কথার মাঝখানে হুট করেই অরণ্য সুবহার হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে তাকে নিজের রুমে নিয়ে যায়। সুবহাকে ধাক্কা দিয়ে একপ্রকার ছুড়ে ফেলে। অসাবধানতায় বেডসাইড টেবিলে থাকা কাচের গ্লাসটা ভেঙে পড়ে যায় মেঝেতে, সাথে সাথে ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে যায় কাচের গ্লাসটা। এত জোরে ধাক্কা দেওয়ায় টাল সামলাতে না পেরে সুবহাও সেখানে পড়ে যায়। কাচের টুকরো হাতে ঢুকে মেহেদি রাঙা হাতটা মুহূর্তেই রক্তে লাল হয়ে গেছে। অরণ্য খেয়াল করল না সেদিকে, দরজাটা গিয়ে শব্দ করে বন্ধ করে দিয়েছে। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কিরণ সহ বাকিরা এত জোরে দরজা লাগানোর আওয়াজ শুনে তাকিয়েছে অরণ্যের রুমের দিকে। খারাপ কিছু হতে চলেছে, বুঝতে বাকি নেই কিরণের। তখন সে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে, যখন ঝামেলা হলো অরণ্য আর সুবহার মধ্যে। ভাইকে সে আটকাতে পারবে না, জানে ভালো করেই, উল্টো সব রাগ তার উপরেই ঝাড়বে অরণ্য। সেজন্য চুপ করে গিয়েছিল সবটা দেখেও। ভেবেছে, সুবহা যথেষ্ট স্ট্রং তার ভাইয়ের থেকে কম রাগী নয় সে। সামলে নেবে সবটা সুবহা নিজেই। সুবহার বাড়ির সবাই চলে গেছে অনেক আগেই। যাওয়ার আগে কিয়ান বারবার করে বলে দিয়েছে তাকে, যতদিন কিরণ আছে এখানে, সে যেন দেখে রাখে সুবহাকে। কোনো বিপদ যেন না হয় তার বোনের সেই কথাটাই মাথায় আসলো কিরণের। চিন্তিত হলো সে! যেতে চাইলে জাহানারা সুলতানা হাত ধরে আটকে দেন মেয়েকে। মায়ের রাগী চাহনি দেখে কিরণের আর সাহস হয়নি যাওয়ার।
———
কেটে যাওয়া হাতটা অন্য হাত দিয়ে চেপে রক্ত আটকানোর চেষ্টা করছে সুবহা। মাথায় তার আগুন জ্বলছে রাগে। কিছুক্ষণ আগের অরণ্যের সাথে এই অরণ্যের মিল খুঁজে পাচ্ছে না সে। কেউ বারবার কল দিচ্ছে অরণ্যের ফোনে। বিরক্ত হয়ে অরণ্য উঠে চলে গেল তখন। যাওয়ার সময় দরজাটা লক করে গিয়েছে, যাতে সুবহা কোনোভাবে বেরুতে না পারে রুম থেকে। অরণ্য চলে যাওয়ার সাথে সাথে সুবহাও উঠে গিয়েছে। ভাবলো, আজকেই চলে যাবে এখান থেকে এই অসুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের সাথে থাকবে না সে।
কিন্তু দরজা আটকানো দেখে হতাশ হলো সুবহা। রাগে কান্না আসছে তার। কাটা হাত থেকে রক্ত পড়ে যাচ্ছে এখনো, কিন্তু খেয়াল নেই সুবহার সেদিকে। আবারও অরণ্য ভেঙে দিয়েছে তার মনটা। একদিন না যেতেই দেখিয়ে দিয়েছে নিজের আসল রূপ। এই বাড়িতে থাকবে না সে, যেভাবেই হোক চলে যাবে এখান থেকে। বিছানায় শুয়ে এসব ভাবতে ভাবতে কবে যে ঘুমিয়ে পড়েছে, খেয়াল নেই তার সেদিকে।
রাত হয়েছে অনেক আগেই। এরই মধ্যে ড্রয়ারে রাখা সুবহার ফোনটাতে বেশ কয়েকবার কল এসেছে, তবে কানে আসেনি তার। কিরণ এসে ডেকেছে কয়েকবার, কিন্তু প্রতিউত্তর না পেয়ে ফিরে গেছে আবারও। ভেবেছে, সুবহা অরণ্যের সাথেই আছে। দরজা বাইরে থেকে আটকানো এই জিনিসটি চোখে পড়েনি তার। সুবহা বেশ কয়েকবার উঠে গিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করেছে ব্যার্থ হয়ে প্রতিবারই ফিরে এসেছে সে।
———
খাটের সাথে মাথা ঠেকিয়ে বসে মেঝেতে বসে থাকা সুবহার কেটে যাওয়া হাতটাতে মেডিসিন লাগিয়ে দিচ্ছে অরণ্য। তীব্র জ্বলুনি অনুভব হওয়ার চোখ খুলে তাকিয়েছে সুবহা। কথা বলার শক্তিটুকুও পাচ্ছে না সে, ব্যথায় হাত নাড়াতে পারছে না পর্যন্ত। জেদ করে নিজেও মেডিসিন নেয়নি, রেখে দিয়েছে ওভাবেই। অরণ্য তাকে ছুঁয়েছে ভাবতেই রাগে লাল হয়ে গেল সুবহার চোখ-মুখ। হুট করেই হাতটাকে ছাড়িয়ে নিয়েছে অরণ্যের থেকে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলছে —--
‘ আপনার ওই হাত দিয়ে ছুঁবেননা আমাকে।’
অরণ্যের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি খেলে গেলো। হাত টেনে একপ্রকার জোড় করেই বিছানায় তুললো সুবহাকে। হাতে মেডিসিন লাগিয়ে বেন্ডেজ করে দিলো। হাতে চুমু দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল সুবহাকে।
“ লাভবার্ড, রাগ করেছ তুমি?”
অরণ্যের কথার উত্তরে বলে উঠলো সুবহা —--
“ বললাম না আমার থেকে দূরে থাকতে?"
হাসলো অরণ্য, বিছানায় পড়ে থাকা সুবহার ঠোঁটে স্লাইড করে কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললো অরণ্য।
“ লাভবার্ড, পুরো তুমিটাই তো আমার! আমি তোমাকে স্পর্শ করবো, এমনভাবে তোমাকে আমার মাঝে বিলীন করবো যা তুমি আগে কখনো অনুভব করোনি।”
সুবহা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে সাথে সাথে। অরণ্য তার গাল টেনে আবারও ঘুরালো নিজের দিকে ঠোঁট কামড়ে হাসল সে সুবহার দিকে কিছুটা ঝুকে বলছে অরণ্য।
“ আদর খাবে? সব রাগ গলে পানি হয়ে যাবে মুহূর্তেই।”
অরণ্যের এমন কথায় কিছুটা লজ্জা পেলো সুবহা অরণ্যে বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠলো সে।
“ নির্লজ্জ লোক। ”
সুবহা বার বার নিজের থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে অরণ্যকে না পেরে সে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বিরক্ত হয়ে। অরণ্য দ্রুত সুবহার গাল টেনে নিজের দিকে ঘুরালো।প্রেয়সীর গোলাপসম ঠোঁটগুলো খুব করে টানছে তাকে। বার বার ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। দেরি কিসের?সুবহাতো তারই! বেশি কিছু না ভেবে সুবহার লালচে ঠোঁটজোড়া আঁকড়ে ধরেছে অরণ্য। মিনিট কয়েক পরে ছেড়ে দিলো তাকে। অরণ্যের ঠোঁটের কোণে হাসি।এদিকে ওর এমন কাজে বেজায় বিরক্ত সুবহা। রেগে গিয়ে অরণ্যের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠেছে তখনই।
“ কি করলেন এটা?”
অরণ্য সেই আগের মতোই হাসছে আর বলছে৷
“বলেছিলাম না, এই গ্লসি লিপস্টিক আমি আজকে টেস্ট করব! সেটাই করলাম।”
সুবহা রেগে কিছু বলতে যাচ্ছিল তখন, কিন্তু সুবহাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অরণ্য তার ঠোঁটজোড়া আঁকড়ে ধরেছে শক্ত করে। অরণ্যের এভাবে হুটহাট গায়ে হাত দেওয়ার বিষয়টা বিরক্ত লাগছে সুবহার। হাত দিয়ে খুঁজে বেডসাইড টেবিলে রাখা ছোট ফুলদানিটা হাতে তুলে নিয়েছে। প্রচণ্ড রাগে অরণ্যের মাথায় মারতে গেলে চতুর অরণ্য ধরে ফেলে সুবহার হাত। মুখ তুলে নিজের রক্তলাল চোখগুলো নিয়ে তাকায় সুবহার দিকে। সুবহা আঁতকে উঠেছে অরণ্যের এমন চাহনি দেখে, ভয় পেয়ে গেছে সে। অরণ্যকে এখন ঠিক আগের মতোই হিংস্র লাগছে। এই অরণ্যকে বড্ড অচেনা লাগে তার। অরণ্য সুবহার হাত থেকে ফুলদানিটা কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলেছে ওটা। হাত দুটো বেডের বোর্ডের সাথে চেপে ধরেছে অরণ্য। হাতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হচ্ছে সুবহার। অন্য হাত দিয়ে সুবহার চোয়াল চেপে ধরে রাগমিশ্রিত কণ্ঠে বলছে অরণ্য।
“আমাকে মেরে বিধবা হবার এত শখ তোমার?”
“লাগছে আমার, ছাড়ুন।”
“আমারও লাগছে—এই যে এখানটায়, দেখতে পাও না তুমি?”
অরণ্য তার বুকের বাম দিকে হাত দেখিয়ে বলছে কথাগুলো সুবহাকে। প্রচণ্ড রাগে অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে সুবহা। হাতের ব্যথায় এই মুহূর্তে কান্না করতে ইচ্ছে করছে তার। এক তো এতটা জায়গা কেটে গেছে, আরেকদিকে অরণ্য অমানুষের মতো ব্যবহার করছে তার সাথে। এই ছিলো অরণ্যের মনে? বিয়েটা কি তাহলে সুবহাকে কষ্ট দিতেই করেছে সে? নিজের ভাগ্যের প্রতি নিজেরই হাসি পেলো সুবহার। অরণ্যের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল সে—--
“নাটক করেছেন আমার সাথে, তাই না?”
অরণ্য বাঁকা হেসে বলল—--
“তুমি কি কম নাটক করেছ আমার সাথে?”
“কি করেছি আমি?”
সুবহার প্রশ্ন শুনে পুরোনো রাগটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল আবারও অরণ্যের। তখনই চোখ গেলো সুবহার ফর্সা উদরের দিকে। রাগ উড়ে গিয়েছে কোথায় যেন। শাড়িটা পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে,পেটের উপর থেকে সরে গেছে অনেকটা। অরণ্যের কি যেন হলো, পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। নিজের ঠান্ডা হাতটা এনে রাখলো সুবহার পেটে। সাথে সাথে কেঁপে উঠলো সুবহা, চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো তখনই—--
“ছুঁবেন না আমাকে।”
অরণ্য এবার বাঁকা হাসলো। হাতগুলো ছেড়ে দিয়ে শাড়ির আঁচল সরিয়ে চুমু এঁকে দিলো সুবহার ফর্সা উদরে। পুরো শরীরটা কেমন অবশ হয়ে এলো সুবহার। অরণ্যকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলো নিজের থেকে। অরণ্য এবার রেগে কামড় বসিয়ে দিলো সেখানে। সাথে সাথে ব্যথায় চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো সুবহা। অরণ্য মুখ তুলে তাকালো। সুবহার ফর্সা পেটের লালচে দাগটাতে চোখ বুলালো সে। আদর করে নিজের ঠোঁটের স্পর্শ দিলো সুবহার ব্যথা পাওয়া জায়গাটাতে। অরণ্য মুখ তুলে চাইলো সুবহার দিকে। তার বন্ধ করা দুই চোখের পাতায় চুমু দিলো গিয়ে। অরণ্যের কেমন পাগল পাগল লাগছে। সুবহাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করছে তার। সব দূরত্ব গুছিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে আজ। চেয়েও নিজেকে আটকাতে পারছে না অরণ্য। এক এক করে শার্টের বোতাম খুলছে অরণ্য। দেখে সুবহার বুঝতে বাকি নেই, অরণ্য কী চাইছে এখন। মাথা নাড়িয়ে বারবার কাছে আসতে বারণ করছে তাকে। অরণ্যের হুঁশ-জ্ঞান হারিয়েছে সব, তার এই মুহূর্তে সুবহাকে চাই! পুরোপুরি ভাবে নিজের করে চাই। অরণ্য ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। সুবহার ঠোঁটে আলতো করে চুমু দিয়ে নেশালো কণ্ঠে বলছে—--
“লাভবার্ড, আজকের দিনটা আমার হয়ে যাও প্লিজ। কথা দিচ্ছি, আর জ্বালাবো না তোমাকে।”
সুবহার কি যেন হলো, কথা বের হচ্ছে না তার মুখ দিয়ে। কিন্তু সে চাইছে না এখনই এসব। নিজের হাতটা তুলে অরণ্যের বুক ঠেলে, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল—--
“না প্লিজ! সময় লাগবে আমার।”
ভ্রু কুঁচকালো অরণ্য। আবারও সুবহার হাত দুটো ধরে বোর্ডের সাথে চেপে ধরল। রাগমিশ্রিত কণ্ঠে বলল—--
“কিসের জন্য সময় চাই তোমার? কেন আমার কাছে আসতে চাইছ না তুমি? রাইয়ানকে এত ভালো লেগে গেছে যে তার জায়গায় আমাকে বসাতে পারছ না? তোমার ওই রাইয়ানকে আমি মেরে ফেলব, লাভবার্ড, বিশ্বাস করো।”
শেষের কথাটা বলার সময় অরণ্যের চোখ-মুখে ফুটে ওঠা ক্রোধ লক্ষ্য করেছে সুবহা। এই অরণ্যকে অচেনা লাগছে তার। ঘেন্না হচ্ছে এই কথাগুলো শুনে। দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠেছে সুবহা—
“আপনার ছোঁয়া আমার বিষের মতো লাগছে। বিরক্ত লাগছে আমার! এই হাত দিয়ে ছুঁবেন না আমাকে।”
অরণ্য হাসল। এগিয়ে গেলো সুবহার দিকে। গালের সাথে গাল ঘষে বলল তাকে—--
“এই বিষে ক্ষতি হবে না কিছুই। হলেও আমি ওঝা হয়ে বিষ ঝেড়ে দেব নাহয়। তবুও বাধা দিও না আমাকে, আই কান্ট কন্ট্রোল মাই'সেলফ লাভবার্ড। আমার হয়ে যাও আজকে!”
[ রোমান্টিক পছন্দ না হলে এই জায়গাটুকু কেবল স্কিপ করুন।]
সুবহার ভারী বিরক্ত হচ্ছে অরণ্যের কাজে রেগে কিছু বলতে গেলে অরণ্য তার ঠোঁট জোড়া দখল করে নিলো তখনই। কিচ্ছুক্ষণ পরেই ঠোঁট ছেড়ে গলায় মুখ ডোবালো তার। জুড়ে জুড়ে শ্বাস ফেলছে সুবহা অরণ্য এবার নিজের ঠোঁটের ভিজে চুমুতে ভরিয়ে দিলো তার গাল,মুখ। ঠোঁটে আলতো করে চুমু দিয়ে কানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল — “ ইউ লাইক ইট অর নট, মাই লিপস উইল টাচ এভরি ইঞ্চ অফ ইয়োর বডি। এবার থেকে অভ্যাস করে নাও লাভবার্ড প্রতিদিন এমন হবে।” কথাটা শুনে সুবহার রাগ, লজ্জা,অভিমান সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল যেন। মুখ সরিয়ে নিলো অন্যদিকে।অরণ্য তার শাড়ির কুচিতে হাত দিতেই চোখ বন্ধ করে নিয়েছে সুবহা। অরণ্য তাকিয়ে হাসল তার লজ্জা পাওয়া মুখটির দিকে৷ অরণ্যের ঠোঁটের গভীর স্পর্শে বার বার কেঁপে উঠছে সে পুরো শরীরটা অবশ হয়ে এসেছে এবার। অরণ্যকে বাধা দিয়েও কাজ হবেনা বুঝতে পেরে একসময় নিজেকেও ছেড়ে দিয়েছে অরণ্যের হাতে। উপরে উপরে রাগ দেখালেও তার মন হয়তো চাইছে অরণ্যকে কাছে পেতে। অরণ্যের উন্মাদনা বাড়ছে সুবহার বড় বড় নখের আচড় পড়েছে তার পুরো পিঠ জুড়ে। একসময় নিজের নিস্তেজ শরীরটা সে ছেড়ে দিয়েছে বিছানায়। সুবহার পুরো শরীর জুড়ে রাজত্ব চলছে অরণ্যের। সুবহাও কেমন বশীভুত মন্ত্রের ন্যায় সায় জানাচ্ছে অরণ্যের ভালোবাসার ডাকে। ভালোবাসাময় সুখের যন্ত্রণায় চোখ গড়িয়ে এক ফোটা পানি পড়লো তার। অরণ্যের চোখ পড়ল সেদিকে ঘন ঘন শ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো সুবহার দিকে চোখের পানি মুছে গাড় চুম্বন একেঁ দিলো ঠোঁটে। মুখ তুলে তাকাতেই, সুবহার আকুতিভরা চোখের চাহনি দেখতে পেলো অরণ্য। মুখের চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বলল তখন অরণ্য —“ সরি লাভবার্ড, সহ্য করে নাও আজকে আমাকে।” সুবহা চোখ বন্ধ করে নিলো সাথে সাথে। অরণ্যের হাতের অবাধ্য বিচরণ পাগল করে দিচ্ছে তাকে।অরণ্য পুরোপুরি মত্ত হয়ে আছে সুবহাতে। অন্য কোনো দিকে হুশ নেই তার। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে ঝড়ের তান্ডব চলছে প্রকৃতিকে আর এই নিস্তব্ধ বন্ধ রুমে চলছে দুই মানব মানবীর ঘন শ্বাস প্রশ্বাসের খেলা। আজকে সব রাগ অভিমান, অভিযোগ দূরে ঠেলে দিয়ে এক হতে ব্যাস্ত দুটি মন, দুটি ভালোবাসার মানুষ।
———
অরণ্য শুয়ে আছে সুবহার ছোট্ট বুকে মাথা রেখে, সুবহা ওদিকে ঘুমোচ্ছে বেঘোরে। চোখ মুখ জুড়ে ক্লান্তির চাপ, পুরোটা রাত ঘুমোতে দেয়নি অরণ্য তাকে। অরণ্য মুখ তুলে তাকালো সুবহার দিকে মনে পড়লো ভালোবাসাময় সুন্দর রাতটির কথা।ঠোঁটের কোণে তৃপ্তিময় হাসি ফুটে উঠলো তার। কিছুক্ষণ পরেই ভোর হবে একবারও ঘুমোয় নি সে,চোখ লেগেছিলো মাত্রই সুবহার নড়াচড়ায় ভেঙে গেছে আবারও। তাকে জাগিয়ে মহারানি ওদিকে নিশ্চিতে ঘুমাচ্ছেন। অরণ্য সুবহার পুরো মুখে হাত বুলিয়ে দিলো, আলতু করে চুমু খেলো তার ঠোঁটে। ঘুমন্ত সুবহাকে কোলে তুলে নিয়ে চলে গেলো ওয়াশরুমের দিকে৷
শরীরে পানি পড়তেই তীব্র জ্বলুনি অনুভব হলো সুবহার খামছে ধরলো অরণ্যের ফর্সা পিঠ। অরণ্য ব্যথা পেলো বটে! কিছু না বলে সুবহার মতোই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। ভিজে শরীরটা মুছিয়ে দিয়ে টাওয়াল জড়িয়ে আবারও কোলে তুলে নিয়ে গেলো তাকে।
———
একটা সুন্দর রাতের পর সকাল এসেছে। অন্ধকার কেটে গিয়ে আলো ফুটেছে চারিপাশে। সকাল হতেই ঘুম ভেঙে গেছে সুবহার। মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে তার। চোখ খুলতেই নিজেকে আবিষ্কার করল কারও প্রশস্ত বুকে। কেউ খুব যত্ন করে তার মাথাটা চেপে ধরে রেখেছে নিজের বুকে। পরম ভালোবাসায় আগলে নিয়েছে তাকে। আস্তে আস্তে মাথাটা তুলে তাকাল সুবহা। নজরে এলো অরণ্যের ঘুমন্ত মুখশ্রী। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সে। অরণ্যের চোখ-মুখ দেখে যেন বাচ্চাদের মতোই নিষ্পাপ লাগছে এখন। কে বলবে, এই অসভ্য, নির্লজ্জ লোকটা এত কষ্ট দিয়েছে সুবহাকে! জোর করে নিজের করে ছেড়েছে তাকে। সুবহার এখন ইচ্ছে করছে সজোরে ঘুষি মারতে অরণ্যের এই বুকে।
———
মিহি আর আদ্রীশ বসে আছে একটা ক্যাফেতে। মিহি যাচ্ছিল এই দিক দিয়েই, তখনই দেখেছে বসে থাকা আদ্রীশকে। কিছু না ভেবেই চলে এসেছে সে, আদ্রীশের সাথে কথা বলতে। আজকাল এই আদ্রীশকে বিরক্ত করতে খুব ভালো লাগে মিহির। শুধুই কি ভালো লাগে? না! সে পছন্দ করে এই ভদ্র, সভ্য, বোকাসোকা মানুষটাকে। কিন্তু এই ভালো লাগাটা কখনোই প্রকাশ করবে না। মিহি জানে, আনহাকে আদ্রীশ নিজের থেকেও বেশি পছন্দ করে। বন্ধু হয়েই না হোক, থাকবে তারা! আদ্রীশের ভালোবাসায় থাকুক আনহাই।
আদ্রীশ মিহিকে বিদায় জানিয়ে উঠে চলে গেছে। মিহি এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে তার যাওয়ার পানে। মনে মনে ভাবছে সে—
“কি অদ্ভুত, তাই না? যে যাকে ভালোবাসে, তাকে সে কখনোই পায় না। এই যে, আনহা নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসল অরণ্যকে, তাকে কি পেয়েছে? অরণ্য যেমন সুবহার জায়গাটাকে কাউকে দেয়নি, মিহিকেও আদ্রীশ আনহার জায়গাটা দেবে না—জানে সে ভালো করেই।”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মিহি। উঠে চলে যাবে সে, তখনই চোখে পড়ল টেবিলে রাখা আদ্রীশের পছন্দের ডায়েরিটা। মিহি কৌতূহলে ডায়েরির একটা পাতা উল্টালো। চোখ জোড়া আটকে গেল তার একটা লাইনে, সুন্দর করে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা সেখানে—--
❝ আমার অন্ধকার জীবনে একফালি রৌদ্দুর হয়ে কেউ একজন আসুক! সে থেকে গেলে আমিও তাকে রেখে দিব যুগ যুগ। ❞
মুচকি হাসল মিহি। বিড়বিড় করে বলল—-- “বাহ! সুন্দর তো।”
সেও পেন বের করে সেখানে লিখে দিল কিছু। আদ্রীশ কি ভাববে না ভাববে, কিছুই ভাবেনি মিহি তখন। মিহি উঠে দাঁড়িয়েছে, দ্রুত আদ্রীশকে ফোন দিয়ে দাঁড়াতে বলে সেও ছুটেছে সেদিকে, যেদিকে কিছুক্ষণ আগেই গেল আদ্রীশ। মিহি দৌড়ে এসে পেয়ে গেল আদ্রীশকে। ডায়েরিটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—--
“এসেছি।”
আদ্রীশ তার থেকে ডায়েরিটা নিয়ে নিজের গম্ভীর ভাব বজায় রেখেই বলল—--
“ভালো করেছিস।”
“রেখে দে আমাকে।”
“কিহহ!”
মিহি উপর-নিচ মাথা নাড়ালো। কী বোঝাতে চাইল, কিছুই বুঝল না আদ্রীশ। মিহির মাথায় গাট্টা মেরে বলল তখন—--
“পাগল হয়েছিস?”
“না,প্রেমে পড়েছি।”
“কার?”
মিহি কিছু বলল না তখন। অন্য দিকে তাকিয়ে জিভ কাটল নিজের। নিজেই নিজের মাথায় বারি মেরে মনে মনে নিজেকে বকাঝকা করল কিছুক্ষণ। কথা না বাড়িয়ে একটা হাসি দিয়ে চলে গেল সেখান থেকে। আদ্রীশ পুরোটা সময় বোকার মতো তাকিয়ে ছিল মিহির দিকে। কী বোঝাল মিহি? কী বলল এসব! আদ্রীশ হেঁটে যাচ্ছিল আবার নিজের বাসার উদ্দেশ্যে। তখনই মনে হলো ডায়েরিটা খুলে দেখবে। দেরি করল না আর। প্রথম পাতাটা উল্টাতেই তার লেখার ঠিক নিচে আরেকটা লেখা দেখল আদ্রীশ। পা জোড়া থেমে গেল আদ্রীশের। সুন্দর করে লিখেছে সেখানে কেউ—--
❝ আপনার অন্ধকার জীবন আলোকিত করতে একফালি রৌদ্দুর হয়ে আসলাম আমি। আপনি রেখে দিলে আমিও থেকে যেতে রাজি। রাখবেন তো আমাকে? ❞
আদ্রীশ অবাক হলো বটে। মনে প্রশ্ন জাগল তার— এগুলো লিখেছে কে? মিহি! মিহি কি কোনোভাবে পছন্দ করে তাকে? তখন নিজের কথা দিয়ে কী বোঝাতে চাইল—এটাই! দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আদ্রীশ। ভাবল, মিহি মজা করেছে তখন। মিহির সাথে এই জিনিসগুলো ভালোভাবেই যায়। আজ অবধি কোনো কিছুতেই সিরিয়াস হতে দেখেনি সে মিহিকে—এটাও মজাই ধরে নিয়েছে।আদ্রীশ কি আর জানে? মিহি তাকে ভালোবাসে। ঠিক যেভাবে আদ্রীশ চায় আনহাকে, মিহিও একইভাবে চায় তাকে।