নিজেকে সামলে নিতে কিছুক্ষণ সময় লেগেছে, যুথি হয়তো ধরেই নিয়েছে সজীবকে সে পাবে না। এতটা বছর যার জন্য প্রতিটি প্রহর গুনে অপেক্ষা করে যাচ্ছে, গতকাল রাতে সকল লাজলজ্জা সে পরিত্যাগ করে সজীবকে জড়িয়ে ধরলো। কিন্তু সজীব তার সেই জড়িয়ে ধরা অনুভূতির কোনই মূল্য না দিয়ে পালিয়ে গেল।
মোবাইল হাতেই ছিল, সজীবের নাম্বারে কল দিয়ে রিসিভ হবার অপেক্ষা করতে লাগলো।
- সজীব রিসিভ করে বললো, হ্যাঁ যুথি বলো।
- কতদূর গেছেন?
- বাসে উঠে বসলাম মাত্র, লোকাল বাস তাই তো দেরি হচ্ছে অনেক।
- সকালে খেয়ে রওনা দিয়েছেন?
- হ্যাঁ, তুমি খেয়েছ?
- মাত্র ঘুম থেকে উঠে বসলাম, আর মোবাইলর দিকে তাকিয়ে সুখবরটা পেলাম।
- মানে?
- কিছু না, সাবধানে যাবেন।
- আমার উপর রাগ রেখো না, আমার মতো যদি তুমি পরিস্থিতির স্বীকার হতে তাহলে তুই তখন কি করতে ভেবে দেখো।
- আমি এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না সজীব ভাই, বাদ দেন তো।
- না না বাদ দেবো কেন? তুমি নিজেকে একবার আমার স্থানে দাঁড় করিয়ে দেখো।
- আচ্ছা দাঁড় করালাম।
- এবার বলো, তুমি কি করতে?
- সজীব ভাই..?
- বলো।
- এমন পরিস্থিতিতে যদি পরতাম তাহলে সেখান থেকে পালিয়ে যেতাম না। আমি সেই পরিস্থিতির সামনাসামনি হয়ে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চেষ্টা করতাম। জীবন থেকে কিংবা জীবনের সব চলমান ঘটনা থেকে পালিয়ে কিছু করা যায় না। এসব কথা আপনাকে বলা অর্থহীন কারণ আপনি এসব কখনো বুঝতে পারবেন না।
- যুথি?
- বলেন।
- সবাই সবকিছু পারে না, তুমি বিষয়টা ঠিক যতটা সহজ ভাবো ততটা সহজ কিন্তু নয়।
- পৃথিবীতে কোন জিনিসটা কঠিন হলেও অসম্ভব এমন উদাহরণ দিতে পারবেন? যত কঠিন হোক তবুও কিন্তু তার আলাদা সমাধান আছে, নিজেকে সম্পুর্ণ মেলে ধরতে হবে। রাখি সজীব..?
- আচ্ছা ঠিক আছে।
কল কেটে দিয়ে সজীব কিছুক্ষণ যুথির বিষয় নিয়ে ভাবলো, মেয়েটা কতটা সুন্দর। কত নিখুঁত করে শাড়ি পরতে পারে, এমন কোন কাজ নেই যেটা সে করতে পারে না। ঠিক একেবারে বৃষ্টির মতো, বৃষ্টি যেমন সকল বিষয়ে খুবই পারদর্শী ছিল তেমন হয়েছে যুথি। বৃষ্টি বিয়ে করে স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে শান্তিতে আছে, কিন্তু যুথি আজও তার জন্য অপেক্ষা করে। তাহলে যুথি আসল...?
কিছু একটা করে মনোযোগ পরিবর্তন করা উচিৎ নাহলে মন খারাপ হতে থাকবে। সজীব হাতের ব্যাগ থেকে যুথির লেখা ডায়েরি বের করে হাতের সামনে ধরলো।
★★★
যুথির ডায়েরিঃ-
বাবার সঙ্গে কথা বলে সজীব ভাই যখন আমাদের বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন তখন আমি ছিলাম বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। আমার একটা ছাগল আছে, তার গায়ের রঙ সম্পুর্ন সাদা। যেহেতু মা-বাবার ছেলে বা মেয়ে বলতে শুধু আমি, তাই আমাকেই মাঝে মাঝে ছাগল নিয়ে আসতে হতো। তাই সজীব ভাই যখন বের হলো তখন আমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে।
- আমি বললাম, সজীব ভাই একটা কথা ছিল।
- কি কথা?
- এভাবে রাগী চেহারায় কথা বলেন কেন? আমি কি আপনার শত্রু নাকি?
- তোমার হাবভাব বেশি সুবিধা মনে হচ্ছে না তাই পানিশমেন্টে রাখতে হবে।
- আপনি আমাকে পানিশমেন্ট করার কে?
- আমিই অনেক কিছু, সেটা সময় হলে বুঝতে পারবে তুমি।
- আমি এখনই বুঝতে চাই, আমাকে এখনই যদি বোঝাতেন খুব ভালো হতো।
- তুমি কোন ক্লাসে যেন পড়ো?
- আপনার এক ক্লাস নিচে।
- তারমানে ক্লাস নাইনে?
- হুম।
- তোমার সাথের বান্ধবীরা কতজনে প্রেম করে?
- সবাইকে তো জিজ্ঞেস করিনি।
- তুমি কতগুলো করো?
- কি যে বলেন আপনি? একটাই কপালে লেখা নেই আবার কতগুলো?
- সমস্যা নেই, পড়াশোনা ঠিকমতো করো তাহলে ঠিকই কপালে এসে যাবে।
- আপনি কাউকে পছন্দ করেন? বা আপনাকে কি কেউ প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে?
- হাহাহা আমাকে প্রস্তাব দেবে?
- কেন দেয় না?
- হুম দেয় তো।
- কি বললেন? কে দিয়েছে শুনি?
- দিয়েছিল একজন, কিন্তু তার সেই প্রেমের চিঠি আমি তার বাবার কাছে পৌঁছে দিছি।
- কেন? আপনাকে বুঝি ভালবাসতে পারে না?
- না পারে না।
- আপনার কেমন মেয়ে পছন্দ?
- কেন? মেয়ে খুঁজবে নাকি?
- বলেন না একটু...!
- যে মেয়ে দিনরাত শাড়ি পরে থাকতে পারে সেই রকমের মেয়ে খুব ভালো লাগে।
- খুব ফালতু ধরনের কথা বললেন, অল্পবয়সী কে এমন আছে যে সবসময় শাড়ি পরে থাকবে?
- তুমি এত নাক ছিটকাও কেন? তোমাকে তো কেউ সেসব করতে বলে নাই। সারাদেশ খুঁজে যদি একটা মেয়ে পাওয়া যায় তাহলে আমি সেই একটা মেয়ে বিয়ে করবো।
- সারাদেশ খুজতে হবে না, সবার আগে আপনি আমাদের গ্রাম থেকে খোঁজা শুরু করবেন।
- সে যখন বিয়ে করবো তখন দেখা যাবে।
- আচ্ছা।
সেদিন থেকে অবশ্য আমি শাড়ি পরা আরম্ভ করি নাই, উক্ত ঘটনার ও অনেক দিন পর একদিন সে বলেছিল সেদিন থেকে পরি। তবে সেসব সামনে যখন আসবে তখন বলবো, এখন নাহয় ঘটমান বর্তমান নিয়ে লিখি।
★
দিন ফুরিয়ে গেছে, আজ আমাদের স্কুলে বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। চলতি বছরে যারা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে তারা আজ স্কুল থেকে বিদায় নেবে। দীর্ঘ দশ বছর পড়াশোনা করে আজকে তাদের স্কুল পরিত্যাগ করতে হবে।
গতকাল রাতে সজীব ভাইয়ের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল আমাদের বাড়িতে। তারা গতকাল রাতে স্কুলে পিকনিক করেছে, রাতের বেলা স্কুলের মধ্যে তারা বিভিন্ন কাজ করেছে। কাজ শেষ করে তারা এখানেই খাবারের ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু আমাদের বাড়িতে গেছিল বাবার সঙ্গে কথা বলতে। বাবা তখন বাসায় ছিল না, মাগরিবের নামাজ পড়েই তিনি আমাদের সাদা ছাগল খুঁজতে গেছে, কারন বিকেল থেকে তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।
আমি অন্ধকারে বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে সজীব ভাইকে বললামঃ-
- কালকে আপনাদের বিদায় তাই না?
- হ্যাঁ।
- খুব খারাপ লাগছে আমার।
- কেন? তোমাদের বিদায় অনুষ্ঠান তো এখনও এক বছর পরে তাহলে এখন কি?
- আপনারা এতদিন ছিলেন আর কাল থেকে আর দেখা হবে না, খারাপ লাগবে না?
- সত্যি বলতে আমারও খুব খারাপ লাগছে যুথি, ভাবতে গেলে বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর আনন্দের মুহূর্ত গুলোকে ছেড়ে চলে যাবো। কলেজ কিংবা ভার্সিটি যেখানে যাই না কেন, স্কুল জীবনের স্মৃতি কোনদিন হয়তো ভুলতে পারবো না।
- আপনি এসএসসি পরীক্ষার পর কোথায় গিয়ে ভর্তি হবেন সজীব ভাই?
- জানি না রে, তবে স্যার বলছেন খুলনা শহরে গিয়ে ভর্তি হতে।
- এতদূর?
- আগে পাশ করি তারপর ভাববো, গেলাম রে।
সজীব ভাই দৌড়ে বেরিয়ে গেল, সেদিন রাতে সে হয়তো তার দীর্ঘ দশ বছরের স্কুল জীবনের বন্ধুরা মিলে পিকনিক করেছে। কিন্তু আমি নিজের ঘরে থেকেও কিছু খেতে পারিনি, একতরফা ভাবেই কাউকে ভালবেসে সে দুরে চলে গেলে বুকের মধ্যে কতটা কষ্ট লাগে সেটা সেদিন অনুভব করছি।
বিদায় অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তারা সবাই কম বেশি কেঁদেছে , কিন্তু সজীব ভাইয়ের বক্তৃতা শুনে শিক্ষকদের মধ্যে অনেকে কেঁদে দিল। সজীব ভাই বাসা থেকে একটা কাগজে করে সবকিছু সাজিয়ে লিখে এনেছিল। তারপরও সেগুলো বাদ দিয়েও নিজের প্রিয়জনদের ছেড়ে যাওয়া নিয়ে এতটা আবেগ দেখাল যে সকলের মন খারাপ হতে বাধ্য হয়ে গেছে। আমি এমনিতেই গতকাল রাত থেকে কেঁদেছি, কিন্তু আজকে আবারও কাঁদলাম।
সবাই যখন চলে গেছে তখন শুধু তারা বিদায়ী ছাত্রছাত্রীরা সবাই ছিল। নিজেদের মধ্যে তারা সব কিছু ভুলে বিদায় নিচ্ছেন, আমি এবং আমার এক বান্ধবী অপেক্ষা করছি।
হঠাৎ করে সজীব ভাইয়ের ক্লাসের একটা মেয়ে সজীব ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল। আমার তখন শরীর জ্বলে যাচ্ছে রাগে দুঃখে অভিমানে, কিন্তু কিছু বলতে পারি নাই। এগুলো দেখে খুব খারাপ লাগছে বলে স্কুল থেকে বের হয়ে আমি সোজা বাড়ি চলে গেলাম। কি দরকার ছিল সেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরার? বুঝলাম বিদায় অনুষ্ঠান তাই বলে জড়িয়ে ধরা অনুভূতি প্রকাশ করা লাগে নাকি আর উপায় নেই?
★★★
মোবাইলের রিংটোনে ডায়েরি থেকে মুখ তুলে তাকাল সজীব, রাত্রি কল দিয়েছে। এমন সময় রাত্রির কল দেবার কারণ কি?
- সজীব রিসিভ করে বললো, হ্যালো রাত্রি?