- কেমন আছেন স্যার..?
- আছি অনেকটা ভালো, তোমার কি অবস্থা?
- বেশি ভালো না স্যার, মনে হয় চাকরিটা করতে পারবো না আমি।
- কেন?
- বলে বোঝাতে পারবো না, খুব খারাপ অবস্থা।
- একটু তো ধারণা দিতে পারো।
- মানুষের সবসময় বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে আর আমি অবলা মেয়ের বেতন দুই হাজার টাকা কমিয়ে দিল শালা মেনেজার। আবার কাজের চাপ বাড়িয়ে দিছে অনেক।
- ওহ্।
- আপনি কোথায় আছেন?
- খুলনাতে।
- চাকরি নিয়েছেন তাহলে?
- না তবে ইচ্ছে আছে।
- বাড়িতে সবাই ভালো আছে?
- হ্যাঁ, তোমার পারিবারিক সব খবর ভালো তো? আর বিয়ের কি হলো? কতদূর..?
- ভাঙ্গা গড়ার মধ্যে চলে, তবে আমি স্যার জবটা নিয়ে টেনশনে আছি।
- চিন্তা করো না, নিজের যোগ্যতা দিয়ে চাকরি করবা তাই নিজের উপর ভরসা রাখো। তাছাড়া আমি চাকরি নিলে তোমাকে নিজের কাছে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবো, যদি তুমি চাও।
- মেলা মেলা ধন্যবাদ স্যার, আমি এটাই শুনতে চাই আপনার কাছে। আপনার সঙ্গে মাত্র একদিন কাজ করে আমার মেলা দিন কাজ করার ইচ্ছে করছে।
- তোমার হবু স্বামীর সাথে তো করতে পারো।
- না পারি না, একসাথে দুজন চাকরি করার ইচ্ছে নেই আমার।
- কেন? দুজন মিলে একসাথে অফিসে যাবে আর একসাথে ফিরে আসবে, বৃষ্টির দিনে একই ছাতার নিচে হেঁটে বাসায় ফিরবে।
- স্যার রাখি?
- লজ্জা পাচ্ছ?
- একটু একটু।
- আচ্ছা ঠিক আছে ভালো থেকো, আর আমি যে কোন জবের ব্যবস্থা হলে জানাবো।
★★
স্কুল থেকে ফিরে যুথি পুকুর পাড়ে বসে আছে, এই জীবন কেন এমন করে? যুথির মা এখন একটু সুস্থ তাই তিনিই রান্না করতে গেছেন। অন্যদিন যদি হতো তাহলে যুথি রাগারাগি চেঁচামেচি করতো কারণ সে তার মাকে রান্না করতে দেয় না। কিন্তু আজ কিছু বললো না, বাবার কাছে গিয়ে বসতে পারলে ভালো লাগতো। নিজের একান্ত মন খারাপ হলে সে বাবার সঙ্গে গল্প করে, খুব ভালো লাগে।
যুথি উঠে দাঁড়াল, শাড়ির আঁচল হাতে নিয়ে সে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো।
- বাবা কি করো?
যুথির বাবা মাত্র শোয়া থেকে উঠে বসেছেন, যুথি আসাতে তার মুখে হাসি।
- কিছু না রে মা, আয় বস।
- বাবা আমি কিছুদিন নানা বাড়িতে যেতে চাচ্ছি।
- সত্যি বলছিস?
- হ্যাঁ, যেহেতু স্কুল খোলা তাই দুই দিনের ছুটি নেব আর সঙ্গে একটা শুক্রবার।
- হঠাৎ করে নানাবাড়িতে?
- জানি না, ইচ্ছে করছে হঠাৎ। নানি মারা যাবার পরে তো আর যাইনি, অনেক দিন তো হয়ে গেল তাও প্রায় আড়াই বছর।
- আচ্ছা ঠিক আছে।
- তোমাদের কষ্ট হবে না বাবা?
- শোন পাগলি মেয়ের কথা! দুদিন পরে তোকে তো বিয়ে করে শশুর বাড়িতে যেতে হবে। তখন কি আমরা একা থাকবো না?
- বাবা একটা কথা বলবো?
- কি কথা?
- আমি যদি কখনো বিয়ে না করে সারাজীবন এই তোমাদের সাথে থাকতে চাই। তাহলে কি তোমরা আমাকে তোমাদের সঙ্গে রাখবে?
- হঠাৎ এমন অদ্ভুত কথা কেন মা? কি হয়েছে তোর?
- যুথি চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললো, জানিনা কি হয়েছে? তুমি আমার কথার জবাব দাও। সত্যি সত্যি আমাকে তোমাদের সঙ্গে রাখবে তো? নাকি জোর করেই আমাকে বিয়ে দিয়ে দেবে?
- তুই তো কান্না করিস, ঘটনা কি? আর তুই যথেষ্ট বড় হয়েছিস তাই তোকে জোর করে বিয়ে দেবার চিন্তা কেন করবো?
যুথির ভিতর থেকে আরো বেশি কান্না বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে, যুথি নিজেকে সামলাতে না পেরে তার বসে থাকা বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিল। যুথির বাবা হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে গেলেন, পরিস্থিতি দ্রুত এমন হবে সেটা তার মনের মধ্যে ছিল না।
- যুথি বললো, বাবা আমি কোনদিন বিয়ে করতে চাই না, তুমি দয়া করে কখনো আমাকে বিয়ের জন্য জোর করবে না। তোমার দুটো পায়ে পরি এই কথাটা রেখো তুমি বাবা।
- আচ্ছা ঠিক আছে ঠিক আছে, তুই একটু শান্ত হয়ে বস।
রান্নাঘর থেকে কান্নার শব্দ পেয়ে যুথির মা ছুটে এসে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা মেয়ের মধ্যে এই নিষ্পাপ ভালবাসার সাক্ষী হয়ে থাকলেন তিনি এবং আরেকজন দিনদুনিয়ার মালিক, আল্লাহ।
★★★
সজীব পড়াশোনা করার সময় মামুন ভাইয়ের মেস এর মধ্যে থাকতো। একসময় এখানে কত রঙিন জীবন কাটিয়েছে সে, বন্ধু বান্ধব দিয়ে ভরপুর সে মুহূর্ত আজকে চোখের সামনে ভাসে। যারা যারা একসাথে ছিল তারা আজ সবাই বিচ্ছিন্ন, কেউ কেউ দেশের বাইরে। আজকে সেই "মান্না দে..." জনপ্রিয় "কফি হাউসের সেই আড্ডা" গানটা বেশ মনে পরছে। হায়রে জীবন...?
মামুন ভাইয়ের মেসের মধ্যে এখনো ছাত্ররা থাকে, সবাই পড়াশোনা করে আশেপাশের কলেজে। দিন বদলে যায়, রুমগুলো আজও সেই আগের মতো আছে, সবকিছু দেখে মনে হয় যেন সেই সময়ের মধ্যে আছে।
একটা রুমে দুজন থাকতে পারে, সেই রুমে সজীব উঠে গেল। তারা যখন ছিল তখন এই রুমে মুবিন আর কিবরিয়া থাকতো, এখন সে একা রবে।
সন্ধ্যার সামান্য আগে সজীব শীতের পোশাক পরে বের হয়ে গেল। চারিদিকে একটু হাটাহাটি করে আসতে চায় সে, সেজন্য পৌরসভার মোড় থেকে একটু সামনে গিয়ে রোটারি স্কুলের মাঠে প্রবেশ করলো সজীব। ফজলুল কাকা আগে এখানে খুব ভালো চটপটি বিক্রি করতেন। এখনো মাঠের এক কোণে একটা চটপটির গাড়ি দেখা যাচ্ছে। দুর থেকে গাড়ির গায়ে "ফজলু মিয়ার চটপটি" শব্দটা দেখে সে হাসলো।
এক প্লেট চটপটি নিয়ে একটা চেয়ারে বসে সজীব খাচ্ছে, জীবন এক রহস্যময় বস্তু।
খাবার প্রায় শেষের দিকে, ১২/১৩ বছরের একটা মেয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। মেয়েটার সঙ্গে আরও একটা মেয়ে আছে কিন্তু তার বয়স ৪/৫ বছর হতে পারে। বড় মেয়েটার চেয়ে ছোট্ট মেয়েটা খুব সুন্দর লাগছে, এতটুকু মেয়েকে বিদেশি এক বিশাল কোর্ট পরানো হয়েছে। দেখলে মনে হয় যে অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ কিংবা আমেরিকান মায়ের সন্তান। সজীব এক দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে কেন যেন তাকিয়ে আছে, সে বললোঃ-
- কি নাম তোমার?
- বাচ্চাটা পরিষ্কার কণ্ঠে ময়না পাখির মতো করে বললো, স্নিগ্ধা মেহজাবিন।
এক মুহূর্ত ধাক্কা খেল সজীব, নামটা বেশ পরিচিত লাগছে। মেয়ে দুটো সামনে থেকে সরে যাচ্ছে, সে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। এমন সময় সজীব এর মোবাইলে মেসেজ বেজে ওঠে, সজীব ফোন বের করে অবাক হয়ে গেল।
মেসেজে লেখা আছেঃ-
" কেমন আছেন সজীব সাহেব? খুব সুন্দর লাগে বাচ্চাটা, তাই না? আজ থেকে ছয় বছর আগে যদি অবহেলা করে আমাকে ছুড়ে না ফেলতেন তাহলে এই সন্তানের পিতা হতেন আপনি। চিনতে পারছেন আমাকে? নাজমা আক্তার বৃষ্টি, নামটা মনে আছে? নাকি ভুলে গেছেন? অবশ্য আপনার মতো মানুষ আমার নাম মনে রাখবে সেটা আমার ভাবনা করা বোকামি। আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ছোট্ট মেয়েটা আমার, স্নিগ্ধা মেহজাবিন।
যাইহোক,
কেমন আছেন?
খুলনা শহরে কতদিন ধরে?