এত কষ্ট করে যখন মেয়েটার সন্ধান পেয়ে তার কাছে ছুটে এসে জানতে পারলাম তার আজকে বিয়ে তখন মন খারাপ হবে সেটাই স্বাভাবিক। রাকিব কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু আমি তো চুপচাপ।
- ছেলেটা বললো, আপনারা আমার সাথে চলুন আমি আপনাদের পৌঁছে দিচ্ছি।
- আমি বললাম, আচ্ছা ভাই আপনি কি শিওর যে এই মেয়ের আজকে বিয়ে হচ্ছে?
- কি যে বলেন ভাই? এটা আমাদের গ্রাম আর আমি জানবো না?
- রাকিব বললো, দেখুন আপনাকে আমরা চিনি না তাই সবকিছু গুছিয়ে বলা সম্ভব না। আমার যে বন্ধু আপনাকে পাঠিয়েছে ও থাকলে খুব ভালো হতো। সে যখন নেই আর মেয়েটার যেহেতু আজ বিয়ে তাই আমাদের আর কিছু বলার নেই।
- ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনারা কি তার বিয়ে সেই জন্য আসেন নাই?
- আপনাকে বুঝতে হবে না, অনেক কষ্ট করে যে আমাদের সঙ্গে দেখা করেছেন তাতেই আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। ভালো থাকবেন।
---
আমতলা বাজারে এসে ফজলুল কাকার দোকানে বসে চা খাচ্ছি, মনটা বেশি খারাপ। এমনটা হবার কথা ছিল না তবুও কেন হলো? এই মাত্র চারদিন আগে যে মেয়ে ঢাকা থেকে এসেছে সেই মেয়ের আজকে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে? অনেকদিন পর আজ বৃষ্টির কথা মনে পরে গেল, কতটা বছর হয়ে গেছে যোগাযোগ নেই। অথচ একটা সময় দিনের প্রায় সবটা জুড়ে আমি ছিলাম তার অস্তিত্ব।
যেদিন বৃষ্টির বিয়ে ঠিক হয়ে গেল সেদিন বৃষ্টি খুব কান্না করেছিল। সারাদিন দুজনেই একসাথে কত ঘোরাঘুরি করেছিলাম কিন্তু সন্ধ্যা বেলা যখন ওকে বিদায় দিলাম।
- তখন বৃষ্টি বললোঃ- সজীব যাই?
- হ্যাঁ যাও।
- অনেকটা সময় ধরে তোমার সাথে একসাথে চলার স্বপ্ন দেখেছি, আজ সবকিছু হারিয়ে গেল।
আমি তখন চোখ দিয়ে দুফোঁটা পানি ফেলেছি হয়তো বৃষ্টি সেটা দেখেনি। সেই যে চলে গেল আর দেখা হয়নি, ছয় বছর পেরিয়ে গেছে তবুও আর কথা হয়নি। স্বামীর সাথে বিদেশে চলে গেছে তাই আর যোগাযোগ করে নাই। বেশ ভালো আছে।
রাকিবের ডাকে ধ্যান ভেঙ্গে গেল, রাকিব আমাকে ধাক্কা দিয়ে বললোঃ-
- মন খারাপ করিসনা বন্ধু।
- না না ঠিক আছে বাদ দে।
- তোর কপালটাই খারাপ রে সজীব, সেই কতদিন আগে বৃষ্টি তোকে ছেড়ে চলে গেল। অবশ্য তখন বৃষ্টির চেয়ে তোর দোষ বেশি ছিল, নাহলে কিন্তু সে আজ তোর স্ত্রী থাকতো।
- তুই ও বৃষ্টির কথা মনে করলি?
- কেন?
- আমিও এতক্ষণ মনে মনে বৃষ্টির কথা ভাবছি, কেমন যেন মনে পরে গেল।
- একটা কথা বলবো, রাখবি?
- চেষ্টা করবো, বল।
- তুই বিয়ে করে সংসার শুরু কর, বয়স তো কম হলো না। এবার নাহয় সবকিছু বাদ দিয়ে গ্রামের একটা মেয়ে বিয়ে করে ফেল।
- আচ্ছা দেখি।
পকেটে মোবাইল বেজে উঠলো, বের করে দেখি ঢাকা থেকে আমাদের ম্যানেজার কল দিয়েছেন। তার নাম্বার দেখে অবাক হলাম কারণ এই ব্যক্তি কখনো সুসংবাদ দেবার জন্য কল করে না। সে সর্বদা দুঃসংবাদ দিতে পছন্দ করে তাই আৎকে উঠেছি।
রিসিভ করে কথা বলে বুঝতে পারছি সত্যি সত্যি আবারও দুঃসংবাদ।
----
বাড়িতে ফিরে মায়ের সঙ্গে সবকিছু বললাম, মা একটু অবাক হয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু পরক্ষণেই মা বললোঃ-
- চিন্তা করিসনা, এরচেয়ে অনেক ভালো মেয়ে আমরা তোর জন্য খুঁজে বের করবো।
- ঠিক আছে সমস্যা নেই, কিন্তু আমার তো মনে হয় দু তিনদিনের মধ্যে ঢাকা যেতে হবে।
- কিন্তু কেন? তুই তো বললি যে অনেকদিন ধরে থাকতে পারবি। নতুন প্রজেক্টের কাজ শুরু হবে তাই কিছুদিন বাড়িতে থাকবি।
- বলেছিলাম, কিন্তু আমতলা বাজারে থাকতে হঠাৎ ম্যানেজার কল দিয়ে বললো যে আমাকে খুব তাড়াতাড়ি যেতে হবে। আমাদের আরেকটা প্রজেক্ট আছে চট্টগ্রামে, সেখানে অফিসের কিছু স্টাফ ছিল। কিন্তু সেই প্রজেক্টের মালিক নাকি তাদের কাজে অসন্তুষ্ট তাই সম্পুর্ন টিম পরিবর্তন করতে হবে। এখন সেখানে নতুন টিম পাঠিয়ে প্রজেক্ট কমপ্লিট করতে হবে।
- তাহলে তো যেতেই হবে, তাও আবার চট্টগ্রামে?
- কি করবো বলো?
- তোর জন্য মেয়ে দেখা কিন্তু চলবেই, যখন মেয়ে পছন্দ হবে তখনই কিন্তু বিয়ে করতে আসতে হবে রাজি তো?
- আচ্ছা সে তখন দেখা যাবে।
---
গতকাল রাতে ডাটা বন্ধ করার পরে আর চালু করিনি, ভেবেছিলাম তার সেই মেসেজের রিপ্লাই হিসেবে সাহস দেখাতে তার সামনে যাবো। কিন্তু সত্যি সত্যি তার সামনে দাঁড়ানোর সাহস আমার ছিল না বলে চলে এসেছি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ডাটা চালু করলাম, রাত্রির হোয়াটসঅ্যাপ থেকে চারটা মেসেজ এসেছে।
প্রথম মেসেজঃ-
আপনি আমার এতগুলো ছবি কোথায় পেলেন?
দ্বিতীয় মেসেজঃ-
আমি বাড়ি ফেরার পথে ছবি সংগ্রহ করেছেন সেটা বোঝা যাচ্ছে কিন্তু এটা খুবই অন্যায়।
তৃতীয় মেসেজঃ-
আপনাকে আমি চিনি না, কিন্তু আপনার কাছে বিশেষ অনুরোধ রইল যে আমার ছবিগুলো যেন আর কারো কাছে না যায়। খুব কষ্ট পাবো।
সর্বশেষ মেসেজে লেখা আছে, "না জেনে ব্লক দিলাম তাই দুঃখিত, নিজের কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা তাই ব্লক দিতে বাধ্য হলাম। সরি। "
মনে মনে ভাবলাম, যার আজকে বিয়ে হয়ে গেল সে আমাকে ব্লক করে দেবে সেটাই স্বাভাবিক। এ বিষয় নিয়ে শুধু শুধু মন খারাপ করার কোন মানে হয় না, ছবি গুলো ডিলিট করতে গিয়েও ডিলিট করলাম না। তবে ল্যাপটপের মধ্যে সেভ করে মোবাইল থেকে ডিলিট করে দিছি।
থাকনা কিছু স্মৃতি অমলিন হয়ে, ক্ষতি কি?
-----
আরো চারদিন পরে চট্টগ্রামে আসলাম। আমাদের ম্যানেজার সাহেব দিনরাত পাগলের মতো কর দিয়ে যাচ্ছে নাহলে আরো দুদিন থাকতাম। কিন্তু এবার আজকে সকালে চাকরি কেড়ে নেবার হুমকি দিয়েছে তাই বাধ্য হয়ে যাচ্ছি। আমার বন্ধু শফিক চট্টগ্রামে আছে, তাকে বলে আগেই একটা থাকার ব্যবস্থা করেছি। যদিও বড় খালার বাসা আছে সেখানে কিন্তু আত্মীয় স্বজনের কাছে ইচ্ছে করে না যেতে।
সকাল বেলা এসে পৌছলাম, কিন্তু বিশ্রাম করার সুযোগ নেই কারণ স্বয়ং ম্যানেজার নিজে এখন চট্টগ্রামে উপস্থিত। তিনি আজকে আমাদের সকল কাজ বুঝিয়ে দিয়ে ঢাকা চলে যাবেন। আমাদের প্রজেক্টের কাজ চলছে হালিশহর থানার মধ্যে বড়পোল এলাকায়। আমি এখন বন্দরটিলা তাই এখান থেকে বড়পোল যেতে হবে। শফিক বলে দিয়েছে ১১ বা ১৩ নাম্বার বাসে উঠে গেলে নাকি বড়পোল যেতে পারবো। তাই বাসা থেকে বেরিয়ে ফ্রী পোর্ট মোড়ে গেলাম হেঁটে হেঁটে সেখান থেকে ১১ নাম্বার গাড়িতে উঠে বসলাম। চারিদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। ইপিজেডের সকল শ্রমিকরা একে একে প্রবেশ করছেন ইপিজেডের মধ্যে।
বাস মোটামুটি পরিপূর্ণ তবুও ছাড়ার নাম নেই, এ জন্য লোকাল বাসে উঠতে ইচ্ছে করে না। যদি একটা সিএনজি নিয়ে যেতাম তাহলে ভালো হতো মনে হয়।
হঠাৎ করে বাসের মধ্যে কালো বোরকা পরা এবং মুখে স্কার্ফ দিয়ে পেচানো একটা মেয়ে উঠলো। তার শুধু চোখদুটো দেখা যাচ্ছে কিন্তু বাকি সব শরীর ঢাকা আছে।
- আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ভাই এটা তো মহিলা সিট আপনি কি মহিলা?
- আমি তো অবাক, কেমন অপমান? এ আবার কি ধরনের ঝামেলা?
- কি বলছি শুনতে পাচ্ছেন? মেয়েদের সিট ছেড়ে দেন কারণ আমি বসবো।
- আমার বাম পাশে আরেকটা বুড়ো মানুষ বসে আছে তিনি বললেনঃ- সিট পেলেই বসতে হবে নাকি? মেয়েদের সিট চোখে পরে না?
- আমি বললাম, আপনার সিটের সাথে তো লেখা আছে " প্রতিবন্ধী " তাহলে আপনার কি প্রতিবন্ধী নাকি?
- লোকটা চুপসে গেল কিন্তু মেয়েটা বললো, হ্যাঁ তিনি একজন বুড়ো মানুষ। আর বুড়ো মানুষরা দুর্বল হয় বেশি সুতরাং তারা অনেকটা প্রতিবন্ধী। এবার তাড়াতাড়ি সিট ছেড়ে দেন নাহলে কিন্তু আরও বেশি কথা বাড়বে।
- আমি বললাম, ঠিক আছে তোমাদের সিট তাই তোমরা বসো।
- এই মিস্টার? আমাকে তুমি তুমি করে কেন বলছেন? আমি কি আপনার ছোট্টবেলার বান্ধবী নাকি ভার্সিটির বান্ধবী?
- আচ্ছা সরি।
- ইটস ওকে।
অপয়া ম্যানেজারের চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে নিলাম তারপর শফিক কে কিছুক্ষণ মনে মনে গালি দিচ্ছি। বাসের বুদ্ধি না দিয়ে সিএনজির কথা যদি বলতো তাহলে কি হতো? শালা খবিশ।
.
.
একরাশ বিরক্তি নিয়ে ম্যানেজার স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, অনেকক্ষণ কিছু আজেবাজে কথা বলেলেন যার সাথে কাজের কোন সম্পর্ক নেই।
- এরপর বললেন, তোমার সাথে আরেকটা মেয়ে আছে কাজ করার জন্য। সে তোমার জুনিয়র তবে তাকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে কাজ আদায় করা হচ্ছে তোমার দায়িত্ব। ছোটখাটো কাজ তাকে দিয়ে তুমি বড় ইম্পরট্যান্ট কাজগুলো ভালো করে গুরুত্ব দেবে।
- কিন্তু সেই মেয়ে কোথায়?
- সে তার বোনের বিয়ের জন্য ছুটিতে ছিল, কাল থেকে জয়েন করেছে কাজে। আর আজ থেকে তো তুমি আসলে, সমস্যা নেই সে একটু পরে চলে আসবে তুমি অপেক্ষা করো। আমি বরং একটু মালিকের সঙ্গে দেখা করে আসি।
- ঠিক আছে স্যার।
স্যার চলে যাবার একটু পরে দেখলাম বাসের মধ্যে যে মেয়ে আমাকে দাড় করিয়ে দিয়েছে সেই মেয়ে গেইট দিয়ে প্রবেশ করলো। ইচ্ছে করছে এক্ষুনি তাকে সেখানে দাঁড় করিয়ে প্রতিশোধ নিতে কিন্তু দেখি তো কি জন্য এসেছে?
- আমার সামনে আসার আগেই আমাদের অফিস এর আরেকজন সঙ্গে তার দেখা হলো। তিনি আমার দিকে হাত ইশারা করে কিছু একটা তাকে বোঝালেন। তারপরই মেয়েটা মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে প্রথমে বললোঃ- " সরি স্যার! "
- কিসের সরি?
- বাসের মধ্যে খারাপ ব্যবহার করার জন্য, আমি বুঝতে পারিনি যে আপনি আমার সেই বস। যদি বুঝতে পারতাম তাহলে কোনদিন এটা করতাম না স্যার।
- আমি লক্ষ্য করে দেখলাম মেয়েটা এখনো ঠিক সেভাবেই বোরকা পরে আছে এমনকি সম্পুর্ন মুখ বের করে নাই এখনো। কিন্তু জুনিয়র এই মেয়ে আমাকে বাসের মধ্যে সিট থেকে উঠিয়ে দিয়েছে ভেবে লজ্জা লাগলো। মুখ গম্ভীর করে বললাম, তুমি কি বোরকা পরে ডিউটি করো?
- না স্যার, বোরকা পরে আসি তারপর ফ্রেশ হয়ে বোরকা খুলে কাজের ইউনিফর্ম পরে তারপর কাজ করি। আপনি একটু অপেক্ষা করুন আমি দুই মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে আসছি।
দুই মিনিটের পরিবর্তে দশ মিনিট পার হয়ে গেছে তবুও সে আসছে না। তাই আমি ভাবলাম এবার একটু চারিদিকের কাজ ঘুরে দেখা যাক, সেই মেয়ে নাহয় আমাকে খুঁজে বের করবে।
- মিনিট পাঁচেক হাঁটলাম ঠিক তখনই পিছন থেকে মেয়েটা বললো, সরি স্যার দেরি হয়ে গেল।
- আমি সেভাবেই পিছনে না ঘুরে বললাম, আর কতবার তুমি সরি বলবে মিস...?
- মিস রাত্রি স্যার, ফাতিমা জাহান রাত্রি আমার নাম তবে সবাই রাত্রি বলে ডাকে।
মুহুর্তের মধ্যে সম্পুর্ণ শরীর শিহরিত হয়ে গেল, আমি সেকেন্ডের মধ্যে পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি এই সেই মেয়ে। যেই মেয়ের ২৩২ টা ছবি আমি তুলেছিলাম কিন্তু আফসোস...!
বোরকা পরে ছিল তাই বুঝতে পারিনি কিন্তু এখন তো বোরকা নেই তাই স্পষ্ট তার মুখটা চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের নিচে একটা তিল আছে সেটাই যেন বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
- তোমার নাম রাত্রি?
- জ্বি স্যার।
- তোমার বোনের বিয়ের জন্য ছুটিতে ছিলে?
- জ্বি স্যার।
- কবে বিয়ে হয়েছে?
- চারদিন আগে।
- তোমার বাসা কোথায়?
- বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলায়।
- আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি।
- রাত্রি আবার বললো, আমার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে স্যার। অবশ্য সে আমার চেয়ে মাত্র ৩ মিনিটের বড় কারণ আমরা জমজ বোন।
- এবার আশ্চর্য হলাম খুব, বললাম, তোমরা দুই বোন একই রকম দেখতে?
- হ্যাঁ স্যার, আমার বোনের নাম নিঝুম আর আমি হলাম রাত্রি। জমজ দুই বোন নিঝুম রাত্রি।