রাগবো কেন? বোকা মেয়ে।”
সুবহা চুপ রইল, প্রতিউত্তর করল না সে। সুবহা চুপ আছে দেখে আনহা বলল আবারও—--
‘তুই কি ভাবছিস আমি তোকে দোষারোপ করব এই বলে যে তুই অরণ্যকে আমার থেকে কেড়ে নিয়েছিস? অরণ্য তো কখনোই আমার ছিল না সুবহা। ওর মনে প্রাণে সবটা জুড়ে তুই-ই ছিলি। তাই আমি তোদেরকে এক করতে নিজেই সরে গেলাম।’
সুবহার কেমন কষ্ট হলো আনহার বলা কথাগুলো শুনে।
অরণ্যকে আনহা ভালোবাসে নিজের সবটা দিয়ে, সেই অরণ্য চোখের সামনে অন্য কারোর হয়ে যাচ্ছে—আনহার ভিতরটা কি জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে না?
একবার মনে হলো এই বিয়েটা ভেঙে দিবে সুবহা। অনেক্ষন ভেবে কিছু একটা বলতে যাবে, তখনই আনহা থামিয়ে দিল তাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল—--
“ ঘুমিয়ে পড়। রাত জাগার কারণে চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল পড়বে, কালকের সাজটাই মাটি হয়ে যাবে তাহলে। ”
সুবহা হেসে মাথা নাড়ালো। আনহা চলে গেল সেখান থেকে।
বিছানায় গিয়ে শুয়েছে সুবহা। কেন এমন অনুশোচনা হচ্ছে তার? বারবার কেন মনে হচ্ছে আনহার সাথে ভুল হচ্ছে? অরণ্য যদি আনহাকে পছন্দ না করে, সেদিন কি সুবহা ভুল দেখেছিল?
এসব ভাবতে ভাবতেই রাত প্রায় ১টা বেজে গিয়েছে। বাড়িটা পুরোপুরি নিস্তব্ধ, কারোর কথাবার্তা এখন আর কানে আসছে না সুবহার। অনেক চেষ্টার পর চোখটা মাত্রই লেগেছিল, তখনই ফোনের রিংটোন কানে আসে তার। ধ্যান ভাঙে সুবহার। ফোনটা হাতে নিলে দেখতে পায় কিরণ ফোন দিয়েছে তাকে। কোনো কিছু না ভেবেই কলটা রিসিভ করে নেয় সুবহা। হাসিমুখে বলতে যাবে কিছু, তখনই ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসে এক পরিচিত পুরুষালী কণ্ঠস্বর। কেউ ঠাট্টার স্বরে বলছে সুবহাকে —--
“কালকের জন্য রেডি তো?”
“কালকে কি হবে?”
“আমাদের ২য় বাসর।”
“এটা বলতে ফোন দিয়েছেন?”
“এতো রাতে আর কিসের কথা বলব।”
“শেইমলেস লোক একটা।”
কথাটা বলেই সুবহা কেটে দিল কলটা। ফের আসলো একই নাম্বার থেকে কল। ভাবলো ধরবে না, কিন্তু বারবার কল আসছে বিধায় বিরক্ত হয়েই কলটা রিসিভ করলো সুবহা। চোখ-মুখ শক্ত করে বলল অরণ্যকে—--
“কি চাই?”
“কতবার বলব? আমার তোমাকে চাই।”
“বিরক্ত করছেন কিন্তু আপনি আমাকে! রাখুন, আমি ঘুমাব।”
“এইটুকুতেই বিরক্ত! কালকে যে আমি তোমাকে ঘুমাতে দেব না সারারাত।”
“ ফোনটা রাখলাম, ২য় বার কল দিলে কিক মেরে ব্লক লিস্টে ফেলব।”
“ যা ইচ্ছে করো, আমিও কালকে এটার শোধ তুলবো।”
সুবহা কানের কাছ থেকে ফোন সরিয়ে নিয়েছে সাথে সাথে। কলটা কেটে দপ করে বিছানায় পড়ে গেছে সে। এরপর অবশ্য ফোন দিয়েছে অরণ্য, তবে সুবহা আর রিসিভ করেনি। দেখেও না দেখার ভান করেছে বলা চলে। এবার মনে হলো মেসেজ দিয়েছে অরণ্য। ফোনটা হাতে তুলে মেসেজ অপশনে যেতেই আরেক দফা লজ্জা পেল সে। অরণ্যের নাম্বার থেকে এসএমএস এসেছে—--“গেট রেডি ফর আ ব্লিসফুল নাইট। ক্যান ইউ হ্যান্ডল মি, লাভবার্ড?”
দেখা মাত্রই সুবহার কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। এই মাঝরাতে অসভ্যটা কীসব বলছে তাকে! অরণ্যের বলা কথা গুলো না চাইতেও বারবার কানে বাজছে সুবহার।
পরিশেষে সব কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে শুয়ে পড়লো সুবহা। কালকে আবার ভোর হলেই সবাই মিলে ভিড় জমাবে তার রুমের দরজায় এসে।
———
ফুলে ফুলে মুখরিত হয়ে আছে চারিপাশ। ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে বর-কনের বসার জায়গাটা। কিয়ান হেঁটে হেঁটে দেখছে সবটা ঠিকঠাক আছে কিনা। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ানের চাচ্চু আর আব্বু দেখছেন তাকে। বিয়ের উসিলায় ছেলেটা ওনাদের কিছুটা হলেও কাজে মন দিয়েছে—এই ভেবে মনে মনে খুশি ওনারা। এই সাতদিনে অফিসের কোনো কাজেই হাত দেননি কিয়ানের আব্বু সুবহাও বাড়িতেই আছে সাব্বির মাঝেমধ্যে দরকারী হলে বাড়িতেই আসে জানাতে। তবে কিয়ান সামলে নিচ্ছে সবটা এই ভেবে নিশ্চিত সবাই।
পার্লারের মেয়েরা এসেছে সুবহাকে সাজাতে, কিন্তু সে ঠিক করেছে সাজবে না। এতো সাজগোজ বরাবরই বিরক্ত লাগে সুবহার। কিন্তু কে শুনে কার কথা! মা, চাচি সহ সব ছোট-বড় কাজিনরা এসে তার রুমে হাজির। সবার একটাই কথা—নতুন কনেকে সুন্দর দেখানো চাই। সবার কথায় সাজতে রাজি হলো সুবহা। রুম থেকে একে একে বেরিয়ে গেছে সবাই, তার সাজটাও প্রায় শেষের দিকে।
সাজগোজ শেষে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে সুবহা। গোল্ডেন কালারের ওপর খয়েরি কারুকার্যের সুন্দর একটা লেহেঙ্গা পড়েছে সে। গলায়, কানে, হাতে স্বর্ণের ভারী গহনা, মুখজুড়ে প্রসাধনীর ছোঁয়া—সুন্দর গোলগাল মুখটা যেন বিয়ের সাজে আরো সুন্দর হয়ে উঠেছে। পার্লারের মেয়েটা বিছানায় ফেলে রাখা ওড়নাটা নিয়ে এসেছে সুবহার মাথায় দিবে বলে। ওড়নাটা পড়লেই সাজ পুরোপুরি কমপ্লিট তার। মেয়েটা সুবহাকে ওড়না পড়িয়ে দিবে, তখন রুমে এসেছে আনহা। সুবহার হাত টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়েছে তাকে, পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে পার্লারের মেয়েটার উদ্দেশ্যে বলছে আনহা—--
“কি যেন একটা মিসিং লাগছে!”
“কি মিসিং লাগছে ম্যাম?”
“কনের খোপায় কাঁচা গোলাপ নেই কেন?”
মেয়েটা মিনমিনে কন্ঠে বলল —--
“ওটা আনতে ভুলে গেছিলাম আসলে।”
আনহা দাঁড়ালো না, চলে গেলো ফুল আনতে। সুবহা তাকিয়ে আছে আনহার যাওয়ার পানে, মনে মনে ভাবছে—--
“ওর কষ্ট হচ্ছেনা? খারাপ লাগছে না? আমাকে কি মনে মনে অভিশাপ দিচ্ছে না? আমি সত্যিই স্বার্থপর! কিভাবে আমি রাজি হয়ে গেলাম এই বিয়েতে!”
সুবহার রাগ হচ্ছে নিজের উপরে বার বার এমন বোকামি কেন করে ফেলছে সে? আচমকাই কাঁধে ধাক্কা পড়ে সুবহার। তাকিয়ে দেখলো, ওর আম্মু আর চাচি এসেছেন। সুবহা কষ্ট করে মুখে হাসি টানলো, তাদের সাথে কথা বলল। ততো সময়ে আনহা চলে এসেছে, হাতে তার বাগান থেকে তুলে আনা কয়েকটা টাটকা কাঁচা গোলাপ। আনহা যত্ন করে সুবহার খোপায় গেঁথে দিলো ফুলগুলো। কারোর ফোন আসায় আনহা চলে গেলো সেখান থেকে।
মেয়েটা এসে সুন্দর করে সুবহার মাথায় ওড়না টেনে দিলো। এবার সুবহার বউয়ের সাজ সম্পন্ন হয়েছে। মেয়ে দুটো চলে যাওয়ার আগে তার সুন্দর সাজের প্রশংসা করে গিয়েছে বটে। সুবহা শুধু হেসেছে তাদের কথা শুনে। খোপার ফুলগুলো হাত দিয়ে দেখছিল সে, তখনই মনে হলো ফুলে থাকা গোলাপের কাঁটা হাতে ঢুকে গেছে সুবহার। হাতটা তাড়াতাড়ি করে এনে চোখের সামনে ধরেছে, ছোট্ট একটা গোলাপের কাঁটা ঢুকে আঙুল দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে তার। দ্রুত ড্রেসিং টেবিলে রাখা ফার্স্ট এইড বক্স থেকে মেডিসিন আর তুলো নিয়ে লাগিয়ে দিলো হাতে। সুবহার মনে হলো, আনহা ফুলগুলো নিয়ে আসার সময় খেয়াল করেনি এতে কাঁটা আছে।
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে কেউ ঠোঁটের কোণে তার হাসি লেগে আছে। মনে হচ্ছে সে সফল হয়েছে নিজের কাজে বিড়বিড় করে কি যেন বলে চলে গেলো সেখান থেকে।
———
“বর এসেছে, বর এসেছে”—বলে হৈ-হুল্লোড় করে তাকে দেখতে গেলো সবাই। বেশ অনেকক্ষণ হলো রুমে একা বসে আছে সুবহা, এই ভারী সাজগোজ নিয়ে বিরক্ত হচ্ছে সে। কারোর পদধ্বনি কানে আসল, সুবহার দরজার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো কিরণকে, পাশে আবার কিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই ম্যাচিং ড্রেস পড়েছে।
কিরণের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখল সুবহা, মেয়েটাকে অপূর্ব লাগছে। কালো রঙের একটা শাড়ি পড়েছে, কোমর পর্যন্ত লম্বা চুলগুলো আবার খুলে রেখেছে, মুখের মিষ্টি হাসিটায় কি সুন্দর লাগছে তাকে। কিরণের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ানকেও কম সুন্দর লাগছে না কিন্তু! কালো রঙের পাঞ্জাবিটা কিয়ানকে মানিয়েছে ভালো। পাশাপাশি দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে তারা একে অপরের জন্যই তৈরি হয়েছে। ভাই আর তার ভালোবাসার মানুষকে একসাথে দেখে বেশ খুশি হলো সুবহা। দুজনের মুখের হাসিই বলে দিচ্ছে তারা কতো খুশি নিজেদের বিয়ে ঠিক হওয়াতে। খুশি হবেই বা না কেন? এতো আয়োজন তো তাদের জন্যই।
কিয়ান আর কিরণ এসে সুবহার পাশে দাঁড়িয়েছে। বোনকে ভালোভাবে দেখলো কিয়ান, বিয়ের সাজে পরীদের মতো সুন্দর লাগছে আজকে সুবহাকে। মুখে হাসি থাকলেও মনে মনে চিন্তা হচ্ছে কিয়ানের সুবহার জন্য। কি ভেবেছিলো আর কি হয়ে গেলো এসব! সুবহা কি ভালো থাকবে অরণ্যের সাথে? দুজনেই দুজনকে পছন্দ করে—জানে কিয়ান। কিন্তু মানিয়ে নিতে অনেকটা সময় লাগবে দুজনেরই। মনে মনে অনুশোচনা হচ্ছে কিয়ানের নিজের ভালোবাসাকে পাওয়ার জন্য বোনকে সে বিপদে ফেলছে না তো?
কিয়ান সুবহার সাথে কথা বলছে, এরমধ্যেই মিহি এসে হাজির হয়েছে। মিহি আসাতেই কিয়ান বেরিয়ে গেছে সবাইকে রেখে। মিহিকে সুবহা চেনে না তেমন, তবে শুনেছিলো আনহাদের আরেকটা ফ্রেন্ড আছে। মিহি এসে ভালো-মন্দ কথা বলেছে তার সাথে, অল্প সময়েই বন্ধুত্ব হয়ে গেছে দুজনের। কি যেন ভেবে মিহি সুবহার হাত ধরে তাকে নিয়ে গেলো জানালার কাছে। সুবহা বুঝল না, মিহি এমন করছে কেন। প্রশ্ন করল মিহিকে—--
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে?”
মিহি নিজের আঙুল উঁচিয়ে কিছু ইশারা করে বলল সুবহাকে —--
“ ওদিকে তাকাও।”
মিহির ইশারা অনুসরণ করে সুবহা উল্টো প্রশ্ন না করে তাকালো সেদিকে। সুবহার রুম থেকে গার্ডেনের সবটাই দেখা যায়, বিয়ের আয়োজনটা করা হয়েছে সেখানেই।
অরণ্যকে স্পষ্ট দেখতে পারছে সুবহা। চকচকে গোল্ডেন রঙের শেরওয়ানি পরেছে অরণ্য, পায়ের ওপর পা তুলে বসেছে সে, পাশে বসে থাকা আদ্রীশের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। সুবহা এই সুন্দর হাসিটার প্রেমে পড়ে বারবার। বেশভূষায় অরণ্যকে পুরো রাজকুমারের মতোই লাগছে। সুবহা তাকিয়ে আছে সেই রাজকুমারের পানে,মুগ্ধ হয়ে দেখছে তাকে। এই অতি সুন্দর পুরুষটি তার স্বামী হবে কিচ্ছুক্ষণ পরেই— এই ভেবে অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেলো তার।সুবহা এতো দূরে দাঁড়িয়ে আছে, তবুও অরণ্য কিভাবে যেন দেখে নিয়েছে তাকে। অরণ্য সুবহার ঠিক চোখ বরাবর তাকিয়ে আছে, কি যেন ভেবে ঠোঁট কামড়ে হাসছে সে।
অরণ্যের হাসি দেখে সুবহার মনে পড়ে গেলো রাতে বলা অরণ্যের কথাগুলো। দাঁড়ালো না আর, মনে মনে অরণ্যকে “নির্লজ্জ” খেতাব দিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে।
কিয়ান এসেছে সুবহাকে নিয়ে যেতে।
আলিশান বাড়িটার পশ্চিম দিকের বিস্তীর্ণ গার্ডেনজুড়ে সাজানো হয়েছে বিয়ের মঞ্চ। চারিদিকটা ফুলের গন্ধ মো-মো করছে। মাঝখানে ঝলমলে সাদা-সোনালি কাপড়ে মোড়ানো স্টেইজ, তার নিচে ফুলসজ্জিত বিয়ের আসন। লাল সাদা নানা ধরনের ফুল গোলাপের সুগন্ধ বাতাসে ভাসছে। হালকা শীতকাল, এখন রোদ নেই তেমন—এই সময়টা বিয়ের আয়োজনের জন্য ভালোই লাগছে। সবুজ ঘাসের গালিচায় পাতার ফাঁক গলে নেমে আসা নরম রোদের ছায়া মিশে গেছে সাদা কাপড়ে ঢাকা চেয়ারগুলোয়। অতিথিরা বসে আছেন সেখানে, সবার দৃষ্টি স্টেইজে বর বেশে বসে থাকা অরণ্যের দিকে।
কিয়ানের হাত ধরে স্টেইজের দিকে হেঁটে যাচ্ছে সুবহা দুইপাশে তার ছোট বড় কাজিনরা সব আছে। অরণ্যের চোখ পড়ল সুবহার দিকে। বিয়ের সাজে তার রূপবতী প্রিয়তমার যেন দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে। এই সুন্দরীর রূপ তার কথা চালচলন সবকিছুই তার দিকে বার বার আকৃষ্ট করে অরণ্যকে ঠোঁটের কোণে হাসি খেলা করছে অরণ্যের অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলে এসেছে আজকে অরণ্য নিজের করে পাবে তার প্রিয়তমাকে। ভারী লেহেঙ্গাটার জন্য উপরে উঠতে সমস্যা হচ্ছে সুবহার কিয়ান সেদিকে খেয়াল করেনি সুবহার হাত ধরে রেখেছে ঠিকই তবে তাকিয়ে আছে কিরণের দিকে। অরণ্য তখন নিচে নেমে আসলো, অরণ্য আসছে দেখে সরে গিয়েছে কিয়ান। অরণ্য এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সুবহার কিছু বলতে দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে কোলে তুলে নিয়েছে তাকে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে দ্রুত অরণ্যের গলা আঁকড়ে ধরেছে সুবহা। হাসলো অরণ্য কে কি বলবে না ভাববে কিছুই ভাবলোনা সে। সুবহাকে নিয়ে অরণ্য ফুলসজ্জিত বিয়ের স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কনের বসার জায়গাটাতে তাকে বসিয়ে সে গিয়ে বসেছে পাশে। সুবহা আর অরণ্যের কাজিনরা সব মিটিমিটি হাসছে কেউ কেউ আবার ঠাট্টা করে এটা সেটা বলছে। সুবহার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে এসব শুনে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো অরণ্য ঘাড় কাত করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সুবহা তখন ভ্রু কুঁচখে রেগে বলল অরণ্যকে —--
“ এসবের মানে কী? ”
“ কোন সবের?”
“ হুট করে সবার সামনে এভাবে কোলে তোলার মানে কি?”
“ আমার মনটা বার বার তোমাকে ছুঁতে চায় কি করব বলো? ”
বলেই অরণ্য গুনগুনিয়ে গাল গাইলো —--
তোমায় ছোঁয়ার ইচ্ছে আমায় ভীষণ পীড়া দিচ্ছে,
বলো কবে ছুঁতে দিবে?
তুমি আবার আমার হবে।
বলেই অরণ্য ফ্লাই কিস ছুঁড়ে দিলো সুবহার দিকে এটা দেখে আবার মিহি আর কিরণ মজা নিচ্ছে এটা সেটা বলে। সুবহা বেশ বিরক্ত হচ্ছে এসবে। এক তো বিয়ের ঝামেলা আরেক কানের কাছে অরণ্যের পকপকানি। এতো ঝামেলা করে বিয়ে কে করে? ভাবছে সুবহা এটাই।
———
সব কাজ প্রায় শেষ। ম্যারেজ রেজিস্ট্রিতে সিগনেচার করেছে দুজনেই। বর কনের কবুল বলার পালা এবার। অরণ্যকে প্রথমবার বলতেই কবুল বলে দিয়েছে সে। এবার কবুল বলার পালা সুবহার। সুবহার দুই পাশে তার আম্মু, চাচিসহ বাকিরা এসে দাঁড়িয়েছেন। বারবার বলার পরও কবুল বলছে না সুবহা। শেষ মুহূর্তে এসেও কেমন অনুশোচনাবোধ কাজ করছে তার মধ্যে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো সুবহা, সবাই আছে এখানে, শুধু আনহাই নেই। মনে প্রশ্ন জাগলো তার—আনহা কোথায় গেলো? মাকে বলতে যাবে, তখনই তিনি ধমকের স্বরে তাড়াতাড়ি কবুল বলতে বললেন সুবহাকে। তবুও চুপ রইলো সুবহা।
তার পাশে বসে থাকা অরণ্যের এবার বিরক্ত লাগছে, সাথে সুবহার প্রতি রাগও হচ্ছে। অধৈর্য হয়ে সুবহার কিছুটা কাছে গিয়ে মেজাজ দেখিয়ে বলল অরণ্য—--
“কবুল বলছো না কেন? আমি কি তোমাকে বিয়ে করে পাতালপুরীতে নিয়ে যাচ্ছি?”
সুবহাও একইভাবে অরণ্যের পানে তাকিয়ে বলল তাকে—--
“বলব না। কী করবেন আপনি?”
“বলতে হবে না আর, এখানেই বাসর সেরে ফেলব আমি। কাছে আসো সুইটহার্ট বাসরের প্রথম ধাপ শুরু করি।”
সুবহা রাগান্বিত চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছে অরণ্যের দিকে। অরণ্যের যায় আসেনা তাতে। সেও একইভাবে তাকিয়ে আছে সুবহার দিকে। মিহি, আদ্রীশ আর কিরণ একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে বারবার এসব দেখে। সুবহার আব্বু উঠে এসেছেন। এবার তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললেন—--
“বাবার বিশ্বাস রাখো প্রিন্সেস, তুমি ভালো থাকবে আমি জানি। কবুল বলো। কাজী সাহেব আর বাকিরা অপেক্ষা করছেন শুনার জন্য।”
সুবহা অবাক হয়ে তাকালো তার বাবার দিকে। বহুদিন পর বাবার মুখে সেই চেনা পরিচিত ডাকনামটা শুনলো সে। বাবার কথা শুনে কঠোর সুবহারও এখন কান্না পাচ্ছে। কেমন কিয়ান এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো বোনকে। সুবহা এখন শান্ত হলো কিছুটা। অবশেষে সুবহা কবুল বলেছে। বিয়ের কাজটা সম্পন্ন হয়েছে। বিয়ের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে দুটি ভালোবাসার মানুষ।
অনেকক্ষণ হলো বিয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে বাড়ির বড়রা সবাই চলে গেছেন সেখান থেকে। সুবহার আব্বু আর অরণ্যের আব্বু দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। সেখান থেকে এদিকের কিছুই দেখতে পারছেন না তারা। অরণ্যের আর বসে থাকতে ভালো লাগছে না। বিয়ে তো হয়েই গেছে। সুবহাও এখন তার। আর বসে কী করবে এখানে? কী যেন ভেবে হুট করে উঠে দাঁড়ালো অরণ্য। সুবহার ঠিক মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়িয়েছে সে।
কাহিনী কী হলো মাথায় ঢুকছে না সুবহার। ভ্রু কুঁচকে তাকালো সে অরণ্যের দিকে। অরণ্য চোখ দিয়ে ইশারা করলো সুবহাকে উঠে দাঁড়াতে। সুবহা উঠে দাঁড়িয়েছিল মাত্রই, অরণ্য কিছু না বলে কোলে তুলে নিয়েছে তাকে। সাথে সাথে অরণ্য আর সুবহার সব কাজিনরা চিল্লিয়ে উঠেছে। এবার সুবহা বিরক্ত হলো খুব। অরণ্যের বুকে ঘুষি মেরে বলছে—--
“করছেনটা কী? নামান আমাকে!”
“আদর দিব। চলো, আমার আর তর সইছে না লাভবার্ড।”
যখন তখন এমন নির্লজ্জ মার্কা কথা বলে দেওয়ার জন্য রাগে সুবহার ইচ্ছে করছে অরণ্যের গালে টাস করে একটা চড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু কী আর করার! মনেই ইচ্ছে, মনেই রইল। তার নতুন বিয়ে করা বরকে চড় মারলে লোকজন তো আবার তাকে দজ্জাল উপাধিতে ভূষিত করবে।