হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ২২

🟢

হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রাত্রি আর সিয়াম, আইসিইউতে চিকিৎসায় রয়েছে সজীব। ডাক্তার এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না, কারণ এখন পর্যন্ত জ্ঞান ফেরেনি। আঘাতের কারণে প্রচুর পরিমাণ রক্তক্ষরণ হয়েছে কিন্তু ঠিক সময় মতো রক্ত সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। সজীব এর রক্তের গ্রুপ "এ নেগেটিভ" তাই রক্ত যোগাড় করতে কষ্ট হচ্ছে।

রাত্রি বেশ চিন্তিত তাই সিয়াম তাকে বললােঃ-

- তুমি খুব টেনশনে আছো।

- থাকবো না? স্যার মুমূর্ষু অবস্থায় পরে আছে আর টেনশন হবে না?

- টেনশন করে কি হবে? ডাক্তার তো চিকিৎসা করে যাচ্ছে তাই না?

- মানে কি সিয়াম? স্যার গতকাল বিল্ডিং থেকে পরে গেছে আর এখনো জ্ঞান ফেরেনি, সেখানে কি টেনশন হবে না?

- আচ্ছা ঝগড়ার দরকার নেই, আমি ভাবছি যে পরে গেছে নাকি কেউ ফেলে দিয়েছে?

- তা তো জানি না, কিন্তু আগে তো স্যার সুস্থ হোক তারপর ওসব জানা যাবে।

- তোমার স্যারের বাড়িতে খবর পাঠানো হয়েছে নাকি? কেউ কি আসছে?

- গতকাল জানানো হয়নি, কারণ স্যারের কাছ থেকে নাম্বার বের করা হয়নি। আজকে সকালে আমি তার সিম খুলে আমার মোবাইলে লাগিয়ে তারপর কল দিছিলাম "মা" লিখে সেভ করা নাম্বারে।

- কি বললেন তারা?

- খুব কান্না করছিল জানো? আমার না এতটা খারাপ লাগছিল স্যারের মায়ের কান্না শুনে। স্যার নাকি তাদের একমাত্র সন্তান, আর কোন সন্তান নেই তাদের।

- আচ্ছা তুমি যে তোমার স্যারের ল্যাপটপে ছবি দেখেছিলে সেগুলো তিনি কেন তুলেছেন জিজ্ঞেস করেছিলা?

- না, কিন্তু সেকথা এখন কেন সিয়াম?

- এমনিতেই, হাসপাতালে দাঁড়িয়ে তো সময় পার হচ্ছে না তাই কথা খুঁজে বের করি।

- তুমি নাহয় চলে যাও, আমি বরং স্যারের বাবা মা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করি।

- তোমার স্যার মনে হয় তোমাকে সেইদিন ফেরির মধ্যে দেখে পছন্দ করেছিলেন তাই হয়তো অত গুলো ছবি তুলে রেখেছিল। আবার সেই ছবি কত যত্ন করে ল্যাপটপের মধ্যে সাজিয়ে রেখেছে।

- তোমার সঙ্গে বলাটাই ভুল হয়েছে, আর তুমি যে কি করো হাসপাতালে? আল্লাহ..!

- কেন খারাপ লাগে আমাকে? তাহলে কাকে ভাল লাগে? তোমার স্যারকে?

- হ্যাঁ, আমার স্যারকে মেলা মেলা ভালো লাগে, যদি তাকে আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখে তাহলে সে সুস্থ হবার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাকে প্রপোজ করবো।

- মানে কি?

- তুমি এখন যাও তো, ফালতু ধরনের কথা বলতে তোমাকে থাকতে হবে না সিয়াম।

রাত্রির চোখ ভিজে যাচ্ছিল, কণ্ঠ শক্ত হয়ে গেছে কারণ সজীবে৷ এখনো কোন পরিবর্তন নেই। আর ডাক্তাররা কিছু বলছে না, যদি এখানে ভালো না হয় তাহলে ঢাকা নিতে হবে। কিন্তু সেটা যদি তারা না বলে তাহলে কীভাবে নেবে ওরা?

সজীব এর মা-বাবা দুজনেই এসেছে, হাসপাতাল এর পরিবেশ কান্না করে ভারি করে ফেলেছেন। রাত্রি তাদের শান্তনা দিচ্ছে, সজীব এর বাবা খুব শক্ত মানুষ তিনি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছেন। কিন্তু সজীবের মা ভেঙ্গে পরেছে খুব, তবে কান্নার মধ্যে তিনি রাত্রির দিকে তাকিয়ে অবাক হলেন। কারণ সজীব এর কাছে তো রাত্রির ছবি তিনি দেখেছিলেন। মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে কিন্তু, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা সন্তানের কথা ভেবে পৃথিবীর আর কিছু মাথায় আসে না।

পাশাপাশি দুই প্রজন্মের দুই নারী কান্না করছে। একজন মা, আরেকজন শুভাকাঙ্ক্ষী। রাত্রির কাছে সজীবের ব্যবহার এতটা ভালো লেগেছিল যে সে হয়তো নিজের বয়ফ্রেন্ড থাকার পরও অনেকটা দুর্বল হয়ে গেছে। সিয়ামকে তো সরাসরি বলেই দিল যে সে সজীবকে প্রপোজ করবে। সত্যি সত্যি পারবে তো?

★★

সন্ধ্যার পর থেকে মনটা খুব খারাপ লাগছে যুথির, জুবায়ের কল দিয়েছিল কিন্তু তাকে মাথাব্যথার অজুহাত দেখিয়ে রেখে দিল। বাবার শরীর বিকেল থেকে ভালো না তাই তিনি ঘুমিয়ে আছেন, যুথি অন্ধকারে কতক্ষণ সামনের বারান্দায় চেয়ারে বসে রইল। বিকেলে বাবার সঙ্গে বেশ কিছু কথা হলো তার, তখন কথায় কথায় সে সজীব এর কথা জিজ্ঞেস করেছিল।

- আচ্ছা বাবা, সজীব ভাই মানুষটা অমন রহস্যের গণ্ডি দিয়ে ভর্তি কেন?

- হাহাহা, এতদিনে তোর মনে হচ্ছে এটা? ওকে তো সেই স্কুল জীবন থেকে আমি রহস্যময় একটা ছেলে হিসাবে চিনি।

- কিন্তু কেন বাবা? স্বাভাবিক নয় কেন সে? তার সবকিছু কত অদ্ভুত, আর দশটা মানুষের সঙ্গে সে একদমই মিলে না।

- সৃষ্টিকর্তা কিছু কিছু মানুষ অদ্ভুত ভাবে তৈরী করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। তারা সবসময় তাদের আশেপাশের সবাইকে অবহেলা করে আনন্দ খুঁজে পাবে এটাই জগতের নিয়ম।

- কিন্তু তাদের সেই অবহেলায় অন্য কেউ যদি আঘাত পায় তাহলে কি হবে?

- সেটা তো তারা ভ্রুক্ষেপ করে না।

- কেন করে না?

- ওই যে, আলাদা সৃষ্টি তাই।

- সজীব ভাইয়ের এবার বিয়ে করা উচিৎ, আন্টি তো দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন। এখন তারও একটা বিয়ে করে বউ আনা উচিৎ, সেদিন বিকেলে তাদের বাড়ি গিয়ে সেটা মনে হচ্ছিল।

- তোর বিয়ের সময় যদি বাড়িতে আসে তখন বলবো বিয়ের কথা। ওর বিয়েটাও দেখে যেতে পারলে মন্দ হয় না, এ জীবনের মেয়াদ আর যে বেশি নেই।

- ধুর বাবা, দিলা তো মন খারাপ করে। তোমার সঙ্গে এ জন্য ইদানীং কথা বলতে আসি না আর তাছাড়া তোমার তো কথা বলা বারণ।

- আচ্ছা ঠিক আছে বাদ দে, শরীর ভালো লাগে না আমার তুই বরং মশারী টানানোর ব্যবস্থা কর নাহলে সন্ধ্যা হতেই মশা আসবে।

অদ্ভুত কিছু একটা আওয়াজে ধড়মড় করে উঠে গেল যুথি, চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে চারিদিকে অন্ধকার। একদম নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করা পরিবেশ কিন্তু ওটা কিসের শব্দ? এম্বুলেন্স নাকি পুলিশের গাড়ি?

হাতের মোবাইল পায়ের কাছে পরে আছে, সেটা তুলে নিয়ে সময় দেখলো। সাড়ে এগারোটা বাজে, তারমানে সে এখানে প্রায় আড়াই ঘন্টা ধরে বসে আছে?

ক্রমশ শব্দ এগিয়ে যাচ্ছে তাদের গ্রামের মধ্যে দিয়ে, মনে হচ্ছে সেটা এখন বাজারের দিকে চলে গেছে। কারণ শব্দটা বাজারের দিক থেকে শুনতে পাচ্ছে, এবং ছিমছাম।

যুথি মোবাইলে ফ্লাশ জ্বালিয়ে বারান্দা থেকে উঠে ভিতরে যাচ্ছিল হঠাৎ করে তার বাবা বললোঃ-

- কে যুথি নাকি?

- হ্যাঁ বাবা, তুমি ঘুমাওনি?

- সন্ধ্যা থেকে তো ঘুমালাম, কিছুক্ষণ আগে ঘুম ভেঙ্গে গেল কিন্তু এম্বুলেন্সের শব্দ আসছে কোন যায়গা থেকে?

- জানি না তো বাবা, কেউ অসুস্থ হলো নাকি?

- এতরাতে অসুস্থ হলে কেউ এম্বুলেন্স ডেকে সময় নষ্ট না করে নিজেরাই হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে কারো লাশ নিয়ে হয়তো এসেছে।

- তুমি বরং বাজারের চৌকিদারকে একটা কল দিয়ে দেখো না বাবা, কেমন খটকা লাগে।

- এতোরাতে?

- দাওনা বাবা।

- ঠিক আছে তুমি কল দিয়ে দে আমি কথা বলে জিজ্ঞেস করছি।

বাজারের রাতের পাহারাদারকে কল দিয়ে বাবার কাছে দিল যুথি। চৌকিদার রিসিভ করে বললোঃ-

- হ্যালো আসসালামু আলাইকুম।

- ওয়া আলাইকুম আসসালাম, আমি আশরাফুল মাস্টার বলছিলাম।

- জ্বি মাস্টার সাহেব, বলেন।

- এম্বুলেন্সের শব্দ পেলাম, কে এসেছে?

- সূর্যমুখী গ্রামের সজীব ছেলাটা মারা গেছে সন্ধ্যা বেলা, তারই লাশ নিয়ে এসেছে। শুনলাম, বাসার ছাদ থেকে নাকি পরে গিয়েছিল গতকাল, আর আজকে সন্ধ্যা বেলা মারা গেছে।

- কি..? কি বললা তুমি?

যুথির কানে বাক্যটা পৌঁছে গেল, সমস্ত শরীরে যেন জগতের সমগ্র অন্ধকার গ্রাস করেছে। আর বাহিরের অন্ধকার তার পৃথিবীর অন্ধকারের কাছে হার মেনে গেল।

যুথি তার বাবাকে বললো, বাবা আমি সজীব ভাইর কাছে গেলাম। এ কথা বলেই দরজা খুলে বাহিরে দৌড়ে নেমে গেল, তার বাবা পিছন থেকে বারবার বলছেন " একা একা কোই যাস মা? "

যুথি এগিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার চিরে, যে মানুষটা তার কাছে ফিরে আসবে বলেছিল সেই মানুষটা চিরকালের জন্য চলে এসেছে গ্রামের বাড়িতে।

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ২২ গল্পের ছবি