হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ৪

🟢

রিপ্লাই আসে না বলে রাত্রির খুব হাসি পাচ্ছে, মনে হয় লোকটা জব্দ হয়ে গেছে। আহারে বেচারা কত আশা করে ছবি তুলে রেখেছে আবার নাম্বার বের করে ফেলেছে। নিশ্চয়ই পরিচিত কেউ হবে নয়তো নাম্বার পেল কীভাবে?

রাত্রির মনে হঠাৎ করে একটা প্রশ্ন চলে এসেছে, যেভাবেই হোক লোকটার পরিচয় বের করতে হবে। আর তার জন্য দরকার হচ্ছে লোকটার সাথে ভালো করে কথা বলতে হবে। আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করতে পারলে তারপর পরিচয় বের করা খুব সহজ হবে।

লান্স টাইম শেষ হয়ে গেছে, শ্রমিকরা কাজে লেগে গেছে সবাই, তাই চারিদিকে আরেকটু চক্কর দিয়ে আসা দরকার।

বৃদ্ধ একটা লোক এবং তার সাথে আরো দুটো ছেলে একপাশে কাজ করছিল। সজীব তাদের দিকে লক্ষ্য করে গিয়ে তাদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। তারা তিনজন কাজ করতে গিয়ে সামান্য বিব্রত হচ্ছে, স্যার টাইপের কাউকে দেখলে শ্রমিক একটু ঘাবড়ে যায়।

সজীব কিছু না বলে চলে গেল, তার চোখে ঘুম টলমল করছে। সারারাত ভ্রমণ করে এসেছে তাই ক্লান্ত হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। চা খেতে ইচ্ছে করে কিন্তু এখানে একটা ব্যবস্থা আছে ঠিকই সেখানের চা ভালো হয় না। সজীব বারোটার দিকে একবার চা খেতে গিয়ে দুই চুমুক দিয়ে ফেলে দিল। তাই গেইট থেকে বেরিয়ে একটু সামনে ফুটপাতে বসে থাকা অস্থায়ী দোকান থেকে চা খেল।

সাড়ে তিনটার দিকে রাত্রির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সজীব এর, এতক্ষণ সে কোথায় ছিল জানে না। মেয়েটা করে টা কি? কাজ করে নাকি চারিদিকে দেখে বেড়ায়?

- সজীব বললো, কি খবর তোমার? কাজের গতি কেমন মনে হচ্ছে?

- স্যার গতি খুব খারাপ, সবাই কেমন ছন্নছাড়া হয়ে কাজ করে আমার মোটেই পছন্দ না। আমার মনে হয় তাদের পরিবর্তন করতে হবে নাহলে তো আমাদের মনমত তাদের কাজ করানো দুরূহ হয়ে যেতে পারে।

- বাহ, একদিন হলো আমরা জয়েন করলাম আর তার মধ্যেই ছাঁটাই করবো?

- স্যার আমি আমার মতামত দিলাম।

- আমি গতকাল রাতে গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছি তাই খুব ক্লান্ত লাগছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি চলে যাবো, তবে তুমি সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত থাকবে ঠিক আছে?

- রাত্রি মন খারাপ করে বললো, ঠিক আছে স্যার।

- ভেবেছিলাম চট্টগ্রামে রাত তিনটার মধ্যে পৌঁছে যাবো কিন্তু মাওয়া ফেরির মধ্যে জ্যাম ছিল তাই দেরি হয়ে গেছে।

- মাওয়া ফেরির কথা শুনে চমকে গেল রাত্রি, তার মনে হচ্ছে যে স্যার যেহেতু ফেরি পার হয়ে এসেছে তাহলে নিশ্চয়ই তার বাসা পদ্মার ওপারে। রাত্রি বললো, আপনার গ্রামের বাড়ি কোথায় স্যার?

- তোমার এলাকার কাছাকাছি!

- মানে? আমি তো আমার এলাকার কথা বলিনি এখনো তাহলে কীভাবে জানলেন আমার এলাকা কোথায়?

সজীব এবার বিপদে পরে গেল। মুখ ফসকে বলে ফেলেছে কিন্তু এখন কি বলবে? আর রাত্রি তার কথা এভাবে ধরে ফেলবে কে জানতো?

- সজীব বললো, তুমি যেহেতু আমার সাথে কাজ করবে তাই তোমার সবকিছু জানা আমার কর্তব্য, তাই না?

- জ্বি স্যার।

- হ্যাঁ সেটাই, আমি তোমার বায়োডাটা দেখলাম সেখানেই তোমার এলাকার নাম দেখেছি। তোমার বাসা বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ আমার বাসাও সেখানেই।

- সত্যি বলছেন স্যার? বাহহ খুব ভালো লাগলো আপনার কথা শুনে। আমি আমার এলাকার বড় সিনিয়র স্যারের সঙ্গে কাজ করবো, ওয়াও।

- তোমাকে ছোট্ট একটা গল্প বলবো, শুনবে?

- জ্বি স্যার বলেন।

- আমি আমার চাকরি জীবনের শুরু করেছিলাম গার্মেন্টসের মাধ্যমে। আমি তিনমাস গার্মেন্টসে চাকরি করেছিলাম তারপর এই কোম্পানির মধ্যে জয়েন করেছি।

- তারপর?

- গার্মেন্টসে বসে প্রতিদিন লান্স টাইমে একটা বিষয় আমি খুব অবাক হতাম।

- কি বিষয় স্যার?

- সাজগোজ করার ব্যাপারে বড় বড় কোম্পানির মধ্যে চাকরি করা মেয়েরা যেমন সচেতন, তেমনি গার্মেন্টসের মেয়েরাও সচেতন। তারা লান্স শেষ করে কেউ কেউ মেশিনে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতো। কেউ কেউ গল্প করে সময় পার করে দিতো, আবার কেউ কেউ মোবাইলে কথা বলতো। কিন্তু যখন তাদের সময় প্রায় শেষ হয়ে আসতো তখন সাজতে বসতো। কে একজন ব্যাগে ভরে ছোট্ট একটা আয়না নিয়ে এসেছে, সেটা ব্যবহার করে চোখ ঠোঁট ঠিক করতো। মাথার চুল একটু হাত দিয়ে নাড়তো আবার চিরুনি বের করে চালিয়ে দিত।

- এগুলো শুধু আপনার চোখে পড়তো?

- অনেক কিছু চোখে পড়েছে কিন্তু তার মধ্যে থেকে এই ঘটনা বলার কারণ আছে।

- কি কারণ স্যার?

- তুমি সকাল বেলা বোরকা খুলে ঠিকই ভালো করে নিজের চেহারা দেখছ, কিন্তু লান্স শেষ করে আর হয়তো দেখতে পারো নাই।

- ঠিক বুঝতে পারলাম না।

- সজীব সামান্য একটু হেসে বললো, তোমার কপালের টিপটা একদিকে সরে গিয়েছে। সেটাকে যথাস্থানে বসিয়ে দাও দেখতে ভালো লাগবে। এটা বলে সজীব সেখান থেকে চলে গেল, আর রাত্রি তার হাতের মোবাইলের গ্লাসে সাথে সাথে দেখে নিল।

----

চারটার দিকে সজীব বের হবার সময় রাত্রিকে ডেকে বললো সেও যেন চলে যায়। যেহেতু আজ প্রথম দিন তাই চলে যাচ্ছে, আর তাছাড়া সজীব চলে গেলে তাকে আর না থাকলেও চলবে। রাত্রি মনে মনে খুশি হয়ে গেল কিন্তু মুখে বললোঃ-

- সমস্যা নেই স্যার আমি আর ঘন্টা খানিক পরে বের হয়ে যাবো, আপনি চলে যান।

- সজীব বললো, আচ্ছা ঠিক আছে থাকো।

রাত্রির মনটা আবারও খারাপ হয়ে গেল, সে শুধু সৌজন্যতার জন্য বলেছিল কথাটা কিন্তু স্যার যে সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেবে এবং দ্বিতীয় বার আর বলবে না তা জানা ছিল না। রাত্রির ধারণা ছিল যে স্যার বলবে "তোমার আর থাকার দরকার নেই তুমি চলো, কিন্তু কপাল..! "

বড়পোল এসে সজীব একটা হোটেলে নুডলস রান্না করতে দেখতে পেল। ছোটবেলা থেকেই সে নুডলস খুব পছন্দ করে, এখনও গ্রামের বাড়িতে গেলে তার প্রতিটি নাস্তার সময় নুডলস রান্না করে তার মা।

সজীব চট করে হোটেলে গিয়ে বসে পরলো, এখন নুডলস খেয়ে তারপর যেতে হবে। নাহলে সারাটা পথ শুধু চোখের সামনে নুডলস দেখতে পাবে।

খাবার খেয়ে বেরিয়ে যেখানে বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করে সেখানে গেল। অনেক গুলো যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে বাস অনেকক্ষণ ধরে আসে নাই তাই যাত্রী জমা হয়ে গেছে। এমন সময় ছুটির দিকে গাড়ি পাওয়া যায় না কারণ সকল বাস এখন ফ্রী পোর্ট মোড়ে চলে গেছে। সেখান থেকে অফিস ছুটি হলে অফিসের শ্রমিকদের নিয়ে চলে আসবে সেটাই উদ্দেশ্য।

হঠাৎ করে সজীব দেখলো বাসের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের মধ্যে রাত্রিও আছে। তার পরনে সকাল বেলার সেই বোরকা। সজীব কিছুটা অবাক হয়ে গেল, মনে মনে বললো, কত চালাক তুমি তাই না? ভেবেছ আমি চলে গেছি তাই আমি আসার সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছো।

একটা বাস এসে দাঁড়াল, বাসের মধ্যে এমনিতেই পরিপূর্ণ হয়ে আছে তবুও তারমধ্য এখানে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন ঝুলে গেল। বাকিরা আবারও সেই অপেক্ষা করতে লাগলো পরবর্তী বাসের জন্য।

সজীব একটা সিএনজি ঠিক করে নিল, তারপর রাত্রির কাছে গিয়ে বললোঃ- তুমি তো দেখি চলে এসেছ? বাস আজকে পেতে কষ্ট হবে তাই চলো আমার সঙ্গে সিএনজি করে যেতে পারো।

- রাত্রি লজ্জা পেয়ে গেল, মাথা নিচু করে বললো, আপনি আসার পরে দেখলাম সত্যি সত্যি আমার কোন কাজ নেই। আর গতকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে বের হয়ে এখানে এসে বাস পেতে খুব কষ্ট হয়েছে। তাই ভাবলাম আপনি যেহেতু যেতে বলে গেছেন তাই চলে যাই।

- আজও বাসের সমস্যা মনে হয়, তুমি চাইলে যেতে পারো।

- রাত্রি আবারও সৌজন্য বজায় রাখতে গিয়ে বলে ফেললো, সমস্যা নেই স্যার আমি যেতে পারবো। আপনি যান তাহলে।

- সজীব বললো, আচ্ছা ঠিক আছে সাবধানে যেও আর সকাল বেলা দেখা হবে। আর তোমার তো ক্ষমতা আছে তাই বাসের মধ্যে বসে থাকা যাত্রী সিট থেকে উঠিয়ে দিয়ে বসতে পারবে। কিন্তু আমি তো তা পারি না তাই চলে যাচ্ছি, ভালো থেকো।

রাত্রির এবার মন খারাপের পরিবর্তে রাগ উঠে গেল, কারণ দ্বিতীয় আরেকবার বলে না কেন? সে নাহয় একবার না বলে ফেলেছে কিন্তু তাই বলে কি একটু জোরাজোরি করা যায় না। অদ্ভুত।

সজীব চলে গেল, রাত্রি দাঁড়িয়ে আছে।

দুই মিনিটের পর একটা সিএনজি এসে রাত্রির সামনে দাঁড়াল। পিছনে দরজা খুলে সজীব তার দিকে তাকিয়ে বললো, দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। বাসের মধ্যে তোমার যায়গা হবে না তাই আজকে আপাতত চলো।

- রাত্রি এবার আর কিছু না বলে চুপচাপ সিএনজি লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল।

সিএনজি চলছে, দুজনেই চুপচাপ বসে আছে। নিমতলা বিশ্বরোড আসার পরে হঠাৎ করে রাত্রির মোবাইল বেজে উঠলো। রাত্রি ব্যাগে থেকে বের করে দেখলো সিয়াম কল দিয়েছে। সে মনে মনে চিন্তা করছে, কল রিসিভ করবে কি করবে না?

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ৪ গল্পের ছবি