হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ১১

🟢

সজীব স্থির হয়ে বসে আছে, যুথির কথা অনুযায়ী দৌড়ে তার সাথে দেখা করতে যাওয়ার কোন মানে হয় না। শীত ভালোই শরীর ছুয়ে যাচ্ছে, শহরে এত শীত লাগে না কিন্তু গ্রামের কথা ভিন্ন।

সজীব ভেবেছিল যুথির বিষয় এখানেই সমাপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু তার ধারণা ভুল। যুথি কল দিয়ে পুরো রাগী হয়ে বললোঃ-

- আমাকে আসতে হবে নাকি নিজেই আসবেন?

- কেন কি হইছে?

- আসতে বলছি আসেন।

- রাতের আধারে দেখা করা ঠিক হবে?

- আপনি আসেন, এতো প্রশ্ন করেন কেন?

- আচ্ছা ঠিক আছে।

সজীব খেলার স্থান ত্যাগ করে যুথিদের বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। যুথি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এবং তার সাথে আরো দুটো মেয়ে, তবে সেই মেয়েগুলো ছোট ছোট সেটা বোঝা যাচ্ছে।

- সজীব বললো, কি ব্যাপার?

- আপনি এখানে কেন এসেছেন?

- খেলা হপ্পে তাই দেখতে এসেছি।

- জীবনে কখনো দেখেননি? এত শীতের মধ্যে কি খেলা দেখতে হবে?

- একটু পরে চলে যাবো ভাবছিলাম, তবে এসেছি যখন তাই খানিকটা বসলাম নাহলে আমার তেমন আগ্রহ নেই।

- আপনি আমার ডায়েরি চুরি করেছেন?

- সজীব এবার বোকা হয়ে গেল, হঠাৎ করে ঠিক কি জবাব দিতে হবে মাথায় আসে না।

- কি হলো চুপ করে আছেন কেন?

- হ্যাঁ নিয়েছি।

- কেন নিয়েছেন?

- যে ডায়েরি না পড়েও তুমি আমাকে সেটা পড়ার মিথ্যা অভিযোগ করেছ সেই ডায়েরি এখন পড়তে কৌতুহল হচ্ছে।

- কোন দরকার নেই, ওখানে কোন সাহিত্যিকের কথা দিয়ে সাজানো কোন গল্প নেই যেগুলো পড়ে আপনি আনন্দিত হবেন।

- তাহলে কি লেখা আছে?

- গ্রামের এক সহজ সরল বালিকার অল্পবয়সে কোন এক মানুষের প্রেমে পড়ার গল্প। অবুঝ সেই সময়ে কত বোকা ছিল মেয়েটা সেগুলো সব খুব নিখুঁত করে লেখা আছে। আমি চাইনা আমার সেই বোকামি কাজগুলো পড়ে আপনার কাছে হাসির পাত্র হই।

- আমি তবুও পড়তে চাই।

- যেহেতু আমি নিষেধ করেছি সেহেতু ওটা কিন্তু আপনি পড়তে পারবেন না সজীব ভাই। আপনার কিন্তু যথেষ্ট জ্ঞান আছে, তাই সহজসরল আমার সেই আবেগময় অনুরাগের কথা আপনি আমার অনুমতি ছাড়া পড়বেন না।

- আর কিছু বলবে?

- আগে বলেন।

- সেটা সম্ভব না, ডায়েরি আমি পড়বোই।

---

সকাল বেলা মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙ্গে গেল সজীব এর, বাহিরে ঘন কুয়াশার আড়ালে সূর্য খুঁজে বের করা কষ্টকর। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাড়ে সাতটার বেশি বেজে গেছে। বিছানা ছেড়ে উঠেই তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিল, যুথির সঙ্গে তার স্কুলে যাবার কথা। গতকাল রাতে সে ডায়েরি পড়েছিল প্রথম পাতা, যে পাতাটা আমরা আগেই যুথির মাধ্যমে পড়েছি সেটা পড়েছে সজীব। আর দ্বিতীয় পাতা থেকে যখন পড়া শুরু করবে তখন আমরা সবাই জানতে পারবো।

নাস্তা করতে গিয়ে সজীব এর মা বললোঃ-

- তোর স্যারের শরীর কেমন আছে?

- আছে মোটামুটি ভালো, শীতের জন্য বৃদ্ধ সকল মানুষের একটু কষ্ট হয়। তাই তিনিও আছেন সেই মোটামুটি, তবে যুথি না থাকলে স্যার আর তার স্ত্রী কষ্ট পেতেন খুব।

- যুথি মেয়েটা খুব ভালো তাই না?

- হ্যাঁ অনেক ভালো মনে হচ্ছে, নিজের মা-বাবার জন্য আজও কত সুন্দর ভাবে সংসার আগলে রেখেছে।

- অমন মেয়ে যদি আমার একমাত্র ছেলের বউ করে আনতে পারতাম।

- মানে কি মা?

- রাগ করিস কেন? তুই যে মেয়েকে পছন্দ করে ছবি তুলে আনলি সেই মেয়ের তো বিয়ে হয়ে গেল। এখন কি নতুন করে তোর জন্য আমরা বিয়ের ব্যবস্থা করবো না?

- তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি, সেই মেয়ের বিয়ে হয়নাই মা। ওরা জমজ দুই বোন, রাত্রির বড় বোন নিঝুমের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু রাত্রির বিয়েও ঠিক হয়ে আছে, যেকোনো সময় হয়তো সে বিয়ে করবে।

- তাহলে আর সেই মেয়ের কথা তুলে লাভ কি? যেদিন যুথি আমাদের বাড়িতে এসেছিল তার ঠিক পরেরদিন তোর বাবার সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে কথা বললাম। তাছাড়া মেয়েটা স্কুলে চাকরি করে, খুব ভালো লেগেছে আমাদের।

- এখনই কিছু আগ বাড়িয়ে ঠিক করতে যেও না মা, আমি যেহেতু কিছুদিন থাকবো তাই তোমাদের জানাবো আমি।

বাইক নিয়ে সজীব যখন বাড়ি থেকে বের হয়েছে তখনও সূর্য দেখা যাচ্ছে না। বাইক চলার জন্য বাতাসে আরো বেশি ঠান্ডা লাগছে, পাকা রাস্তা শিশিরে ভিজে চুপসে গেছে।

সজীব যখন যুথিদের বাসায় গেল যুথি তখন মাত্র সকালে খাবার খেয়ে থালাবাসন পুকুর থেকে ধুয়ে ঘরে যাচ্ছিল। সজীবকে দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে বললোঃ-

- বাহ, মনে রেখেছেন তাহলে? আমি তো আবার ভেবেছিলাম ভুলে গেছেন।

- তুমি এখনো তৈরী হতে পারো নাই?

- আপনি বাবার সঙ্গে বসে গল্প করুন, আপনাকে চা দিচ্ছি। তারপর সেই চা খেতে খেতে আমি তৈরী হয়ে আসবো।

- আচ্ছা।

- একদম পারফেক্ট।

- মানে কি?

- ঠিক যেভাবেই সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চেয়েছি সেভাবেই তৈরী হয়ে এসেছেন।

- ঠিক বুঝতে পারছি না।

- আপনাকে স্কুলের আরেকটা শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে যাবো। সেই লোকটার বাসা বাগেরহাট জেলা সদরে, মেম্বার বাড়িতে থাকে আর স্কুলে চাকরি করে। বেশ কিছুদিন ধরে সে আমাকে ইশারায় কিছু বলতে চায়। আমার ধারণা সে যদি যেকোনো সময় মেম্বারের সঙ্গে বিষয়টা বলে ফেলে তাহলে মেম্বার নিশ্চয়ই আমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে আসবে। আর বাবা তখন ঠিকই রাজি হয়ে যাবে, তাই আগে থেকে ওই ছেলেকে বলবো আমার বয়ফ্রেন্ড আছে। তাই আপনাকে সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি, আর বয়ফ্রেন্ড হিসেবে আপনার সাজগোছ হেব্বি হয়েছে। হিহিহি।

- আমি যাবো না।

- কেন?

- পারবো না মিথ্যা অভিনয় করতে।

- ঘাড় ধরে নিয়ে যাবো।

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ১১ গল্পের ছবি