হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ১৪

🟢

" সজীবের মা বললো, তুমি বসো আমি চা নাস্তার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি। সজীব তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে চিন্তা করিও না, আপাতত এখানে বস। "

সজীব কিছু না বলে আস্তে ভিতরে চলে গেল, মনে হয় সে কতবড় অপরাধী। তাই যুথির সামনে পরার সঙ্গে সঙ্গে সে অসহায় হয়ে গেছে, অথচ তার তো এমন করার কথা নয়।

সজীবদের বাসা থেকে যখন যুথি আর সজীব বের হলো তখন মাগরিবের আযান প্রায় দিয়ে দিচ্ছে। সজীব এর মা বললো আজান শেষ হোক তারপর যাবে, কিন্তু যুথি রাজি হলো না। তাই সজীব তাকে নিয়ে রওনা দিল, বাইকের পিছনে বসিয়ে আস্তে আস্তে বাইক চালাতে লাগলো।

সজীবদের গ্রাম আর যুথিদের গ্রামের মাঝখানে একটা বিশাল মাঠ আছে আর সেই মাঠের ভিতর দিয়ে রাস্তা। রাস্তার দুপাশে সারিসারি তালগাছ ও খেজুর গাছ, অনেকটা পথের আশেপাশে কোন বাড়িঘর নেই। মাগরিবের আযান দিয়েছে প্রায় দশ মিনিটের মতো হয়ে গেছে। তারা মাঠের ঠিক মাঝ বরাবর আসার পরে যুথি বললোঃ-

" সজীব ভাই গাড়ি দাঁড় করান। "

" কেন? "

" কাজ আছে আপনি দাঁড় করান। "

সজীব গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেয়, যুথি সঙ্গে সঙ্গে বাইক থেকে নেমে দাঁড়িয়ে রইল। এই রাস্তা দিয়ে এখন সচারাচর দু একটা রিক্সা কিংবা ইজিবাইক ছাড়া কিছু আসবে না। সজীব বললোঃ-

" কেন দাঁড়ালে? "

" কিছু কথা বলতে চাই। "

" বলো। "

" আপনি আমাকে কষ্ট দিয়ে কতটা আনন্দ পান একটু বলবেন? "

" আজব তো, কষ্ট কখন দিলাম? "

" আল্লাহ, আমি কাকে কি বলি? আপনি কিন্তু খুব ভালো করে জানেন আমি আপনাকে ভালবাসি। শুধু একদিন দুদিন নয় বরং বছরের পর বছর ধরে আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। মাঝখানে তো তিন বছর যোগাযোগই রাখেন নাই, এখন এই সময়ে এসে আবারও হারিয়ে যেতে চান। আমি কি আপনাকে ভালবেসে পাপ করেছি সজীব ভাই? প্লিজ বলবেন আমাকে?

- তুমি কিন্তু ভালো করে জানো স্যার তোমার জন্য সরকারি চাকরিজীবী ভালো একটা ছেলে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আমার মতে তার কথামতো যদি তুমি তেমন একটা ছেলে বিয়ে করো তাহলে খুব সুখী হতে পারবে।

- সুখের দরকার নেই আমার, আপনি শুধু বলেন আপনি আমাকে বিয়ে করবেন। আমি কিছুই চাই না সজীব ভাই, সারাজীবন একসাথে থেকে শুধু ভালবাসতে চাই।

- স্যারের কথা আগে বিবেচনা করো।

- বাবা যদি আপনার কথা জানে তাহলে সে আর কিছু বলবে না বরং হাসিমুখে আপনাকে গ্রহণ করে নেবে দেখিয়েন।

- সজীব চুপচাপ।

- সজীব ভাই..? ও সজীব ভাই..?

- হুম।

- দিবেন না আপনার বুকে ঠাই? আগে যখন বৃষ্টি আপু ছিল তখন তো কখনও দাবি করিনি। কিন্তু এখন তো কেউ নাই, আমার দিকে তাকিয়ে একটু ভালবাসা কি দেয়া যায় না?

- এই বয়সে তোমার এমন ছেলেমানুষী মানায় না যুথি, তুমি বড় হয়েছ, তোমার যথেষ্ট জ্ঞান আছে।

- জ্ঞান আছে তাই বলে কি ভালবাসা ভুলে যাবো? তাই যদি হয় তাহলে আমি জ্ঞান ছেড়ে বোকা হতে রাজি আছি তবুও আপনাকে চাই।

- আমি মিথ্যা কথা বলে তোমাদের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করেছি কেন জানো?

- কেন?

- তুমি এইভাবে আমাকে যেন বিরক্ত করতে না পারো তাই দুরে থাকতে চাই।

- আমি বিরক্ত করি আপনাকে?

- অবশ্যই বিরক্ত করো।

যুথি এবার সজীবকে অবাক করে দিয়ে, দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বললোঃ-

- আমি আপনাকে ছাড়া কিছু চাই না, আমার এই জীবনের অপেক্ষা শুধু আপনার জন্য। আমি আর কোনদিন আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে মনের মধ্যে স্থান দিতে পারবো না। দয়া করেন।

সজীব চুপচাপ, কিন্তু সে যুথিকে হাত দিয়ে আর সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলো না। যুথির নরম শরীরের স্পর্শে তার কেঁপে ওঠার কথা কিংবা হাত দিয়ে জোর করে নিজেকে মুক্ত করা। কিন্তু সে কিছু বলে নাই এবং যুথিকে ঠেলে সরিয়েও দেয় নাই।

- যুথি সেভাবেই জড়িয়ে ধরে বললো, এই বুকটা সারাজীবন নিজের করে নিতে চাই। খুব ক্লান্ত হয়ে এখানেই মাথা রেখে দুচোখ বন্ধ করে চুপটি করে পরে থাকতে চাই। তুমি এতটা পাষাণ কেন সজীব ভাই? একটু ভালবাসা দাও না আমাকে..!

- তুমি কি চাও যে আর কখনো তোমার সাথে আমার দেখা না হোক?

- না না না, আমি চাই সারাজীবন একসাথে থেকে প্রতিটি সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে তোমার মুখটা দেখবো। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে যাক তবুও আমি রাতের আধারে তোমার এই বুকটা চাই।

- আচ্ছা এবার তাহলে ছাড়ো, আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলে দেখবো।

- সত্যি তো?

- হ্যাঁ সত্যি সত্যি, তুমি পাগলামি করা বন্ধ করো।

- সরি।

- এতক্ষণ পরে সরি কেন?

- হঠাৎ করে তুমি বলে ফেলেছি তাই।

- পরবর্তীতে আর বলিও না, তুমি এমন একটা মেয়ে যার কাছ থেকে আপনি ডাকটা শুনতে খুব ভালো লাগে আমার।

- আপনার যদি ভালো লাগে তাহলে আমি বিয়ের পরেও সারাজীবন আপনি করে ডাকবো।

- মনে থাকে যেন।

- হ্যাঁ থাকবে।

- ঠিক আছে চলো তাড়াতাড়ি।

- সজীব ভাই..? ও সজীব ভাই...?

- আবার কি হলো?

- মেলা মেলা ধন্যবাদ।

- কেন?

- আমার মতো এই গ্রামের অবলা মেয়ের মনের কষ্ট বোঝার জন্য, তাকে আপনার ওই বুকে ঠাই দেবার জন্য।

- ওহ্হ আচ্ছা।

- ওহ্হ আচ্ছা মানে কি?

- তাহলে..?

- আপনি এতো রসকষহীন কাঠখোট্টা কেন?

- আমাদের সবসময় রোদের মধ্যে কাজ করতে হয় তাই সূর্যের তাপমাত্রায় সকল রসকষহীন মনে হয় শুকিয়ে গেছে।

- সমস্যা নেই আমার বিকল্প পদ্ধতি জানা আছে।

- মানে?

- শীতের রাতে পুকুরের পানিতে আপনাকে যদি গলা পর্যন্ত ভিজিয়ে রাখা যায় তাহলে আবার রসে পূর্ণ হয়ে যাবে।

- ফাজিল।

মাগরিবের পরে এই খোলা মাঠের কিনারে দাঁড়িয়ে দুজনের এই কান্না আর হাসির সাক্ষী মানবকূলের কেউ নাই। কিন্তু মুক্ত আকাশের তারা, কিংবা এ ধরনীর এই গাছপালা সবকিছু দেখেছে নীরবে। যুথি যখন কান্না করে মিনতি করছিল, প্রকৃতি মনে হয় তখন তার প্রতি বিরক্ত হচ্ছিল। আবার যখন শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে গেল তখন সবাই হয়তো অবাক হয়ে গেছে।

ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল সেখানে ছিল পাশাপাশি দুটি তালগাছ। একটা পুরুষ আরেকটা মহিলা, যেটা পুরুষ গাছ সেটা তাল কিংবা রস হয় না। কিন্তু যেটা মহিলা সেটা তাল হয়, তারপর সে তাল পেকে ভাদ্র মাসে মাটিতে পরে। আবার সেই আঁটি দিয়ে নতুন গাছের জন্ম হয়।

- পুরুষ গাছটা মহিলা গাছকে বললো, এতক্ষণ ধরে ওদের কথা শুনে কিছু বুঝতে পারছ?

- মহিলা গাছটি বললো, দুজনেই হয়তো দুজনকে ভালবাসে কিন্তু প্রকাশ করে না। বাধ্য হয়ে মেয়েটা বলে দিয়েছে কারণ সে আর কষ্ট সহ্য করতে পারে নাই। যেমন করে আমি পারি না।

- তুমি তো মেয়ে তাই ওই মেয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলো, কিন্তু আমার কাছে ছেলেটাকে ঠিক মনে হচ্ছিল।

- কেন?

- জানি না।

- মেয়ে গাছটি বললো, কিন্তু আমার কাছে কেমন যেন মনে হচ্ছে ছেলেটাকে।

- কেমন?

- মনে হয় সে আবারও তাকে কষ্ট দেবে, কেমন যেন একটা অপূর্ণতা ছিল তার কথায়।

- তুমি সবসময় এমন অলুক্ষনে কথা বলো, যাও ওদের জন্য দোয়া করো।

- শেষ পর্যন্ত তাদের কি হয় সেটা জানতে বড্ড ইচ্ছে করছে, কিন্তু আমরা তো গাছ তাই আমাদের জায়গা থেকে নড়তে পারিনা।

- সেটাই কষ্ট আমাদের, তবে আমাদের কিন্তু এক সুবিধা আছে। মানুষেরা চলাচল করে তাই তাদের কত ধরনের পদ্ধতি দরকার, কেউ হেঁটে হেঁটে যায় আবার কেউ গাড়ি নিয়ে। আর আমাদের কিন্তু এ সবের দরকার নেই তাই আমরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

★★

বাহিরে মোরেগের ডাকে ঘুম ভেঙ্গে গেল যুথির, চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে জানালা দিয়ে আলো এসে রুমের মধ্যে ভর্তি হয়ে গেছে। যুথি দেখলো সজীব তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে। যুথি হাসলো, এটাই তো সে চেয়েছিল। সারারাত জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে থাকবে, সকাল বেলা স্বামীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রবে। তারপর নিজেকে মুক্ত করে বিছানা থেকে উঠে গোসল করে নাস্তা তৈরি করবে। যুথি আবার হাসলো, আচ্ছা বিয়ে হলেই কেন গোসল করার কথা মাথায় আসে?

যুথি যখন উঠে যাচ্ছিল তখন সজীব তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললোঃ-

- কোথায় যাও?

- সকাল হয়ে গেছে, নাস্তা বানাতে হবে তুমি তো উঠেই নাস্তা নাস্তা বলে চিৎকার করো।

- আজকে চিৎকার করবো না, তুমি বরং আরও কিছুটা সময় থাকো।

- হচ্ছে না সাহেব, আমার শশুর শাশুড়ী আছে তাই তারাও কিন্তু নাস্তা করে।

- আমি কিন্তু ভিষণ রেগে যাবো।

- ঠান্ডা পানি দিয়ে সেটা শেষ করবো।

- তবে রে?

যুথি এবার হুট করে উঠে বসলো, আর অমনি তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তারমানে সে স্বপ্ন দেখছিল? ইস কি রোমান্টিক মুহূর্ত, এখনই বিয়ের পরে স্বামীর সঙ্গে থাকার স্মৃতি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।

বাহিরে সত্যি সত্যি বেলা হয়ে গেছে অনেক, যুথি মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে সাড়ে সাতটা বাজে। সে দেখলো যে সজীব এর নাম্বার থেকে একটা মেসেজ এসে জমা হয়ে আছে। যুথি সেই মেসেজ সিন করে পড়তে গিয়ে অবাক হয়ে গেল, চোখের কোনে পানি জমা হয়েছে। স্বপ্ন দেখে মনটা ঠিক যতটা ভালো ছিল, মেসেজ পড়ে তারচেয়ে বেশি খারাপ হয়ে গেল।

সজীব লিখেছেঃ-

" গতকাল সন্ধ্যা বেলা মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে আমি তোমাকে শান্ত করেছি। বাস্তবে কোনদিন তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধার ইচ্ছে নেই আমার, তোমার হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি আজকেই শহরে চলে যাচ্ছি। আমাকে যতটা খারাপ ভাবতে পারো তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু তোমার কাছে একটা অনুরোধ থাকবে। তুমি তোমার এই ভালবাসা কোনদিন স্যারের কাছে প্রকাশ করিও না। "

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ১৪ গল্পের ছবি