- না না দেরি হবে না, আমি আসার সময় দেখে এসেছি মা রান্না করছেন, বাড়ি ফিরতে ফিরতে রান্না শেষ হয়ে যাবে।
- জুথি বললো, আপনার মায়ের রান্নার কথা কে বলছে? আমি তো আমার কথা বলছি। সকাল হতে মায়ের প্রেশার বেড়ে গেছে, সেই জন্যই আমি স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি এসেছি। এখন কেবল রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছি তাই রান্না শেষ করতে মেলা মেলা দেরি হবে। আপনি বরং আপনার স্যারের সঙ্গে শহরের গল্প করুন, বাবা তো এখন আর আগের মতো বাজারে যায় না। দেশের গল্প করার মতো কাউকে কাছে পায় না, মাঝে মাঝে আমাকে জোর করে বসিয়ে রাখে।
- তাই নাকি? আচ্ছা ঠিক আছে গল্প করবো তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু বাড়িতে মায়ের কাছে বলে আসিনি কিছু। দুপুরে ফিরতে দেরি হলে না খেয়ে বসে থাকবে, তাই আমাকে যেতে হবে।
- কোন দরকার নেই, কল দিয়ে বাবার কথা বলুন দেখবেন কিছু বলবে না।
আশরাফুল মাস্টার লক্ষ্য করলেন তার মেয়ে আজ কেমন ঝটপট কথা বলে। কথার মধ্যে কেমন যেন রসিকতা মিশ্রিত থাকছে, তার সামনে দাঁড়িয়ে জুথি এভাবে কারো সাথে কথা বলে না।
জুথি ঘরের ভিতরে চলে গেল, যাবার সময় বলে গেল ভুলেও যেন সজীব বাসায় না যায়। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল, কিন্তু একটু পরেই ভিতর থেকে জুথির মা আর জুথির কথোকপথন শুনতে পাচ্ছে সজীব।
জুথির মা বললো, " কে এসেছে জুথি? "
" সজীব ভাই এসেছে মা! "
" ওকে বল ভিতরে এসে আমার সাথে দেখা করে যেতে। "
জুথি বাহিরের ঘরে এসে সজীবকে বললো " মা তার শোবার ঘরে আছে, প্রেশার বেড়ে গেছে তাই বিছানা থেকে উঠছে না। আপনি একটু ভিতরে গিয়ে দেখা করতে পারবেন? "
সজীব ভিতরের রুমে জুথির মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেল, জুথি পিছনের দরজা খুলে আবারও রান্না ঘরে চলে গেল।
- আন্টি আসবো?
- হ্যাঁ হ্যাঁ আসো বাবা, কেমন আছো তুমি?
- আপনাদের দোয়ায় অনেক ভালো আছি, তো আপনার শরীরের অবস্থা এখন কেমন?
- সবসময় তো ভালোই থাকে কিন্তু হঠাৎ করে প্রেশার বেড়ে যায় আর তখন মনে হয় যে এখনই বোধহয় প্রাণ বেরিয়ে গেল।
- আপনারা দুজনেই কেমন রোগব্যাধি জমিয়ে ফেলেছেন, সবসময় ঠিক মতো ঔষধ খাবেন। তা নাহলে কিন্তু আপনাদেরই অসুস্থতার জন্য কষ্ট পেতে হবে।
- তোমার মা-বাবা কেমন আছে?
- জ্বি আলহামদুলিল্লাহ দুজনেই বেশ আছে, দোয়া করবেন আমার মা-বাবার জন্য।
- নামাজ পড়ে সবার জন্য দোয়া করি, আমরা আর কতদিন বাঁচবো? চিন্তা শুধু মেয়েটাকে নিয়ে, বাপ-মেয়ে কেউ রাজি হচ্ছে না।
- কেন?
- তোমার স্যারের স্বপ্ন মেয়েকে যেহেতু সরকারি চাকরি করে তাই জামাই হতে হবে একটা সরকারি চাকরিজীবী। অবশ্য জুথি চাকরি পাবার আগে থেকে তিনি এ কথা বলতেন। কিন্তু জুথিতো আরো একধাপ এগিয়ে, সে তো সরাসরি বিয়ে করতে চায় না। তাহলে নাকি আমাদের কেউ দেখবে না, সেই ভয়ে বিয়ে করতে চায় না।
- সজীব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, আচ্ছা ঠিক আছে আমি তাহলে স্যারের সঙ্গে আলাপ করে দেখি। আর আমার মনে হচ্ছে স্যার যদি মত দেয় তাহলে জুথি আপত্তি করবে না। আর যেহেতু জুথি প্রতিষ্ঠিত মেয়ে তাই ওর জন্য সরকারি জব করা ছেলে পেতে বেশি কষ্ট করতে হবে না।
- তুমি কিন্তু দুপুরে খাবার খেয়ে তারপর যাবে, কতদিন পরে এসেছ তাই আমাদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেও।
---
জুথির মা-বাবার রুম থেকে বের হয়ে সামনে শুধু ফাঁকা স্থান, আর তার পরেই জুথির ঘর। সজীব কিছু চিন্তা না করেই জুথির রুমে প্রবেশ করলো, চারিদিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হতে বাধ্য। সজীব নিজের রুমটা কখনো এত সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতে পারে না। রুমে ঠিক দক্ষিণ পাশে খাট আর সেই খাটের পাশ ঘেঁষে টেবিল, টেবিলের সঙ্গে চেয়ার আছে। একপাশে একটা কাঠের আলনা, সেখানে জুথির সব পোশাক ভাঁজে ভাঁজে রাখা হয়েছে। স্টিলের একটা শোকেস আছে, তার সাথে বিশাল এক আয়না।
রুমের বিছানায় বালিশের পাশে একটা নীল রঙের ডায়েরি, সজীব এর হঠাৎ মনে পরে গেল জুথি তাকে বলেছিল সে নাকি ডায়েরি পড়েছে। কিন্তু সেই ডায়েরি আজকে সামনে তাই কৌতুহল নিয়ে সেটা হাতে নিল।
.
.
.
আড়াইটা বাজে সবাই কে খাবার দেওয়া হয়েছে, জুথির মা ভিতরে নিজের রুমে খাচ্ছেন। সজীব আর জুথির বাবা দুজন মিলে সামনের বসার ঘরে বসে খাচ্ছে। তরকারি মাত্র দুই ধরনের, ফ্রিজ হতে ইলিশ মাছ বের করে ভাজি করা হয়েছে আর মুরগির মাংস সেটাও ফ্রিজে ছিল। নতুন করে জবাই করে খাওয়ানোর মতো মেহমান আপাতত সজীব নয়, তাছাড়া সময় স্বল্প আবার তার মা ছিল অসুস্থ।
সচারাচর গ্রামে মেয়ে গুলোর মধ্যে শতকরা ৯০% রান্না করতে পারে। তবে যারা পারে না তার হচ্ছে পরিবারের ছোট মেয়ে, বড় আপুরা রান্না করে বলে তাদের করতে হয় না। তাই তারা শিখতেও পারে না, অবশ্য সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। জুথি অনেক আগে থেকে রান্না করে, তখন মনে হয় সে সিক্সে পড়তো।
রান্না খুব ভালো ছিল তাই কম খাওয়ার জন্য কোন কারনই থাকতেই পারে না। খাবার খেয়ে সে কিছুক্ষণ বসে রইল, আশরাফুল মাস্টার বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করলেন আর পরক্ষণেই তার নাক দিয়ে শব্দ বের হবার কারণে বোঝা যাচ্ছে তিনি ঘুমিয়ে গেছেন।
সজীব এর মোবাইলে রাত্রির কল এলো, জুথি তাদের খাইয়ে দিয়ে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ভিতরে চলে গেছে। মনে হয় সেগুলো পরিষ্কার করে নিজে খাবে তারপর বের হবে।
সজীব কল রিসিভ করে বললো,
- কেমন আছো রাত্রি?
- ভালো আছি, স্যার আপনি?
- আমিও ভালো আছি।
- কখন গিয়ে পৌঁছলেন? পথে কোন অসুবিধা হয়ে গেল নাকি?
- না রাতেই পৌঁছে গেছি।
- নতুন একটা লোক এসেছে কাজ করতে।
- সেটাই স্বাভাবিক, শূণ্যস্থান পূরণ করতে হবে।
- কিন্তু স্যার যোগ্য ব্যক্তি বাতিল করে দিয়ে যদি অযোগ্য ব্যক্তি রাখে তাহলে কেমন হবে?
- যোগ্য কেউ থাকে না রাত্রি, আস্তে আস্তে সবাই যোগ্য হয়ে যায়। তুমিও একদিন আমার চেয়ে বড় পোস্টে চাকরি করতে পারবে, শুধু কাজের প্রতি ভালবাসা আর সততা থাকাটাই জরুরি।
- স্যার আপনি নতুন চাকরি কোথায় নিবেন?
- এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি, তবে খুলনা একটা ছোট প্রজেক্ট আছে। সেখানে অনেক আগে বলেছিল তাদের সাথে যোগ দিতে কিন্তু আমার ইচ্ছে করে নাই। এখন তাদের সাথে যোগাযোগ করে দেখি যদি কিছু হয়।
- তাহলে তো আপনার জন্য ভালো, খুলনা থেকে প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে আসতে পারবেন। স্যার যদি আপনার চাকরি হয়ে যায় তাহলে আমার জন্য একটা ব্যবস্থা করবেন প্লিজ। নিজের এলাকার কাছাকাছি তাছাড়া আপনার সাথে কাজ করতে পারার সুযোগ, প্লিজ স্যার।
- উঁহু, এতবার প্লিজ প্লিজ করো কেন? তুমি কি আমার পর নাকি? তুমি চিন্তা করিও না, আমার ব্যবস্থা হলেই আমি তোমাকে নিয়ে আসবো। আর তারপর থেকে হাসি আনন্দে একসাথে প্রাণ ঢেলে কাজ... ( সজীব এর কথা শেষ হবার আগেই কথা বন্ধ হয়ে গেল, কারণ সে অনুভব করলো তার শরীর ভিজে যাচ্ছে। পিছনে তাকিয়ে দেখে জুথি তার হাতে খালি গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্লাসের পানি যে সম্পুর্ন তার শরীরে ঢেলে দিয়েছে সেটা বুঝতে বাকি রইল না।
- সজীব বললো, শীতের দিনে এমন করে কেউ পানি গায়ে মারে? ভিজে গেলাম না?
- জুথি বললো, একদম চুপ..! বেশি কথা বললে পুকুরের পানিতে ফেলে দেবো।