হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ১৩

🟢

যুথি বাড়ি ফিরে জানতে পারল যে সজীব এসেছে কিন্তু তার সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করতে পারে নাই। বাড়ি ফিরে নানা বাড়িতে চলে যাবে সে কথাও বাবার কাছে জানতে পারলো। সামান্য কিছু প্রশ্ন জট পাকিয়ে যাচ্ছে মনের মধ্যে, সকাল বেলা স্কুলে যাবার আগে থেকে এমন টের পাওয়া গেছে। মাগরিবের পরে সজীব এর নাম্বারে কল দিল কিন্তু নাম্বার বন্ধ।

সজীব কিন্তু যুথিদের বাসা থেকে বের হয়ে নানার বাড়িতে যায় নাই। স্যারের বাসায় যেন আপাতত আর যেতে নাহয় তাই অজুহাত দিয়ে চলে এসেছে যেটা নিজের বুদ্ধির কারবারি। সজীব লক্ষ্য করে দেখল যে মাত্র দুইদিনের মধ্যে সে বেশ কয়েকবার যুথিদের বাড়িতে গেছে। এভাবে আর যাওয়া ঠিক বলে মনে হচ্ছে না সজীব এর কাছে। সে তাদের মধ্যে এমন কেউ নয় যে তার অনুপস্থিতিতে তেমন কোনো ক্ষতি হবে। বরং সে উপস্থিত থাকলে তার প্রতি যুথির দুর্বলতা প্রকাশ পেতে পারে।

রাতের খাবার খেয়ে সজীব নিজের বিছানায় শুয়ে ডায়েরী বের করলো। ডায়েরির দ্বিতীয় পাতা দিয়ে পড়া শুরু করতে হবে, কিন্তু মনটা পড়ার দিকে আকর্ষণ করা যাচ্ছে না। তবুও মনের বিরুদ্ধে গিয়ে সে পাতা উল্টিয়ে পড়তে লাগলো।

"হৃদয়ের সবকথা নীরবতা"

দ্বিতীয় পাতাঃ-

রাতে আমি ভালো করে ঘুমাতে পারি নাই, সজীব ভাই আমার হাত ধরে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে সেটা বারবার মনে পড়ে গেল। ভাত খেতে বসে আমি একা একা হেসে দিলাম, মা তখন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। আমি মাথা নিচু করে ভাত মুখের মধ্যে দিয়ে না চিবিয়ে গিলে গিলে খেলাম। রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম, সজীব ভাই বড়শী দিয়ে মাছ ধরে বাড়ি যাচ্ছে আর আমি তাকে সেই মাছ রান্না করে দেবার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছি। রাতের সেই স্বপ্ন দেখে আমি খুব মেজাজ খারাপ করলাম, এ ধরনের স্বপ্ন দেখার মানে কি? কি বিশ্রী।

আমাদের স্কুলে যেমন শুক্রবার বাদ দিয়ে সপ্তাহের বাকি ছয়টা দিন সকাল বেলা স্কুলে যাই। তেমন করে চলছে জীবনের গতি, আর সজীব ভাই মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসে। তবে তার সঙ্গে বেশিরভাগ সময় তার ক্লাসের দু একটা বন্ধু সঙ্গী হিসেবে থাকে।

স্কুলের কমনরুমে বসে সজীব ভাইয়ের ক্লাসের মেয়েরা মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে কথা বলে। সজীব ভাইর নাম শুনলে আমি কান খাড়া করে তাদের কথা শুনতাম। মাহফুজা নামের একটা মেয়ে যিনি সজীব ভাইয়ের ক্লাসে পড়ে, তিনি নাকি একটা চিঠি লিখেছেন। সজীব ভাই সেই চিঠি স্যার এবং ক্লাসের সকলের সামনে পড়ে শুনিয়েছে। মেয়েটা খুব লজ্জা পেয়ে গেছে, চিঠি পড়ার সময় সবাই নাকি হাসাহাসি করছিল। কিন্তু তার পরে স্যার নাকি খুব বকা দিয়েছে, বেশ করেছে। আমার মন চাচ্ছিল আমি তাকে আমাদের স্কুলের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট খালের পানিতে ফেলে দিবো।

( এটুকু পড়ে সজীব হেসে দিল, কারণ যুথি এখন যেমন করে সজীবকে পানিতে ফেলে দিবো বলে। সেই অভ্যাস তার অনেক আগে থেকেই তৈরী হয়ে গেছে, তাই তখনকার সময়ে লেখা ডায়েরিতেও সে পানির কথা উল্লেখ করেছে।)

ক্লাস নাইনে উঠে মাঝামাঝি সময়ে আমি বুঝতে পেরেছি যে সজীব ভাইয়ের প্রেম পরেছি। তখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো তাকে দেখতে না পেলে, খুব খারাপ লাগতো। যখন আমার পাগলামি বৃদ্ধি পেতে লাগলো তখনই সজীব ভাই স্কুল বন্ধ দিতে আরম্ভ করলেন। এক সপ্তাহে মাত্র একদিন ক্লাস করেছে আর পুরো সপ্তাহ তাকে দেখতে পাইনি। সহ্য করতে না পেরে বাসায় গিয়ে বাবার সঙ্গে জিজ্ঞেস করলামঃ-

" বাবা সজীব ভাই ইদানীং স্কুলে যায় না, তারপর আমাদের বাড়িতেও আসে না। আর সামনে তার এসএসসি পরীক্ষা, এমন সময় সে এভাবে ক্লাস বন্ধ দিচ্ছে কেন? "

" বাবা বললো, বইয়ের পড়া শেষ হয়ে গেছে তাই এখন ক্লাস করা বেশি সময় নষ্ট হচ্ছে। স্কুলে এসে চার ঘন্টা বসে না থেকে বাসায় বসে দুই ঘন্টা যদি পড়ে সেটাই কাজে দেবে। "

বাবার উপর তখন মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, সে নিশ্চয়ই এটা বলেছে। বললামঃ-

" তো এই মহান বুদ্ধিটা কি তোমার টাকলা মাথা থেকে বের হয়েছে নাকি অন্য কেউ দিয়েছে? "

" হাহাহা, আমিই বলেছি, ওদের মাধ্যমে স্কুলের ভালো একটা রেজাল্ট আশা করে সবাই। তাদের যেভাবে ভালো হবে সেটাই চিন্তা করা হচ্ছে, আর এজন্য এই ব্যবস্থা। "

সজীব ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হওয়া কমে গেল, আমি নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ করতে লাগলাম। নিজের মনে মনে শুধু প্রার্থনা করতাম যে সজীব ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না হোক কিন্তু সে অন্য কারো না হয়।

টেস্ট পরীক্ষার আগে একদিন সজীব ভাই যখন আমাদের বাড়িতে এলো তখন আমি মায়ের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছি উঠোনে। সজীব ভাই যখনই প্রবেশ করলো আমি লজ্জায় দৌড় দিলাম তার সামনে থেকে পালানোর জন্য। কিন্তু আমি পিছনে ফিরতেই আমাদের উঠোনের মাঝারি আমগাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আমি চিৎপটাং।

মানসম্মান সব পুকুরের পানিতে ধুয়ে গেল, আমি লজ্জায় চোখ বন্ধ করে সেভাবেই শুয়ে রইলাম। আর সজীব ভাই ভেবেছেন আমি মনে হয় বেশি আঘাত পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছি। ভেবেছিলাম সে আমাকে ধরে তুলতে চেষ্টা করবে নাহলে মাথার কাছে ঝুঁকে কিছু জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু খচ্চর বেডা সেটা না করে বাবাকে ডাকতে লাগলো, খুব মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আমি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বললামঃ-

" হয়েছে আর মহান হতে হবে না, আমার কিছু হয় নাই তাই কাউকে ডাকতে হবে না। "

" কিন্তু এই মাত্র তো দেখলাম তুমি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে চিৎ হয়ে গেলে। "

" তো কি হইছে? মরে গেছি? নিজে তো দৌড়ে এসে তুলতে পারতেন। ওহ্হ আচ্ছা, ভেবেছেন যে যদি মরে যায় তাহলে তো লাশ স্পর্শ করে আবার জেলে যেতে হবে। "

সজীব ভাই আমার কথা শুনে আমার দিকে খুব সুন্দর করে তাকিয়ে আছে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি হারিয়ে গেলাম তার চোখের ভাষার মাঝে। এতো সুন্দর করে তাকিয়ে আছে কেন? ইস আমার লজ্জা করে না বুঝি? তার সেই চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা কবিতা বানিয়ে ফেলেছিলামঃ-

কেন তাকাও এভাবে?

তুমি কি আমার মনের খবর জানো?

তোমার জন্য মনে মনে -

মনের একান্ত সন্ধিক্ষণে ;!

অনেক স্বপ্ন সাজিয়ে রেখেছি,

সবকথা নীরবতায় রয়ে গেছে প্রিয়।

মনের গহীনে লুক্কায়িত চুপিসারে -

প্রেম কি ব্যর্থতা জানে?

সে কি মনের কথা না মেনে আমার কথা মানে?

একটু হাসো,

আরেকটু হাসো।

বাহহ কি সুন্দর তোমার হাসি।

তাইতো বড্ড বেশি ভালবাসি, - প্রিয়।

গ্রহণ করো মোরে,

এক টুকরো মেঘ জমেছে নীল নীড়ে।

তুমি আমার,

হ্যাঁ শুধুই আমার।

তোমার চোখ দুটো দেখুক আমায়,

সাথী করে ঠাই দিক, মনের পারায়।

---

মনে মনে কবিতা সৃষ্টি করলাম।

" সজীব ভাই বললেন, কি হইছে তোমার? "

" আমি লজ্জায় লাল হয়ে শাড়ির আঁচল মুখের মধ্যে কামড় দিয়ে বললাম, অভাবে তাকিয়ে কি দেখছেন সজীব ভাই? "

" ভাবছি তুমি এমন করে মুখে মুখে কথা বলার সাহস কবে থেকে করলে? "

" সাহস সবার জন্য নয় "

দ্বিতীয় পাতা শেষ করে সজীব ঘুমিয়ে গেল।

★★

তিনদিন হয়ে গেছে, সজীব এর সাথে যোগাযোগ নেই যুথির। সেদিন বিকেলে সজীব বলে গেছে সে নানা বাড়িতে চলে যাবে কিন্তু তাই বলে মোবাইল বন্ধ কেন? যুথির কাছে খটকা লাগলো তাই সে আজ বিকেলে সজীবদের বাড়িতে গেল। যুথি সব সময় শাড়ি পরে তাই আজকেও বিপরীত নয়, সে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করে প্রথমে সজীব এর মায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

" আসসালামু আলাইকুম আন্টি। "

" ওয়া আলাইকুম আসসালাম, কেমন আছো তুমি? "

" আলহামদুলিল্লাহ, আপনারা ভালো আছেন? "

" হ্যাঁ সবাই ভালো, আমি আজকে দুপুরেও খাবার খেতে বসে সজীবের কাছে তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছি। সজীব বললো তুমি নাকি ব্যস্ত? "

" যুথি অবাক হয়ে বললো, সজীব ভাই বাড়িতে আছে? "

" হ্যাঁ, নিজের রুমে আছে। তোমার বাবার শরীর কেমন আছে? "

" জ্বি বাবা ভালো আছে, আন্টি আমি বরং আজ চলে যাচ্ছি, আরেকদিন আসবো। "

কথাটা বলে শেষ করার আগেই সজীব মা মা বলে ডাকতে ডাকতে যুথি এবং সজীবের মায়ের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। সম্মুখে যুথি দাঁড়িয়ে আছে সেটা দেখে সজীব চুপসে গেল।

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ১৩ গল্পের ছবি