হৃদয়ের সবকথা নীরবতা

পর্ব - ১৯

🟢

সজীব কিছু না বলে তবুও বাইক নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো, কিন্তু যুথি তার সঙ্গে বাইকে উঠে নাই। সজীব তখন বাইকটা ঠিকাদারকে দিয়ে সে নিজেও হাঁটতে লাগলাে। যুথি একটু পরে যখন দেখতে পেলো সজীব পিছনে পিছনে আসছে সে একটু স্বস্তি পেল। জেদ করে বৃষ্টি কথা শুনে চলে এসেছে ঠিকই কিন্তু তার ইচ্ছে ছিল সজীব এর সঙ্গে বসুক।

রাত্রি যখন বলছিল যে আজকে স্যারের বান্ধবীর জন্মদিন, স্যার হয়তো সেখানে যাবার প্রোগ্রাম করেছে। কিন্তু আপনার বাবার জন্য সবকিছু মনে হয় বাদ দিয়ে দিয়েছে, কারণ এটাই করা উচিৎ।

এ কথা শুনে যুথি বলেছিল,

- বৃষ্টি আপু খুলনা এসেছে?

- হ্যাঁ সেটাই তো মনে হচ্ছে, গতকাল রাতে স্যার বলছিলেন কিছু একটা উপহার দেবে।

- উপহার?

- হ্যাঁ, কিন্তু পরে কিছু মনমতো হচ্ছে না বলে সে চুপ করে চলে গেল।

- আপনার স্যার কতবার দেখা করেছে তার সঙ্গে?

- তাতো জানি না, আমাকে বলে নাই।

- আচ্ছা ঠিক আছে।

ব্রিজটা হেঁটে পার হতে হয়েছে, তারপর ইজিবাইক করে ওরা সরাসরি আবু নাসের হাসপাতালে চলে এলো, যদিও রিজার্ভ করে আসতে হয়েছে কারণ সরাসরি কোন ইজিবাইক আসে না।

ইজিবাইক থেকে নেমে সজীব বললো,

- এখনো রেগে থাকবে?

- যুথি দাঁড়াল, কেন কি করলাম আমি?

- বৃষ্টির সঙ্গে আমার কোন দেখা হয়নি, সে দেশে ফিরেছে ঠিকই কিন্তু দেখা হয়নি।

- আমার তাতে কি?

- তুমি তো তার জন্য রাগ করে আছো।

- আমি রাগ করি নাকি কষ্ট পাই নাকি হাসি, তাতে আপনার কি কোন সমস্যা? আমার তো মনে হয় না যে আপনার এতে মাথা ব্যথা আছে।

- দেখো যুথি, আমি তোমার সঙ্গে যা করছি তার সবটুকু কিন্তু স্যারের স্বপ্ন পুরনের জন্য। নাহলে কিন্তু তোমাকে গ্রহণ করতে আমার কোন আপত্তি ছিল না।

- ওসব ভুলে গেছি, আচ্ছা একটা কথা বলবো?

- বলো।

- আমার ডায়েরিটা ফিরিয়ে দিবেন প্লিজ?

- হ্যাঁ দেবো।

- সত্যি সত্যি?

- হ্যাঁ, কারণ আমি ৩/৪ পাতা পড়েছিলাম তারপর আর পড়তে ইচ্ছে করছে না।

- কেন?

- পড়তে গেলে মনটা খারাপ হয়ে যায়, অতীতের মধ্যে হারিয়ে যেতে হয়। বুকের ভিতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে, সেটা বোঝানো সম্ভব না।

- বাহ, তারপর?

- কিছু না, আমি আবার হাসপাতালে আসার সময় নিয়ে আসবো।

- মেলা মেলা ধন্যবাদ সাহেব।

যুথি দেখলো তার বাবা ঘুমাচ্ছে, অসুস্থ হবার পর থেকে তার বাবার ঘুম বেড়ে গেছে। অবশ্য ডাক্তার ওষুধ দিয়েছে ঘুমের তাই এমন অবস্থা হয়তো। সে আর সজীব বেডের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, নার্সের কাছে জিজ্ঞেস করে জানলো যে তিনি নাকি ঔষধ খাইয়ে দিয়েছেন।

হাসপাতালের মধ্যে রোগীর সঙ্গীদের বসার স্থানে সজীব অনেকক্ষণ বসে রইল। যুথির চোখে মুখে বিরক্তি স্পষ্ট তাই তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না তার। স্যারের সঙ্গে ভালো করে কথা না বলে যেতেও পারে না তাই অপেক্ষা করা হচ্ছে। গ্রামের সেই সহজসরল যুথি আর এখানের এই যুথির মধ্যে কত পার্থক্য মনে হচ্ছে।

মাগরিবের কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ করে যুথি এসে বললো " বাবা আপনাকে ডাকছেন! "

সজীব আস্তে আস্তে গিয়ে স্যারের পাশে বসলো, যুথি তখন নিচে ইঞ্জেকশনের কথা বলে বেরিয়ে গেল। সজীব বললোঃ-

- এখন কেমন আছেন স্যার?

- অনেকটা ভালো বাবা, কিন্তু বারবার মনে হচ্ছে উপরের ডাক এসে গেছে।

- স্যার এভাবে ভেঙ্গে পরবেন না, নিজেকে শক্ত করতে হবে।

- আল্লাহ যদি আর দুই সপ্তাহ পরে অসুস্থ করতো তাহলে সবকিছু ঠিক হয়ে যেতো।

- মানে?

- তুমি তো জানো সজীব, আমার একমাত্র মেয়ে নিয়ে সকল চিন্তা। ওর একটা বিয়ে দিয়ে যেতে পারলে মৃত্যুতে সমস্যা নেই, কিন্তু এভাবে ওকে এ পৃথিবীতে একা রেখে কবরে কীভাবে যাবো? এই মাত্র কিছুদিন আগে যুথি একদিন কেঁদে কেঁদে বলেছিল "বাব আমি কোনদিন বিয়ে করবো না! "

- তারপর?

- কিন্তু তার দুদিন পরেই সেই মেম্বার আমাদের বাড়িতে এসে বিয়ের বিষয় আলোচনা শুরু করে। আমি তাকে বললাম যে আমার মেয়ে এই মুহূর্তে বিয়ে করতে চায় না। তখন তিনি বললেন, আপনি চিন্তা করবেন না মাস্টার সাহেব। আপনার মেয়ের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, যুথি নিজেই আমাকে আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলেছে।

- বলেন কি?

- হ্যাঁ সজীব, আমিও অবাক হয়ে গেলাম, তারপর যখন ওকে জিজ্ঞেস করলাম তখন ও রাজি হয়ে গেল। আর আমি বিয়ের বিষয় ভাবতে আরম্ভ করলাম।

- যুথির সঙ্গে যেই ছেলে স্কুলে চাকরি করে সেই ছেলের সঙ্গে তাহলে?

- হ্যাঁ, ছেলেটা একদিন এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। মাশাল্লাহ খুব সুন্দর ব্যবহার, আমার কাছে খুব পছন্দ হয়েছে আর তোমার আন্টির ও পছন্দ হয়েছে।

- আলহামদুলিল্লাহ।

- যুথিকে বললাম তোমাকে জানাতে, কিন্তু সে বললো তোমার নাম্বার নাকি বন্ধ।

সজীব চমকে গেল, যুথি মিথ্যা কেন বললো?

- স্যার আবার বললো, এ যাত্রা বেঁচে গেছি আমি, আল্লাহ হয়তো আমাকে অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তি করার জন্য বাঁচিয়ে দিয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে বারবার বলেছি যেন একটু সময় দেন। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে যেতে পারলেই বিয়েটা তাড়াতাড়ি শেষ করবো। তুমি কিন্তু অবশ্যই ছুটি নিয়ে আমার কাছে যাবে, আমার তো কোন ছেলে নেই।

হৃদয়ের সবকথা নীরবতা পর্ব ১৯ গল্পের ছবি