- সজীব বললো, বৃষ্টির সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল কলেজে ভর্তি হবার পর থেকে। কিন্তু তুমি গ্রামের বাড়িতে ছিলে তাই তোমার তো জানার কথা নয় বৃষ্টির বিষয়।
- জানতে পেরেছি বলে কি অন্যায় হয়ে গেছে?
- না তবে অবাক হলাম খুব।
- আপনার মধ্যে আবার অবাক হবার অনুভূতি আছে নাকি? যে মানুষ সবকিছু বুঝেও অভিনয় করে সে কিছু বুঝতে পারে না। যে মানুষ আমার লেখা ডায়েরি পড়েছে, যেই ডায়েরির পাতার সব কথাগুলো শুধু তাকে ঘিরে। তবুও সে কি একবার একটু গুরুত্ব দিতে পারতো না?
- কিসের ডায়েরি? আমি তো কোন ডায়েরি পড়ি নাই কখনো!
- হাহাহা, হাঁসালেন সজীব ভাই। আচ্ছা যাইহোক বাদ দেন আমার এসব অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা। বাবার শরীর ভালো নয় তাই, আপনার কথা প্রায়ই বলাবলি করেন। যদি পারেন একটু তার সাথে কথা বলবেন আর গ্রামের বাড়িতে আসলে একটু দেখা করতে আসবেন।
- আচ্ছা ঠিক আছে, কিন্তু সত্যি বলছি আমি তো কোন ডায়েরি পড়ি নাই।
- আচ্ছা আমার ভুল হয়েছে, মাফ করবেন।
- আশ্চর্য এখানে মাফ করার কি হইছে?
- কিছু না, রাখলাম সজীব ভাই।
- আচ্ছা।
কল কেটে দিয়ে জুথি কিছুক্ষণ সজীব এর নাম্বার ভালো করে দৃষ্টি দিয়ে দেখলো। এতদিন মোবাইল এর মধ্যে ছিল কখনো ব্যবহার করা হয়নাই, আজ কতদিন পরে কথা হলো। কণ্ঠ ঠিক সেই আগের মতো আছে, কথার মধ্যে কেমন একটা অজানা রহস্যময় জড়িয়ে দেয়। না না, জুথি এসব নিয়ে কেন ভাবছে? সে সজীব কে ভুলে গেছে, তার সেই দুরন্তপনা শৈশবের কথা মনে করতে চায় না। তবু কেন আবারও বারবার মনে হচ্ছে তার কথা? সে তো আমাকে নিয়ে এত ভাবে না তাহলে আমি আর কত একা একা তাকে নিয়ে ভাববো?
বিছানায় শুয়ে বিরক্তি অবস্থায় আছে জুথি, চোখ দিয়ে ঘুম পালিয়ে গেছে। অনেকদিন পর আজকে ঘুম পালিয়ে গেল, বাহিরে অদ্ভুত শিশিরের টুপটাপ পতনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। জুথি বিছানা থেকে উঠে রুমের বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে, শীতের রাতে কম্বলের ভিতর থেকে বের হয়ে গেছে সে। টেবিলে অনেকগুলো বইয়ের নিচে ডায়েরিটা আজও খুব একা একা পরে আছে। জুথি সেটা হাত দিয়ে স্পর্শ করে রেখে দিতে চাইল, আবার কি ভেবে হঠাৎ করে সেটা বের করে আনল।
কিছু যখন ভালো লাগে না তাই পুরনো কিছু স্মৃতি পড়তে খুব ইচ্ছে করছে। প্রথম পাতা উল্টিয়ে এক নজর দেখে সেটাই পড়তে ইচ্ছে করছে। প্রাথমিক দিকে জুথি তার ডায়েরির কোন নাম দেয় নাই, তবে অনার্স শেষ হওয়ার সময় যখন ডায়েরির সব পৃষ্ঠা গুলো ফুরিয়ে গেছে তখনই থেমে গেছে তার লেখার হাত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ডায়েরি ফুরিয়ে গেছে তবুও সেখানে এখনো সে নিজের ভালবাসার সফলতা লিখতে পারে নাই। কেবল শেষ একটা পৃষ্ঠা খালি রেখে দিয়েছে জুথি, কোন একদিন সেটাও পূর্ণ করে দিতে হবে।
আচ্ছা, আজকের কথোপকথন দিয়ে যদি শেষ করে দেয় তাহলে কেমন হবে? না থাক, ব্যস্ত শহরের মাঝে মাইলের পর মাইল হাঁটা বেকার ছেলেটা যেমন করে ২০ টাকার নোটটা আগলে রাখতে চায়। ঠিক তেমন করে এই একটা পাতা খালি রাখতে চায় জুথি। জুথি তার ডায়েরির নাম দিয়েছে একটা। যেহেতু তার সম্পুর্ণ ডায়েরি জুড়ে শুধু নিজের একার মনের কথা রয়েছে তাই ডায়েরির নাম দিল,
" হৃদয়ের সবকথা নীরবতা "
পৃষ্ঠাঃ- ০১
আজকে সজীব ভাইয়ের সাথে আমার সবচেয়ে বেশি কথা হয়েছে। প্রথমে আমাকে খুব বেশি করে বকা দিয়েছে তারপর নিজে এসে আমাদের বাড়ি দিয়ে গেছে। রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে অন্ধকারে হোঁচট খেয়ে পরে গেলাম, তারপর সজীব ভাই আমার হাত ধরে নিয়ে এলেন।
আজকে ছিল শুক্রবার, আমার এক বান্ধবী আছে তাদের বাসায় যেতে ৬/৭ মিনিট সময় লাগে। সেই বান্ধবীদের বাসায় টিভি আছে, আর যেহেতু আজ শুক্রবার তাই টিভিতে প্রচারিত হয়েছিল পূর্ণদৈর্ঘ বাংলা ছায়াছবি "অন্তরে অন্তরে"। সালমান শাহ মৌসুমি অভিনীত ছবিটা দেখে সেই একটা ভালো রোমান্টিকতা ছুয়ে গেছে আমাকে।
শীতের সময় সূর্য তাড়াতাড়ি ডুবে যায় আর দিন গুলো হয় ছোট ছোট। গরম কালে যেখানে সন্ধ্যা সাতটা বাজে মাগরিবের আযান দেয় সেখানে শীত কালে সাড়ে পাঁচটার আগেই আজান দিয়ে দেয়।
ছবির মধ্যে এতটা আকর্ষণ ছিল যে আমি সমাপ্ত না দেখে আসতে পারছিলাম না। কিন্তু মাগরিব পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে এবং আমাকে যে দুটো বড় বাগান পেরিয়ে বাড়ি যেতে হবে সেটা মনের মধ্যে আসে নাই। কিন্তু যখন বের হয়ে দেখি যে রাতের আধার ঘিরে আসছে তখন বুকের মধ্যে ধপাস করে উঠলো। বাবা যদি এখনো বাজার থেকে না ফিরে থাকে তাহলে মা নির্ঘাত আমাকে আজ ঝাড়ু পেটা করবে। এমন কথা ভাবতে গেলে মনটা খারাপ হয়ে গেল, বান্ধবীও আমার মতো ছোট তাই সে আর কি করবো? আমি তখন সেই অন্ধকারে দৌড় দিলাম এমন অবস্থা মনে হচ্ছে।
ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দুমিনিট হাঁটতে হয় তারপর বাগানের মধ্যে পথ। আমি রাস্তায় উঠে দেখি কে যেন পিছন থেকে আসছে, তাকে দেখে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। আমি বাগানের মধ্যে প্রবেশ করার আগ মুহূর্তে একটা শেকড়ের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে পরে গেলাম মাটিতে। পিছনের হেঁটে আসা লোকটা এগিয়ে এলো আমার দিকে, আমি তখনো মাটিতে পরে আছি।
- সে কাছেই বললো, কে? কে ওখানে?
আমি চমকে উঠলাম, আরে এ তো সজীব ভাই কথা বলছেন। আমি আনন্দে হেসে দিলাম কিন্তু সেই হাসি সজীব ভাই দেখতে পেল না কারণ দেখা যাচ্ছে না মুখটা।
বললাম, সজীব ভাই আমি জুথি!
- জুথি? তুমি এতরাতে রাস্তায় বসে আছো? কি হইছে তোমার?
- হোঁচট খেয়ে পরে গেলাম তো, দেখতে পাননি আমি দ্রুত হাঁটছি?
- কিন্তু কোথায় গেছিলা তুমি?
- কবিতাদের বাড়িতে ছবি দেখতে গেছিলাম, কিন্তু এত রাত হবে বুঝতে পারিনি।
- আচ্ছা ঠিক আছে তুমি চলো তাড়াতাড়ি, আমি তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসবো। আর এসব ছবি না দেখলে কি হয় শুনি? বিকেল বেলা পড়াশোনা করবা কাজে দেবে, সিনেমা নাটক দেখার সময় সারাজীবন পরে আছে। এখন হচ্ছে পড়ার সময় তাই পড়াশোনা করতে হবে বেশি বেশি।
- সবাই কি আপনার মতো বইপোকা নাকি? আমি বেশিক্ষণ পরতে পারি না। আমার সারাক্ষণ শুধু ঘুরতে ইচ্ছে করে, কিন্তু মায়ের জন্য পারি না।
- তাহলে তো আন্টির কাছে আরও ভালো করে বলে আসতে হবে যেন শাসন আরো বেশি করে।
- আমি হাঁটা বন্ধ করে ধপ করে দাঁড়িয়ে গেলাম, আর তিনি কথা বলতে বলতে হেঁটে গেল। কিন্তু দশ পা এগিয়ে গিয়ে দেখল আমি নেই তখন সে বললো, কি হইছে?
- আমি কান্না মন খারাপ করার মতো করে তাকে বললাম, এমনিতেই মা আমাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেয় না। সবসময় খুব শাসন করে, আপনি যদি কিছু বলেন তাহলে একদম তালা দিয়ে বন্দী করবে আমাকে।
- হাহাহা, আচ্ছা ঠিক আছে বলবো না, তুমি যেন কোন ক্লাসে পড়ো?
- ক্লাস সেভেন, আর আপনি ক্লাস এইট।
- তুমি আমাকে ভালো করে চেনো মনে হচ্ছে।
- হ্যাঁ আপনার কথা বাবা সবসময় বলে, আমি বাবার কাছে বেশি শুনি আপনার কথা।
- আচ্ছা ঠিক আছে বুঝতে পেরেছি, জোরে জোরে পা চালাও।
---
- সিয়াম কল দিয়ে বললো, তুমি তো জানো আমি তোমার সাথে ঝগড়া না করে কিছু হজম করতে পারি না। তবুও কেন বারবার আমার ঝগড়া নিয়ে রাগ করো? আমি ঝগড়া করবো, তুমি খুব সুন্দর করে তখন ভালবাসা দিয়ে কথা বলবে।
- রাত্রি বললো, অনেক দিনের সম্পর্ক তাই খুব বেশি ঝগড়া সহ্য করতে পারি না। এখন শুধু বিয়ে করতে ইচ্ছে করে, তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয় অন্তরের অন্তস্তলে ঢুকে গেছে।
- ভালবাসার মধ্যে তোমার দুর্বলতা আছে নাহলে ভয় করবে কেন?
- মাথা গরম করার মতো কথা বলবা না, দুর্বলতা মানে কি? থাবড়াইয়া কান লাল করে দিমু।
- পারবা তো?
- হুম অবশ্যই, ওরে পিডান পিডামু রে।
- আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি রাত্রি।
- কি সিদ্ধান্ত...?
- আমরা দুজনেই যেহেতু চাকরি করি তাই আর দু'বছর পরে বিয়ে করতে চাই। আমি বিএসসিতে পড়ছি, তুমিও ভর্তি হয়ে যাবে আর আমরা পড়ার পাশাপাশি চাকরি করে যাবো। দুজনেই পড়াশোনা শেষ করে তারপর খুব ভালো একটা অবস্থানে দাঁড়িয়ে বিয়ে করবো।
- হঠাৎ করে তোমার কি হইছে সিয়াম?
- দেখ রাত্রি, এখন বিয়ে করলে হয়তো দুজনের কিন্তু খুব চাপ পরবে। আর যেহেতু আমরা দুজন নিজেরা চাকরি করি তাই তোমাকে তো তোমার পরিবার জোর করে বিয়ে দেবে না তাই না?
- একটা প্রশ্ন করতে চাই।
- করো।
- তুমি কি আদৌ আমাকে বিয়ে করতে চাও নাকি মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখো?
- এটা কেমন কথা রাত্রি?
- যেটা মনে হচ্ছে সেটাই বলছি, তোমার কি মনে আছে তুমি অনেকদিন আগেই আমাকে বিয়ে করা নিয়ে খুব চাপ দিচ্ছিলে?
- হ্যাঁ মনে আছে, তখন তুমি রাজি হও নাই, আর এখন তুমি বলছো কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এখন বিয়ে করা ঠিক না। তাই দুজনের দুটো আপত্তি বহাল থাকছে, এরপর যেকোনো একজন যখন বলবো তখনই বিয়ে করবো।
- ঠিক আছে বুঝতে পেরেছি।
- কি?
- সেটা নাহয় না বললাম।
---
সকাল বেলা প্রজেক্টের সাইডে হাটাহাটি করছিল সজীব, সূর্য খুঁজে পাওয়া যায় না। তার গায়ে এখন শীতের চাদর জড়িয়ে রাখা, জ্বর এসেছে কিন্তু তা কমছে না। চোখের সামনে পিলার পাইলিং কাজ চলছে, সজীব সেটা তাকিয়ে দেখছে। সজীব এই দৃশ্য আগেও দেখেছে কিন্তু আজকে একটু অন্য রকম ভালো লাগছে।
রাত্রিকেও আজকে কেমন যেন খুব ভালো লাগছে দেখতে, সে তার হাতে দুকাপ চা নিয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে। বড় বড় পাইলিং আগে উপরে তৈরী করা হয়েছে, সেগুলো মেশিনের সাহায্যে বসানো হচ্ছে। সবাই অনেকটা রিস্ক নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, সজীব এর দিকে তাদের আগ্রহ নেই একটুও।
- স্যার আপনার চা।
সজীব হাত বাড়িয়ে চা নিতে পারে নাই তার আগে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। মেশিন দিয়ে তৈরি করা ৭০ ফিটের পাইলিং খাঁড়া করে সোজা বসানোর সময় রড ছিঁড়ে গেল। দানবের মতো সেই পাইলিং পরে যাচ্ছে একদিকে, রাত্রে তার মুখ থেকে শুধু বললো, " স্যা...র।
সবাই মোটামুটি দৌড়ে সরে গিয়েছেন কিন্তু শুধু একটা লোক পরে গিয়েছেন। তিনি একটা ইটের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে কিছুটা দুরে গিয়ে পরলেন আর সেই তৈরী করা পাইলিং পরলো তার পায়ের উপর। লোকটা শুধু মা বলে একটা চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।
লোকটাকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে, সজীব রাত্রি সহ আরো তিনজন এসেছে হাসপাতালে। টাকা খরচের যাবতীয় কিছু কোম্পানির নামে বিল করতে বললো, আর তখনই সমস্যা দেখা দিল।
ম্যানেজার স্যার কল দিয়ে আপত্তি করে জানাল যে এতটাই খরচ কেন করতে হবে? প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দাও। কিন্তু সজীব সেটা না করে ঘাড়ত্যাড়ামি করলো, যেভাবেই হোক সে শ্রমিকের চিকিৎসার ব্যবস্থা কোম্পানির পক্ষ থেকে করাতে চাইছে।
কিন্তু সকল আশা ভেঙ্গে গেল, কারণ আসরের খানিকটা পরে ম্যানেজার কল দিয়ে বললোঃ-
- তোমাকে আর ডিউটি করতে হবে না, তুমি ঢাকা হেডঅফিসে আসো এবং তোমার পাওনাকড়ি নিয়ে চলে যাবে। তোমাকে আমরা চাকরি থেকে বাদ দিতে চাচ্ছি, তোমার ডিউটি করতে হবে না।