অন্তরালের প্রণয়িনী

পর্ব - ২৮

🟢

রাত হতে চলল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে বৃষ্টির পানি ছুঁয়ে দিচ্ছে সুবহা। দরজা খোলার আওয়াজ কানে আসল ওর। মনে হলো অরণ্য এসেছে, এই ভেবে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই। কিন্তু সুবহার ভাবনা ভুল ছিলো। অরণ্যের জায়গায় কিরণ এসেছে ওর রুমে। চিন্তিত হয়ে বলছে সুবহাকে।

‘ ভাইয়া কোথায় সুবহা? তোরা তো একসাথেই বেরুলি। ’

সুবহারও এবার চিন্তা হচ্ছে,সত্যিই তো অরণ্য আসছেনা কেন? এই অচেনা জায়গায় ঝড় বৃষ্টির মধ্যে অরণ্য কোথায় গেলো? এত সময়ে তো চলে আসার কথা। কোনো ক্ষতি হলো না তো? কথাটা ভাবনায় আসতেই গলা শুকিয়ে কাঠ সুবহার। কিরণকে কিছু না বলে দ্রুত গিয়ে বিছানায় ফেলে রাখা ফোনটা হাতে নিয়েছে। একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছে অরণ্যের নাম্বারে। বারবার ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। সুবহার মনে হলো অরণ্য আছে আদ্রীশের সাথে। দেরি না করে কল দিতে যাচ্ছিলো আদ্রীশের নাম্বারে, ঠিক তখনই সুবহার রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আদ্রীশ, ডাকছে সে অরণ্যকে। বুঝতে বাকি নেই সুবহা আর কিরণের, অরণ্য এখনও ফিরেনি। বার বার মাথার মধ্যে একটা কথাই আসছে, কিন্তু এই অচেনা অজানা জায়গায় অরণ্য গেলোটা কোথায়? ঠান্ডার মধ্যেও কেমন ঘামছে সুবহা। চিন্তা হচ্ছে ওর। কিরণ বুঝতে পারছে সুবহার মনের অবস্থা। কাছে এসে বসেছে, কিছু বলবে বলে। কিরণের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে বলে উঠেছে সুবহা।

‘ তোর ভাইয়া কোথায় কিরণ? এই অচেনা জায়গায় আমি ওনাকে কোথায় খুঁজবো এখন? ’

‘ আমরা আছি তো। সবাই মিলে খুঁজে নিব। এত টেনশন করিস না। ভাইয়ার কিছুই হয়নি। ’

কিরণ সুবহাকে শান্ত করার জন্য বলেছে কথাটা, কিন্তু মনে মনে যে প্রচণ্ড ভয় হচ্ছে ওর। এত সময় হয়ে গেলো, অরণ্য আসছে না কেন? ১০০ টার বেশি কল দিয়েছে হয়তো, একবারও অরণ্য রিসিভ করেনি। এমন তো আগে কখনও করেনি। চিন্তা হচ্ছে কিরণের। সুবহাকে বসিয়ে রেখে আদ্রীশের সাথে কথা বলতে বলতে চলে গেছে নিজের রুমে। আদ্রীশ কিরণকে বুঝিয়ে বলেছে শান্ত থাকতে, সে দেখছে অরণ্য কোথায়। কিরণও আর প্রশ্ন করে বিরক্ত করেনি আদ্রীশকে। নিজের রুমে চলে গেছে সে।

————

ধবধবে সাদা বিছানাটায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে কিয়ান। কিরণ যে ওর পাশে নেই, মাত্রই খেয়াল করলো। উঠে বসতেই জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিরণের চিন্তিত মুখশ্রীটা নজরে আসলো তার। চিন্তা হলো কিয়ানের। কিরণের কি মন খারাপ হলো কোনো কারণে? বিছানা থেকে উঠে কিয়ান হেঁটে গেলো কিরণের কাছে। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো কিরণকে। নিজের মুখ ডুবিয়েছে কিরণের গলায়। কিরণের ভালো লাগছে না কিছুই। কিয়ানকে সরিয়ে দিয়েছে নিজের থেকে। কিরণের এমন আচরণে রাগ হলো কিয়ানের। ভ্রু কুঁচকে কিরণের দিকে তাকালো সে। হাত ধরে একটানে নিয়ে আসল নিজের কাছে। রেগে কিছু বলতে যাবে, তখনই চোখে পড়লো কিরণের ছলছল জোড়া চোখ। নিজের দু’হাতের আঁজলায় কিরণের ছোট্ট মুখটি নিয়ে চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করলো কিয়ান।

‘ কি হয়েছে রাগীনি? শরীর খারাপ তোমার? ’

কিরণ হুট করেই জড়িয়ে ধরল কিয়ানকে। কিয়ানের বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। কিয়ান হাত বুলালো কিরণের মাথায়, শান্ত কণ্ঠে বলল ওকে —--

‘ কি সমস্যা হয়েছে আমাকে বলো। ’

কান্নারত অবস্থাতেই উত্তর দিলো কিরণ —--

‘ আমার ভাইয়াকে এনে দিন। ’

কিয়ান চোখ বন্ধ করে একটা শ্বাস ছাড়লো। কিরণকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে বিছানার কাছে যেতে যেতে বলল।

‘ তোমার দামড়া ভাইকে আমি এনে দিব কীভাবে? নিজে গিয়েছে, নিজেই চলে আসবে। অপেক্ষা করো। ’

‘ ভাইয়ার ফোন বন্ধ। সেই বিকেলে বেরিয়েছিল, এখন ৯ টা বাজতে চলল।’

কিয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল। এই অপরিচিত জায়গায় অরণ্য একা একা গেলো কোথায়? অরণ্য কি কোনো বিপদে পড়ল? কথাটা ভাবনায় আসতেই সুবহার জন্য চিন্তা হলো কিয়ানের। কিরণের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

‘ সুবহা কোথায়? ’

কিরণের মনে মনে রাগ হলো কিয়ানের কাজে, নিজের বোনের জন্য কতো চিন্তা, অথচ তার ভাইয়ের কথা বলতেই মুখটাকে কেমন যেন বানিয়ে রেখেছিল। উত্তর না পেয়ে কিরণকে আবারও জিজ্ঞেস করেছে কিয়ান। মাথায় হাত চেপে বলল কিরণ।

‘ ও রুমেই আছে। কিন্তু আমার ভাইয়া কোথায় গেলো? আমি খারাপ স্বপ্ন দেখেছি, বিশ্বাস করুন। ভাইয়ার কিছু হলো না তো। ’

সুবহা মাত্রই এসে দাঁড়িয়ে ছিলো কিয়ানদের দরজার সামনে। কিরণের কথাটা কানে যেতেই কয়েক পা পিছিয়ে গেলো সে। রিসোর্টের কর্মচারীদের সাথে কথা হলো সুবহার। এখানে নাকি এমন দিনে একটা না একটা এক্সিডেন্ট হয়। মনের মধ্যে কচকচ করছে সুবহার। অরণ্য ঠিক আছে তো? এই আঁকাবাঁকা রাস্তায় বৃষ্টির দিনে হাঁটাও তো বিপদজনক। মাথাটা ধরে এসেছে সুবহার। কান্না করতে ইচ্ছে করছে ওর। মাকে হারিয়ে কাছের মানুষ হারানোর কষ্ট কেমন, ভালো করেই বুঝেছে সে। অরণ্যকে কোনোভাবেই হারাতে চায় না সুবহা। কঠোর সুবহাও কেমন নরম হয়ে গেছে অরণ্যের ভালোবাসায়। অরণ্যকে ছাড়া ওর বাঁচা দায় হয়ে পড়বে। সুবহার মাথাটা ঘুরছে। দরজার সাথে হেলান দেওয়া অবস্থায় ছিলো। এসব ভাবতে ভাবতে মেঝেতে বসে শব্দ করে কান্না করে দিয়েছে।

কিয়ানের কানে আসল বোনের কান্নার আওয়াজ। কিরণের সাথে কথা বলা রেখে ছুটে আসলো সুবহার কাছে। কিরণও এসেছে কিয়ানের পিছু পিছু। সুবহাকে হাত ধরে তুলে বসিয়েছে নিয়ে সোফায়। সুবহার কান্নার কারণ বুঝতে সমস্যা হয়নি কিয়ানের। কিয়ান অবাক হচ্ছে অরণ্যের প্রতি সুবহার ভালোবাসা দেখে। এই সুবহাই কিনা অরণ্যের ওপর রাগ করে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল! কিছু একটা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো কিয়ান। নিজের হাতের সাহায্যে বোনের চোখের পানি মুছে দিয়ে তাকে শান্ত থাকতে বলেছে কিয়ান।

সুবহার যে ভালো লাগছে না, মাথাটা প্রচণ্ড ঘুরছে, বমি বমি পাচ্ছে বারবার। সুবহা উঠে দাঁড়িয়ে ছিলো নিজের রুমে যাবে বলে, হাঁটতে গিয়ে পড়ে যেতে নিলে কিয়ান ধরে নিয়েছে তাকে। আদ্রীশকে ডাকতে পাঠিয়েছে কিরণকে।

বেশ অনেক্ষন হলো আদ্রীশের জন্য অপেক্ষা করছে কিয়ান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ও। বাইরের বৃষ্টির তান্ডব কমে গিয়েছে প্রকৃতি এখন শান্ত হয়েছে অনেকটাই। আদ্রীশ আসছে না দেখে নিজেই ওকে ডাকতে যাচ্ছিল কিয়ান। তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মিহিকে দেখতে পেলো। কিয়ান জানে মিহি এখানের হসটিটালেই জব করে তাই অবাক হয়নি মিহিকে দেখে।বরং এই সময়টাতে মিহি এসেছে তাই চিন্তামুক্ত হয়েছে কিছুটা। কিয়ান মুচকি হেসে ভেতর আসতে বলল মিহিকে। মিহিও কিয়ানের হাসির উত্তরে হাসি দিয়ে ভেতরে আসল তার সাথে একজন কম বয়সী নার্সও আছেন। তাদেরকে রেখে কিয়ান চলে গেছে রুম থেকে বেরিয়ে।

কিরণের কথা শুনে তাড়াহুড়ো করে আদ্রীশ এসেছিলো। রুমে এসে দেখা পেলো মিহির। কপাল কুঁচকে মিহির দিকে তাকিয়ে ভাবছে আদ্রীশ, এই রাতের বেলায় ঝড়ের মধ্যে মিহি একা একা এখানে আসলো কিভাবে? কিয়ান দাঁড়িয়ে আছে রুমের বাইরে। কিরণ আর আদ্রীশও সেখানেই গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশ অনেকক্ষণ পর মিহি বেরিয়েছে রুম থেকে। চিন্তিত হয়ে কিরণ গিয়ে জিজ্ঞেস করলো মিহিকে,

‘ সুবহার কি হয়েছে মিহি আপু? '

মিহি মুচকি হেসে কিরণের হাত ধরে বললো —--

‘ তুমি ফুফি হতে যাচ্ছ কিরণ। ’

কিরণের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ান মিহির কথা শুনে এক গাল হেসে বললো —--

‘ আমি তাহলে মামা হতে চলেছি। ’

মিহি হেসে উপর নিচ মাথা নাড়ালো। কিরণ খুশি হয়েছে সুখবরটা পেয়ে। আনন্দে ওর নাচতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ভাইয়ের কথাটা মাথায় আসলেই চিন্তারা এসে ভিড় করছে ওর চোখ মুখে। কিরণ সামলালো নিজেকে। রুমে গিয়ে বসল সুবহার মাথার কাছে।

মিহি চলে যাচ্ছিলো। আদ্রীশও ওর পিছু নিয়েছে, বারবার ডেকে যাচ্ছে মিহিকে। শুনেও না শোনার ভান করে চলে যাচ্ছে সে। এখানকার সবকিছুই মিহির চেনা। ছোট থেকে তার বেড়ে ওঠা এখানেই, বাবার চাকরির বদলিতে ওরা স্ব পরিবার এখানে এসেছিল। মিহির আব্বু মা/রা গিয়েছিলেন কোনো একটা এক্সিডেন্টে। তখন নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে চেয়েছিল মিহি, কিন্তু রাজি হননি ওর আম্মু। মিহিও এখানকার মানুষ, পরিবেশ, সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিয়েছিল আস্তে আস্তে।

বিজ্ঞাপন

পড়াশোনার জন্য যখন নিজের পরিচিত জায়গা ছেড়ে মিহি শহরে গিয়েছিলো, তখন দেখা হয়েছিল অরণ্য, আনহা আর আদ্রীশের সাথে। অরণ্যকে বরাবরই সে ভাইয়ের চোখে দেখত, বিপদে পড়লেই অরণ্য সুপারম্যানের মতো সাহায্য করতে ছুটে আসত তাকে। আদ্রীশকে মিহি সেই প্রথম দেখা থেকেই পছন্দ করত। কিন্তু যখন বুঝলো আদ্রীশ আনহাকে চায়, সে সরে এসেছিল সবকিছু ছেড়ে। ইন্টার্নি করার জন্য যখন অরণ্যের হসপিটালে গেলো, তখন আবার দেখা হলো আদ্রীশের সাথে। আদ্রীশের প্রতি আনহার ওমন অবহেলা দেখে মায়া হয়েছিলো মিহির। আদ্রীশকে জানাতে চাইছিলো, সে যেভাবে আনহাকে চায়, কেউ একজন তাকেও ওভাবে চায়। নিজের ভালোবাসার কথা বলেছিল মিহি আদ্রীশকে। কিন্তু লাভ কি হলো? আদ্রীশ বরাবরের মতোই ফিরিয়ে দিলো তাকে। মনের মধ্যে অভিমান জমে ছিল মিহির, জেদ লাগছিল খুব, তাই সব ছেড়েছুড়ে চলে এসেছে এখানে।

সুবহার অসুস্থতার খবর জানে মিহি। বাড়াবাড়ি কিছু হওয়ার আগেই ছুটে এসেছে সে। অরণ্যের কাছে যে মিহি ঝণী! এসে অবশ্য খারাপ কিছুই হয়নি, বরং ফুফি হবে শুনে সারপ্রাইজড হয়েছে সে। মিহি এসব ভাবছে আর হেঁটে যাচ্ছে। ওর সাথে আসা নার্স আগে আগে হেঁটে যাচ্ছে। আদ্রীশ তখন ওর কাছে গেলো, হেঁচকা টানে মিহিকে নিয়ে এল নিজের কাছে। মিহির রাগ হচ্ছে খুব, আদ্রীশের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলছে—--

‘করছিস টা কি? ছাড় আমাকে।’

‘এতো জেদি হলি কবে থেকে?’

‘যবে থেকে তুই আমাকে ইগনোর করছিস!’

‘আমি করছি না, তুই করছিস।’

কথা বললো না মিহি। আচমকাই ধাক্কা দিয়ে উঠলো আদ্রীশের বুকে। আদ্রীশ কি যেন ভেবে ছেড়ে দিলো মিহিকে। মিহিও আর অপেক্ষা না করে চলে যেতে চাইল সেখান থেকে। আদ্রীশ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো তখন—--

‘আমি এগিয়ে দিব?’

‘আমি একাই যেতে পারব।’

‘এতো সাহস হলো কবে?’

‘ধাক্কা খেতে খেতে সাহস হয়ে গেছে, এখন আর আমি ভয় পাই না।’

মিহি কথা বাড়ালো না আর। চলে গেলো সেখান থেকে। মিহির যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে আদ্রীশ। কি যেন ভেবে যাচ্ছে মনে মনে।

কারো হাতের স্পর্শ কাঁধে পড়তেই পাশ ফিরে তাকিয়েছে আদ্রীশ। দেখলো কিয়ান দাঁড়িয়ে আছে তার ঠিক পাশেই। কিয়ানের এখানে আসার কারণ অজানা নয় তার আদ্রীশেরও মনে হলো অরণ্যকে খুঁজতে যাওয়া দরকার। এতো সময় হয়ে গেলো অরণ্য আসছে না, মানে নিশ্চয়ই কোনো বিপদে পড়েছে।

————

বৃষ্টি কমেছে অনেক আগেই, প্রকৃতি এখন অনেকটাই শান্ত হয়েছে। আদ্রীশ আর কিয়ান হাঁটতে হাঁটতে এসেছে ওই জায়গাটায়, যেখানে সুবহা আর অরণ্য মিলে এসেছিল তখন। স্থানীয় কয়েকজন লোকও আছে কিয়ানদের সাথে, টর্চ জ্বালিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে সবাই। কিয়ানও সতর্ক চোখে চারিপাশটা দেখছে ভালো করে। কোথাও কোনো জনমানবের উপস্থিতি নেই। অরণ্যকে খুঁজতে খুঁজতে খাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে দুজনেই। অরণ্যকে না পেয়ে ফিরে যাবে ভাবছিলো, ঠিক তখনই কিয়ানের পায়ে কিছু লাগে। টর্চটা নিচের দিকে নিলে দেখতে পেলো অরণ্যের হাতের ঘড়িটা। মাটি থেকে ঘড়িটা তুলে হাতে নিলো কিয়ান, স্পষ্ট মনে আছে কিয়ানের আসার সময় অরণ্যের হাতে দেখেছিলো এটা।

আদ্রীশ তখন কিয়ানের সামনে এসে হাতে থাকা কাদা মাখা অরণ্যের ফোনটা দেখালো। দুজনেরই এবার চিন্তা হচ্ছে। অরণ্যের ফোন আর ঘড়ি এখানে, অথচ সে নেই! বুঝতে বাকি থাকলো না বড়সড় কোনো বিপদ হয়েছে অরণ্যের। এদিকে কিরণ বারবার ফোন দিয়ে যাচ্ছে কিয়ানকে। বিরক্ত হয়ে কিয়ান ফোনটা অফ করে দিয়েছে। কি বলবে কলটা ধরে? অরণ্যকে তারা পায়নি, শুধু পেয়েছে ওর ফেলে রাখা ঘড়ি আর ফোন! এই সময়টাতে সুবহাকে আর টেনশনে ফেলতে চায় না কিয়ান।

————

ভোর হয়ে গেছে অনেক আগেই। কিয়ান আর আদ্রীশ পুলিশ স্টেশনে বসে আছে। কাল থেকে ঘুম, খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে অরণ্যকে খুঁজে যাচ্ছে তারা, কিন্তু কেউই এখানকার তেমন কিছু ভালোভাবে চেনে না। মিহিকে ফোন দিয়েছিল আদ্রীশ, রিসিভ করেনি একবারও। রাগে আদ্রীশও মিহির নাম্বারটা ব্লক লিস্টে ফেলে রেখেছে, ভেবে নিয়েছে আর কখনো কথা বলবে না ওর সাথে।

এবার কিয়ানদের উঠতে হবে এখান থেকে। ইন্সপেক্টরের সাথে প্রয়োজনীয় সব কথা বলে উঠতে যাবে ঠিক তখনই কোথা থেকে এক কনস্টেবল এসে জানিয়েছে, ওই জায়গাটায় নাকি কালকে কেউ একজন অরণ্যের মতো কাউকে যেতে দেখেছে, কিন্তু ফিরে আসতে আর দেখেনি। খাদে পড়ে যাওয়ার আশংকাই বেশি। কথাটা শুনে ভয় হলো কিয়ানের। ওই গভীর খাদে কেউ পড়লে তো আর বেঁচে ফেরার উপায় নেই! গলা শুকিয়ে আসছে ওর, আদ্রীশের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। বারবার কানের মধ্যে বাজছে অরণ্য কি ঠিক আছে? পরক্ষণেই আবার মনে হচ্ছে না, না, অরণ্যের কিছু হতে পারে না। অরণ্য তো জানেও না ওর ঘর আলো করে একটা ছোট্ট রাজকন্যা বা রাজপুত্র আসতে চলেছে। সবাই মিলে আবারও সেই খাদের কাছে গেলো। পুলিশ বারবার বলছে হয়তো, অরণ্য পড়ে গেছে এই গভীর খাদে, নাহলে ওর হাতের ঘড়ি আর ফোন এখানে পড়ে থাকবে কেন? বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠেছে কিয়ানের। সুবহাকে সে কি উত্তর দিবে? ফিরলেই তো জানতে চাইবে অরণ্য কোথায়! কি বলবে কিয়ান?

————

হাতে স্যালাইন আর মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে এক যুবক। ডাক্তারেরা চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে ওর পাশে। মিহি একটু পর পর এসে চেক করছে ওর জ্ঞান ফিরেছে কিনা। বেশ অনেক্ষন পর নিভু নিভু চোখে তাকালো যুবকটি। মিহির চোখে পড়া মাত্রই দ্রুত এসে দাঁড়ালো ওর পাশে। সবাইকে কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতে বললো মিহি। ডাক্তারেরা মিহির কথা শুনে বেরিয়ে গেলো। যাওয়ার আগে বলে গেলো, কোনো সমস্যা হলে যেন অবশ্যই ডাকে। মিহি মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো।

উদ্বিগ্ন হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলো মিহি, কিন্তু যুবকটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো—--

‘ আমার লাভবার্ড কেমন আছে, মিহি? ’

মিহি হেসে উত্তর দিলো অরণ্যকে—--

‘তুই কি জানিস অরণ্য, তোদের বেবি আসছে?’

কথাটা শুনা মাত্রই অরণ্যের ঠোঁটে হাসি খেলে গেলো। সুবহার অসুস্থতার লক্ষ্মণ দেখে ব্যাপারটা আন্দাজ করেছিল সে, তবে নিশ্চিত ছিলো না বলেই পাঠিয়েছিলো মিহিকে। চোখ বন্ধ করে প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো অরণ্য। ইচ্ছে করছে এক্ষুণি সুবহার কাছে ছুটে যেতে। পুরো মুখজুড়ে হাজারটা চুমু দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিতে তাকে। আনন্দে ভরে উঠছে অরণ্যের হৃদয়। মনে মনে ভাবছে অরণ্য, বাবা হওয়ার অনুভূতি তবে এমনই হয়! মিহি বুঝতে পারছে অরণ্যের খুশির কারণ। অরণ্য উঠার চেষ্টা করছিলো, মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা পেলো। চোখ-মুখ কুঁচকে বন্ধ করে নিলো সাথে সাথে, শুয়ে পড়লো আবারও। মিহি সেটা লক্ষ্য করে দ্রুত বলে উঠলো অরণ্যকে—--

‘কি করছিস? তুই অসুস্থ, ভুলে গেছিস? কাল থেকে সেন্সলেস হয়ে পড়ে ছিলি এখানে।’

‘আমি ফিরব।’

‘ফিরবি মানে? হাঁটতে পারবি তুই? মাথায় আঘাতটা ঠিক হতে কম করে হলেও দুই সপ্তাহ সময় লাগবে। আরেকটুর জন্য তো পটল তুলতে যাচ্ছিলি!’

অরণ্য চুপ করে শুয়ে রইলো। অবাক হয়ে দেখছে মিহিকে। এখন পুরোপুরি প্রফেশনাল ডাক্তার হয়ে গেছে মিহি। মিহির এই সাফল্য দেখে ভালোই লাগছে অরণ্যের।

————

মেঝেতে বসে খাটের সাথে মাথা এলিয়ে দিয়েছে সুবহা। কান্না করতে করতে ফুলে গেছে ওর চোখ-মুখ। কত সময় হয়ে গেলো অরণ্যের মুখটা দেখেনি সে। অরণ্য কি জানে, সে বাবা হতে চলেছে? তাদের একটা ছোট্ট বাবু আসবে! কোথায় গেলো অরণ্য? চিন্তায় চিন্তায় মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে সুবহার।

কিয়ান এসেছে অনেকক্ষণ হলো। সুবহা তখন থেকেই প্রশ্ন করে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি কিয়ানের কাছ থেকে। রাগে এসে সুবহা নিজের রুমে দরজা আটকে বসে আছে। সকাল থেকে কিছু খায়নি পর্যন্ত। কিরণ আর কিয়ান এসে দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। এতো সময় হলো ডেকে যাচ্ছে, শুনেও চুপ করে বসে আছে সুবহা। কিরণ আর কিয়ানও চলে গেছে একসময়।

————

দুইদিন হলো অরণ্যের কোনো খোঁজ নেই। বাড়িতে এখনো কাউকেই কিছু জানানো হয়নি। সুবহার অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে, খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে মেয়েটা। এদিকে কিরণ নিজেই ভেঙে পড়েছে। সুবহাকে সামলাবে, নাকি নিজেকে, বুঝে উঠতে পারছে না সে। এই বেড়াতে আসার ইচ্ছেটা ছিলো সবচেয়ে বেশি কিরণের। এখন নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছে, কেন এসেছিলো এখানে? ওর ভাই কি আদৌ ঠিকঠাক আছে? অরণ্যের কথা মনে পড়লেই চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে কিরণের। কিয়ান শত চেষ্টা করেও পারছে না কিরণ বা সুবহাকে সামলাতে। সেও কি কম চেষ্টা করছে অরণ্যকে খুঁজে পেতে!

সুবহা শুয়ে আছে বিছানায়। মিহি এসে দেখে গেছে কিছুক্ষণ আগে। বারবার বলেছে নিজেকে ঠিক রাখার কথা। সুবহা শুধু শুনেছে মিহির কথা, নিজে থেকে কিছুই বলেনি সে। সবাই বেরিয়ে যেতেই ধীরে ধীরে উঠে বসেছে সুবহা। মাথাটা পুরো বিগড়ে গেছে ওর। বার বার ইচ্ছে করছে নিজেকে শেষ করে দিতে। কি যেন ভাবছে সুবহা, এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ফলের ঝুড়িতে রাখা ছুরিটার দিকে,কাঁপা কাঁপা হাতে বেডসাইড টেবিল থেকে ফল কাটার ছুরিটা তুলে নিয়েছে সে। চোখ বন্ধ করে ছুরিটা দিয়ে নিজেকে আঘাত করতে যাবে ঠিক তখনই কেউ এসে শক্ত করে ধরে ফেলেছে ওর হাত।

সুবহা থমকালো, শুকনো ঢোক গিলে, আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকিয়েছে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে। এ কাকে দেখছে সুবহা? নিজের অতি পরিচিত মানুষটাকে দেখে, চোখ বেয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে তার। সুবহা কি ঠিক দেখছে? নাকি এটা তার স্বপ্ন?

বিজ্ঞাপন
অন্তরালের প্রণয়িনী গল্পটি আফরোজা আঁখি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক গল্প