হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ১৮

🟢

পরদিন সকাল বেলা মোবাইল হাতে নিয়ে সজীব দেখলো মায়ের নাম্বার থেকে রাতে বেশ কয়েকটা মিসকল এসেছে। সজীব বুঝতে পারছে নিশ্চয়ই এগুলো ডাইরেক্ট কল ছিল কিন্তু রিসিভ করতে পারে নাই বলে মিসডকল হয়ে গেছে। মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করলো, মা এতো রাতে কেন কল দিল বারবার? বাড়িতে কোন সমস্যা নাকি? সবাই ভালো আছে তো?

সঙ্গে সঙ্গে মায়ের নাম্বারে কল দিল সজীব, আর কিছুক্ষণ পরেই রিসিভ হলো।

- হ্যালো মা?

- কেমন আছো বাবা?

- আমি ভালো আছি, গতকাল রাতে মোবাইলের ভলিউম কম ছিল তাই শুনতে পারিনি। কিন্তু তুমি অনেকবার কল দিছো, সবকিছু ঠিক আছে তো?

- হ্যাঁ আমরা ঠিক আছি, আশরাফুল মাস্টার নাকি খুব অসুস্থ। দুদিন আগে তাকে খুলনা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তোর বাবা গতকাল রাতে বাজার থেকে শুনে এসেছে তাই তোকে কল দিছি বারবার।

- বলো কি? কোন হাসপাতালে?

- আবু নাসের হাসপাতাল।

- ঠিক আছে আমি ফ্রেশ হয়ে এক্ষুনি বের হচ্ছি।

- তার সঙ্গে যুথি আছে, তুই একটু সেখানে গিয়ে দেখ তাদের কি অবস্থা? লোকটা অনেক ভালো মানুষ ছিল, খুব খারাপ লাগছে আমাদের।

- ঠিক আছে মা যাচ্ছি আমি।

★★

তড়িঘড়ি করে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে সজীব রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সরাসরি সাইডে গিয়ে সজীব রাত্রির রুমে নক দিল, রাত্রি তখনও বিছানা ছেড়ে উঠে নাই।

দরজা ধাক্কার শব্দ পেয়ে রাত্রি দরজা খুলে সজীব কে দেখে অবাক হয়ে গেল। ঘুম থেকে মাত্র উঠে আসার জন্য তার চোখে মুখে একটা আলাদা করে সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্য এ মুহূর্তে সজীব এর নজরে পরলো না।

- সজীব বললো, রাত্রি আমি একটু হাসপাতালে যাচ্ছি। আমার খুব শ্রদ্ধার একজন শিক্ষক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে। তাকে নিয়ে একটু বিজি থাকতে হতে পারে, তুমি বরং এদিকটা ভাল করে দেখো।

- স্যার অবস্থা কি বেশি খারাপ?

- উঁহু, সকাল বেলা বাসি মুখে অলুক্ষুনে কথা কি না বললেই নয়? যাও তাড়াতাড়ি গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হও। এতবেলা করে ঘুমাতে হয় নাকি? নাকি নাকের ডগায় কাজ তাই বিছানা থেকে আর শরীর উঠতে চাচ্ছে না?

রাত্রি দেখলো সজীব এর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে সে যেমন ব্যবহার করেছিল ঠিক সেই রকমের রেগে গেল সজীব। এই মুহূর্তে তর্ক না করে মাথা নিচু করে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ তাই সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সজীব পিছনে ফিরে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে হাঁটতে লাগলাে।

★★

হাসপাতালের মধ্যে কেবিনে স্থান হয়নি যুথির বাবা মাস্টার আশরাফুলের, তাই সবার সঙ্গে বেডে সে শুয়ে আছে। যুথি তার একমাত্র সঙ্গী, যুথির কেন আত্মীয় ছিল না যে এখানে আসবে। গ্রামের বাড়ি যারা আছেন তারা বেশিরভাগ কেউ আসেনি, তাই নিয়ে যুথির কোন আফসোস নেই। সে সম্পুর্ণ চুপ হয়ে নিজের মনে বাবার সেবাযত্ন করে যাচ্ছে, মনে হয় এগুলো তার করার জন্য তৈরী সে। সে যদি ছেলে হতো তাহলে কি আসতে পারতো? জানিনা আমি, যুথি হয়তো জানে।

দুদিন আগে হঠাৎ করে বিকেলে খাট থেকে পরে গিয়েছিল যুথির বাবা। যুথি তখন বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল, দৌড়ে এসে দেখল যে বাবা কেমন করেছে। তাড়াতাড়ি চিৎকার করে সে সাহায্য চাইল, বাড়ির সামনে দিয়ে এক প্রতিবেশী যাচ্ছিল। তিনি দৌড়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকেছিলেন আর তারপর তিনিই কল দিয়ে গাড়ি এনে তাদের উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গেল।

সন্ধ্যা বেলা হাসপাতাল থেকে জানানো হলো যে রোগীর অবস্থা ভালো না তাই তাকে খুলনা সদর হাসপাতালে কিংবা আবু নাসের হাসপাতালে নিয়ে গেলে ভালো হবে। এম্বুলেন্স ঠিক করে যুথি সঙ্গে সঙ্গে খুলনা রওনা দিল, সে বাড়ি থেকে আসার সময় শুধু একটা বোরকা পরে ছিল এবং এই দুদিন ধরে সে ওই বোরকা আর শাড়ি পরে আছে। হাসপাতালে গোসলের ব্যবস্থা আছে কিন্তু সে তো কিছু নিয়ে আসে নাই।

আগামীকাল তার ছোটমামা আসার কথা আছে, যদি তিনি আসেন তাহলে বাড়ি থেকে পোশাক আসবে। ডাক্তার বলেছেন কমপক্ষে আরও দশ দিন থাকতে হবে, তবে এরমধ্যে যদি রোগী অবস্থা ভালো না হয় তাহলে বেশিও লাগতে পারে।

মাস্টার সাহেব কথা বলতে খুব কষ্ট পান, একদম আস্তে আস্তে তিনি মেয়ের সঙ্গে কথা বলেন। যুথি তার অবস্থা দেখে মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, তার বাবার মতো ভালো মানুষের এমন কষ্ট কেন?

বাবার বেডের পাশে ছোট্ট টুলে বসে বেডের উপর মাথা রেখে তন্দ্রা লেগেছিল যুথির। তার বাবাও এ মুহূর্তে ঘুমিয়ে আছে তাই সেও একটু ঝিমিয়ে গেল মনে হয়। কিন্তু হঠাৎ করে মাথায় কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে তন্দ্রা ভেঙ্গে গেল তার। চোখ মেলে সে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। সজীব দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে, সে কীভাবে আসলো? সেদিন সন্ধ্যা বেলা যাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে সে ভালবাসা ভিক্ষা চাইল। এবং তার সেই কান্নাকেও উপেক্ষা করে যে মানুষ পরদিন সূর্য ওঠার সাথে সাথে গ্রাম ত্যাগ করলো, সে কেন এখানে?

- যুথি কিছু না বলে টুল থেকে উঠে বসার যায়গা করে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

- সজীব সেখানে বসে বললো, এখন কেমন আছে স্যার?

- জ্বি আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো।

- আমাকে জানাওনি কেন?

- যুথি একটু হাসলো, মুখের মধ্যে একটা কথা এসে আটকে গেল।

- ডাক্তার সবসময় আসে?

- ডাক্তারের কাজই তো রোগী দেখা, তাহলে তিনি কেন আসবেন না?

- সজীব বুঝতে পারছে যুথি অভিমান নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে। সজীব বললো, আমি যদি আগে জানতাম তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আসতাম, আর আমাকে তোমার জানানো উচিৎ ছিল।

- আমি তো জানি না আপনি কোথায়? তাছাড়া দরকার হয়নি তাই কাউকে ডাকিনি।

- যদি হতো?

- ছোটমামাকে আসতে বলেছি তিনি কাল সকালে বাড়ি থেকে কিছু টাকাপয়সা আর আমার জন্য কাপড়চোপড় নিয়ে আসবেন!

- কাপড়চোপড় কেন?

যুথির রাগ চেপে গেল, কিন্তু তার বাবা ঘুমাচ্ছে তাই কিছু না বলে চুপচাপ বের হয়ে গেল। আর সজীব সেদিকে তাকিয়ে রইল, আবার সে স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। একটু পরে যুথি পিছন থেকে এসে বললো,

- দাঁড়িয়ে আছেন কেন? এদিকে আসুন, বাবা তো ঘুমাচ্ছে তাই পরে কথা বলবেন। যদি বেশি ব্যস্ততা থাকে তাহলে ভিন্ন ব্যবস্থা করতে হবে।

সজীব তখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল, যুথির কাছে যখন জানলো যে সে দুদিন ধরে গোসল করতে পারে নাই। এবং একমাত্র বাবার জন্য সে খুব কষ্টের মাঝে-ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তখন সে একটু অবাক হতে চাইলো কিন্তু পারে নাই, আর তারপরই সজীব বললোঃ-

- একটা কথা বলবো?

- জ্বি বলেন।

- আমি যেখানে থাকি সেখানে যেতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। আসার সময় সাইড থেকে বের হয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে এবং তার বাইক নিয়ে এসেছি। তুমি যদি আমার সঙ্গে এখন যাও তাহলে ভালো হবে, গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আবার আমিই নিয়ে আসবো।

- ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল যুথি, আশ্চর্য আপনি এমন প্রস্তাব কীভাবে দিলেন?

- আশ্চর্য হবার কি আছে? যা বলছি তাই হবে, আমি স্যারকে এখানে দেখার ব্যবস্থা করছি।

যুথিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সজীব তার স্যারের বেডের দিকে চলে গেল। আর যুথি হা করে তাকিয়ে রইল সজীব এর দিকে, একটু পরে সে আস্তে আস্তে ভিতরে গেল।

ভিতরে গিয়ে দেখে অবাক কান্ড, তার বাবা জেগে আছে এবং বেডের পাশে একটা নার্স। যুথি আস্তে আস্তে কাছে যেতেই তার বাবা তাকে ইশারা করে কাছে ডাকলেন। তারপর বললেন,

- আমি তো এখন একটু সুস্থ আছি, আমাকে নিয়ে ঘন্টা দুই সময় চিন্তা করতে হবে না। তুই বরং ওর সঙ্গে বাসায় গিয়ে একটু গোসল করে শরীরটাকে হালকা করে আয়। নাহলে আমার সঙ্গে সঙ্গে তুইও যে অসুস্থ হয়ে যাবি।

যুথি কিছু না বলে রাগান্বিত হয়ে সজীবের দিকে তাকিয়ে রইল, আর সজীব সেটা বুঝতে পেরে মুখ ঘুরিয়ে পাশে তাকিয়ে আছে।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও নার্সের কাছে দায়িত্ব দিয়ে সজীব এর সঙ্গে বেরিয়ে গেল যুথি। যদিও সেই নার্সকে টাকা দিতে হয়েছে কিন্তু কত টাকা তা সে জানে না। নিচে এসে সজীব যখন বাইক স্টার্ট দিল সেই সময় যুথি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে বাইকে উঠে বসলাে। কিন্তু সমস্ত রাস্তার মধ্যে কেউ কোন কথা বলে নাই।

যুথিকে সে নিয়ে গেছিল রাত্রির কাছে, কারণ সে ভাবলো রাত্রির কাছে সবকিছুই পাওয়া যাবে। এক মেয়ে নতুন এক যায়গা গিয়ে কি কি দরকার সেটা আরেকটা মেয়ের কাছে নিশ্চয়ই আছে। যুথিকে রাত্রির কাছে দিয়ে সজীব সাইডের কাজের দিকে গেল, খুব সংক্ষিপ্ত করে চারিদিকে একটা চক্কর দিয়ে সে আসতে চাইছিল। কিন্তু পরে ভাবলো যে যতক্ষণ পর্যন্ত যুথি বা রাত্রির ডাক না আসে ততক্ষণে সে যাবে না। আর এভাবেই অপেক্ষা করতে করতে বেলা দেড়টার দিকে সজীবকে যুথি কল দিয়ে বললো,

- আমার তো হাসপাতালের জন্য মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে, বাবার ওষুধ আছে দুপুরে। আমি সেখানে যেতে চাই, আপনি কি আমাকে একটু সেখানে যাবার ব্যবস্থা করে দিবেন?

সজীব দেখলো যুথি তাকে সঙ্গে যেতে বলে নাই বরং ব্যবস্থা করতে বলেছে। সে আবারও সেই ঠিকাদারের বাইক নিয়ে যখন যুথিকে নিতে গেল তখন যুথি বললো,

- আপনাকে কষ্ট করে যেতে হবে না, আমি একাই যেতে পারবো। আপনি যদি বাবাকে আজকে আর একবার দেখতে চান তাহলে আপনার সেই মানুষ টার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে তারপর নাহয় একবার হাসপাতালে যাবেন।

- সজীব অবাক হয়ে বললাে, কার কথা বলছো?

- কেন আপনার সেই চিরপরিচিত বৃষ্টি?

সজীবের মুখটা কালো হয়ে গেল, নিশ্চয়ই রাত্রির কাছে শুনেছে যুথি। খুব রাগ হচ্ছিল রাত্রির প্রতি, কেন বলতে হবে বৃষ্টির কথা?

- যুথি আবারও বললো, আশা করি বাবা এ যাত্রা বেঁচে যাবেন তাই তার জন্য আপনার বন্ধুর সেই জন্মদিনে যাওয়া মিস করবেন না। আমি চলে যাচ্ছি, আপনি বরং কালকে সকালে হাসপাতালে গিয়ে একটু দেখে আসবেন।

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ১৮ গল্পের ছবি