হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ২০

🟢

স্যারের কথা শুনে সজীব কিছুক্ষণ চুপ করে সেই অবস্থায় বসে ছিল, তারপর উঠে আস্তে আস্তে সে বাহিরে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ করে মন থেকে কেমন যেন বের হতে চাচ্ছে, কিন্তু কেন?

মনটা খারাপ হচ্ছে কেন?

সে তো যুথিকে নিজেই ফিরিয়ে দিচ্ছে, যুথি তাকে বারবার অনুরোধ করার পরও সে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। যুথি আজ যদি তাকে রেখে অন্য কারো সঙ্গে ঘর বাঁধতে চায়, তাতে তার কি? তার তো এ নিয়ে মন খারাপের কোন কারণ নেই।

- একা একা দাঁড়িয়ে আছো কেন?

চমকে গেল সজীব, পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে যুথি দাঁড়িয়ে আছে।

- না এমনিতেই!

- মন খারাপ?

- কোই না তো।

- সেটাই ভালো, আপনার আবার মন খারাপ হবে নাকি? মরুভূমির বালুর মতো উত্তপ্ত।

- তোমার বিয়ে হঠাৎ করে ঠিক হয়ে গেছে?

- কে বলেছে? বাবা?

- হ্যাঁ।

- কি করবো বলেন? মা-বাবার আফসোস দেখে আর সহ্য হচ্ছে না। যদিও মুখ দিয়ে এখর আর কিছু বলে না কিন্তু তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি মনের অন্তঃপুরের কষ্ট বুঝতে পারি। তাছাড়া যার জন্য ভালবাসার মহাসমুদ্রে ঝাপিয়ে পরে এ জীবনে হাবুডুবু খেলাম, সেই মানুষটা একবার সমুদ্রের পাড়ে এসেও খবর নিল না। আপনি একটু বলেন, একা একা মানুষ কত করবে বলেন?

- সজীব চুপচাপ।

- আপনি বরং চলে যান, আপনার কাজের তো অনেক সমস্যা হচ্ছে।

- তোমার সঙ্গে যার বিয়ে ঠিক হয়েছে তিনি কি স্যারের অসুস্থতার কথা জানে?

- হ্যাঁ জানে, সে নিজেই এম্বুল্যান্সে তুলে দিয়েছে। সঙ্গে আসতে চাইছিল কিন্তু আমি নিষেধ করেছি, কারণ আমি নেই আর সেও যদি আসে তাহলে স্কুল চলবে কীভাবে?

- ওহ্ আচ্ছা।

- লোকটা খুব কেয়ার করে, এতদিন আমি আমার চোখে সজীব নামের একটা চশমা পরে ছিলাম। তাই আমার চোখে এ পৃথিবীতে সজীব ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন ছেলে পরেনি। কিন্তু সেই চশমা খুলে এখন দেখি কত সুন্দর বিচিত্র পৃথিবী, আমি শুধু শুধু এতটা সময় নষ্ট করেছি। আজ থেকে অনেক আগেই যদি এই কাজটা করতে পারতাম তাহলে আমার বান্ধবীদের মতো আমারও ২/১ টা সন্তান থাকতো।

- সজীব হাসির চেষ্টা করে বললো, সন্তানের মা হবার খুব সখ বুঝি?

- একদম হাসবেন না, অসহ্য।

- বিয়েটা কব হবে?

- বাবাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যেদিন যাবো তার পরে ২/৪ দিনের মধ্যেই হতে পারে।

- স্যার বলছিলেন...

- ছেলে হিসেবে বিয়ের দায়িত্ব নিতে?

- হ্যাঁ।

- তার দরকার নেই, কারণ আমি কোন অনুষ্ঠান করে বিয়ে করবো না। ইচ্ছে আছে কাজি অফিসে গিয়ে দুজনেই বিয়ে করবো, অবশ্য মেম্বার এবং দু একজন মুরব্বিদের নেবো। বাড়িতে বিয়ের কোন বাড়তি আয়োজন করতে চাই না, সুতরাং আপনার আর সেই কষ্ট করতে হবে না।

- বুঝতে পারছি।

- তাহলে কি এখনই চলে যাবেন?

- এমন ভাব করছো, মনে হচ্ছে আমাকে চোখের সামনে থেকে সরাতে পারলেই বাঁচো?

- অনেক সেরকমই।

- কিন্তু কেন?

- একটু আগে ও কল দিছিল, যখন তোমার কথা বললাম তারপর বেচারা মন খারাপ করে মোবাইল কল কেটে দিয়েছে। সচারাচর এটা অনেকেই তো সহ্য করতে পারে না, কারণ নিজের পছন্দের মানুষকে কেউ পুরনো ভালবাসার সঙ্গে দেখতে চায় না।

- হ্যাঁ তা ঠিক, ঠিক আছে চলে যাচ্ছি।

★★★

যুথি তার বাবাকে নিয়ে যতদিন হাসপাতালে ছিল ততদিন সজীব প্রতিদিনই গিয়ে দেখা করতো। সে গেলে তার স্যার খুব খুশি হতেন, দুজনেই অনেক গল্প করতো।

তিনদিন হলো তারা চলে গেছে, কিন্তু সজীবের মনের মধ্যে একরাশ দীর্ঘশ্বাস জমা হয়ে গেল। কেন এমন হলো? বৃষ্টি নামের মেয়েটা তার জীবনে এসে সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়ে চলে গেল। আজ সে ফুটফুটে মেয়ের মা হয়ে দেশে এসেছে বেড়াতে, আহ আনন্দ। এর অনেক পরে সেদিন ফেরি ঘাটে রাত্রিকে তার ভালো লেগেছিল, কিন্তু সেটা কি ভালবাসা?

আর সেই স্কুল জীবন থেকে একটা মেয়ে তাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবেসে গেছে। অনিশ্চিত জেনে তবুও সে ভালবেসে গেছে শুধু কোন একদিন তার ভালবাসা পাবে বলে। আজ সেই যুথিও অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেল, সেও নতুন করে সংসার শুরু করবে। আচ্ছা যুথির কি দোষ আছে?

সে তো সজীবকে চায়, কিন্তু সজীবের অবহেলা যদি তাকে অন্য কারো হতে বাধ্য করে তাহলে সেই কারণে যুথি কেন দায়ী হবে?

তাহলে কি সব দোষ তার?

- মনের মধ্যে থেকে জবাব এলো, হ্যাঁ সব দোষ তোমার।

- সজীব মনকে প্রশ্ন করলো, আমার দোষ কেন ?

- মন বললো, তুমি চাইলে কিন্তু যুথির ওই নিষ্পাপ ভালবাসার মূল্য দিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে নিতে পারতে। তার এত বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাকিটা জীবন তাকে পূর্ণ ভালবাসা দিয়েই সাজিয়ে দিতে পারতে এবং নিজেও সুখী হতে। যুথির সেই সহকর্মী শিক্ষকের কিন্তু যুথির জীবন সঙ্গী হওয়া খুব বেশি জরুরি নয়। কিন্তু যুথির সেই কৈশোর থেকে গড়ে ওঠা ভালবাসার সফলতা খুব জরুরি ছিল। মা-বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে সে হয়তো সেই ছেলেকে বিয়ে করবে। বিবাহ বন্ধনের নিয়ম রক্ষা করতে সে হয়তো গভীর রজনীতে তার স্বামীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত অনুভব করবে। কিন্তু সেই সময় হয়তো তার মনের মধ্যে তোমার নামটা ভেসে উঠবে। দিনের শেষে ক্লান্ত হয়ে মাগরিবের নামাজের পরে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সে যখন নিস্তব্ধ হবে। তখন বুকের মধ্যে হুহু করে উঠবে, গভীর রাতে টিনের চালে কিছু টুপটাপ পতনের শব্দে হয়তো ঘুম ভেঙ্গে যাবে। কিংবা নিশাচর পাখির ডাকে ধড়মড়িয়ে বিছানায় বসে পরবে, আে পাশেই থাকব সুষুপ্ত স্বামী। এমন হতে পারে সে হয়তো বিছানায় বসেই ডুকরে কেঁদে উঠবে, কিংবা চাপা নিশ্বাস ছাড়বে। তার সেই রাতের নিস্তব্ধতার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যাবে তার স্বামীর। তারপর তার কপাল চুমু দিয়ে হয়তো নিজের বউকে বলবে, "কি হয়েছে? স্বপ্ন দেখছো নাকি? "

তারপর হয়তো স্বামীর বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে চেষ্টা করবে। তুমি চিন্তা করো সজীব, একটা মেয়ে তার স্বামীর বুকে মাথা রেখেও তোমার কথা ভেবে যাচ্ছে, তুমি কতটা ভাগ্যবান? এতটা শয়নে স্বপনে স্থান পেতে হলে কতকিছু করা লাগে, আর তুমি কিনা নিজেই ঠেলে দিলে?

- সজীব মনকে প্রশ্ন করলো, তাহলে আমি কি করতে পারি? কি বা করার আছে?

- মন বললো, অনেক কিছু করার আছে। যুথির সঙ্গী হয়ে সারাজীবন একসাথে কাটানোর মতো সুযোগ আছে। সন্ধ্যা বেলা একা একা হাহুতাশ না করে স্ত্রীর সঙ্গে ভালবাসার গল্প করতে পারার মত সুযোগ আছে। বাজারে গিয়ে পকেটে করে মন থেকে যত্ন করে তার জন্য কিছু কিনে আনার মতো সুযোগ আছে। তার সঙ্গে ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে রাতের জোৎস্না দেখতে পারবে কতকাল..! আহা কি সুন্দর একটা জীবন তুমি চাইলেই কিন্তু নিজের করে নিতে পারতে। দুপুরের রোদের তাপে ক্লান্ত পিপাসিত হয়ে বাসায় ফিরবে, দেখবে কারো একটা শাড়ির আঁচল তোমার কপালের ঘাম মুছে দেবার জন্য অপেক্ষা করছে। ঠান্ডা পানি বের করে দিয়ে তোমার সেই ঘর্মাক্ত শরীরের জড়িয়ে ধরে আনন্দ খুঁজে নেবে সে।

★★

চমকে গেল সজীব, সত্যি কি তাই? নিজের কিছু সুখ খুঁজে নিতে পারা যায় তাহলে? কিন্তু আজ তো তিনদিন হলো তারা চলে গেছে। যুথি বলেছিল যে গ্রামের বাড়িতে গিয়েই বিয়ে করবে, তাহলে কি তার আজকেই বাড়িতে যাওয়া উচিত?

ভাবতে ভাবতেই সজীব যুথির নাম্বারে কল দিল, যুথি রিসিভ করে বললোঃ-

- বাহহ, এতো সৌভাগ্য আমার?

- কেমন আছো যুথি?

- মেলা মেলা ভালো আছি, আপনি?

- জানি না।

- কেন কেন?

- তোমার বিয়ে কবে?

- আগামীকাল, সবকিছু মোটামুটি ঠিক হয়েছে। কালকেই আমরা কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ে করব, অবশ্য বাবা আপনাকে আজকেই কল দিত।

- যুথি আমি এখন বাড়িতে রওনা দেবো।

- ওহ্ আচ্ছা, হঠাৎ করে? নাকি ছুটিতে?

- তোমার জন্য, তোমাকে পাবার জন্য।

- হাহাহা হাহাহা, হাস্যকর সজীব ভাই।

- সত্যি বলছি যুথি, আমি আজকেই বাড়িতে গিয়ে স্যারের কাছে তোমাকে চাইবো। স্যার অবশ্যই আমাকে ফিরাইবে না, আমার দিকে তাকিয়ে সে নিশ্চয়ই রাজি হবে।

- আর স্যারের মেয়ে? তার রাজি হতে হবে না?

- তুমি তো রাজি।

- না, আমি আপনাকে নিয়ে আর স্বপ্ন দেখি না, রাখলাম, ভালো থাকবেন।

কল কেটে গেল।

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ২০ গল্পের ছবি