অন্তরালের প্রণয়িনী

পর্ব - ৩১

🟢

অরণ্য চলেই গিয়েছিল, মাঝরাস্তায় গিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত বদলে দিলো। ভাবলো সুবহাকে নিয়ে ঘুরতে যাবে আজকে। অনেকদিন হলো ওকে বাইরে বেরুতে দেয় না অরণ্য। গাড়ি ঘুরিয়ে আবারও এসেছে সুবহাদের বাড়িতে। দরজাটা ধাক্কা দিয়ে খুলতেই আনহা আর ওর আম্মু দুজনেই তাকিয়েছেন সেদিকে। অরণ্য আবারও ফিরে এসেছে দেখে ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ আনহার। এখন যদি এসব শুনে, তাহলে অরণ্য কেমন রিয়েক্ট করবে অজানা নয় তার। অরণ্য হাসিমুখেই বাড়ির ভেতরে ঢুকেছে, সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আনহা আর ওর আম্মুর। ওনাদের এমন ভয়ার্ত চাহনির মানে বুঝতে পারছে না সে। অরণ্য আনহার চোখখের সামনে হাত নাড়িয়ে বলছে ওকে —--

' কি হলো? আমি বাঘ না ভাল্লুক! আমাকে দেখে এমন কাতলা মাছের মতো হাঁ করে আছিস কেন?'

'কো... কোথায়? আমি তো ঠিক আছি।'

' তা তো দেখতেই পারছি।'

অরণ্য কথা না বাড়িয়ে আশপাশে চোখ বুলিয়ে খুঁজলো সুবহাকে। কোথাও না পেয়ে ওর রুমে গেলো। ভাবলো সেখানেই আছে। অরণ্যের পিছু পিছু গিয়েছে আনহাও, দাঁড়িয়ে আছে সুবহার দরজার সামনে। ওর আম্মু মাথায় হাত দিয়ে ড্রয়িংরুমে পাতানো সোফাটায় বসে কান্না করে যাচ্ছেন।

পুরো রুমে কোথাও সুবহাকে পেলো না অরণ্য। বেলকনি, ওয়াশরুম সব দেখে নিয়েছে। কপালে ভাঁজ পড়ল ওর সুবহা গেলো কোথায়? দরজার সামনে আসতেই ধাক্কা লাগে আনহার সাথে। বিরক্ত হয়ে ধমকের স্বরে বলল অরণ্য —--

' সামনে থেকে সর, পেত্নী।'

আনহা দ্রুত সরে গেছে অরণ্যের সামনে থেকে। অরণ্য ভাবল সুবহা কিরণের সাথে আছে। নিচে নামতে নামতে কল দিয়েছে ওর ফোনে। কি যেন মনে হলো অরণ্যের, আবারও ফিরে তাকিয়েছে আনহার দিকে। আনহার চোখমুখ দেখে বুঝতে বাকি নেই, অরণ্যের খারাপ কিছু হয়েছে এখানে।অরণ্য জানে আনহা এখন আগের থেকে অনেকটা পরিবর্তন গেছে। তাইতো বিয়ের এতোদিন পরে এই প্রথম এখানে থাকতে দিয়েছে সুবহাকে। সুবহা কোথায়? ও কি ঠিক আছে? এসব ভাবনায় আসতেই ভয় বাড়ল অরণ্যের। ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে আনহার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে ওকে —--

' আমার লাভবার্ড কোথায়, আনহা?'

হঠাৎ অরণ্যের কথা কানে আসতেই ভড়কে তাকালো আনহা। নিজেকে স্বাভাবিক করে ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলো অরণ্যের কথার।

' হসপিটালে।'

কথাটা শুনা মাত্রই কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল অরণ্যের।কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চিৎকার দিয়ে বলে উঠেছে তখন।

' কীহ! হসপিটালে কেন? বেবি আসার তো সময় হয়নি এখনও!'

' আসলে...'

' আসলে নকলে না বলে কি হয়েছে, বল!'

অরণ্যের চিৎকার কানে গেছে আনহার আম্মুর,এসে দাঁড়িয়েছেন অরণ্যের পাশে, সবটা খুলে বলেছেন ওকে। সুবহা পড়ে গেলো, সময় আনহা ওর পাশেই ছিল কথাটা বারবার কানে বাজছে ওর। অরণ্য হুট করেই ভ্রু কুঁচকে, রাগান্বিত চেহারা নিয়ে তাকিয়েছে আনহার দিকে। আনহা কিছু বলার আগেই অরণ্য হাত তুলেছে, ওকে চড় মারবে বলে। কি যেন ভেবে আবার হাতটা নামিয়ে নিয়েছে। সুবহার রুমের দরজার সামনে রাখা ফুলদানিটা ছুড়ে ফেলেছে মেঝেতে। মেজাজ দেখিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে উঠেছে আনহাকে —--

'কেন করলি এটা?'

কেঁপে উঠেছে আনহা কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে বলছিল সে।

' আমি কিছু...'

আনহার পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অরণ্য আবারও রেগে-মেগে বলে উঠেছে ওকে।

' খোদার কসম আনহা, আমার বেবির কিছু হলে আমি তোকে বাঁচিয়ে রাখব না।'

অরণ্য অপেক্ষা করেনি আর, দ্রুত বেরিয়ে গেছে সেখান থেকে।

আনহার কান্না পাচ্ছে। রিগ্রেট ফিল হচ্ছে ওর, নিজের করা ভুলেরই শাস্তি পাচ্ছে এখন। এগুলো তো হওয়ারই ছিল, এখন কেন কষ্ট পাচ্ছে?আনহার আম্মুও মেয়েকে কথা শুনিয়ে চলে গেছেন সেখান থেকে। বাড়ির গাড়ি নিয়ে ওনাকেও যেতে হবে হসপিটালে। সুবহার আব্বু-চাচ্চুর কানে এখনও যায়নি কিছুই। জানলে কি হবে, ভালো করেই জানা ওনার। অসুস্থ মানুষটাকে আর চিন্তায় ফেলতে চান না তাই কথা বাড়াননি এখানে।

আনহা বসে পড়েছে মেঝেতে, হাঁটুতে মুখ গুঁজে কান্না করে যাচ্ছে। আজকে ওর জন্য সুবহার ক্ষতি না হলেও, তো সারাজীবন ওর ক্ষতি করে এসেছে আনহা। মায়ের মতো নিজের বড় আম্মুকে মেরে ফেলেছে নিজ হাতে। ওর বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। কি যেন ভেবে উঠে দাঁড়িয়েছে আনহা, পা বাড়িয়েছে নিজের রুমের দিকে।

————

হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে সুবহা। রিপোর্টে খারাপ কিছু আসেনি দেখে নিশ্চিত হয়েছে কিরণ। এতক্ষণে খেয়াল করল, ফোনটা ও রুমেই ফেলে এসেছে। মিহি হয়তো সব জানিয়ে দিয়েছে অরণ্যকে। ভয়ে হা-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে ওর অরণ্যের চোখের সামনে পড়লে কাঁচা গিলে খাবে ওকে। কিয়ানকে মিহি পাঠিয়েছে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ আনতে। কিরণ আর ওর আম্মু গিয়ে বসেছেন সুবহার পাশে। জাহানারা সুলতানা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন বউমার। চিন্তায় এতোক্ষন গলা দিয়ে পানি নামেনি ওনার।বাচ্চাটা সুস্থ আছে জেনে ভয় কমেছে কিছুটা। ঠিক তখনই কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে অরণ্য। ভাইকে দেখা মাত্রই সুবহার পাশ থেকে উঠে গিয়ে মায়ের পেছনে দাঁড়িয়েছে কিরণ। অরণ্যের আম্মুও উঠে দাঁড়িয়েছেন তখন। অরণ্য সুবহার পাশে গিয়ে বসেছে। কিরণের দিকে তাকাতেই ভয়ে ও বেরিয়ে গেছে, মাকে সঙ্গে নিয়ে।

মিহি এসে চোখের ইশারায় বুঝিয়েছে অরণ্যকে চিন্তা না করতে। অরণ্যও মিহির সাথে কথা বলেছে। সুবহা আর ওর বেবি ঠিকঠাক আছে বুঝতে পেরে শান্ত হলো কিছুটা। মিহি বেরিয়ে যেতেই সুবহা আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকিয়েছে। চোখের সামনে অরণ্যের রাগান্বিত চেহারাটা ভেসে উঠেছে ওর। প্রথমে ভাবল স্বপ্ন দেখছে নিজের হাত ছুঁয়ালো অরণ্যের মুখে৷ অরণ্য এক ঝটকায় সুবহার হাতটা নামিয়ে দিয়েছে সুবহা কেঁপে উঠেছে এ দেখে। বুঝল অরণ্য সত্যি সত্যিই বসে আছে ওর পাশে। অরণ্যের রাগ হচ্ছে অকারণেই বারবার বলার পরও সুবহা থেকে গেলো কেন? তার কথা শুনেনি বলেই এতোকিছু হলো।

' তোমার পাকনামির জন্য আমার বেবির কিছু হলে কি করতে?'

মিনমিনে কন্ঠে জবাব দিল সুবহা —--

' কিছু তো হয়নি।'

' কেয়ারলেস কোথাকার! কিছু হবে বলে অপেক্ষা করছিলে তুমি?'

কানের কাছে এতো জুড়ে কথা বলে ওঠায় ভয় পেলো সুব মহা। কিছু না বলে চুপ করেই রইলো সে। কিন্তু অরণ্য কথা বলা থামছে না এটা সেটা কত কী বলে যাচ্ছে সুবহাকে। সুবহার ভালো লাগছে না অরণ্যের এতো কথা। কী বলছে এসব? ও কি নিজে চাইবে বাচ্চার ক্ষতি করতে! সুবহা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে অন্যদিকে। অরণ্য এখনও যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছে। সহ্যের সীমা পেরিয়েছে তার, অরণ্যের কথার উত্তরে মেজাজ দেখিয়ে বলে উঠেছে সুবহাও—--

' এভাবে কেন বলছেন? বেবি তো আমারও।'

' তাহলে কষ্ট দিলে কেন ওকে?'

' ইচ্ছে করে দিইনি।'

' তা তো বুঝতেই পারছি।'

' কি বুঝলেন?'

অরণ্যের প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। কথার উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, চলে যাবে বলে। আবারও ফিরে তাকিয়ে বলেছে সুবহাকে—--

' আজকের পর রুম থেকে পা বের করলে পা দুটো কেটে রেখে দিব তোমার।'

সুবহা উঠে বসেছে ততোসময়ে। সেও একইভাবে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলছে অরণ্যকে—--

' আপনি যা বলবেন সেটাই হবে?'

' ইয়েস, আমি যা বলবো সেটাই হবে।'

সুবহা ওর হাতের ক্যানুলাটা খুলে ফেলেছে টান দিয়ে।রক্ত বের হচ্ছে জায়গাটা দিয়ে। অরণ্যের কথার উত্তরে আবারও কিছু বলতে যাবে, তখনই অরণ্য থামিয়ে দিয়েছে ওকে। এবারে আরও জুড়ে চিৎকারের স্বরে বলে উঠেছে সুবহাকে—--

' এত তর্ক করছ কেন? তুমি এখন আর একা নেই বুঝতে পারছ না এটা? তোমার মধ্যে আমার বাচ্চা বেড়ে উঠছে। তোমার এই কামখেয়ালিপনার জন্য ওর কিছু হলে আমি তোমাকে ছাড়ব না, বিশ্বাস করো।'

বিজ্ঞাপন

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মিহি আর অরণ্যের আম্মুর কানে গেছে অরণ্যের চিৎকার। আবারও কোনো অঘটন ঘটেছে বুঝতে পেরে দৌড়ে এসেছেন ওনারা।বেডে বসে থাকা সুবহার দিকে তাকাতেই বুকের ভিতরটা ছ্যাত করে উঠেছে জাহানারা সুলতানার। মেয়েটার সুন্দর মুখটা কেমন শুকনো হয়ে গেছে,অন্ধকার নেমে সেন। আজকের ঘটনাটা নিয়ে হয়তো চিন্তা করছে। এদিকে অরণ্য রেগে তাকিয়ে আছে সুবহার দিকে মনে হচ্ছে চোখের চাহনিতেই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিবে ওকে। মিহি একবার সুবহার দিকে তাকিয়ে আবার অরণ্যের দিকে তাকালো। ওর রাগান্বিত চেহারা দেখে ঠাহর করল কী হয়েছে। ঝামেলা হবে, তাই অরণ্যকে বুঝিয়ে সুজিয়ে নিয়ে গেল কেবিন থেকে।

অরণ্য বেরিয়ে যেতেই কিরণ আবারও এসেছে সুবহার কাছে। সুবহার মনে পড়ল তখনকার ঘটনা। কিরণ যে আনহাকে ওভাবে রাগ দেখিয়েছিল, চোখে পড়েছিল সুবহার। কিন্তু পরের কথাগুলো কানে আসেনি ওর। সবাই কি আজকের ঘটনার জন্য আনহাকেই দোষারোপ করছে? কিরণ হয়তো সুবহাকে কিছু বলতে চাইছিল। কিরণকে থামিয়ে দিয়ে বলেছে সুবহা—--

' আপুকে ওভাবে বললি কেন কিরণ? ওর কোনো দোষ নেই, আমি নিজেই পড়ে গেছিলাম ওভাবে।'

' এত ভালো সাজতে হবে না তোকে। ওই আনহা আপুই যে তোকে ফেলেছে, আমি ভালো করেই জানি।'

' ভুল জানিস তুই।'

' আমি ওখানে ছিলাম সুবহা।'

' তুই ভুল দেখেছিস কিরণ। আনহা আপু আর আগের মতো নেই।'

কিরণ আর কথা বাড়াল না। চুপ করেই রইলো সে। আনহাকে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না কিরণ। আবার সুবহার কথাও মিথ্যা নয়, ও নিজেই তো দেখছে আনহাকে এতদিন ধরে।

বেশ কিছুক্ষণ পরে কিয়ান আর ওর আম্মু এসেছেন সুবহাকে দেখতে।অপেক্ষা করছিলেন বাইরে দাঁড়িয়েই। কিয়ান আবারও বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইলো সুবহাকে। দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠেছে তখন অরণ্য—--

' ওই বাড়িতে আর যাওয়া হবে না।'

কিয়ানের রাগ হলো অরণ্যের এমন কথায়। সেও বলল—--

' আমার বোনকে আমি যেখানে ইচ্ছে সেখানেই নিয়ে যাব।'

অরণ্য এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে কিয়ানের সামনে।

' আমার বউকে আমি কোথাও যেতে দিব না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে কিরণকে নিয়ে যাব সাথে করে। বউহীনা জীবন কাটাতে ভালো লাগবে? '

কিয়ান দাঁত কিড়মিড় করে বলছে অরণ্যকে—--

' আমাকে চিনিস তুই?'

অরণ্য কি যেন ভেবে হাসল কিরণকে ডেকে বলল—--

' কিরণ, তোর বর তার পরিচয় জানে না। বাংলা সিনেমার মতো গাছের সাথে ধাক্কা লেগে মেমোরি লস হয়েছে হয়তো। পরিচয়টা জানিয়ে দিস।'

কিরণ আর উপস্থিত বাকিরা হাঁ করে তাকিয়েছেন কিয়ানের দিকে। কিয়ান বেচারা থমথম খেয়ে গেছে, কথাটা বলেও ভুল করেছে মনে হচ্ছে এখন। বিড়বিড় করে বলছে অরণ্যকে—' শালা ডাকাত।' মনে মনে অরণ্যকে আরও কিছু বকাঝকা দিয়েছে কিয়ান।

অরণ্য কিছু না বলেই সুবহাকে গিয়ে কোলে তুলে নিয়েছে, বেরিয়ে গেছে হাসপাতাল থেকে। পিছু পিছু গিয়েছেন বাকিরাও।

সুবহা পুরোটা সময় চুপ করেই ছিল, কথা বলেনি একটাও। অরণ্যের ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছে সে। বাচ্চাটা আসবে বলেই কি অরণ্য সুবহাকে এতটা যত্ন করে? ওর প্রতি আলাদা কোনো ভালোবাসা নেই অরণ্যের? থাকলে আজকে এতগুলো কথা শোনাল কীভাবে সুবহাকে? অরণ্য একবার তাকালো সুবহার দিকে, কিছু না বলেই গাড়িতে তুলল ওকে।

————

নানা ঝড়ঝাপ্টা আর চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে দিয়ে কেটে গেছে আরও তিনটি মাস। বিছানায় শুয়ে আছে সুবহা, বাচ্চার নড়াচড়া বুঝতে উপলব্ধি করতে পারে এখন। মাঝেমধ্যেই পেটে হাত দিয়ে হেসে ওঠে ও। বাচ্চাটা আজকাল বড্ড জ্বালাতন করে সুবহাকে। অরণ্য তখন ওর বিরক্তিমাখা মুখশ্রীটা লক্ষ্য করে হেসে বলে সুবহাকে—--' আমার ডিএনএ তো আমার মতোই হবে, তাই না?'

সুবহাও তখন মনে মনে হাসে অরণ্যের কথা শুনে।

আজকে সকাল হতেই বাড়িতে মেহমানদের আনাগোনা চলছে। মিহি আর আদ্রীশের আংটিবদল হবে আজকে। দুজনেই দুজনকে পছন্দ করে, কিন্তু জেদ করে কথা বলে না কেউ কারো সাথে। বিষয়টা অরণ্য লক্ষ্য করেছে আগেই। কথা বলেছে দুই বাড়ির মানুষের সাথে, কেউই আপত্তি করেননি বিষয়টিতে। সারপ্রাইজ দিবে বলে নিজের বাড়িতেই আয়োজন করেছে সবটার। অরণ্যের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই ভিতরে সোফায় বসে থাকা আদ্রীশ আর মিহিকে দেখল আনহা। দুজনেরই বাড়ির মানুষজন উপস্থিত সেখানে। প্ল্যানটা ছিলো অরণ্যেই আদ্রীশ আর মিহি দুজনকেই নিয়ে এসেছে মিথ্যা বলে। আদ্রীশ, মিহি দুজনেই এসে নিজেদের বাড়ির লোকজনকে এখানে দেখে অবাক হয়েছিল। পরে বুঝল সবকিছু করেছে অরণ্য। এতো আয়োজন আর সবার মুখে লেগে থাকা হাসিটা লক্ষ্য করল আনহা, অজান্তেই মন খারাপ হলো তার।

আজকে কেন আদ্রীশকে অন্য কারো পাশে দেখে কষ্ট হচ্ছে ওর? আনহা তো কোনো কালেই আদ্রীশকে পছন্দ করতো না। আনহার বুকটা ভার হয়ে এসেছে, চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা লাগছে। চলে যাবে তখনই চোখ পড়ল অরণ্য আর সুবহার দিকে দুজনেই দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি। সুবহার পরনে একটা নীল রঙের জামদানী শাড়ি, অনেকটা পরিবর্তন এসেছে ওর মধ্যে। এই পরিবর্তনের কারণটা সুবহার মা হওয়ার। ভালো লাগছে ওর হাসিমাখা মুখটা দেখে। সুবহার থেকে চোখ সরিয়ে অরণ্যের পানে তাকালো আনহা। কেমন মায়াভরা চোখে সে তাকিয়ে আছে সুবহার দিকে, সবার নজর অরণ্যের দিকে আর ওর নজর সুবহার দিকে। না চাইতেও আনহার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল, সারাজীবন অরণ্যের থেকে এই এটেনশনটাই তো পেতে চেয়েছে সে। আজকে আর সুবহাকে হিংসা করবে না আনহা। বরাবরই তো সুবহাকে হিংসা করে আসল, কি পেয়েছে এতো কিছু করে? আফসোস হচ্ছে আজকে, না জেনে না বুঝে মরিচিকার পিছে দৌড়েছে সে এতদিন।আনহা একবার পুরো বাড়িটাতে চোখ বুলালো, অপেক্ষা না করে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। সুবহা মাত্রই তাকিয়েছিল দরজার দিকে। আনহাকে স্পষ্টই দেখতে পেয়েছে সে। কাউকে কিছু না বলে সুবহাও পিছু নিয়েছে আনহার। কিছুদূর গিয়েই দেখতে পেলো বোনকে। সুবহা ডাকছে বার বার আনহাকে, কিন্তু আনহার কান পর্যন্ত যাচ্ছেনা ওর ডাক। সুবহা দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে আনহার। চোখ বন্ধ করে বড় বড় শ্বাস ফেলে তাকিয়েছে আনহার দিকে। আহনা উদ্বিগ্ন হয়ে বলছে বোনকে।

' এভাবে দৌড়াচ্ছিস কেন? '

' চলে যাচ্ছিস কেন আপু?'

' তোকে দেখতে এসেছিলাম, দেখা শেষ তাই চলে যাচ্ছি।'

সুবহা হুট করেই আনহার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো বাড়ির দিকে, আনহা ওকে থামিয়েছে কত কিছু বলে। গার্ডেনের দিকে গিয়ে ওখানে পাতানো লম্বা বেঞ্চটায় বসেছে দুজনে। আনহা ভালো করে দেখল সুবহাকে, ওর মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে ও মা হতে চলেছে। আনহা হাসল কিছু একটা ভেবে, সুবহার পেটে হাত রেখে বলল ওকে—--

' বেবির নাম কি রাখবি?'

সুবহা কিছুক্ষণ ভেবে বলল আনহাকে—--

' ঠিক করিনি তো।'

' রাজকন্যা আসলে অদ্রিজা রাখবি, অরণ্যের নামের সাথে মানাবে ভালো।'

সুবহার মুখের হাসি সরে গেছে মুহূর্তেই। ও যদি আনহা আর অরণ্যের মধ্যে না আসত তাহলে হয়তো আজকের দিনটা আসত না। অরণ্যের পাশে সুবহার বদলে আনহাই থাকত। আনহার এই অবস্থা দেখলে মাঝেমধ্যে নিজেকেও অপরাধী মনে হয় সুবহার। মানছে, আনহা অনেক ভুল করেছে, আগে তাদের সম্পর্কটা ভালো ছিল না। কিন্তু আগের আনহার সাথে এই আনহার কোনো মিল নেই সে বদলে গেছে পুরোপুরি। আনহাও তো একটা সুন্দর জীবন ডিজার্ভ করে! সুবহা মুখে হাসি টেনে জড়িয়ে ধরল আনহাকে। বলল ওকে—--

'বেবি আগে আসুক, নামটা না হয় ওর খালামুনিই রাখবে।'

আনহা হাসল সুবহার কথা শুনে, আনহাকে কতো কিছু বলে বুঝিয়ে ভিতরে নিয়ে যেতে চাইলো সুবহা, কিন্তু আনহা জেদ ধরেছে সে এখান থেকেই ফিরে যাবে আজকে।

অরণ্য সুবহাকে খুঁজতে খুঁজতে গার্ডেনের দিকে এসেছে। সুবহা অরণ্যকে দেখা মাত্রই পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ওর। অরণ্য লক্ষ্য করল সুবহাকে ওর মাথার খোলা চুলগুলো বিরক্ত করছে খুব। সুবহার চোখেমুখে আসা চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিলো অরণ্য, চুমু দিল ওর কপালে।

আনহা ওখানে বসেই দেখে যাচ্ছে সুবহা-অরণ্যকে। মনে মনে খুশি হচ্ছে এই ভেবে ওরা ভালো আছে। এবার আর সুবহা-অরণ্যকে পাশাপাশি দেখে রাগ লাগেনি আনহার, বরং ভালো লেগেছে ওর। সবশেষে আনহা এটাই চায় সুবহা আর অরণ্য ভালো থাকুক ওদের জীবনে। এতো সময় পর অরণ্য খেয়াল করল, আনহাকে সেদিনের ঘটনার জন্য অরণ্য সরি বলেছিলো ওকে। বুঝতে পেরেছিল নিজের ভুল। আনহা পালটে গেছে বিষয়টা লক্ষ্য করেছে অরণ্য নিজেও। আজকে আদ্রীশ-মিহির বিয়ে। আনহা যদি বুঝত আদ্রীশকে, মিহির জায়গায় হয়তো ও নিজেই থাকত। কিন্তু পরক্ষনেই আবার ভাবনায় এল অরণ্যের সে যেমন কোনো কালেই আনহাকে বন্ধু ব্যতীত অন্য কোনো নজরে দেখেনি, আনহাও একই ভাবে আদ্রীশকে নিজের বন্ধু ছাড়া অন্য কিছু ভাবেনি। সুবহাকে ভিতরে পাঠিয়ে দিয়েছে অরণ্য, কথা দিয়েছে আনহাকে নিয়ে আসবে। সুবহা অরণ্যের কথা শুনে চলে গেছে সেখান থেকে।

আনহা এসে দাঁড়িয়েছে অরণ্যের সামনে, অনেকদিন পরে আজকে আবার কথা বলেছে দুজনে। পুরোনো সব মান-অভিমান দূরে ঠেলে দিয়েছে তারা। আগের আনহাকে মিস করে অরণ্য। সেও চায়, আনহা ভালো থাকুক ওর জীবনে।অরণ্য ওকে নতুন করে নিজের জীবন সাজাতে বলল। অরণ্যের সব কথার উত্তরে একটাই কথা বলল আনহা—--' যার যাকে মনে ধরে, সে ছাড়া আর কাউকেই ভালো লাগেনা অরণ্য।'

অরণ্য কথা না বলে তাকিয়ে আছে আনহার দিকে। কি বুঝাল আনহা ওর কথা দিয়ে? অরণ্যের এমন চাহনি দেখে আনহা হেসে বলল তাকে—--

' ভয় নেই, তোদের মধ্যে আমি আর কখনোই আসব না। তুই আমার বন্ধু আর বোনের হাজবেন্ড হয়েই থাকবি।'

কথাটা বলেই চলে গেলো আনহা। বাড়ির গাড়িটা নিয়ে এসেছে, সাথে করে ড্রাইভারকে বলে দিয়েছে সে একাই বাড়ি ফিরবে। ড্রাইভারও চলে গেছে আনহার কথা শুনে। অরণ্য এখনও আগের জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছে, তাকিয়ে আছে আনহার যাওয়ার পানে। আনহার কথাগুলো শুনে ওর মাথায় কি চলছে বুঝা মুশকিল। তবে নতুন করে আর কোনো অঘটন ঘটাবে না এই ব্যাপারে নিশ্চিন্ত অরণ্য।

বিজ্ঞাপন
অন্তরালের প্রণয়িনী গল্পটি আফরোজা আঁখি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক রোমান্টিক গল্প