হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ৩

🟢

মন ভালো এবং খারাপ দুটোই হয়ে গেছে, যেহেতু দুজনেই একরকম দেখতে তাহলে আমি কার ছবি তুলেছিলাম। সেদিন রাতে কাকে মেসেজ করেছি? যদি আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাত্রির কাছেই মেসেজ করে থাকি তাহলে সে বিয়ের দিন কেন ব্লক করে দিলো? যেভাবেই হোক আগে আমাকে খুঁজে বের করতে হবে সেদিন কার ছবি তুলেছি আমি? আর যার ছবি তুলেছি তার নাম্বারেই কি কল দিলাম নাকি নিঝুমের নাম্বারে?

যদি এমন হয়ে যায় যে আমি ছবি তুলেছি রাত্রির কিন্তু মেসেজ দিয়েছি নিঝুমকে। তাহলে তো এর মধ্যে গরমিল অবশ্যই হবে তাই যেভাবেই হোক আস্তে আস্তে সবগুলো বের করতে হবে।

আপাতত মনের মধ্যে হৃদয়ের সবকথা নীরবতায় রেখে দিয়ে কাজের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। যেহেতু নতুন কাজ তাই শুরতেই অবহেলা করে কাজের ক্ষতি করা যাবে না।

আপাতত কাজের প্রতি মনোযোগ দিয়ে তাকে একটু কন্ট্রোল করতে হবে। বাসের মধ্যে বসার ঘটনা চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠলো আর আমি "জ্বলে উঠলাম আপন শক্তিতে"।

- বললাম, কাজের অভিজ্ঞতা কতদিনের? মানে এর আগে কতদিন কাজ করছো?

- চারমাস আগে জয়েন করেছি স্যার।

- আমার সাথে কাজ করতে হলে সবসময় কিন্তু মনোযোগ দৃষ্টি সজাগ থাকবে। আমি কিছু বলার আগেই যদি তুমি বুঝতে পারো তাহলে তোমার জন্য খুবই ভালো হবে। নিয়মশৃঙ্খলা রুচিবোধ সব বজায় রাখবে, শ্রমিকদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। আবার এতটা ভালো ব্যবহার করবে না যাতে তারা তোমাকে সম্মান করতে ভুলে যায়।

- ঠিক আছে স্যার।

- এখন বাংলা কোন মাস চলে?

- জানি না স্যার।

- একটু ভেবে বলা উচিৎ ছিল, যদি ভেবে দেখতে তাহলে হয়তো পারতে।

- সরি স্যার।

- সরির বস্তা বাসা থেকে নিয়ে এসেছো নাকি? শুধু কথা বললেই সরি সরি করো। নাকি তোমার নিজ ডিকশিনারিরর মধ্যে সরি ছাড়া কোন শব্দ নেই?

- আস্তে আস্তে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

- কতদিন লাগবে?

- রাত্রি মাথা নিচু করে কেমন অসহায় ভঙ্গিতে বললো, প্রথম যখন চাকরি আরম্ভ করেছি তখন সপ্তাহ খানিকের মধ্যে ফ্রী হয়ে গেছিলাম।

- কেমন ফ্রী?

- বন্ধুর মতো।

- আমি কিন্তু তোমার বন্ধুর মতো নয়, বয়সে বেশি আবার কাজের ক্ষেত্রেও বেশি সিনিয়র। তাই তুমি আমাকে বন্ধুর মতো বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড নিয়ে গল্প করতে চাইবে সেটা ঠিক না।

- আমি কখনো করবো না স্যার।

- আচ্ছা ঠিক আছে তোমার সাথে পরে কথা হবে তুমি বরং চারিদিকটা একটু ঘুরে দেখ। আমি বরং স্যার আর ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলে আসি, তোমাকে ডাকবো তখন। আচ্ছা তোমার মোবাইল নাম্বার দাও, জরুরি কাজে সামনে না থাকলে কল দিয়ে ডেকে নেবো। আর আমার নাম্বারটা সেভ করে রাখো, তাহলে তুমিও প্রয়োজনে কল দিয়ে কথা বলতে পারবে।

- আমি সবসময় আপনার আশেপাশে থাকবো তাই কল দিতে হবে না তবে আপনি নাম্বার সেভ করে রাখুন সমস্যা নেই। আর আমার কখনো যদি দরকার হয় তাহলে আমি আপনাকে খুঁজে বের করবো।

- মনে করো তুমি বাসায় একটা ঝামেলার মধ্যে আটকে গেলে তখন অফিসে আসতে পারছো না। তখন কীভাবে খুঁজবে? কল দিয়ে সমস্যার কথা জানাতে হবে তাই না?

- জ্বি স্যার।

- গুড, যাও চারিদিকে দেখে আসো।

----

নায়ক নায়িকা দুজনের মনের ভিতরের আলাদা অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য আমি গল্পের বর্ননা পরিবর্তন করতে চাই। সেক্ষেত্রে সজীব এবং রাত্রি উভয়ের নাম বলে কাহিনি বর্ননা করবো আমি। নিজের মতো করে বর্ননা করার জন্য অনেকে মনে করেছে যে গল্পটা আমার নিজের।

তাই গল্পের বিবৃতি লেখক হিসেবে দিচ্ছি।

----

সজীবের সামনে থেকে বের হতে পেরে বড় একটা নিশ্বাস ফেললো রাত্রি। প্রথম দিনই যেই মানুষ এতটা কঠিন কথা বলতে পারে সেই ব্যক্তি সামনে কতটা অত্যাচার করবে আল্লাহ ভালো জানে। যে মানুষটা দেখতে এত সুন্দর সে কিনা এতো কর্কশ গলায় কথা বলে? তবে একটা বিষয় ভেবে রাত্রির মনটা ভালো লাগছে সেটা হচ্ছে, প্রথম প্রথম যদি তিক্ততা দিয়ে শুরু হয়ে থাকে তাহলে পরবর্তীতে মিষ্টি হতে পারে। মাথার মধ্যে সজীব নামক স্যার বিচরণ করতে লাগলো।

বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে সজীব এর কাছে রাকিব কল দিল। সজীব তখন ম্যানেজার স্যারের সঙ্গে চা খাচ্ছিল, প্রথম তিনবার কল রিসিভ করে নাই। কিন্তু চতুর্থ বারে কল না দিয়ে রাকিব মেসেজ দিয়ে বললো " দোস্ত খুব জরুরি কথা আছে তুই তাড়াতাড়ি কল দিস আমার কাছে। "

সজীব তাক সত্যি সত্যি তাড়াহুড়ো করে তার সেই ম্যানেজারের সামনে থেকে সরে গেল। তারপর বাহিরে গিয়ে রাকিবের কাছে কল দিলঃ-

- হ্যাঁ রাকিব বল।

- দোস্ত গরম গরম খবর আছে, আমার তো সেই খবরের জন্য নাচতে ইচ্ছে করছে।

লে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স।

- আমি জরুরি কাজে আছি, তুই এক কাজ করো রাকিব। যেহেতু গরম গরম খবর তাই একটু সময় অপেক্ষা কর, তাহলে ঠান্ডা হবে এবং তারপর ধিরে সুস্থে বলবি। গরম গরম শুনতে গেলে আমার কান পুড়ে যাবে তাই না?

- কান পুড়ে যাবে?

- হ্যাঁ, গরম গরম খেতে গেলে মুখ পুড়ে যায় আর গরম গরম শুনতে গেলে কান পুড়ে যায়।

- ফাজলামো করছিস? রাত্রির বিষয় নিয়ে জরুরি কথা আছে। ১০ কেজি মিষ্টির ব্যবস্থা না করলে কিন্তু বলবো না, বলে দিলাম।

- তোর ভাগ্য ভালো না রাকিব, দুই কেজি মিষ্টির ব্যবস্থা করতে পারি আমি। কারণ তুই যে খবর দিতে চাও সেটা ৮০% আমি জেনে গেছি আজকে সকালে। এখন বাকি আছে ২০% তাই সেই ২০% এর জন্য ২ কেজি মিষ্টি পেতে পারো।

- কি জানলি তুই?

- রাত্রিরা জমজ দুই বোন, বড় বোনের নাম নিঝুম আর ছোটবোনের নাম রাত্রি।

- ওরে বাটপার, সবকিছু জেনে গেছো?

- না সবকিছু জানতে পারি নাই, আমি সেদিন কার ছবি তুলেছি সেটা বের করতে হবে। যদি সেই দিন নিঝুমের ছবি তুলে থাকি তাহলে তো আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু যদি রাত্রির ছবি তুলে থাকি তাহলে তো লে হালুয়া, অনেক কিছু করার আছে বলার আছে।

- আমি সেটাও তোকে বের করে দিচ্ছি সেজন্যই মিষ্টির বাজেট করতে হবে।

- আচ্ছা আগে বল।

- নিঝুম আর রাত্রি দুজনের চেহারা একরকম ঠিক কিন্তু দুজনের চুলের স্টাইল ভিন্ন ভিন্ন। শুধু এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ, নিঝুমের মাথার চুল কোঁকড়া আর রাত্রির চুল কোঁকড়া নয়। তুই যেই ছবি দিলি সেখানে রাত্রির চুল দেখা যাচ্ছে এবং সেই জন্য বুঝতে পারছি তুই রাত্রির ছবি তুলে এনেছিলি। সুতরাং নিঝুমের বিয়ে হয়ে গেছে যাকে তুমি এখনো দেখো নাই। আর যাকে দেখে মনের মধ্যে বিদ্যুৎ চমকে গেল তিনি হচ্ছে রাত্রি, তার এখনো বিয়ে হয় নাই।

- আর সে এখন চট্টগ্রামে আছে চাকরি করে তাই তো?

- কীভাবে জানলি?

- আগে তোরটা বল।

- আমি আমার সেই বন্ধুর সাথে সবকিছু খুলে বলেছি তারপর অনুসন্ধান করে করে মনের সকল কৌতূহল মেটালাম। তবে আমার বন্ধু কিন্তু তোকে সঠিক নাম্বার দিয়েছিল।

- এখন আমি বলি শোন, রাত্রি চট্টগ্রামে আছে এবং সে আমার সাথেই নতুন জয়েন করেছে। আজকে সকালেই তার সাথে প্রথম দেখা হলো আমার।

- বারেহ বাহ, তাহলে তো পথ পরিষ্কার।

- আচ্ছা রাকিব তুই রাখ তাহলে, আমি বাসায় গিয়ে ফ্রী হয়ে বিস্তারিত কথা বলবো।

- আচ্ছা ঠিক আছে।

----

লান্স শেষ করে রাত্রি বসে আছে একটা টিনের চালা রুমের মধ্যে। এখানে মোটামুটি স্টাফ জাতীয় কিছু কাজের আলোচনা চলে। অবশ্য তার জন্য আলাদা আরেকটা রুম আছে কিন্তু সেখানে তাদের ম্যানেজার বসে আছে। ম্যানেজার চলে গেলে তখন সে সেখানে বসতে পারবে, কিন্তু সেই রুমে সজীব আর আরও দুইজন বসবে।

মোবাইলে সিয়ামের কল এলো, রাত্রির এই মুহূর্তে মেজাজ খারাপ কারণ টিনের চাল গরম হয়ে খুব গরম লাগছে। যদিও শীতের দিন তবুও দুপুরের প্রখর রোদে গরম বেশি লাগছে।

রাত্রি আর সিয়ামের প্রেমের সম্পর্ক প্রায় বছর খানিক হয়ে গেছে। মোটামুটি বিয়ে হবার সম্ভবনা আছে খুব তাড়াতাড়ি কারণ দুজনেই চাকরি করে।

সিয়াম রাত্রির চেয়ে এক বছর সিনিয়র ছিল কলেজে।

- রাত্রি রিসিভ করে বললো, হ্যা বলো।

- কি করো?

- লান্স শেষ করে বসে আছি, তুমি কি করো?

- আমি এখনো লান্স করতে যেতে পারি নাই।

- কেন?

- একটু কাজের চাপ তাই।

- সকাল থেকে মন খারাপ আমার, চাকরি করতে পারবো কিনা জানিনা সিয়াম।

- কেন?

- নতুন একটা স্যারের সঙ্গে কাজ করতে হবে, তিনি খুব রসকষহীন কাঠখোট্টা মানুষ। কথার মধ্যে কোন মিষ্টি কথা নেই, সারাক্ষণ শুধু কড়া কড়া কথা বলে। তাকে একদমই ভালো লাগে না।

- তুমি তো চাকরি করবে তাহলে ভালো লাগার দরকার কি? রসকষহীন তাই আমার তো ভালো লাগছে। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তোমাকে যদি সে পটিয়ে ফেলে তখন আমার কি হবে?

- ফাজলামো করবা না সিয়াম, তুমি কিন্তু ভালো করে জানো আমি তোমাকেই বিয়ে করতে চাই।

- কত মানুষ তো বিয়ের পরও স্বামীকে রেখে বড় ধরনের কোন ভালো চাকরিজীবী দেখে চলে যায়। কীভাবে বিশ্বাস করি বলো তো?

- করতে হবে না বিশ্বাস।

খট করে মোবাইল কেটে দিল রাত্রি, এটা কেমন ধরনের রসিকতা? সবসময় এমন করে বলে তাই খারাপ লাগে রাত্রির।

সিয়াম আরেকবার কল দিল কিন্তু রাত্রি রিসিভ না করে কেটে দিল। তখন সিয়াম একটা মেসেজ দিয়ে বললো

" অভিমান করে গাল ফুলিয়ে বসে থাকো আর তোমার স্যার কিন্তু বেশি বকা দেবে। যতখুশি রাগ করে থাকো সমস্যা নেই, রাতে কথা বলে সকল রাগ কমিয়ে ভালবাসা আদায় করবো। "

মেসেজ পড়ে রাত্রি হেসে দিল, কারণ সিয়াম সত্যি সত্যি রাগ ভাঙ্গাতে ওস্তাদ। রাতের বেলা ঠিকই দুজনে আবার খুব রোমান্টিক ভালবাসার স্বপ্নের মধ্যে হারিয়ে যাবে। সিয়াম বর্তমানে আছে ঢাকার বাইরে, নরসিংদির ভিতরে, অনেকদিন তার সাথে দেখা হচ্ছে না।

গ্যালারির মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে হঠাৎ করে রাত্রির চোখে সেই রাতের ৪/৫ টা ছবি দেখতে পেল। সেই অপরিচিত মানুষটা ছবি গুলো পাঠিয়ে আবার উধাও হয়ে গেল। অবশ্য রাত্রিও তাকে ব্লক করে দিয়েছে কিন্তু লোকটার পরিচয় জানা হলো না রাত্রির।

কৌতুহল নিয়ে রাত্রি হোয়াটসঅ্যাপ এ গিয়ে সেই আইডি ব্লক খুলে দিল। অনলাইনে আছে দেখে সে নক করলোঃ-

- আসসালামু আলাইকুম।

সজীব তখন ফেসবুকের মধ্যে ছিল কিন্তু হঠাৎ করে রাত্রির মেসেজ দেখে অবাক হয়ে গেল। সে প্রথমে ভাবলো যে রাত্রির কাছে নাম্বার দিয়েছে তাহলে কি সে চিনে গেছে? পরক্ষণেই মনে হলো যে, সে যেই নাম্বার দিয়ে ইমো হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে সেটা ব্যক্তিগত নাম্বার। এই নাম্বার অফিসের কাউকে সে দেয় না কখনো।

সজীব রিপ্লাই দিলঃ-

- ওয়া আলাইকুম আসসালাম।

- কেমন আছেন?

- আলহামদুলিল্লাহ আপনি কেমন আছেন?

- আলহামদুলিল্লাহ, সেদিন রাতে অকারণে ব্লক করার জন্য সরি।

সজীব মেসেজ পরে হেসে দিল। যদি এখন রাত্রি তার সামনে থাকতো তাহলে বলতো, আবারও সরির বস্তা খুলে গেছে নাকি? কিন্তু যেহেতু মেসেজ তাই কিছু বলা যাচ্ছে না এবং সে যে তার স্বামী সেটা বুঝতে না দিয়ে বললোঃ

- সমস্যা নেই, আপনার ব্যক্তিগত সমস্যা থাকতে পারে তাই কিছু মনে করিনি।

- একটা প্রশ্ন করবো?

- হ্যাঁ করুন।

- আপনি ছবিগুলো কেন তুলেছেন?

- ভালো লেগেছিল খুব তাই।

- আপনার মায়ের জন্য পুত্রবধূ খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাই না?

- অনেকটা তাই।

- হাহাহা, তো আপনার মায়ের কাছে সেই ছবি দেখাইছেন?

- হ্যাঁ।

- পছন্দ হয়েছে আপনার মায়ের?

- শুধু পছন্দ নয় বরং কল্পনার মাঝে বিয়ে দিয়ে নাতি বানিয়ে ফেলেছেন।

- হাহাহা হাহাহা, বলেন কি?

- সত্যি বলছি।

- আপনার মায়ের কাছে আজকে বলবেন, যেই মেয়ের ছবি তুলেছেন সেই মেয়ের বয়ফ্রেন্ড আছে এবং তাদের বিয়ে মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছে।

সজীব এবার রিপ্লাই করতে গিয়ে থমকে গেল, কি জবাব দেবে সেটা ভাবতে খানিকটা সময় লাগলো সজীব এর।

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ৩ গল্পের ছবি