মা'কে উদ্দেশ্য করে বাবা বললো, তোমার ছেলের মোবাইলে একটা মেয়ের ২৩২ টা ছবি আছে, কিন্তু তোমার আমার কোন ছবি নেই। ছেলে তো বড় হয়ে গেছে তাই হয়তো আমাদের বুড়ো বুড়ী আর দরকার নেই।
আমি নিজের রুম থেকে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি মা আর বাবা আমাকে নিয়ে আলোচনা করছে। কিন্তু বাবা আমার মোবাইলে ছবি কীভাবে দেখলো সেটা বুঝতে পারছি না।
- মা বললো, কেমন দেখতে মেয়েটা? আমার ছেলের পছন্দ তো খারাপ হতে পারে না তাই না?
- লে হালুয়া.. তুমিও দেখি তালে তাল মিলিয়ে কথা বলে যাচ্ছ। আমি একটা বেদনার কথা বলে একটু শান্তনা চাচ্ছি আর তুমি কিনা সেই মেয়ের চেহারা নিয়ে ব্যস্ত?
- ওহ তোমাকে নিয়ে যত জ্বালা, আমার যে ছেলে মেয়েদের থেকে সবসময় দুরে থাকে সেই ছেলে একটা মেয়ের ২৩২ টা ছবি রেখেছে। এটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে, তুমি তাড়াতাড়ি করে সেই মেয়ে খুঁজে বের করার চেষ্টা করো। আমার ছেলে যেহেতু চাকরি করে তখন সেই মেয়ের সঙ্গে আমি ওর বিয়ে দেবো। এরপর দাদী হয়ে যাবো আর সারাক্ষণ নাতি চোখের সামনে ঘুরঘুর করবে আহ কি মজা।
- আশ্চর্য হলাম সজীবের মা, এরমধ্যে তুমি সেই মেয়ে পুত্রবধূ বানিয়ে সরাসরি দাদী হয়ে গেলে।
- নয়তো কি? বুঝতে পারছি তোমাকে দিয়ে কাজ হবে না তাই আমি বরং সজীব এর সাথে কথা বলে সবকিছু বের করবো।
আমি এতক্ষণ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সব কথা শুনছিলাম, মা আমার রুমে আসবে শুনে তাড়াতাড়ি করে বিছানায় শুয়ে পরলাম। একটু পরেই মা আমার রুমে উপস্থিত হয়ে গেল আর আমিও সদ্য ঘুম থেকে ওঠার ভান করলাম।
- কিরে ঘুম ভাঙ্গলো?
- হ্যা মা, কি ব্যাপার তুমি এখানে?
- আট মাস পরে গ্রামের বাড়িতে আসলি মাত্র দুই দিন হলো, আবার তো চলে যাবি সেই ব্যস্ত শহরে। এখন যদি কাছাকাছি না থাকি কবে থাকবো?
- মা তুমি যখন অভিমান করে কথা বলো তখন পিচ্চি পিচ্চি লাগে তোমাকে।
- কিসের অভিমান? তোর বাবার জন্য তো সমস্যা নাহলে আমরা দুজন তোর সঙ্গে শহরে থাকতাম। তুই তো আমাদের একমাত্র সন্তান, শহরে শহরে কোথায় কি খাওয়া দাওয়া করো।
- মা আমি কিন্তু এসএসসি পাস করার পর থেকে শহরে শহরে আছি। তারপর কিন্তু আরো দশ বছর পেরিয়ে গেছে পড়াশোনা করতে করতে। আর জব করি তাও দুই বছর হয়ে গেছে, এখনো যদি তুমি আমার খাওয়া দাওয়া নিয়ে চিন্তা করো তাহলে কি মানায় বলো?
- ছেলে বুড়ো হয়ে গেলেও মায়ের চোখে সবসময় চিন্তার ছাপ স্পষ্ট থাকে।
- তা জানি আমি।
- তোর মোবাইলটা কোই?
- কেন মা?
- তোর বাবা বললো যে একটা মেয়ের নাকি ২৩২ টা ছবি আছে তোর মোবাইলে? আমি তাড়াতাড়ি সেই মেয়ে দেখতে চাই, বের কর।
- বাদ দাও না মা, কেন এমন করো?
- তুই বড় হয়েছিস না? তোকে এবার বিয়ে না দিয়ে শহরে পাঠাচ্ছি না বলে দিলাম। তাড়াতাড়ি ছবি বের কর আর সেই মেয়ের নাম ঠিকানা সব আমাকে বল। আমি তোর বাবাকে বলে সবকিছু ব্যবস্থা করে নেবো।
আমি হাত বাড়িয়ে মোবাইল বের করে দেবার আগেই মা বালিশের পাশ থেকে মোবাইল বের করে নিয়ে গেল। মোবাইলের প্যাটার্ন মা-বাবা দুজনের জানা আছে তাই মা লক খুলে নিজেই গ্যালারিতে গিয়ে ছবি দেখলো। আর আমি তখন চুপ করে মাথার উপর ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
- মা বললো, বাহ এত সুন্দর মেয়েটা? কীভাবে এ মেয়ে খুঁজে বের করলি রে? তুই বাড়িতে আসার আগে আমরা কত মেয়ের ছবি দেখলাম কিন্তু তা একটাও পছন্দ হলো না।
- হাহাহা, মা এগুলো সব আমার ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে তোলা তাই বেশি সুন্দর মনে হচ্ছে। বাস্তবে কিন্তু এত সুন্দরী নয়, তবে চেহারায় একটা মায়া মায়া ভাব আছে।
- নাম কি মেয়েটার?
- জানি না মা।
- মানে কি? বাসা কোথায় তার?
- কিছু জানি না আমি, শুধু একবার দেখা হয়েছে আর তখনই ছবিগুলো তোলা হয়েছে।
- আমি তো তোর বন্ধুর মতো, তোর বাবার মতো তো নয় তাহলে মিথ্যে কেন বলিস?
- ভালো করে দেখো মা, সবগুলো ছবিতে কিন্তু মেয়েটা একটা ড্রেসই পরে আছে। তার সাথে যদি দ্বিতীয় দেখা হতো তাহলে তো নতুন ড্রেসের ছবি অবশ্যই তুলতাম মা।
- তাই তো, আচ্ছা কোথায় পেলি তাকে? আর স্থান দেখে মনে হচ্ছে নদীর উপর কোনকিছুর মধ্যে বসে তোলা। আবার কিছু ছবিতে বাসও দেখা যাচ্ছে।
- ছবি গুলো সব মাওয়া ফেরির মধ্যে তোলা, ওরা যেখানে যেখানে গেছে আমি সেখানেই লুকিয়ে লুকিয়ে ছবি তুলেছি। তুমি তো জানো আমার ছবি তোলার খুব নেশা, তার মধ্যে যদি এত সুন্দরী মেয়ে হয় তাহলে তো আর কথা নেই।
- তারপর?
- ছবি তুলতে এতটা ব্যস্ত ছিলাম যে ফেরি কখন ঘাটে ফিরেছে বুঝতে পারিনি। শেষ ছবিটি কিন্তু ওই মেয়ে বাসের মধ্যে বসে আছে আর আমি তার সাইডে নিচে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে ছবি তুলছি।
যখন বুঝতে পারছি যে তারা বাসে করে চলে গেল তখন মনে হলো ইসসস কথা বলতে পারি নাই।
- যাহ, এটা কিছু হলো নাকি?
- হয়েছে মা।
- কি..?
- আমি আমার বাসে বসে বসে তার ছবিগুলো মোবাইলে নিয়ে দেখছিলাম। তখন হঠাৎ করে দেখি যে সে যেই গাড়ির মধ্যে ছিল সেই গাড়ির নাম "বলেশ্বর পরিবহন" আর পরিবহনের শেষ দুই অক্ষরের "হন" রঙ উঠে গেছে।
- তাতে কি হইছে?
- আমি যখন আমাদের মোড়েলগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে এসে নামলাম তখন দেখি আমাদের ওই ঘাটে নদী পার হবার জন্য দুটো বাস দাঁড়িয়ে আছে। একটার নাম "বনফুল" আরেকটা "বলেশ্বর" তারা নদী পার হয়ে রায়েন্দা যাবে। আমি কৌতুহল নিয়ে বলেশ্বর গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি সেই গাড়ির 'হন' অক্ষর দুটি নেই। আমি সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ড্রাইভার আর সুপারভাইজারকে মেয়েটা ছবি দেখালাম। তারা বললো সেই মেয়ে নাকি "আমতলা" এসে নেমে গেছে।
- আমাদের মোড়েলগঞ্জের দুটো স্ট্যান্ড আগেই যে আমতলা সেখানে?
- হ্যাঁ মা সেখানে।
- তাহলে তো খুব কাছেই।
- হ্যাঁ, কিন্তু কোন এলাকায় গেছে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। আমার একটা বন্ধু আছে সেখানে তাই ওকে সেদিনই ছবি দিয়েছি কিন্তু এখনো কিছু বের করতে পারে নাই।
- মা এবার মুখ ভার করে বললো, যেভাবেই হোক ওই মেয়ে খুঁজে বের করতে হবে তারপর তুই ঢাকা শহরে যাবি।
- কি যে বলো তুমি? অনেক বড় এলাকা, কোন গ্রাম থেকে কোন গ্রামে চলে গেছে তা কি আমি জানি?
- চেষ্টা করলে সবকিছু সম্ভব আর আমি তো তোর মা, সেজন্য বেশি করে চেষ্টা করবি।
- তোমার মতো একটা মিষ্টি মেয়ের সঙ্গে বাবার মতো একটা চালকুমড়ার কীভাবে বিয়ে হলো?
- তোর নানা জোর করে বিয়ে দিয়ে দিছে নাহলে কি আর বিয়ে করি?
- হাহাহা।
----
যার কাছে মেয়েটার ছবি দিয়ে খোঁজ লাগিয়েছি তার নাম রাকিব। সে রাত দশটার দিকে কল দিয়ে বললোঃ-
- দোস্ত মেয়ে পাওয়া গেছে।
- আমি তখন রাস্তায় হাঁটতেছি, হাঁটা বন্ধ করে তাকে বললাম, সত্যি বলছিস বন্ধু?
- হ্যাঁ দোস্ত, অনেক দুরের পথ, আমার একটা বন্ধু বললো ওর খালা বাড়ির কাছে নাকি বাসা। সে তো দেখার সাথে সাথে চিনতে পেরেছে কারণ ও এখন বেশিরভাগ সময় সেদিকেই থাকে। আমি তাকে বলে ওই মেয়ের নাম্বার যোগাড় করেছি, তবে সেটা খুব কষ্ট হয়েছে। আর যা কিছু করি সমস্যা নেই কিন্তু নাম্বার কীভাবে পেলাম তা বলা যাবে না।
- এত্তো এত্তো ধন্যবাদ বন্ধু, তাড়াতাড়ি নাম্বার দে আর আমি কাউকে কিছু বলবো না।
- আচ্ছা নাম্বার উঠা তাহলে....
- ধন্যবাদ বন্ধু, আচ্ছা নাম কি মেয়েটার?
- রাত্রি, ফাতিমা জাহান রাত্রি।
নাম্বার সেভ করার সঙ্গে সঙ্গে ইমু হোয়াটসঅ্যাপ দুটোর একাউন্ট চলে এসেছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে চেক করে দেখলাম তিনি অনলাইনে আছে, তাই সঙ্গে সঙ্গে নক করে লিখলামঃ-
অনেক খুঁজে পেলাম তোমায়
শান্তি লাগছে বেশ।
না পাইলে খুঁজতে থাকতাম
সারা বাংলাদেশ।
খুব শীঘ্রই দেখা হবে
বলবো অনেক কথা।
তোমার জন্য মনের মধ্যে
অনেক স্বপ্ন গাঁথা।
আমার মায়ের পুত্রবধূ
বানাবো তোমায় আমি।
যেভাবেই হোক আমি কিন্তু
হবো তোমার স্বামী।
তোমার জীবনে এখন যদি
অন্য কেউ থাকে..!
তাকে রাখিয়া সাড়া দিও
এই সজীবের ডাকে।
অনেকক্ষণ ধরে সিন করেও রিপ্লাই করে নাই, আমি অপেক্ষা করতে করতে বাড়ি ফিরে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। বিছানায় শুয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে এগারোটা বাজে। মোবাইলের ডাটা চালু করে দেখি রাত্রির হোয়াটসঅ্যাপ থেকে মেসেজ এসেছে।
সাহস যদি এতই থাকে
সামনে আসুন তবে।
সামনে এসে সামনাসামনি
কথা বলতে হবে।
তারপর নাহয় আপনার মায়ের
খুঁজবেন ছেলের বউ।
হতে পারে রাত্রি মেয়েটা
গভীর সমুদ্রের ঢেউ।
চুবানি খেয়ে সেই ঢেউ থেকে
বাঁচতে যদি চান।
বিরক্ত করা বন্ধ করে
নিজেই ধরুন কান।
আমি মেসেজ পরে পুরা আবুল হয়ে গেছি কিন্তু রিপ্লাই পেয়ে ভালো লেগেছে। তাই সঙ্গে সঙ্গে তার তোলা ছবি গুলো থেকে ৪/৫ টা ছবি পাঠিয়ে দিয়ে ডাটা বন্ধ করে দিলাম। আর মনে মনে ভাবলাম, এবার পাগলা তুমি আমার কথা ভেবে ভেবে রাতের ঘুম হারাম করো।
----
পরদিন সকালে উঠেই আমতলা রাকিবের বাড়ি রওনা দিলাম। বেলা সাড়ে দশটার দিকে আমি রাকিবের বাড়ি পৌঁছে তাকে নিয়ে সেই মেয়ের গ্রামের মধ্যে গেলাম। কিন্তু যে ছেলে আমাদের সকল ইনফরমেশন দিয়েছে সে গ্রামে নেই। তাই আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না কোন যায়গা গিয়ে খুঁজবো?
হয়রান হয়ে রাকিব তার বন্ধুকে কল দিল, তারপর রাকিবের বন্ধু আরেকটা ছেলের নাম্বার দিল। আর সেই ছেলেকে বলে দিল যে আমরা যে মেয়ের ছবি দেখাবো তাদের বাড়ি নিয়ে যেতে হবে।
সেই ছেলেটার সঙ্গে দেখা করলাম আধা ঘণ্টা পরে আর তাকে ছবি দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে বললোঃ-
- আপনারা কি তার পরিচিত?
- রাকিব বলল, জ্বি মোটামুটি?
- নিশ্চয়ই তার বিয়ের জন্য খবর পেয়ে এসেছেন তাই না?
রাকিব আর আমি দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর রাকিব বললঃ-
- বিয়ের জন্য মানে?
- এই মেয়েটার তো আজকে বিয়ে, তাই বললাম আপনারা কি বিয়ের দাওয়াতে এসেছেন?
রাকিব ওই ছেলের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো আর আমি আমার হাতে মোবাইলে রাত্রির ছবির দিকে তাকিয়ে আছি।
তার মানে আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি নাকি?