লোকটার রাগান্বিত চেহারা দেখে ভয় পেয়েছে সুবহা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা যে অরণ্য ছাড়া আর কেউ নয়। অরণ্য একটু একটু করে এগিয়ে আসছে সুবহার দিকে। অরণ্য যত এগুচ্ছে, সুবহা ততই পিছিয়ে যাচ্ছে। সুবহা এবার চলে যেতে চাইলো নিজের রুমে, অরণ্য দ্রুত গিয়ে তার পথ আটকে দাঁড়ালো। গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো —--
“তুমি এখন বিবাহিত, ভুলে যাও এটা?”
নিজেকে স্বাভাবিক করে উত্তর দিলো সুবহা।
“ভুলতে যাব কেন?”
“কি পড়েছ এসব? তোমার সাজসজ্জায় মনে হচ্ছে তুমি বিবাহিত?”
“মানে, পোশাকের সাথে বিবাহিত-অবিবাহিতার সম্পর্ক কি?”
“এত কিছু এক্সপ্লেইন করতে রাজি নই আমি, এসব ছেড়ে শাড়ি পড়ে আসো।”
সুবহা দুই হাত বুকে ভাঁজ করে তাকালো অন্যদিকে দাঁত কটমট করে বলে উঠলো অরণ্যকে —--
“আমি শাড়ি পড়তে পারি না।”
অরণ্য মুচকি হেসে সুবহার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলছে—--
“আমি হেল্প করছি, চলো।”
সুবহা কিছু দূর সরে গিয়ে বলল—--
“একদম না।”
অরণ্য কোনো কথা না বলে সুবহার কাছে গিয়ে এক প্রকার জোড় করেই কোলে তুলে নিলো তাকে। বিরক্ত হলো সুবহা, রাগে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল—--
“মেরে ফেলুন আমাকে।”
“উঁহু, এটা হবে না। তুমি পটল তুলতে গেলে আমার সন্টু-মন্টুর আম্মু কে হবে?”
কথাটা শুনেই দাঁত কিড়মিড় করে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলো সুবহা। কথা বলল না আর, জানে ভালো করেই অরণ্যের কথার সাথে সে পেরে উঠবে না কখনোই।
———
মিহি আর আদ্রীশ হেঁটে যাচ্ছে হসপিটাল থেকে কিছুটা দূরে থাকা রেস্টুরেন্টের দিকে। এত সময় হলো, অপেক্ষা করে যাচ্ছে অরণ্যের জন্য। বারবার তাকিয়ে দেখছে—সে আসলো কিনা। কিন্তু সবাই চলে এলেও, অরণ্যের কোনো খোঁজ নেই।
মিহির এদিকে খিদে পেয়েছে খুব, বারবার আদ্রীশের গায়ে থাকা অ্যাপ্রোনটা ধরে টানাটানি করছিলো। আদ্রীশ বিরক্ত হয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে মিহিকে বলল—--
“সমস্যা কি তোর? পোকা কামড়েছে?”
“পছন্দের পোকাটা তো কাছেই আসে না, কামড়াবে কী করে?”
মিহির এমন কথা শুনে বোকা বনে গেলো আদ্রীশ। হাঁ করে কিছুক্ষণ মিহির দিকে তাকিয়ে বলল—--
“তুই পাগল হয়েছিস?”
“নারে পাগলা, আমি প্রেমে পড়েছি।”
“কার প্রেমে পড়েছিস?”
চুপ করে গেলো মিহি। কী উত্তর দিবে বুঝতে পারলো না সে। কথা কাটাতে বলে উঠল আদ্রীশকে—--
“কিপ্টে কোথাকার! আমার খিদে পেয়েছে তখন থেকে বলে যাচ্ছি, আমাকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলে কি তোর পাপ হবে?”
“এখন রেস্টুরেন্টে গেলে দেরি হয়ে যাবে। পৌঁছে গিয়ে যা খেতে চাইবি খাওয়াবো।”
মিহি তখনই বসে পড়লো মাটিতে। গালে হাত দিয়ে আদ্রীশের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—--
“পেটে খিদে নিয়ে মরে গেলে আমার ভবিষ্যৎ জামাইটা অকালে বিধবা হবে। এর জন্য দায়ী থাকবি তুই।”
আদ্রীশ কিছু না বলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল মিহির দিকে। মনে মনে বকুনি দিয়েছে ওকে। তারপর মাটিতে বসে থাকা মিহির হাত ধরে টেনে তুলল তাকে—--
“চল, পরে আবার আমাকে বদ-দোয়া দিয়ে মারবি।”
মিহির ঠোঁটের হাসি চওড়া হলো। আদ্রীশকে অনেকগুলো ধন্যবাদ দিলো একসাথে। রেস্টুরেন্টের ভেতর ঢুকবে ঠিক তখনই আদ্রীশের চোখ পড়ল পার্কিং এরিয়ার দিকে। আনহা আর রাইয়ান কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছে ওদিকেই।
খটকা লাগল আদ্রীশের, আনহা এখানে কি করছে? ভাবলো সে মনে মনে। কিছুক্ষণ না যেতেই, কিছুদিন আগের ঘটনা মনে পড়ল তার। এই ছেলেটাকেই তো ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি দিয়ে ধাক্কা মেরেছিলো অরণ্য। কারণটাও অজানা ছিল না আদ্রীশের। ছেলেটা নজর দিয়েছিল সুবহার দিকে—এই রাগেই অরণ্য তাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এই দুজন এখানে কি করছে? এত মনোযোগ দিয়ে কীসেরই বা কথা বলছে?
আদ্রীশ যেতে চাইল আনহার কাছে। মিহি গিয়ে পথ আটকালো। হাত দুটো পিছনে দিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল, সে কোথায় যাচ্ছে। মিহির বলার ধরণে আর মুখের ভঙ্গিমা দেখে হাসি পেলো আদ্রীশের।
মিহির মাথায় গাট্টা মেরে বলল তখন —--
“আজকে বিয়ে দিলে কালকে বাচ্চার মা হবি, কিন্তু তুই এখনও ঠিক আগের মতোই রয়ে গেলি।”
মিহি হাসল, আস্তে করে বলল —--
“আমি এমনই থাকব। বাচ্চা সামলাবি তুই, আর আমি সামলাবো তোকে।”
মিহির আস্তে করে বলা কথাটা স্পষ্টভাবে কানে আসেনি আদ্রীশের। জানবে বলে জিজ্ঞেস করল—--
“কিছু বললি?”
“কই, কিছু না তো।”
আদ্রীশ আর মিহি আবারও হাঁটতে লাগল রেস্টুরেন্টের দিকে। যেতে যেতে আদ্রীশ পিছু ফিরে তাকালো পার্কিং এরিয়ার দিকে, কিন্তু দেখতে পেলো না আনহা বা রাইয়ান কাউকেই।
আদ্রীশের মনে হলো, খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে। রাইয়ান আর আনহা মিলে কি আবারও অরণ্য আর সুবহার মধ্যে ঝামেলার সৃষ্টি করবে?
এবার ভুল করলে, আদ্রীশ আর ছেড়ে দেবে না আনহাকে। যাই হোক না কেন, অরণ্যকেও বলে দেবে আনহা আসলে কেমন।প্রথমবার বিয়েটা ভেঙেছিল আনহাই সেখানে কোনো দোষ ছিলোনা সুবহার।
———
সুবহার পরনে থাকা শাড়ির কুচিগুলো ঠিক করে দিচ্ছে অরণ্য, সুবহা পুরোটা সময় ধরে শুধু দেখেই যাচ্ছে তাকে। এই লোকটা এমন কেন? এই ভালো তো এই খারাপ! মাঝেমধ্যে মনে হয়, অরণ্যের সবটা জুড়ে শুধু সুবহাই আছে। আবার কখনও কখনও এমন মনে হয়, সে প্রচণ্ড ঘৃণা করে সুবহাকে। তার প্রতি অরণ্য জমিয়ে রেখেছে অনেক রাগ। সুবহা এসবই ভাবছিল তখনই কানে আসে অরণ্যের গম্ভীর কণ্ঠস্বর।
“কোথায় যাচ্ছিলে তুমি?”
চুপ রইলো সুবহা, কথা বলল না সে। অরণ্য দেখলো, সুবহার চুপ থাকা, উত্তর না পেয়ে বিরক্ত হলো সে। সুবহার হাতের কব্জিতে টান দিয়ে কাছে নিয়ে এল তাকে। হাতটা শক্ত চেপে ধরে বলল—--
“সেজেগুজে একা একা কোথায় যাচ্ছিলে তুমি? উত্তর চাই আমার।”
শুকনো ঢোক গিললো সুবহা, কথা কাটানোর জন্য বলে উঠলো—
“আপনি না চলে গেলেন! আবার ফিরে আসলেন যে?”
অরণ্য বাঁকা হাসল, হাতটা ছেড়ে সুবহার কোমর চেপে ধরে নিজের কাছে গিয়ে এসে বলল—--
“গাড়িতে উঠবো তখনই মনে পড়লো লাভবার্ড আমাকে গুড বাই কিসসি দেয়নি। পটাপট আমাকে কয়েকটা চুমু দিয়ে দাও তো, নাহলে পেটে গুড়গুড়ি করবে। কোথাও গিয়ে শান্তি পাবো না আমি।”
“দিবো না, কি করবেন?”
“জোড় করে আদায় করব। তখন কিন্তু তুমিই কষ্ট পাবে। চুমুর বদলে কন্ট্রোললেস হয়ে আমি আরও অনেক কিছুই করে দিতে পারি।”
সুবহা কি যেন ভেবে হাসলো, পা উঁচু করে অরণ্যের গলা জড়িয়ে ধরলো। একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিল তার দিকে। অরণ্য নিজেও এগিয়ে আসছিল সুবহার দিকে। যেই না সুবহার ঠোঁটের সাথে নিজের ঠোঁটটা মিলাবে, তখনই সুবহা থেমে গেলো। চুমুর বদলে অরণ্যের বুকের খোলা স্থানে কামড় বসিয়ে দিলো সে। চোখ-মুখ কুঁচকে বন্ধ করে নিলো অরণ্য। সুবহা যখন দেখলো অরণ্য শান্ত আছে, তখনই মুখ তুলে তাকালো তার দিকে। নজরে আসলো অরণ্যের বিরক্তিমাখা মুখশ্রী। হাসি পেলো তার, মনে হলো নিজের কাজে সফল হয়েছে। অরণ্য দীর্ঘ এক শ্বাস ছেড়ে বলল সুবহাকে—--
“রক্ত খাওয়া শেষ?”
“রক্ত খাইনি তো, গুড বাই কিসসি দিয়েছি। যান, শান্তি মতো ঘুরে আসুন।”
অরণ্য নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে দেখলো, ফর্সা জায়গাটাতে লালচে দাগ বসে গিয়েছে। সুবহার কামড়ের দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অরণ্য একটানে সুবহাকে নিজের কাছে নিয়ে এসে বলল আবারও —--
“ যেখানে ব্যথা দিলে সেখানে গুণে গুণে পাঁচটা চুমু দাও।”
সুবহা হেসে বলল—--
“দিচ্ছি।”
অরণ্য বুঝলো বউয়ের কোনো বদ মতলব আছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল তারা। অরণ্য হুট করেই ঘুরিয়ে দিলো সুবহাকে। সুবহার মেদহীন ফর্সা পেটে হাত ছুঁইয়ে দিলো নিজের। সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে নিলো সুবহা। অরণ্য হাসল। সুবহার পিঠের চুলগুলো সরিয়ে দিলো একপাশে। সুবহা ভাবলো, অরণ্য চুমু দেবে তার ঘাড়ে। আটকালো না সেজন্য।
অরণ্যের হাতটা যখন সুবহার শাড়ির কুচিতে গেল, সে চোখ খুলে ধরে নিলো অরণ্যের হাত। অরণ্য মুখ ডুবাল সুবহার ঘাড়ে। চুমুর জায়গায় কামড় পড়তেই হুশ ফিরলো সুবহার। ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো সে, সরে যেতে চাইলো অরণ্যের থেকে। বিরক্ত হয়ে বলল—--
“করছেন কি? লাগছে আমার।”
“আমারও লেগেছে।”
“প্রতিশোধ নিচ্ছেন?”
“ধরে নাও তাই।”
“ছাড়ুন আমাকে।”
“চুমু দাও আগে।”
অরণ্যের কাজে বিরক্ত হলো সুবহা, বাধ্য হয়েই শুনতে হলো তার কথা। অরণ্য ঠোঁট হাসছে, সুবহাকে জব্দ করতে পেরে। সুবহার মনে হলো, অরণ্য রাগবে না আর।ভাবল এবার যাওয়ার কথাটা বলবে অরণ্যকে। সুবহা অরণ্যকে জড়িয়ে ধরলো তার মুখ পানে তাকিয়ে সুন্দর করে বলল সে—--
“আম্মুকে দেখতে যাব।”
“যেতে হবে না।”
“কেন?”
সুবহা সাথে সাথেই ছেড়ে দিলো অরণ্যকে, সুবহা রাগ করেছে বুঝতে পেরে অরণ্য তার হাতটা ধরে নিয়ে বলল।
“আমি বলেছি তাই।”
সুবহার রাগ হচ্ছে প্রচণ্ড। হাতটা এক ঝটকায় অরণ্যের থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছে, চলে যাবে বলে পা বাড়িয়েছে—তখনই অরণ্য আটকে দিলো তাকে। এবার আর রাগ করলো না সুবহা, অসহায় দৃষ্টিতে অরণ্যের পানে তাকিয়ে বলল তাকে—--
“কেন করছেন এমন? আমাকে বন্দী করে রাখবেন, কষ্ট দিবেন বলেই কি বিয়েটা করেছেন?”
সুবহার অসহায় চোখের চাহনি দেখে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো তার। অরণ্য কাছে গেলো, সুবহার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল—--
“আমি ফিরে আসি, তুমি যেখানে যেতে চাও সেখানেই নিয়ে যাব।”
সুবহা চুপ করে রইলো, চুপচাপ গিয়ে বসে পড়লো বিছানায়। কান্না পাচ্ছে ওর। অরণ্য ভুল করলেও এখন আর তার উপর নিজের রাগ দেখাতে পারে না কেন সে? সুবহার অবাক লাগে মাঝে মাঝে, এই কয়েকদিনেই অরণ্যের প্রতি এত দুর্বল হয়ে পড়লো কীভাবে সে?
অরণ্য চলেই যাচ্ছিল, দরজার সামনে গিয়ে আবারও ফিরে তাকিয়ে চোখ-মুখ শক্ত করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—--
“আমি আসার আগে রুম থেকে বেরুবে না, বেরুলে পা ভেঙে বিছানায় ফেলে রাখব। কথাটা মনে থাকে যেন।”
শুনেও কিছু বলল না সুবহা। মনে মনে কিছুক্ষণ অরণ্যকে বকাঝকা দিয়ে শান্ত হয়ে গেলো সে। অরণ্য বেরিয়ে যেতেই সাব্বিরকে ফোন দিয়ে চলে যেতে বলেছে সে।
———
সময়টা সন্ধ্যা, আকাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে। বাতাস বইছে চারিদিকে, গাছপালাগুলোও দুলছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে। ছাদের রেলিঙে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আনহা। চারদিকের অবস্থা কেমন, সেদিকে খেয়াল নেই তার—আনমনে ভেবে যাচ্ছে কী যেন। আনহা ভাবছে অরণ্যকে নিয়ে। কেন অরণ্য তার হলো না? আনহা কি অরণ্যকে কম ভালোবাসত? তার মধ্যে কি এমন নেই যা সুবহার মধ্যে আছে? কথাটা ভাবনায় মাত্রই মুহূর্তেই চোখ-মুখে রাগ ফুটে উঠেছে তার। সুবহার প্রতি রাগ হচ্ছে আনহার। অরণ্য—বাড়ি, গাড়ি, অফিস সবকিছুই তো সুবহার, তাকে কেন সবাই এত ভালোবাসে? কেউ কেন সুবহার মতো আনহাকে ভালোবাসে না?
পাশে থাকা ফুলের টবটা হাতে নিয়ে এক আছাড়ে ভেঙে ফেলল আনহা। কী যেন হলো তার, গটগট করে হেঁটে চলে এলো নিজের রুমে। ড্রয়ার থেকে একটা অ্যালবাম বের করলো, এক এক করে দেখতে লাগলো সবগুলো ছবি। যেসব ছবিতে সুবহা আছে, সেই সব কয়টা ছবি বের করে কেবল সুবহার ছবিটাই সরিয়ে দিল সেখান থেকে। রাগে হাত-পা কাঁপছে আনহার। বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে বারবার—--
“তোকে আমি ভালো থাকতে দিব না সুবহা, আমি যেভাবে জ্বলছি, কষ্ট পাচ্ছি, সেভাবেই তোকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিব।”
কিয়ান ফোনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছিলো আনহার রুমের দিকেই। দরজাটা খোলা ছিল বলে না চাইতেও চোখ গিয়েছিলো ওর রুমের ভেতর। সুবহার নামটা কানে এসেছে তার, কিন্তু আগে-পরে কী বলেছে, কিছুই শুনতে পায়নি। ফোনটা নিজের কান থেকে সরিয়ে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকালো কিয়ান আনহার দিকে। কী হয়েছে বুঝতে পারলো না কিছুই, ওর মন-মস্তিষ্কে আসলে কী চলছে, দেখে বোঝা মুশকিল।
———
ঘড়ির কাটা জানান দিচ্ছে এখন রাত ৮ টার কাছাকাছি। এরমধ্যে আবার পেরিয়ে গেছে একদিন। অরণ্য সেই যে গিয়েছিল ফেরেনি এখনও কল দিয়েছে বেশ কয়েকবার সুবহার ফোনে। আকাশ পাতাল কতো কি ভাবতে ভাবতে বিছানায় পড়ে কখন যে সুবহা ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই তার।
বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে সুবহা, পরনের শাড়িটাও ঠিকঠাক নেই। হঠাৎ তলপেটে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠেছে সে। চোখ খুলে তাকিয়েছে তখনই, চিৎকার দিতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ চেপে ধরলো ওর মুখ। ভয়ার্ত মুখশ্রী নিয়ে তাকালো সুবহা লোকটির দিকে। ড্রিম লাইটের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে অরণ্যের ফর্সা মুখটা। মুখের উপর থেকে অরণ্যের হাতটা সরিয়ে বলল সুবহা—--
“কখন আসলেন?”
“মাত্রই আসলাম। ভয় পেলে তুমি?”
সুবহা বাচ্চাদের মতো করে মাথা নাড়াল উপর-নিচ। অরণ্য হেসে ওর ঠোঁটে ছুঁয়ালো সুবহার কথার উত্তরে বলল—--
“আমি ছাড়া অন্য কেউ আমার লাভবার্ডের গায়ে হাত দিবে—এতো সাহস কারোর হয়নি।”
অরণ্যের মুখের গরম শ্বাস পড়ছে সুবহার চোখ মুখে। অরণ্যও কেমন নেশালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুবহার দিকে। কেন যেন লজ্জা পেলো সে মুখ ঘুরিয়ে নিলো অন্যদিকে। জানালাটা খোলা, বাইরে থেকে বাতাস আসছে। অনেকক্ষণ হলো বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। অরণ্যের আসার কথা ছিলো দুই দিন পরেই, কিন্তু একদিন না যেতেই চলে এসেছে সে। বাড়িতে আসবে এটা জানায়নি কাউকে, তাই তো এতো অবাক হলো সুবহা। অরণ্য উঠে গেছে ওয়াশরুমে। সুবহাও গিয়ে দাঁড়িয়েছে জানালার পাশে। ইচ্ছে করছে বাইরে বৃষ্টিতে ভিজবে সে।
ওয়াশরুমের দরজাটা খোলাই আছে, অরণ্যকে দেখতে পাচ্ছে সুবহা। কী যেন ভেবে সেও গেলো অরণ্যের কাছে, সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল—--
“আসুন, বৃষ্টি বিলাস করি।”
“অসুস্থ হওয়ার শখ জেগেছে মনে?”
হাসি মুখটা চুপসে গেলো সুবহার বাচ্চাদের মতো করে বলল।
“ভিজবেন না?”
“ বাচ্চামো না করে চুপচাপ গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।”
সুবহার রাগ হলো, গাল ফুলিয়ে চলে যাচ্ছিলো সেখান থেকে। অরণ্য হুট করেই এসে কোলে তুলে নিলো তাকে, পড়ে যাবে বলে অরণ্যের গলা জড়িয়ে ধরলো সুবহা। মুখের দিকে তাকিয়ে বলল।
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
“বৃষ্টিতে ভিজবে না?”
সুবহা হাসলো, শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অরণ্যকে।
ছাদে এসেছে সুবহা আর অরণ্য। হেঁটে গিয়ে টুপটাপ বৃষ্টির মধ্যে গিয়ে দাঁড়িয়েছে সুবহা। চোখ বুজে মুখ তুলে দিয়েছে আকাশের দিকে। জলকণাগুলো তার মুখ, চুল, শাড়ির আঁচল বেয়ে নামছে।পুরোটা শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে তার। বৃষ্টির পানিতে শাড়িটা ভিজে লেপ্টে গেছে তার গায়ের সাথে। সুবহা আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, অরণ্য তার পাশে নেই। দরজার দিকে তাকালো তখন অরণ্য এখনও দাঁড়িয়ে আছে তার আগের জায়গাতেই। সুবহা হাতের ইশারায় ডাকলো তাকে। অরণ্য ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়ালো তার।
অরণ্য দেখছে সুবহার বাচ্চামো, মনে হচ্ছে আবারও ফিরে গেছে সেই অতীতে। আগের চঞ্চল, হাসিখুশি সুবহাকেই অরণ্যের বেশি পছন্দ ছিলো ভালোবেসেছিলো মায়াবী চেহারার, মিষ্টি হাসির অধিকারীনি মেয়েটিকে। সময়ের সাথে সবকিছু কেমন বদলে গেছে অরণ্য মিস করে আগের দিন গুলোকে, আগের সুবহাকে। পরক্ষণেই আবার মনে হচ্ছে সুবহা তো একা পরিবর্তন হয়নি হয়েছে সে নিজেও দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল অরণ্য।
অনেক সময় হলো ছাদে এসেছে তারা। আরও কিছু সময় এই বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলে নির্ঘাত জ্বর বাধাবে সুবহা—এই ভেবে অরণ্য তাকে চলে আসতে বলল। সুবহা শুনলো না অরণ্যের কথা, গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো আগের মতোই। অরণ্য উপায় না পেয়ে সুবহাকে কোলে তুলে নিলো আবারও। সুবহার রাগটাও কোথায় যেন চলে গেলো, সে শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরলো অরণ্যের।