হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ২১

🟢

আগামীকাল বিয়ে হবে সেটা সম্পুর্ণ মিথ্যা, কারণ জুবায়ের বাগেরহাট গিয়েছে। যুথির সঙ্গে তার বিয়ে হচ্ছে সেটা সে কল্পনা করতে পারছে না, তাই বাগেরহাট খান জাহান আলীর মাজারে চলে গেছে যেটা যুথির একদমই অপছন্দ।

বিয়ের তারিখ এখনো চারদিন বাকি আছে, তাই যুথি সময় পাচ্ছে কিছুটা। হাসপাতাল থেকে এসে তার বাবা মোটামুটি সুস্থ আছেন কিন্তু বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেন না তাহলে শ্বাস উঠে যায়। সে জন্য যুথি তার বাবাকে কথা বলতে একদমই মানা করে দিয়েছে।

গতকাল রাতে সে ডায়েরিটা বুকের উপর রেখে অনেক কান্না করেছে। সজীবের সঙ্গে তখন তার কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছিল কিন্তু নিজেকে আর দুর্বল প্রমাণ করতে চায়নি যুথি।

★★

মোবাইল কেটে দিয়ে সজীব অন্যমনস্ক হয়ে কিছু সময় হাঁটতে লাগলাে। এমন সময় রাত্রি কল দিয়ে তাকে দক্ষিণ দিকের নতুন পাইল বসানোর স্থানে ডাক দিল। সজীব অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেখানে গিয়ে হাজির হলো, এবং সঙ্গে সঙ্গে তার রাগ বেড়ে গেল। কারণ যেখানে পাইল বসানো হচ্ছে সেখানে মাটি খুড়ে অনেক বড় গর্তের মতো করা হয়েছে এবং তার পাশেই রাখা হয়েছে অনেক পাথরের স্তুপ। যেকোনো মুহূর্তে সেই পাথর নিয়ে মাটি ধসে পরতে পারে গর্তে বা বেজমেন্টের মধ্যে। আর তখন আহত হতে পারে বেজমেন্টের মধ্যে কাজ করতে থাকা শ্রমিকরা।

যুথিরা যতদিন ছিল ততদিনে সে ডিউটি করেছে ঠিকই কিন্তু কাজে মনোনিবেশ করতে পারে নাই ঠিকঠাক। রাত্রিই বেশিরভাগ সময় কাজের জন্য ছোটাছুটি করেছে আর সমস্যা হলে সেটা ডেকে জিজ্ঞেস করেছে। কিন্তু এখন এই পরিবেশ দেখে সজীব এর সবচেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে যুথির উপর কারণ সে এটা কেন সরাতে বলে নাই?

যাইহোক।

মোটামুটি কাজের ধারণা দিয়ে পাথর সারানোর নির্দেশ দিয়ে সজীব চলে গেল। রাত্রি তার পিছনে পিছনে হাঁটছিল, কিছু বলতে গিয়ে যেন বারবার সে থমকে যাচ্ছে। সজীব বিষয়টা বুঝতে পেরেছে কিন্তু নিজের থেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে তার ইচ্ছে করছে না।

সজীবকে গেইট দিয়ে বের হতে দেখে রাত্রি আর চুপ থাকতে পারলো না। সে বললোঃ-

- স্যার আপনি চলে যাচ্ছেন?

- হ্যাঁ রাত্রি, হয়তো গ্রামের বাড়িতে যেতে পারি। বাসায় গিয়ে অফিসে কথা বলবো যে আমার কিছু দিনের জন্য ছুটি চাই।

- কিন্তু হঠাৎ করে স্যার?

- হ্যাঁ।

- আমার কিছু কথা ছিল।

- সেটা আগেই বুঝতে পারছি, বলো।

- স্যার, সিয়াম খুলনা আসতে চাচ্ছে।

- ওহ্ আচ্ছা।

- দৌলতপুর উপজেলা না যেন কোন যায়গা সে একটা জবের ব্যবস্থা করতে চায়।

- তাহলে তো খুব ভালো।

- কিন্তু স্যার।

- আমি একটু রুমে যাচ্ছি, তোমার সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে পরে কথা বলবো রাত্রি। প্লিজ রাগ করো না।

রাত্রির জবাব না শুনেই সজীব হাঁটতে লাগলো, যে বাসায় থাকে সেই বাসায় গিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। যুথির কাছে গিয়ে কি সবকিছুর জন্য সরি বলবে? নাকি তাকে তার মতো করে ছেড়ে দিয়ে নিজের নিঃসঙ্গতায় মৌন থাকবে?

রুম বন্ধ করে সজীব ছাদের উপর গেল, সেখানে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ এদিক সেদিক হাঁটছে। জীবনের গল্পের বড় হিসেবটা যে কোনভাবেই মিলছে না তার, এ জীবনের শেষ কোথায়? এরকম নানাধরণের কিছু ভাবতে আরম্ভ করলো সজীব।

বাড়িটা এখনো পরবর্তীতে ছাদ দিয়ে বড় করার ইচ্ছে আছে বলে মালিক ছাদে রেলিং করেনি। সজীব হাঁটতে হাঁটতে রেলিঙের দিকে গেল ঠিকই কিন্তু তার চোখে পরেছে যে সে কিনারের কাছেই। সজীব নির্দিষ্ট দুর্দান্ত রেখে পিছনে ঘুরে গেল কিন্তু পায়ের নিচে কলার খোসা চোখে পরলো না। ডান পা কলার খোসার উপর পরতেই পিছলে পড়ে গেল সজীব। প্রথমে রেলিঙের পাশে তারপরেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সোজা না।

"মা" বলে একটা চিৎকারের শব্দ হলো, আর ধুপ করে একটা আওয়াজ পাওয়া গেল।

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ২১ গল্পের ছবি