অন্তরালের প্রণয়িনী

পর্ব - ২৯

🟢

চোখের সামনে অরণ্যকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে সুবহা তাকে জাপ্টে ধরল। অরণ্য এদিকে রেগে আছে সুবহার উপরে, ওকে নিজের থেকে সরিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠেছে অরণ্য —--

' কি করতে যাচ্ছিলে তুমি?'

চুপ রইল সুবহা, কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। অরণ্যকে এটা বলবে! নিজেকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিল সে। অরণ্য কি ছেড়ে দেবে সুবহাকে? ভালো করেই তো জানে অরণ্যের রাগ সম্পর্কে। ভালো করে দেখলে অরণ্যের মাথার ব্যান্ডেজটা নজরে আসল সুবহার। সুবহা ওর হাতটা অরণ্যের মাথায় ছুঁইয়ে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করল —--

'আপনি ঠিক আছেন? মাথায় কি হয়েছে?'

অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই। সুবহার হাতটা ধরে নিজের বুকে এনে রেখেছে, ঘাড় কাত করে ওর দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করল অরণ্য —--

' তুমি ঠিক আছো? '

উত্তর না দিয়ে ছলছল চোখে সুবহা তাকিয়ে আছে অরণ্যের পানে। কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে ওকে। অরণ্যের বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠেছে সে। সুবহার কান্নার শব্দ কানে বাজছে অরণ্যের, বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠছে ওর, কষ্ট হচ্ছে খুব।অরণ্য শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সুবহাকে। কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে অরণ্যের দিকে তাকাল সুবহা। অরণ্য মুচকি হেসে আলতো করে চুমু এঁকে দিল সুবহার কপালে। নিজের দুই হাতের আঁজলায় সুবহার মুখটি নিয়ে বলল তাকে,

' কাঁদছ কেন? তাকিয়ে দেখো, আমি পুরোপুরি ঠিক আছি। '

ক্রন্দনরত অবস্থাতেই অরণ্যের দুই হাত ধরে উত্তর দিল সুবহা।

' কোথায় ছিলেন আপনি? '

অরণ্য কিছু না বলে তাকিয়ে রইল সুবহার পানে। কিছুক্ষণ পর মুখে হাসি টেনে বলে উঠল —--

'দেখলে, বলেছিলাম না, একবার আমার ভালোবাসা পেলে যেদিকে তাকাবে, শুধু আমাকেই দেখবে। মিলল তো আমার কথা!'

সুবহা হাসল মনে মনে। সত্যিই তো, আজকাল ওর অশান্ত মনটা অরণ্যকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। কিছু সময় চোখের সামনে না দেখলেই কেমন পাগল পাগল লাগে। অরণ্যের প্রতি কবে যে এতোটা দুর্বল হয়ে পড়ল, নিজেও জানে না সুবহা। খাবারের প্লেট হাতে তখনই রুমে ঢুকেছে কিরণ। বেডসাইড টেবিলে খাবারের প্লেটটা রেখে চলে যাবে, তখনই অরণ্য ডেকে উঠেছে কিরণকে। কিরণের কষ্ট হচ্ছে, অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি পড়ছে ওর। অরণ্য বুঝল কিরণের কান্নার কারণ। ছোটবেলা থেকেই কিরণ এমন, অরণ্য কোথাও গেলে কান্না করে ভাসাত সে। ফিরে আসলে অরণ্য আবার আদর করে বুকে জড়িয়ে নিত বোনকে। কয়েকটা খেলনা উপহার দিলেই ছোট্ট কিরণের রাগ ভেঙে যেত তখন। অরণ্য কি যেন ভেবে ওর হাত মেলে চোখের ইশারায় ডাকল কিরণকে। দেরি করল না কিরণ, দৌড়ে গিয়ে জাপ্টে ধরল ভাইকে। কান্না করে যাচ্ছে অঝোরে। অরণ্য ওর চোখ মুছে শান্ত হতে বলেছে। কিরণও শুনেছে অরণ্যের কথা। সুবহাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ান মুখ ভেংচি দিয়ে বলছে বিড়বিড় করে।

' হুহ, রাগীনির সব ভালোবাসা শুধু ভাইয়ের জন্য। আমি যেন বন্যার পানিতে ভেসে এসেছি। '

সুবহা তাকিয়েই ছিল কিয়ানের দিকে। কথাটা স্পষ্ট শুনতে না পেলেও মুখের ভঙ্গিমায় বুঝতে বাকি নেই, কিয়ান মনে মনে অরণ্য বা কিরণকেই বকুনি দিয়েছে। ভাইয়ের এমন কাজে সুবহা হাসল আনমনে।

————

অরণ্য সুবহাকে খাইয়ে দিয়েছে নিজের হাতে। এখন অনেকটা ভালো লাগছে ওর। মিহি চলে গেছে, যাওয়ার আগে বারবার বলেছে অরণ্যকে নিজের খেয়াল রাখতে। মাথার আঘাতটা ঠিক হতে অনেকটা সময় লাগবে। অরণ্য শুধু মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়েছে মিহির কথায়। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুবহা। অরণ্য ওকে জড়িয়ে ধরেছে পেছন থেকে। কি যেন ভেবে অরণ্য সুবহাকে ঘুরিয়ে নিয়েছে নিজের দিকে, হাঁটু গেড়ে বসেছে মেঝেতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অরণ্য তার ঠোঁটের স্পর্শ দিল সুবহার উদরে। হাসল সুবহা, অরণ্যের ঘন চুলের ভাঁজে হাত বুলালো নিজের।

অরণ্য ওকে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করে বলছে বার বার।

' থ্যাংক ইউ লাভবার্ড,থ্যাংক ইউ ফর গিভিং মি আ বিগ সারপ্রাইজ। '

সুবহা কথা না বলছে না ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওভাবেই, অরণ্য উঠে দাঁড়িয়েছে সুবহাকে কোলে তুলে বিছানায় নিয়ে গেছে। চোখ বন্ধ করে ঘুমোতে বলেছে ওকে। সুবহা শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে অরণ্যকে, মনে হচ্ছে ছাড়লেই সে পালিয়ে যাবে সুবহাকে ছেড়ে। অরণ্য হাসল সুবহার কাজে, ওর বন্ধ করা চোখের পাতায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিল নিজের। জানালাটা খোলাই ছিল, বাইরে থেকে বাতাস আসছে রুমে। বাতাসে সুবহার শাড়িটা পেটের উপর থেকে সরে গেছে অনেকটাই। টের পেয়ে ঠিক করতে যাচ্ছিল, তখনই খেয়াল করল, অরণ্য নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা দিয়ে ছুঁয়েছে সুবহার উদর। সুবহা তাকিয়ে দেখল অরণ্যের দিকে, চোখ মুখে তার খুশির ঝিলিক। অরণ্য তাকিয়েছে সুবহার মায়াবী মুখপানে। কাছে গিয়ে পরপর কয়েকটা চুমু দিয়েছে ওর পুরো মুখজুড়ে। সুবহা তখন বলতে যাচ্ছিলো কিছু ঠোঁটে চুমু দিয়ে ওকে থামিয়ে দিলো অরণ্য। সুবহার হাতটা ধরে বলল ওকে —--

'লাভবার্ড, আমার কিন্তু গুণে গুণে দুইটা সন্টু মন্টু চাই।'

সুবহা হাসি পাচ্ছে অরণ্যের কথা শুনে,ঠাট্টার স্বরে বলছে অরণ্যকে।

'মাত্র দুইটা!'

' দুইটা কারণ, একসাথে তিন-চারটি ডাউনলোড দিতে গেলে তোমার কষ্ট হবে বেশি। এবার দুইটা মেয়ে বাবু পরের বার দুইটা ছেলে বাবু। ক্রিকেট টিম না বানানো পর্যন্ত থামব না আমি।'

সুবহা খিলখিল করে হাসছে অরণ্যের কথায়। অরণ্য এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ওর হাসিমাখা মুখটির দিকে। দরজার ঠকঠক আওয়াজে ধ্যান ভাঙল অরণ্যের, মনে হলো মিহি বা আদ্রীশ দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। সুবহাকে ঘুমোতে বলে অরণ্য চলে গেছে বাইরে।

————

রিসোর্টের বাইরে একটা প্যাভিলিয়নে বসে আছে আদ্রীশ আর অরণ্য। তাদের কথার মধ্যেই সেখানে কিয়ান এসে উপস্থিত হয়েছে। মিহি আর অরণ্যের উপর রাগ লাগছে কিয়ানের, তার বোন ওতোটা কষ্ট পাচ্ছিল, অসুস্থ জেনেও মিহি কি বলেনি অরণ্যকে? বলেছে নিশ্চয়ই! অরণ্যের কথা শুনতে মিহিও কাউকে বলেনি যে অরণ্য ঠিক আছে। এই বিষয়টা নিয়ে তখন থেকেই রেগে আছে কিয়ান। অরণ্য লক্ষ্য করল কিয়ানের বিরক্তিভরা মুখশ্রী। কি যেন ভেবে হেসে ওর কাঁধে ছাপড় মেরে বলল কিয়ানকে,

' আমার ভবিষ্যৎ বাচ্চাদের মামা হবি তুই। মুখটাকে এমন পালোয়ানের মতো বানিয়ে রাখলে চলে? '

কিয়ান অরণ্যের হাতটা ঝাড়া মেরে ফেলে দিয়ে বলছে ওকে,

বিজ্ঞাপন

' যত্তসব ঢং!'

' বোনের হাজবেন্ডকে সম্মান করতে শিখ, নইলে পাছায় লাথি মেরব উগান্ডা পাঠাতে বেশি সময় নেব না আমি।'

কিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছে অরণ্যের দিকে। অরণ্য ভাবলেশহীনভাবে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। কিয়ানের চাহনি দেখে বুঝল আদ্রীশ, এক্ষুণি বড়সড় কোনো ঝামেলা হয়ে যাবে এখানে। চোখের ইশারায় মাথা ঠান্ডা করতে বলেছে কিয়ানকে। কিয়ান শুনল আদ্রীশের কথা, তবে এখানে থাকলেই ঝামেলা হবে অরণ্যের সাথে, তাই চলে যেতে নিচ্ছিলো। আদ্রীশ ওর হাত ধরে আটকে নিয়েছে। নিজের পাশে বসতে বলেছে কিয়ানকে।

————

কিয়ান আর অরণ্য বসে আছে মুখোমুখি, একে অপরের দিকে রেগেমেগে তাকাচ্ছে বারবার। মনে মনে হয়তো বকাঝকা করছে একজন অন্যজনকে। আদ্রীশ মাথায় হাত দিয়ে একবার তাকাচ্ছে কিয়ানের দিকে, তো আরেকবার তাকাচ্ছে অরণ্যের দিকে। পরক্ষণেই আবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলছে।

'এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার নয়।'

আদ্রীশ কিছু বলেছে বুঝতে পেরে ভ্রু কুঁচকে অরণ্য তাকিয়েছে ওর দিকে। আদ্রীশ অরণ্যকে বলতে বলছে বারবার, কি হয়েছিল তার? আর কোথায় ই বা ছিল অরণ্য? অরণ্যের কি যেন হলো, চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ, কিছু না বলে উঠে গেছে সেখান থেকে।

কিয়ান ভ্রু কুঁচকে অরণ্যের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলছে আদ্রীশকে।

'দেখলে! এমনি এমনি কি আমি এই লোকটাকে অহংকারী বলি? '

কিয়ান কথাটা বলে শেষ করেছে কিনা, কেউ পিছনে এসে চুল টেনে ধরেছে ওর। কিয়ানের বুঝতে বাকি নেই এটা কিরণ, তার মাথার চুল ধরে টানবে এত বড় সাহস আর কারো হয়নি।

' রাগিনী, ছাড়ো! টাকলা বানাতে চাচ্ছ নাকি আমাকে? '

' তা তো বটেই! আরেকবার আমার ভাইয়াকে নিয়ে কিছু বলে দেখুন, মাথার সব চুল কেটে হাতে ধরিয়ে দেব। '

আবাহাওয়ায় মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে এক্ষুণি। কিরণ একবার চোখ বুলালো চারিপাশে কিয়ানকে কিছু না বলেই চলে যাচ্ছিল সেখান থেকে, কিয়ান হুট করে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোলে তুলে নিয়েছে কিরণকে। কিরণ বুঝল না কিয়ানের মনে কি চলছে, জিজ্ঞেসও করেনি আর। কিয়ানের কাজে রাগ চলে গেছে ওর, চোখ মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠেছে কিরণের। এরইমধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে, রুমে যেতে যেতে আধভেজা হয়ে গেছে দুজনেই। আদ্রীশ বেচারা ওখানেই বসে আছে গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে আছে জোড়া কবুতরের দিকে।

রুমে এসে কিয়ান নামালো কিরণকে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখল ওকে, ভিজে শাড়িটা পুরোপুরি লেপ্টে আছে গায়ের সাথে। পাতলা জর্জেট শাড়িটা ভেদ করে কিরণের ফর্সা, মেদহীন উদর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিয়ানের ইচ্ছে করছে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতে কিরণের শরীরের প্রতিটি ভাজেঁ। দেরি কিসের? বউতো তারই। এই ভেবে কিরণের কাছে এগিয়ে আসল কিয়ান। কিরণ নিজের দুই হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল কিয়ানের গলা। কিয়ান ওর ঠোঁট ছোঁয়ালো কিরণের কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে। বেশ অনেক্ষন পর ছেড়ে দিলো ওকে, লজ্জায় চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে কিরণের ভাবল সে পালাবে এক্ষুণি, কিন্তু বাধা পড়ল আবারও। কিয়ান ওর কোমর চেপে ধরে নিয়ে এসেছে নিয়ের কাছে ঠোঁট আঁকড়ে ধরেছে আবারও। কিরণ ছটফট করে পালাতে চাইলে রাগে কিয়ান কামড় বসিয়ে দিয়েছে ওর ঠোঁটে। তীব্র জ্বলুনি অনুভব হলো কিরণের, সাথে সাথে খামচে ধরেছে কিয়ানের মাথার চুল। কিয়ানের হুশ নেই সেদিকে, ঠোঁট ছেড়ে মুখ ডুবিয়েছে কিরণের গলায় বিরক্ত লাগছে এবার কিরণের, কিয়ানের বুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বলছে ওকে।

' ছাড়বেন আমাকে! '

কিয়ান নিজের কাছে নিয়ে এসেছে কিরণকে, কিরণের কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে ঘন ঘন শ্বাস ফেলে বলছে ওকে।

' আই নিড ইউ রাগীনি। প্লিজ, আটকিও না আমাকে।'

কিরণ কথা বলল না আর,চুপটি করে তাকিয়ে রইল কিয়ানের মুখপানে। কিয়ান হেসে চুমু দিলো কিরণের ঠোঁটে। কিরণের পরনের শাড়িটা কিয়ান এলোমেলো করে দিয়েছে অনেক আগেই। কোলে তুলে নিয়ে এসেছে বিছানায়। ঠান্ডার মধ্যেও কেমন ঘামছে কিরণ। কিয়ান ওর কাছে গিয়েছে, পুরোপুরি এলোমেলো করে দিয়েছে কিরণকে।

————

অরণ্য শুয়ে আছে সুবহার পাশে। নিজের হাতের আঙুল দিয়ে আলতোভাবে ছুঁয়ে দিচ্ছে সুবহার ঘুমন্ত মুখশ্রী। ঘুমের ঘোরেই সুবহা এসে ওকে জড়িয়ে ধরেছে, অরণ্যও হেসে ঠিক সুবহার মতো করেই জড়িয়ে ধরেছে ওকে। চোখ বন্ধ করে ভাবছে সেদিনের কথা। মিহি ঠিক সময়মতো না এলে হয়তো আজ অরণ্য এই পৃথিবীতেই থাকতো না।

রাইয়ানের মুখে বারবার সুবহার নাম শুনে বিরক্ত হচ্ছিলো অরণ্য। রাগে মাথা ফেটে পড়ছিল ওর। রাইয়ান তখন ছুটে আসছিল অরণ্যকে ধাক্কা মেরে খাদে ফেলবে বলে অরণ্য ওর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসছিল তখন। যেই না রাইয়ান অরণ্যের কাছে এসেছে অরণ্য সরে গিয়েছে ওখান থেকে। মুহূর্তের মধ্যে অরণ্যের জায়গায় রাইয়ান গিয়ে পড়ে গভীর খাদে। মিহির মনে হচ্ছিলো অরণ্যই পড়ে গেছে গভীর খাদে, এখান থেকে পড়লে যে বেঁচে ফেরার উপায় নেই। ভয় আর আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিল সে।

কিছুক্ষণ পর যখন চোখ খুলে তাকাল মিহি, দেখে অরণ্য ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাসছে মিহির ভয়ার্ত মুখশ্রী দেখে।মিহির শরীর তখনও কাঁপছে ভয়ে, অরণ্য ঠিকঠাক আছে দেখে মনে হচ্ছিলো নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে আবারও।মিহি এগিয়ে যাচ্ছিল অরণ্যের দিকে, মিহি কাছে যাওয়ার আগেই অরণ্য লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে।

চিন্তিত হয়ে মিহি ওর পাশে বসে বারবার ডাকছিল অরণ্যকে, সাড়া না পেয়ে ভয় হচ্ছিল ওর। ভালো করে খেয়াল করে বুঝতে পারে, রাইয়ান ওর মাথায় কোনো ভারী জিনিস দিয়ে আঘাত করেছে। অরণ্যের গায়ে থাকা সাদা শার্টটা রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে। আকাশে তখন মেঘ ডাকছিল, প্রকৃতি জানান দিচ্ছিল বৃষ্টির আসতে চলেছে। উঠে গিয়ে তখন সেখানকার কিছু স্থানীয় লোকদের ধরে নিয়ে এসেছিল মিহি, পরিচিত মুখ ছিল বিধায় তাদের কাছ থেকে সাহায্যও পেয়েছিল সে।

অরণ্যকে হসপিটালে নিয়ে আসা হলো। মিহি সবাইকে অরণ্যের পরিচয় দিতেই চিনে ফেলেছিল তারা। প্রাণপণে চেষ্টা করেছে অরণ্যকে সুস্থ করতে। উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় মিহি ভেবেছিল আদ্রীশকে জানাবে সবটা, ইমিডিয়েটলি অরণ্যকে নিয়ে ঢাকায় ফিরতে হবে তাদের। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে পড়ছিল অরণ্যের বলা কথা মাথায় হাত চেপে বারবার মিহিকে বলছিল অরণ্য, —“ ওর এই অবস্থার কথা যেন কোনোভাবেই সুবহা বা কিরণকে না জানানো হয়। ” মিহিও শুনল অরণ্যের কথা। অরণ্য না বলা পর্যন্ত কাউকেই কিছু বলবেনা বলে ঠিক করল সে। কিন্তু অনেক্ষন হলো অরণ্যের জ্ঞান ফিরছে না দেখে টেনশন হচ্ছিল মিহির। ফোনটা অন করতেই আদ্রীশের অনেকগুলো কল দেখেছিল, চোখ মুখে চিন্তারা ভিড় জমালো ওর। অরণ্য বলেছিল মিহিকে সুবহা অসুস্থ, ওর কি বাড়াবাড়ি কিছু হলো? কথাটা মাথায় আসা মাত্রই অরণ্যকে হসপিটালে রেখে নার্সকে সাথে নিয়ে রিসোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছিল মিহি।

বর্তমান...

সুবহার নড়াচড়ায় চোখ খুলে তাকিয়েছে অরণ্য, দেখল সুবহা নিজেও তাকিয়ে আছে ওর দিকে। অরণ্য হেসে সুবহার কপালে চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস করলো ওকে।

' কিছু লাগবে তোমার? '

' বাড়ি ফিরব আমি। '

অরণ্যও সায় জানালো সুবহার কথায়। দুজনে কথা বলছিল, কখন যে সুবহার চোখ লেগে গেছে টেরও পায়নি অরণ্য। অবাক হয়নি সে এই সময়টাতে মেয়েদের মধ্যে অনেক চেঞ্জেস আসেই, এসেছে সুবহারও।

—————

ভোরের আলো ফুটেছে অনেক আগেই, আজকে অরণ্যদের ফিরে যাওয়ার কথা। ব্যাগপত্র হাতে নিয়ে রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে এসেছে সবাই। অরণ্য অপেক্ষা করছে মিহির জন্য ও আসলে তবেই যাবে। কিয়ান আর কিরণ চলে গেছে নিজেদের গাড়ি নিয়ে। সুবহা গিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছে অনেক আগেই। শরীরটা খারাপ লাগছে ওর। এখানকার কিছুই ভালো লাগছে না। বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে নিজের বাড়িতে, কাছের মানুষদের কাছে। সুবহার প্র্যাগনেন্সির খবর পাওয়ার পর থেকে ওর চাচি আর শাশুড়ি কয়বার ফোন দিয়েছেন তার ঠিক নেই। পারলে তো ওনারা এক্ষুণি চলে আসেন সুবহার কাছে। সুবহার ভালো লাগছে ওর প্রতি ওনাদের এত যত্ন দেখে। এতো খুশির মধ্যেও মনের মাঝে একটা খারাপ লাগা কাজ করছে ওর। বারবার নিজের মায়ের মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। সুবহা মা হতে চলেছে শুনলে ওর আম্মুও নিশ্চয়ই এতটাই খুশি হতেন, যতটা হয়েছেন অরণ্যের আম্মু। অরণ্যের ডাকে ধ্যান ভাঙলো সুবহার। পাশে এসে বসতেই কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কাঁধে মাথা রাখল ওর।কিছুক্ষন পর মুখ তুলে তাকাতেই অরণ্য পরম যত্নে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো সুবহার কপালে।

বিজ্ঞাপন
অন্তরালের প্রণয়িনী গল্পটি আফরোজা আঁখি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক গল্প