হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ১২

🟢

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে যুথি, কোন রঙের শাড়ি পরবে সেটা নিয়ে বেশ চিন্তিত। সজীব এর সাথে মিলিয়ে পরলে ভালো হতো কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে? একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যায় যদি? তবুও হোক সমস্যা কি? নিজের মনের মতো করে তাড়াতাড়ি তৈরী হচ্ছে যুথি, সজীব যেহেতু তার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে।

সজীব দেখল যুথির বাবা খাটের ওপর বসে বসে একটা পুরাতন পত্রিকা পড়ছেন। সজীব তার চুপ করে প্রবেশ করলো কিন্তু আশরাফুল মাস্টার তাকে দেখতে পেল।

- আসসালামু আলাইকুম স্যার।

- ওয়া আলাইকুম আসসালাম, কেমন আছো? মা যুথি, আর এক কাপ চা দিয়ে যাও তো।

- স্যার আমি চা নাস্তা করে এসেছি।

- সমস্যা কি? শীতের দিনে চা বেশি করে খাও।

- আপনার শরীর ভালো তো?

- হ্যাঁ মোটামুটি ভালোই।

- পত্রিকায় কি পড়ছেন?

- তেমন কিছু নয়, একটা বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলাম তাই সেই চিন্তা দুর করার জন্য পুরাতন এই পত্রিকা হাতে নিলাম।

- কিসের চিন্তা? বলা যাবে?

- যুথির বিষয় নিয়ে।

- যেমন?

- আমার অনেক বছর আগে থেকে স্বপ্ন ছিল যে ওকে একটা ভালো সরকারি চাকরিজীবী ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবো।

- জ্বি স্যার, আপনি স্কুলে বলতেন মাঝে মাঝে।

- তোমার এখনো মনে আছে? হাহাহা হাহাহা।

- এখন চিন্তা কি নিয়ে?

- একটা ছেলের সন্ধান পাওয়া গেছে, কিন্তু সেই ছেলের বাসা অনেক দুরে হয়ে যায়। নিজের এই একটা মাত্র মেয়ে, তাকে এতটা দুরে সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে না।

- যদি স্বপ্ন অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবী ছেলে পেয়ে থাকেন তাহলে ভালো করে বিবেচনা করা উচিত। কারণ সবসময় তো সবকিছু চাহিদা মতো সামনে এসে ধরা দেয় না।

- তুমি তো যুথির সঙ্গে স্কুলে যাচ্ছ, তাই না?

- জ্বি স্যার।

- ওই স্কুলের মধ্যে জুবায়ের নামে একটা ছেলে আছে, ছেলেটা দেখতে শুনতে কেমন একটু কথা বলে দেখিও। তুমি আলাপ করবা ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করবা, তাহলে তো বোঝা যাবে।

সজীবের মনে পড়লো যুথি বলেছে যে তাদের স্কুল থেকে একটা ছেলে তাকে পছন্দ করে। যুথি তার নাম বলে নাই, কিন্তু স্যারের কাছে খবরটা যখন চলে এসেছে তারমানে যুথি ঠিক বলেছে। ছেলেটা নিশ্চয়ই মেম্বারের সাহায্য নিয়ে স্যারের কাছে সে প্রস্তাব দিয়েছে।

- ঠিক আছে স্যার আমি চেষ্টা করবো।

- তুমি তাহলে বিকেলে এসে আমাকে জানিয়ে দিও, কেমন? বয়স তো কম হলো না, মেয়েটার যদি একটা ব্যবস্থা করতে পারি মন্দ কি?

- জ্বি স্যার।

- ছোট্ট জীবনে সকল স্বপ্ন আল্লাহ পূরণ করেছে, এখন শুধু এই একটা স্বপ্ন পূরণ বাকি আছে। সেই স্বপ্ন যদি পূরণ হয়ে যায় তাহলে তো আর কোন ইচ্ছে নেই এ জীবন।

- স্যার দোয়া করি আপনার স্বপ্ন অবশ্যই পূরণ হবে।

- ইনশাহ-আল্লাহ.!

সজীব বাইকের পিছনে বসে আছে যুথি, সারাক্ষণ শুধু একা একা কথা বলে যাচ্ছে আর সজীব তার উত্তরে শুধু হ্যাঁ না জবাব দিচ্ছে। যুথি বিরক্ত হয়ে যায়, ঝাড়ি দিয়ে জিজ্ঞেস করেঃ-

- সমস্যা কি আপনার? হঠাৎ করে মনের মধ্যে থেকে সব রসকষ বেড়িয়ে গেল নাকি?

- কোই না তো।

- তাহলে হু হু করেন কেন?

- বাইক চালানোর সময় কথা বলা ঠিক না।

- ওরে বাপরে, সচেতন নাগরিক।

- হ্যাঁ।

- আবার হ্যাঁ?

- চুপ করো তো।

---

জুবায়ের নামের লোকটাকে সজীবের বেশ ভালো লেগেছে, অত্যন্ত সুদর্শন যুবক। চোখে চশমা দিয়ে হাতে সবসময় কলম নিয়ে হাঁটেন, কথা বলার সময় ঠোঁটের কোনে হাসি লেগে থাকে। একবার কথা শুরু করলে শুধু বলতেই ইচ্ছে করে, সজীব বেশি কিছুক্ষণ তার সাথে কথা বললো। যুথির সঙ্গে কথা বলে সে স্কুল থেকে বের হয়ে বাইক নিয়ে বাজারের দিকে গেল। উদ্দেশ্য হচ্ছে মেম্বার এর সাথে দেখা করে কিছু জিজ্ঞেসা করা। কিন্তু সে মেম্বার সাহেবকে পেল না, বাধ্য হয়ে বাড়িতে চলে গেল।

এখন কিছুক্ষণ যুথির বিষয় ভাবা দরকার, যুথি যেভাবে আচরণ করে তাতে সে সজীব এর দিকে সম্পুর্ন ঝুঁকে আছে। এই মুহূর্তে সজীব এর কাছ থেকে সামান্য সাপোর্ট পেলে সে হয়তো বিয়ের জন্য রাজি হবে। কিন্তু তার আদর্শ স্যার যেভাবে নিজের স্বপ্নের কথা বললেন তাতে করে কীভাবে সে প্রস্তাব দেবে? সে তো সরকারি চাকরিজীবী নয় তাহলে তার কি অধিকার আছে? তারচেয়ে বরং জুবায়ের নামে লোকটার বিষয় ভালো করে খোঁজ নিয়ে যদি একটা ব্যবস্থা করা যায় সেটাই ভালো।

স্কুল থেকে বেরিয়ে যুথি কল দিল সজীবকে কিন্তু সজীব রিসিভ করে নাই। অনেকবার কল করেছে সজীব সেটা দেখেও রিসিভ করে নাই। যুথি একা একা মন খারাপ করে হাঁটতে হাঁটতে বাড়িতে চলে গেল।

বিকেল বেলা আসরের নামাজের পরে সজীব যুথিদের বাড়িতে গেল। যুথি তখন বাড়িতে ছিল না, পাশের বাড়ি সুমাইয়া ভাবির সঙ্গে দেখা করার জন্য গেছিল। যুথির মা-বাবা দুজনই ঘরের সামনে বসে ছিল, মনে হচ্ছে আজকে যুথির মায়ের শরীর ভালো আছে নাহলে এভাবে দাঁড়াতে পারতেন না।

- স্যার ভালো আছেন?

- হ্যাঁ, কি খবর তোমার?

- আমি একটু জরুরি কারণে নানা বাড়িতে যাবো আজকে সন্ধ্যা বেলা। অনেকদিন নানা বাড়িতে যাওয়া হয় না, তাছাড়া বড় মামার মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছে।

- আচ্ছা ঠিক আছে।

- জুবায়ের ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে আজকে, ছেলে আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। আমার পক্ষ থেকে কোন ত্রুটি চোখে পরে নাই, তবে চোখ সবসময় সঠিক নাও দেখতে পারে। আপনি বরং আরেকটা ভালো করে লোক দিয়ে তাদের গ্রামের বাড়ি খোঁজখবর নিয়েন। আমি যেহেতু থাকছি না তাই কিছু করতে পারবো না আপাতত, তবে খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবো।

- আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তাহলে মেম্বারকে বলি তিনি যেন ভালো করে খবরাখবর নিয়ে জানায়।

- জ্বি স্যার, আচ্ছা আমি আসি তাহলে?

- এখনই যাবে? যুথি আনুক, চা খেয়ে তারপর না হয় যাবে।

- সমস্যা নেই স্যার, একটু পরেই ঠান্ডা লাগতে শুরু করবে। বাইক নিয়ে তখন রাস্তা দিয়ে যেতে খুব কষ্ট হবে, বাতাস ভারি ঠান্ডা।

- সাবধানে যেও।

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ১২ গল্পের ছবি