হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ১০

🟢

- সজীব বললো, শীতের দিনে গ্রামের পুকুরের পানিতে ফেলে দিতে কেউ পারে? তাহলে তো টাইটানিক জাহাজের সে যাত্রীদের মতো ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে যাবো।

- কার সাথে কথা বলছিলেন?

- কেন? আমার এক অফিস সহকর্মী, চাকরি চলে যাবার পর সে আমাকে মনে রেখেছে।

- মেয়ে মানুষ তো তাই মনে রেখে যাবে কোই?

- তুমি কেমন অদ্ভুত রকমের কথা বলো।

- কিরকম?

- একদম বৃষ্টির মতো, যেই বৃষ্টির জন্য এতকিছু হয়ে গেল আমার জীবনে সেই বৃষ্টির ছায়া যেন সম্পুর্ণ তোমার মধ্যে এসেছে।

জুথির মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল, বৃষ্টির কথা চলে আসবে সেটা কল্পনায় ছিল না। আর যেহেতু এই মুহূর্তে সজীব এর মাথার মধ্যে বৃষ্টি চলে এসেছে তখন আর কথা বলে লাভ নেই। বললোঃ-

- ঠিক আছে আপনি তাহলে চলে যান, আর পানি গায়ে দিয়ে ভিজিয়ে দেবার জন্য ক্ষমা করবেন। এ কথা বলে জুথি ভিতরে চলে গেল, আর সজীব থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

সজীব মনে মনে ভাবলো যে, কি হলো? তার মনে পরে গেল বৃষ্টির কথা জুথি সহ্য করতে পারে না। সে বলেছিল অনেক আগে বৃষ্টির জন্য তার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। সজীব বুঝতে পারল যে, এমন সময় বৃষ্টির বিষয় না তুললেই ভালো হতো। সে আসার পর থেকে চোখে মুখে কতটা আনন্দ নিয়ে কাজ করছিল, আর সজীব সেটা মাটি করে দিল। ফিরে যেতে চেয়েও সজীব যেতে পারে নাই, আবারও ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো। পা টিপে টিপে জুথির রুমের মধ্যে প্রবেশ করলো, স্যার ঘুমাচ্ছে, জুথির মায়েরও কোন শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।

সজীব দেখল জুথি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছে। পিছন থেকে গিয়ে সে যখন জুথির ঠিক পিছনে দাঁড়াল তখন জুথি আয়নায় সজীবের উপস্থিতি দেখতে পেল।

- আয়নার মাঝেই জুথি সজীবের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, " কি হলো? "

- কিছু না, এক অজানা কারণে যেতে পারি নাই বলে ভিতরে প্রবেশ করলাম।

- সেই অজানা কারণ যদি আমি হয়ে থাকি তবে প্লিজ মাফ করবেন, আমি কোন চলন্ত মায়া ধরে বাঁচতে চাই না।

- তাহলে বাড়ির সামনে গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসো, বাড়ির সদস্য হিসেবে এটা তোমার কিন্তু কর্তব্য পালন করা উচিৎ।

- ঠিক আছে আপনি বের হন আমি আসছি।

জুথির দৃষ্টি এড়িয়ে সজীব জুথির ডায়েরি নিজের জ্যাকেটের মধ্যে লুকিয়ে নিল, তারপর আস্তে করে বের হয়ে গেল। জুথিও পিছনে পিছনে বের হয়ে আসলো ঠিকই কিন্তু তার ডায়েরিটা অপহরণ হয়ে গেছে সেটা বুঝতে পারে নাই।

- সজীব বাইক স্টার্ট দিয়ে থেমে আছে, জুথি তার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে বললো " আবার আসবেন "

- আচ্ছা ঠিক আছে, বাড়িতে যে কদিন আছি সে কয়দিনের মধ্যে দেখা হবে।

- আগামীকাল সকালে কি আপনি ফ্রী আছেন?

- কেন?

- আপনাকে আমাদের স্কুলে নিয়ে যেতাম।

- হঠাৎ করে স্কুলে কেন?

- একটা জরুরি কাজ করাতে হবে আপনাকে দিয়ে তাই নিয়ে যেতে চাই।

- আচ্ছা ঠিক আছে সকালে আমি স্কুলে চলে যাবো।

- বাইক নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসবেন তারপর আমাকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে যাবেন।

- এটা কিন্তু ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম নয়, গ্রামের বাড়ি অনেকে অনেক কিছু ভাবতে পারে।

- হাহাহা, সজীব ভাই আপনি বাচ্চাদের মতো কথা বলেন কেন? এ ধরনের কথা যদি সেই ক্লাস নাইন টেনে পড়ার সময় বলতেন তবে মানা যেত।

- বুঝতে পারছি, আচ্ছা ঠিক আছে সকাল বেলা তৈরি হবার আগে কল দিও।

- মেলা মেলা ধন্যবাদ সজীব ভাই।

- একটা প্রশ্ন করার ছিল।

- জ্বি করুন।

- তুমি কি সবসময় শাড়ী পরে থাকো নাকি আজ হঠাৎ করে পরেছো?

- তিন বছর ধরে আমি সবসময় শাড়ী পরি, এখন একদম অভ্যাস হয়ে গেছে। থ্রি-পিছ পরতে গেলে এখন খুব লজ্জা লাগে সজীব ভাই।

- কিন্তু হঠাৎ করে শাড়ী পরার অভ্যাস কেন?

- জুথি হাসলো কিছু বললো না।

- হাসছো কেন?

- তিন বছর আগে একদিন বাবার একটা ছাত্র আমাদের বাড়িতে এসেছিল। সেদিন আমি সখ করে মায়ের একটা শাড়ী পরেছিলাম, আর সেই শাড়ী পরা দেখে বাবার ছাত্র বললোঃ-

" বাহ জুথি তোমাকে তো শাড়ী পরলে অনেক সুন্দর লাগে, তুমি যদি সবসময় শাড়ি পরে থাকো তাহলে খুব ভালো দেখাবে। অবিবাহিতা মেয়েরা সচারাচর সব সময় শাড়ী পরে না কিন্তু তুমি যদি সবসময় শাড়ি পরে থাকো তাহলে তুমি সবার থেকে আলাদা। "

সেদিন তার সেই কথা বলার পর থেকে আমি শাড়ী পরতাম সবসময় কিন্তু কপাল খারাপ তাই তাকে কখনো দেখাতেই পারিনি।

কথাটা বলে জুথি অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।

সজীব হেসে দিল, কথাগুলো সে নিজেই কোন একদিন জুথিকে বলেছিল। তখন সে পড়াশোনা করার একদম শেষের দিকে ছিল, কিন্তু জুথি সেই কথা আজও মনে রেখেছে। অথচ সজীব নিজেই নিজের কথা ভুলে গেছে, আর আজকে জিজ্ঞেস করে মন খারাপ করে দিয়েছে জুথির৷

- সজীব বললো, যাই তাহলে?

- একটা কথা ছিল, আদেশও বলতে পারেন।

- আচ্ছা বলো।

- আমার বিয়ের জন্য বাবার কাছে কিছু বলতে হবে না, আর মা-বাবা তাদের মেয়ের জন্য চিন্তা করবে সেটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু আপনি সেই চিন্তার মধ্যে গিয়ে চিন্তা দুর করার চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকুন।

- কেন? বিয়ে করতে সমস্যা কোথায়?

- আছে সমস্যা, আপনি বরং আপনার নিজের বিয়ে নিয়ে চিন্তা করুন। আমার মা-বাবার জন্য তো আমি আছি, কিন্তু আপনার মা-বাবার জন্য কেউ নাই। আপনি আছেন ঠিকই কিন্তু আপনার দ্বারা তো কোন কাজ সম্ভব না তাই বিয়ে করে বউ নিয়ে আসুন।

- আচ্ছা ঠিক আছে।

---

ব্যাডমিন্টন মাঠের মধ্যে মাইক বন্ধ হয়ে গেছে সেই জোহরের আজান দেবার সময়। এই মুহূর্তে মাঠে কিছু ছেলেরা আছে ঠিকই কিন্তু তারা মাইক অন করছে না। সজীব সেই ছেলেদের মতো শিমুল কে দেখতে পেল, শিমুল আর সজীব একসময় স্কুলে একসাথে পড়তো। এসএসসি পাস করা পর্যন্ত তারা একসাথে ছিল, তারপর সজীব চলে গেছে শহরে আর শিমুল ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হয়েছিল কিন্তু পরীক্ষা দেয় নাই। পরিবারের হাল ধরে সে হয়ে গেল কর্মজীবী মায়ের সন্তান। বছর পাঁচেক আগে সে নিজের জমানো কিছু টাকা আর বাকি কিছু টাকা ধার করে দোকান দিয়েছে বাজারে।

- সজীবকে দেখে শিমুল বললো, আরে দোস্ত যে.! কেমন আছো তুমি?

- আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো আছি, তোমার কি খবর শিমুল সাহেব? (অনেকদিন যোগাযোগ না থাকলে হঠাৎ করে তুই শব্দটাও আপনিতে রূপ নেয়)

- আছি ভালোই, গ্রামে কবা আসা হলো?

- আজকে সকালেই।

- বেশ ভালো হয়েছে, আজকে রাতে এখানে খুব জমকালো আয়োজন করেছি। তুমি রাতে আসতে পারবে?

- আচ্ছা ঠিক আছে আসবো, এখন তাহলে যাই? বাড়িতে বেশ কিছুদিন থাকবো তাই পরে একদিন তোমার দোকানে গিয়ে আড্ডা হবে।

- আচ্ছা রাতে এসো কিন্তু।

- হ্যাঁ আসবো।

বাসায় ফিরে ডায়েরি পড়বে কি পড়বে না সেটা নিয়ে দ্বিধা করছে মনের মধ্যে। ডায়েরি হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গেল তাই আর পড়া হলো না। ঘুম ভেঙ্গে গেছে মায়ের ডাকে, চারিদিকে তখন মাগরিবের আযান দিচ্ছে।

মাগরিবের নামাজ পড়ে সজীব নাস্তা করলো, চা নাস্তা শেষ করে আবারও বেরিয়ে গেল ব্যাডমিন্টন মাঠের উদ্দেশ্যে।

মাইক চলছে, এই গ্রামের একলোক ধারাভাষ্যকার হিসেবে বসে আছেন। তিনি সবার কথা বলে যাচ্ছে কিন্তু কেমন একটু ধাক্কা ধাক্কা লাগে।

সজীব বসেছিল চেয়ারে, অনেকেই চেয়ারে বসার স্থান পেয়েছে তবে বেশিরভাগ দাঁড়িয়ে আছে। সেই অল্পকিছু বসা মানুষের মধ্যে সজীব এর স্থান করে দিয়েছে ছেলেরা নিজেরাই। সজীব যেহেতু একটু সিনিয়র, তারমধ্যে আবার শহর থেকে চাকরি করে আসা ব্যক্তি, তাই আপ্যায়ন অন্যরকম।

বসে থাকার আধা ঘণ্টা পরে হঠাৎ একটা ছেলে এসে সজীব এর কানে কানে বললোঃ-

- ভাইয়া আপনাকে জুথি আপু ডাকে।

- সজীব অবাক হয়ে বললো, এতরাতে? তোমার জুথি আপু কোথায়?

- ওইদিকে পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, আপনি চলুন আমি নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে।

- তাকে গিয়ে বলো, এখন আমি যেতে পারবো না।

ছেলেটা চলে গেল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আবার এসে ডাক দিল " ভাইয়া? "

- কি হইছে?

- জুথি আপু বললো, তাদের পুকুরের পানি নাকি দুপুরের চেয়ে এখন আরও বেশি ঠান্ডা হয়ে গেছে। তাই সেই পানির কথা চিন্তা করে আপনাকে যেতে বলেছে, নাহলে কি কি যেন বললো...!

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ১০ গল্পের ছবি